×

প্রথম পাতা

স্থবির ঢাকা, দুর্ভোগ চরমে

বাংলা ব্লকেডে রেল ও মহাসড়ক অবরোধ, কাল সর্বাত্মক কর্মসূচি

Icon

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

স্থবির ঢাকা, দুর্ভোগ চরমে

কাগজ প্রতিবেদক : সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের দাবিতে পূর্বঘোষিত ‘বাংলা ব্লকেড’ এর আওতায় টানা দ্বিতীয় দিনের মতো রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছেন শিক্ষার্থীরা। এতে ট্রেনসহ বিভিন্ন ধরনের যান চলাচলে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়, চরম ভোগান্তিতে পড়ে মানুষ।

পূর্বনির্ধারিত ঘোষণা অনুযায়ী গতকাল সোমবার বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে ‘বাংলা ব্লকেড’ আন্দোলনে শামিল হতে রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে জড়ো হন শিক্ষার্থীরা। স্যায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা এবং আগারগাঁওয়ে জড়ো হন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে চলে শিক্ষার্থীদের মিছিল, সেøাগান। এতে মহানগরীর বিভিন্ন পয়েন্ট আটকে যাওয়ায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।

আন্দোলনকারীরা বলছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা ক্লাসে ফিরবেন না। ঢাকা কলেজের সমন্বয়ক মো. রাকিব হোসেন বলেন, আমাদের এই আন্দোলন সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক আন্দোলন। আমরা চাই সরকার আমাদের যৌক্তিক দাবি মেনে নিক। শিক্ষার্থী পড়ার টেবিলে ফিরে যাবে। আর যদি দাবি মেনে না নেয়া হয়, তাহলে আমরা ঘরে ফিরব না। রাত ৮টা পর্যন্ত বিভিন্ন রাস্তা ব্লক করে সেøাগান, গান, কবিতা, লুডু খেলে সময় কাটান আন্দোলনকারীরা। আজ মঙ্গলবার বিকালে আবার ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি চলবে- এমন ঘোষণা দিয়ে গতকাল রাত আটটায় অবরোধ কর্মসূচি শেষ করেন তারা। আন্দোলনের সমন্বয়কারী নাহিদ ইসলাম বলেন, আজ মঙ্গলবার অনলাইন-অফলাইনে কর্মসূচি চলবে। আগামীকাল বুধবার সর্বাত্মক ব্লকেড কর্মসূচি পালন করা হবে।

কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য ৬৫ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করেছে আন্দোলনকারীরা। এদিকে আপিল বিভাগের রায় পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের ধৈর্য ধরার অনুরোধ করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন। আর উচ্চ আদালতে বিচারাধীন বিষয় নিয়ে কোনো ধরনের মন্তব্য করা আইনসিদ্ধ নয় বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। কোটা বাতিলের বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন, তাই আদালতের চূড়ান্ত রায় পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের অপেক্ষা করতে বলেছেন তিনি। একই সঙ্গে জনদুর্ভোগ হয়- এমন আন্দোলন পরিহার করার আহ্বান জানিয়েছেন।

সেতুমন্ত্রী বলেন, আমরা মনে করি, দেশের উচ্চ আদালত বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে রায় দেবেন। শেখ হাসিনা স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে যে সংগ্রাম শুরু করেছেন, তার মূল চালিকাশক্তি হলো মেধাবী জনগোষ্ঠী। শিক্ষিত, দক্ষ, স্মার্ট প্রজন্ম গঠনের মধ্য দিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের সংগ্রামকে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে নিতে মেধাবী তরুণ প্রজন্ম আমাদের প্রধান প্রয়োজন।

স্থবির ঢাকা, দুর্ভোগ চরমে : কোটা বাতিলের এক দফা দাবিতে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচিতে দ্বিতীয় দিনের মতো রাজধানীর শাহবাগ, নীলক্ষেত, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার,

ফার্মগেট, সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়, গুলিস্তানের জিরো পয়েন্ট, চানখাঁরপুলসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন আন্দোলনকারীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ব্যানারে মিছিল বের করা হয়। পরে মিছিলটি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে শাহবাগ মোড়ে আসে। মিছিলের সামনের অংশটি সড়ক অবরোধ করতে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ও বাংলামোটর মোড়ের দিকে চলে যায়। পেছনের অংশটি শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেয়। এ সময় শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেয়া আন্দোলনকারীরা তাদের উত্থাপিত দাবির পক্ষে বিভিন্ন সেøাগান ও বক্তব্য রাখেন। পরে শাহবাগ থেকে একদল শিক্ষার্থী মৎস্য ভবন এবং আরেকদল শিক্ষার্থী বাংলামোটরের দিকে যায়। বিকাল পৌনে ৫টার দিকে একদল শিক্ষার্থী কারওয়ান বাজার হয়ে মিছিল নিয়ে ফার্মগেট অভিমুখে গেলে কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় অবরোধে আটকে পড়া অনেককে পায়ে হেঁটে গন্তব্যে যেতে দেখা যায়। এতে রাজধানীর বড় একটি অংশ কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।

এদিকে বিকাল ৩টা ২০ মিনিটের দিকে ঢাকা কলেজের মূল ফটক থেকে মিছিল শুরু করেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা। প্রথমে তারা মিছিল নিয়ে সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় পর্যন্ত যান। পরে মিছিলটি নীলক্ষেত মোড় হয়ে ইডেন কলেজের সামনে পৌঁছলে ইডেন কলেজের শিক্ষার্থীরাও যোগ দেন। বিকাল পৌনে ৪টার দিকে মিছিলটি আবার ঢাকা কলেজের দিকে চলে আসে। বিকাল ৪টার দিকে মিছিলটি সায়েন্সল্যাব মোড়ে পৌঁছলে শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করেন। এতে বন্ধ হয়ে যায় মিরপুর সড়ক। আগারগাঁওয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিকাল সোয়া ৪টার দিকে সড়ক অবরোধ করেন। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়ে মানুষজন। গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকায় অনেককে পায়ে হেঁটেই গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হতে দেখা যায়।

কাইয়ুম আহমেদ নামের এক পথচারী বলেন, সাভারের উদ্দেশে গুলিস্তান থেকে ডি-লিংক পরিবহনের বাসে উঠেছিলাম। কিন্তু এখানে আসতেই অবরোধের মুখে পড়তে হলো। এখন বাস থেকে বস্তা নিয়ে কিছুটা সামনে এগোনোর চেষ্টা করছি। অবরোধ ছাড়ার জন্য অপেক্ষা করলে রাত পর্যন্ত বসে থাকতে হবে। সেজন্য পায়ে হেঁটে কিছুদূর এগোনোর চেষ্টা করছি।

জুনায়েদ আহসান নামের আরেক পথচারী বলেন, রবিবারও এই একই অবস্থা ছিল। অফিস থেকে ঘরে ফেরার সময় চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। এর একটি সমাধান করা উচিত। প্রতিদিন এমন অবস্থা হলে কর্মজীবী-শ্রমজীবী মানুষের ভোগান্তি হয়। সেজন্য বিষয়টি নিয়ে সমাধানের পথে হাঁটা উচিত।

রেল ও মহাসড়ক অবরোধ : এদিকে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে কোটা সংস্কারের দাবিতে দুপুর থেকেই রেল ও সড়ক পথ অবরোধ করে আন্দোলন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীরা। এতে ট্রেন চলাচলে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অবরোধে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে দীর্ঘ সময় যান চলাচল বন্ধ থাকে। মহাসড়কের দুপাশে কয়েক কিলোমিটার যানজটের সৃষ্টি হয়। তৃতীয় দিনের মতো ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথ অবরোধ করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) শিক্ষার্থীরা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবা?ড়ী বিশ্ব?রোড এলাকায় অবরোধ ক?রে?ন শিক্ষার্থীরা। বিকাল পৌনে ৪টা থে?কে মহাসড়?কের দুপাশে যানজ?টের সৃষ্টি হয়। ‘রাষ্ট্র মেরামত চলছে, সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত’ এমন নোটিস টাঙিয়ে ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক অবরোধ করেন গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা।

আন্দোলনকারীদের ৬৫ সদস্যের কমিটি : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ব্যানারে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ৬৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছেন। এ কমিটিতে সমন্বয়ক হিসেবে রয়েছেন ২৩ জন এবং বাকি ৪২ জনকে সহসমন্বয়ক হিসেবে রাখা হয়েছে। গতকাল এ প্ল্যাটফর্মের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কোটাবৈষম্যের স্থায়ী সমাধানের দাবিতে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ সফল করার জন্য সারাদেশে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের নিয়ে ৬৫ সদস্যবিশিষ্ট সমন্বয়ক টিম গঠন করা হলো। পরে সারাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়কদের নিয়ে এই কমিটি আরো বর্ধিত করা হবে।

কমিটির সমন্বয়করা হলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ, আসিফ মাহমুদ, মো. মাহিন সরকার, আব্দুল কাদের, আবু বাকের মজুমদার, আব্দুল হান্নান মাসুদ, আদনান আবির, জামান মৃধা, মোহাম্মদ সোহাগ মিয়া, নুসরাত তাবাসসুম, রাফিয়া রেহনুমা হৃদি, মুমতাহীনা মাহজাবিন মোহনা, আনিকা তাহসিনা, উমামা ফাতেমা, আলিফ হোসাইন ও কাউসার মিয়া। আরো রয়েছেন- জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরিফ সোহেল, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাসেল আহমেদ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আসাদুল্লাহ আল গালিব, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মো. তৌহিদ আহমেদ আশিক ও ইডেন মহিলা কলেজের সাবিনা ইয়াসমিন।

কমিটির অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, এটি আমাদের কোনো সংগঠন নয়, এটা একটা সমন্বয়ক টিম। কোটা আন্দোলনকেন্দ্রিক কখন প্রোগ্রাম ডাকা হবে, কখন বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে তার নির্দেশনা দেয়ার জন্যই আমাদের এই কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী প্রত্যেকের কাজ ভাগ করা থাকবে। কোটা আন্দোলনকে সুশৃঙ্খলভাবে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য আমাদের এই কমিটি কাজ করে যাবে।

আন্দোলনে রাজনৈতিক উপাদান : কোটাবিরোধী আন্দোলনে রাজনৈতিক উপাদান যুক্ত হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, আমাদের বিভক্ত ও মেরুকরণের রাজনীতি এখানে যুক্ত হয়ে গেছে। কারণ, বিএনপি প্রকাশ্যে এবং তাদের সমমনারা এই কোটা আন্দোলনের ওপর ভর করেছে। তারা সমর্থন করেছে প্রকাশ্যেই। সমর্থন করা মানেই তারা এর মধ্যে অংশগ্রহণও করেছে। কাজেই এটা এখন মেরুকরণের রাজনীতির ধারার মধ্যেই পড়ে গেছে। এটার রাজনৈতিক রং নতুন করে বলার আর অপেক্ষা রাখে না।

প্রসঙ্গত সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা বাতিল করে ২০১৮ সালে সরকারের জারি করা পরিপত্র পুনর্বহালসহ চার দফা দাবি আদায়ে শিক্ষার্থীরা এই আন্দোলন করছেন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App