×

ইষ্টিকুটুম

ছোটচাচ্চু

Icon

দিলরুবা নীলা

প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ছোটচাচ্চু
আলভীর আজ ছোটচাচ্চুর কথা ভীষণ মনে পড়ছে। অবশ্য শুধু আজ না। প্রায় প্রতিদিনই ছোটচাচ্চুর কথা তার মনে পড়ে। আর মনে পড়লেই কোথা থেকে যেন পানি এসে চোখ ভরে যায়। তখনই মা অথবা ফুপি এসে বলে- কীরে আলভী কাঁদছিস? কী হলো তোর? আর কিছু হলেই কাঁদতে হবে? তুই কি মেয়ে নাকি? এদের কথার ভয়ে আলভী ঠিকমতো কাঁদতেও পারে না। মা, ফুপি যেন কেমন! কান্নার আবার ছেলেমেয়ে কী। মন খারাপ তো সবারই হতে পারে। আজ ছোটচাচ্চুর কথা মনে হওয়ার বিশেষ কারণ আছে। আজ রাতের ট্রেনে আলভী চট্টগ্রাম যাচ্ছে। সেখানকার ক্যাডেট স্কুলে পড়ে ও। ভর্তি হয়েছে এক বছর হলো। ঈদের ছুটিতে বাড়িতে এসেছিল। ছুটি শেষে আজ রাতে ফিরে যাচ্ছে। তবে এবারের যাওয়া বিশেষ কারণে গুরুত্বপূর্ণ। আলভী আজ রাতে যাচ্ছে একা। আলভীর বাবা নেই। বাড়িতে সে, মা আর ফুপি। এতদিন মায়ের সঙ্গেই সে যাওয়া-আসা করত। কিন্তু মা বলেছে, এখন থেকে তার একাই যেতে হবে। আর একা যাওয়া এমন কী কঠিন? ট্রেনে উঠিয়ে দিয়ে আসব। ওখানে স্টেশনে আলভীর খালামনি থাকবে। সে আলভীকে নিয়ে তার বাসায় যাবে। তারপর বিকালে ক্যাডেট কলেজে দিয়ে আসবে। আলভী এবার ক্লাস এইটে। যথেষ্ট বড়। মা বলে, যাদের বাবা থাকে না তাদের নাকি আগে আগে বড় হতে হয়। কিন্তু আলভী জানে ছোটচাচ্চু থাকলে তাকে কখনোই একা যেতে হতো না। অবশ্যই চাচ্চু তার সঙ্গে যেত। এই তো মাত্র দুই বছর আগের কথা। ছোটচাচ্চু ছিল আলভীর খেলার সাথী এবং প্রিয় বন্ধু। চাচ্চুর হাতে ভাত না খেলে তার চলত না। চাচ্চু মাথায় হাত বুলিয়ে না দিলে মোটেও ঘুম আসত না তার। আর আলভী যা চাইত ছোটচাচ্চু তাই ওকে এনে দিত। কলেজে পড়লেও চাচ্চু আলভীর সঙ্গে এমনভাবে মিশত, মনে হতো চাচ্চু যেন তারই সমবয়সি। আলভীর সেদিনের কথা মনে পড়ে যায়। দাদাবাড়িতে চাচ্চুর সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে একদিন জঙ্গলে ঢুকে পড়েছিল। জঙ্গলের বেত ঝোপের মধ্যে থোকায় থোকায় বেতফল ঝুলছিল। আলভী ছোটচাচ্চুকে বলল বেতফল এনে দিতে। ছোটচাচ্চু যে সেদিন কত কষ্ট করে বেতফল এনেছিল! বেতের কাঁটায় চাচ্চুর হাত কেটে গিয়েছিল। তা দেখে আলভী খুব কেঁদেছিল। সে কথা মনে পড়লে আলভীর এখনো কষ্ট হয়। আর এক ভয়াবহ দিনের কথা আলভী একদমই মনে করতে চায় না। সেদিন সন্ধ্যায় ছোটচাচ্চু আর আলভীর বাবা লঞ্চে করে আলভীর দাদাবাড়ি ঝালকাঠি যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছিল। আলভী খুব কান্নাকাটি করছিল ওদের সঙ্গে যাওয়ার জন্য। কিন্তু মা যেতে দেয়নি। আলভীর স্কুল আছে তাই। সেদিন রাতে ভয়ানক ঝড় হয়। আলভী ঘুমিয়ে ছিল। তার ঘুম ভাঙে মায়ের কান্নাকাটিতে। আলভী অত কিছু বোঝে না। দশ বছর বয়সের আলভী সেদিন শুধু বুঝেছিল, সেই ঝড়ে তার বাবাদের লঞ্চটা পানিতে ডুবে গিয়েছিল। তার বাবা বাড়িতে ফিরেছিল লাশ হয়ে। কিন্তু ছোটচাচ্চু ফেরেনি, তাকে পাওয়া যায়নি। আলভী এখনো ছোটচাচ্চুর ফেরার অপেক্ষা করে। তার নিশ্চিত ধারণা- চাচ্চু কোনো না কোনো দিন ফিরবেই। - এই আলভী ঝটপট তৈরি হয়ে নাও, ট্রেনের সময় হয়ে এলো। ফুপির কথা শুনে ভাবনার জগৎ থেকে ফিরে আসে আলভী। দেরি না করে আলভী তৈরি হয়ে নেয়। আলভীকে ট্রেনে তুলে দিয়ে ওর মা, ফুপি দুজনই ফিরে যায়। ট্রেন ছাড়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আলভী মায়ের হাত ধরে বসে ছিল। ভীষণ মন খারাপও হয়েছিল তার। কিন্তু মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিল, মাকে কিছুতেই বুঝতে দেবে না। মা বলেছে, যাদের বাবা নেই তাদের তাড়াতাড়ি বড় হতে হয়। তাকে মায়ের কথা মানতেই হবে। ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। আলভী বসেছে জানালার পাশে। যদিও জানালা বন্ধ এবং রাত। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। তবুও আলভীর জানালার পাশেই ভালো লাগে। - কী রে হিরো ভয় ভয় লাগছে? পরিচিত কণ্ঠ শুনে পাশে তাকায় আলভী। বিস্ময়ে আলভীর চোখ ছানাবড়া! আরে এতো ছোটচাচ্চু! - চাচ্চু তুমি? - হ্যাঁ আমি। কেন বিশ্বাস হচ্ছে না? - না হচ্ছে না। - তাহলে তোর হাতে চিমটি কেটে দেখ। ব্যথা পেলে ভাববি সত্য আর ব্যথা না পেলে ভাববি স্বপ্ন। আলভী সত্যি সত্যি হাতে চিমটি কাটে এবং ব্যথা পায়। তার মানে ঘটনা সত্য। ছোট চাচ্চু তার পাশেই বসে আছে। আনন্দে আলভীর চোখে পানি এসে যায়। সে অন্য দিকে তাকায়। চোখের পানি চাচ্চুকে দেখাতে চায় না। কারণ ফুপি তাকে বলেছে, ছেলেদের কাঁদতে নেই। কান্নাকাটি এগুলো মেয়েদের কাজ। - এই হিরো, কাঁদছিস নাকি? - না কাঁদছি না। কাঁদব কেন? আমি কি মেয়ে? - তাইতো, আমাদের হিরো তো মেয়ে না। ছেলে এবং অনেক বড় একটা ছেলে। সে এখন একা একাই চলতে শিখেছে। - এত কথা বলো না, তুমি এতদিন কোথায় ছিলে, তাই বলো। আর ট্রেনেই বা এলে কী করে? তুমি কি জানতে আমি আজ যাচ্ছি? - এত প্রশ্ন করলে কোনটা রেখে কোনটার উত্তর দেবো? আমি তোর সব খবরই জানি। আমি তোর চাচ্চুর পাশাপাশি বন্ধুতো, তাই না? তোকে একা ছাড়তে পারি? তোর তো বোরিং লাগত। তাই এলাম। সারারাত গল্প করতে করতে যাব। আলভী চাচ্চুর প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে চাচ্চুর বুকে মাথা রাখে। কখন যে ঘুমিয়ে পড়ে বুঝতেও পারে না। - এই ছেলে ওঠো ট্রেন থেমেছে। এক অচেনা লোকের ডাকে আলভীর ঘুম ভাঙে। আশপাশে তাকিয়ে সে ছোটচাচ্চুকে খোঁজে, কিন্তু কোথাও দেখতে পায় না। ধীর পায়ে আলভী ট্রেন থেকে নামে। দেখে স্টেশনে তার খালামনি আর খালু দাঁড়িয়ে। তাকে নিতে এসেছে। আলভীকে খালামনি জড়িয়ে ধরে। - বাহ আমাদের আলভী তো বড় হয়ে গেছে, একাই আসতে পারে। খালামনির কথা শুনে আলভী মিষ্টি করে হাসে। এ হাসির মধ্যে যে বিরাট রহস্য লুকিয়ে আছে তা আলভী ছাড়া কেউ জানে না।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App