×
Icon এইমাত্র
কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কোটা আন্দোলনকারীরা বাংলাদেশ টেলিভিশনের মূল ভবনে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ। কোটা সংস্কার আন্দোলনে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ১৯ জন নিহত কোটা ইস্যুতে আপিল বিভাগে শুনানি রবিবার: চেম্বার আদালতের আদেশ ছাত্রলীগের ওয়েবসাইট হ্যাক ‘লাশ-রক্ত মাড়িয়ে’ সংলাপে বসতে রাজি নন আন্দোলনকারীরা

প্রথম পাতা

সরকারের কাছেই সমাধান চান কোটাবিরোধীরা

শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরার আহ্বান সরকারপক্ষের

Icon

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সরকারের কাছেই সমাধান  চান কোটাবিরোধীরা

কাগজ প্রতিবেদক : হাইকোর্টের আদেশে এক মাসের এই স্থিতাবস্থায় এই সময়ে সরকারি চাকরিতে কোটা থাকবে না এবং কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদেরও শ্রেণিকক্ষে ফিরতে বলেছেন প্রধান বিচারপতি। শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন সরকারের শীর্ষ মন্ত্রীরাও। কিন্তু এসবের কিছুই মানতে নারাজ শিক্ষার্থীরা। ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে তারা আগের মতোই অবরোধ-কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। একই দাবিতে আজ বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৩টা থেকে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি পালন করবে তারা। তাদের নতুন দাবি, আদালত নয়, সরকারের নির্বাহী বিভাগ থেকে সুস্পষ্ট ঘোষণা আসতে হবে।

গতকাল বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আজ বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৩টা থেকে বাংলা ব্লকেড কর্মসূচি শুরু হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শাহবাগ অবরোধ করা হবে। এ সময় আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নির্বাহী বিভাগের সর্বোচ্চ পদ থেকে প্রতিশ্রæতি পেলে শিক্ষার্থীরা রাজপথ ছাড়বেন। পাশাপাশি যৌক্তিক সংস্কার করে নিয়োগের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ কোটা রাখারও দাবি জানান শিক্ষার্থীরা। তারা বলেন, শুধু অনগ্রসর জনগোষ্ঠী এবং মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা কোটা পেতে পারেন। নাতি-নাতনিরা নন।

এদিকে পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী, গতকাল সকাল থেকেই অবরোধে নামে তারা। বাংলা ব্লকেড নাম দেয়া আন্দোলনে সড়ক অবরোধ করে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। দুপুরে রাজধানী ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ অন্তত ২০টি পয়েন্ট অবরোধ করে রাখে তারা। এতে প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে মহানগরীর পরিবহনব্যবস্থা। তীব্র ভোগান্তিতে পড়েন অসংখ্য মানুষ। হাসপাতালে যাতায়াতেও সমস্যা হয়।

সরকারের কাছে সমাধান চায় আন্দোলনকারীরা : সরকারি চাকরির প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেয়া রায়ের ওপর চার সপ্তাহের স্থিতাবস্থা জারি করেছেন আপিল বিভাগ। আপিল বিভাগের এমন আদেশকে ‘আন্দোলন দমানোর কৌশল’ হিসেবে দেখছে শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, আন্দোলন দমানোর চেষ্টা না করে একটি কমিশন গঠন করে কোটা নিয়ে স্থায়ী সমাধান করুন। এছাড়া ছাত্রসমাজ রাজপথ ছাড়বে না। কোটাকে ন্যূনতম মাত্রায় এনে সংসদে আইন পাস করে কোটা

পদ্ধতিকে সংস্কার করার দাবিতে চলমান আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে তারা।

আপিল বিভাগের আদেশের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, আদালতের সঙ্গে আমাদের আজকের আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা মূলত নির্বাহী বিভাগের কাছেই কোটা-সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান চাইছি। এক দফা দাবি। এটি আদালতের এখতিয়ার নয়। এটি একমাত্র নির্বাহী বিভাগই পূরণ করতে পারবে। সরকারের কাছ থেকেই আমরা সুস্পষ্ট বক্তব্য আশা করছি।

আন্দোলনকারীদের আরেক সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, আমরা আপিল বিভাগের এমন আদেশে আশাহত হয়েছি। আমরা একটি স্থায়ী সমাধান চেয়েছিলাম। কিন্তু মনে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমাতেই সরকার এমন ‘মুলা ঝুলিয়েছে’। কানাকে হাইকোর্ট দেখানোর রায় দেয়া হয়েছে! আমরা অসুস্থ হচ্ছি কিন্তু দমে যাইনি। কমিশন গঠন করে কোটা পদ্ধতি সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত আমরা রাজপথ ছাড়ব না। আমাদের অবস্থান পরিষ্কার, আমরা স্থায়ী সমাধান চাই। আমরা চাই কোটা নিয়ে পৃথক একটি স্বাধীন কমিশন গঠনের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে এই সমস্যাটির সমাধান করা হোক।

কী বলেছে আদালত : হাইকোর্ট মুক্তিযোদ্ধা কোটা পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয়ার পর রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করে। গত ৪ জুলাই এ বিষয়ে আপিল বিভাগে শুনানির দিন ধার্য ছিল। তবে রিটকারীর পক্ষে সময়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের রায় আপাতত বহাল রাখে আপিল বিভাগ। এদিকে গত মঙ্গলবার দুই শিক্ষার্থীও হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য অনুমতি চেয়ে আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালতে আবেদন করেন। চেম্বার জজ বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম তাদের হলফনামা করার অনুমতি দেন এবং বিষয়টি আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য গতকাল বুধবারের কার্যতালিকায় রাখেন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যেই গতকাল সুপ্রিম কোর্টে শুনানি শুরু হয়। আপিলকারী রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন, আপিলকারী দুই শিক্ষার্থীর পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট শাহ মনজুরুল হক। রিটকারীর পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মনসুরুল হক চৌধুরী।

প্রাথমিক শুনানি নিয়ে প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ সব পক্ষকে চার সপ্তাহ স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশ দেন। কিছু পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা দিয়ে সর্বোচ্চ আদালত বলেন, কোটা নিয়ে এখন কোনো কথা বলা যাবে না। হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে আপিল বিভাগ আবার বিষয়টি শুনবে। এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানি হবে আগামী ৭ অগাস্ট। প্রধান বিচারপতি তার আদেশের সঙ্গে তিনটি পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা দেন। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের তিনি শ্রেণিকক্ষে ফিরে যেতে বলেন। শিক্ষকদের বলেন ছাত্রদের বুঝিয়ে শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে নিতে। আর সংক্ষুব্ধদের উদ্দেশে বলেন, কোনো শিক্ষার্থী যদি মামলায় যুক্ত হতে চান, আইনজীবীর মাধ্যমে যুক্ত হতে পারবেন, শুনানি হলে তখন তাদের কথাও শোনা হবে। এ সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, আপিল বিভাগ প্রয়োজনে সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টের রায় সংশোধন কিংবা এ বিষয়টি নিয়ে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটিও করতে পারে।

অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন জানান, আপিল বিভাগ সাবজেক্ট ম্যাটারে স্থিতাবস্থা জারি করেছে। ফলে হাইকোর্টের রায়ের আগে যেমন ছিল, সব তেমন থাকবে। তার আগে কোটা বাতিল-সংক্রান্ত ২০১৮ সালের পরিপত্র কার্যকর ছিল, সেটি থাকবে। এর আগে আদালতে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আমরা এখনো হাইকোর্টের রায়ের অনুলিপি পাইনি। রায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা কিছুই করতে পারছি না। কোটা রাখা না রাখা সরকারের নীতিগত বিষয়। যেহেতু গত ৫ বছর ধরে কোটা পদ্ধতি বিলুপ্ত ছিল, এরপরও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন আপনারা। সে পর্যন্ত হাইকোর্টের রায় স্থগিত চাই।

দুই শিক্ষার্থীর আইনজীবী ব্যারিস্টার শাহ মনজুরুল হক বলেন, আমরা কোটা সম্পূর্ণ বাতিল চাই না। তবে চলমান সংকট নিরসনে হাইকোর্টের রায় হাতে না পাওয়া পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহালের রায় স্থগিত চাচ্ছি।

রিটকারীদের আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী বলেন, সব কোটা নিয়ে নয়, আমাদের আপত্তি মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল নিয়ে। জাতির পিতা মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা দিয়েছেন। মেধা দিয়েই মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। শুধু চূড়ান্ত বিচারে কোটার সুবিধা পায়। বাতিল আন্দোলনের নামে অনেকে এখন মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান করে কথা বলছেন। মেধা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। আমরা চাই, মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল থাকুক।

শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরার আহ্বান : শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিরা। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, কোটার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে সর্বোচ্চ আদালত। আগস্ট মাসে চূড়ান্ত শুনানিতে শিক্ষার্থীদের দাবি সুবিবেচনা করে সিদ্ধান্ত দেবে আদালত। আদালত শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যেতে বলেছে। আমরা শিক্ষার্থীদের অনুরোধ করব ফিরে যেতে।

তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতও বলেছেন, সর্বোচ্চ আদালতের আদেশে ২০১৮ সালে কোটা বাতিলসংক্রান্ত সরকারের পরিপত্র বলবৎ আছে। তাই জনদুর্ভোগ তৈরি থেকে আন্দোলনকারীদের বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি। ফেসবুকে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ?সর্বোচ্চ আদালত শুধু স্থিতাবস্থার আদেশ দেননি। শুধু স্থিতাবস্থার আদেশ দিলে কোটা বিষয়ে সরকারের পরিপত্র বাতিল করে উচ্চ আদালত যে রায় দিয়েছিল সেটি বলবৎ থাকত। খেয়াল করতে হবে, সর্বোচ্চ আদালত কোটার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে আদেশ দিয়েছেন। অর্থাৎ কোটা বিষয়ে সরকারের জারি করা পরিপত্র এখন আবার বলবৎ হলো।

প্রসঙ্গত, কোটা নিয়ে গত কয়েকদিন জল ঘোলা কম হয়নি। ঘটনার সূত্রপাত ৫ জুন হাইকোর্টের এক রায়কে ঘিরে। রায়ে আদালত বাতিল হওয়া মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল রাখেন। এরপর শুরু হয় কোটাবিরোধী আন্দোলন। ১ জুলাই থেকে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ব্যানারে তারা কোটা বাতিলসহ চার দফা দাবিতে বিক্ষোভ করে। এর অংশ হিসেবে রবি ও সোমবার ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় অবরোধ করে তারা ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি পালন করে। তাদের অবরোধের কারণে শহরজুড়ে ব্যাপক যানজটে নাকাল হতে হয় নাগরিকদের।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App