×

প্রথম পাতা

ঝুলন্ত পার্লামেন্ট পেতে যাচ্ছে ফ্রান্স

কট্টর ডানপন্থিদের থামিয়ে বাম জোটের নাটকীয় জয়

Icon

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কট্টর ডানপন্থিদের থামিয়ে  বাম জোটের নাটকীয় জয়

কাগজ ডেস্ক : ফ্রান্সের জনগণ আবারো জানিয়ে দিল যে, তারা কট্টর ডানপন্থিদের রাষ্ট্র ক্ষমতায় দেখতে চায় না। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছিল ডানপন্থিরা। এমনকি, ফ্রান্সের পার্লামেন্ট নির্বাচনের ক্ষেত্রেও প্রথম দফায় এগিয়ে ছিল তারা। কিন্তু রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য যে নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত করাটা সবচেয়ে বেশি জরুরি ছিল, সেখানেই পিছিয়ে পড়ল মেরিন লে পেনের কট্টর ডানপন্থি দল ন্যাশনাল র‌্যালি (আরএন)। দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে সবাইকে অবাক করে শীর্ষস্থান দখল করেছে বামপন্থি দলগুলোর জোট নিউ পপুলার ফ্রন্ট (এনএফপি)। প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁর মধ্যপন্থি জোট অনসম্বল অ্যালায়েন্স দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে। আর কট্টর ডানপন্থিরা চলে গেছে তৃতীয় অবস্থানে।

আনুষ্ঠানিক ফলাফলে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় ঝুলন্ত পার্লামেন্ট পেতে যাচ্ছে ফ্রান্স। বামপন্থি, মধ্যপন্থি ও ডানপন্থি- এ তিনটি বড় জোটের একসঙ্গে কাজ করার কোনো ঐতিহ্য নেই। প্রত্যেকেরই রয়েছে পুরোপুরি পৃথক ধরনের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এনএফপি কাকে মনোনয়ন দেবে তা এখনো স্পষ্ট হয়নি। তবে নানা অস্পষ্টতা সত্ত্বেও পরবর্তী সময়ে ফরাসি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সামনে এসেছে জঁ-ল্যুক মেলঁশোঁর নাম। ফ্রান্সের বামপন্থি রাজনৈতিক আন্দোলন লা ফ্রঁস আঁসুমিজ-এর প্রতিষ্ঠাতা নেতা তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম দ্য পলিটিকো লিখেছে, এখন বড় প্রশ্ন হলো বামপন্থিরা কাকে প্রধানমন্ত্রী

হিসেবে দায়িত্ব দেবেন। এ নিয়ে কার্যত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি নিউ পপুলার ফ্রন্ট।

এক মাস আগে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট নির্বাচনে ফ্রান্স থেকে কট্টর ডানপন্থিরা জয় পাওয়ার পর হতাশ মাক্রোঁ দেশে আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচনের ডাক দেন। ইইউয়ের নির্বাচনে ডানপন্থিদের এই জোয়ারে মাক্রোঁর মধ্যপন্থি দল খারাপ ফল করায় তিনি জুনে পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে আগাম নির্বাচন ঘোষণা দেন।

দুই পর্বে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের প্রথম পর্বে কট্টর ডানপন্থিরা জয়ী হওয়ার পর দ্বিতীয় পর্বে তাদের ঠেকাতে বামপন্থি ও মধ্যপন্থি দলগুলো একজোট হয়ে লড়াই করে। দুইশরও বেশি নির্বাচনী আসনে মধ্যপন্থি ও বামপন্থি প্রার্থীরা তাদের মধ্যে এগিয়ে থাকা প্রার্থীর পক্ষে সমর্থন দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে যান।

ফ্রান্সের পার্লামেন্টে ৫৭৭টি আসন আছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, বামপন্থিদের জোট নিউ পপুলার ফ্রন্ট (এনএফপি) পেয়েছে ১৮২টি আসন। এরপর ১৬৮টি আসন পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মধ্যপন্থি জোট অনসম্বল অ্যালায়েন্স। আর কট্টর ডানপন্থি ন্যাশনাল র?্যালি (আরএন) জয় পেয়েছে ১৪৩টি আসনে।

ন্যাশনাল র?্যালির নেতা মেরিন লে পেন বলেছেন, এবারের নির্বাচনের ফলাফলের মধ্যে তিনি আগামী দিনের বিজয়ের বীজ দেখতে পাচ্ছেন। দলটির আরেকজন নেতা জর্ডান বার্দেলা বাম ও মধ্যপন্থিদের ইঙ্গিত করে বলেছেন, ‘অস্বাভাবিক’ এবং ‘মর্যাদাহীন’ জোট ফ্রান্সের জনগণকে ‘ন্যাশনাল র?্যালির বিজয়’ থেকে বঞ্চিত করেছে।

বামপন্থি সমর্থকদের বিজয়োল্লাস : রবিবারের ভোটের রাতটি ফ্রান্সের সবার জন্য অপ্রত্যাশিত বার্তা নিয়ে আসে। এ সময় বামপন্থি সমর্থকদের ব্যাপক বিজয়োল্লাস করতে দেখা যায়। উদযাপনে শামিল হন ২৩ বছর বয়সি ডিজাইনার ব্যাপতিস্তে ফোরাস্তি। তিনি বলেন, আমরা এমনটা আশা করিনি। কোনো জনমত জরিপই এমন আভাস দিতে পারেনি। আমরা আনন্দিত যে ফরাসি জনগণ আরো একবার উগ্র ডানপন্থিদের আটকে দিতে সফল হয়েছে। তবে ফোরাস্তির মধ্যে কিছুটা উৎকণ্ঠাও দেখা গেল। তার আশঙ্কা, উগ্র ডানপন্থিদের শক্তি আরো বেড়ে যেতে পারে এবং পরের বার জিতে যেতে পারে। তিনি বলেন, ঝুলন্ত পার্লামেন্টে কাজ করাটা কঠিন হবে। কিন্তু উগ্র ডানপন্থিদের এগিয়ে থাকার তুলনায় তো অন্তত ভালো কিছু হলো।

নির্বাচনের এই ফল মধ্যপন্থি প্রেসিডেন্ট মাক্রোঁর জন্যও একটি ধাক্কা, কারণ তিনি আগাম এ নির্বাচনের ডাক দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পেলেন একটি ঝুলন্ত পার্লামেন্ট। এতে ইইউতে ফ্রান্সের ভূমিকা দুর্বল হয়ে ওঠার আশঙ্কা আছে।

নিউ পপুলার ফ্রন্ট এখন কী করবে : প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ গত ৯ জুন আগাম নির্বাচন ঘোষণা করার পর সোশ্যালিস্ট (সমাজতান্ত্রিক), পরিবেশবাদী, কমিউনিস্ট ও কট্টর বামপন্থী দল ফ্রান্স আনবোয়েড পার্টি (এলএফআই) মিলে নতুন যে জোটটি গড়ে তোলেন, সেটিই ‘নিউ পপুলার ফ্রন্ট’ নামে পরিচিতি পায়। এই দলগুলো আগে একে অপরের সমালোচনা করত এবং তাদের আদর্শ ও কর্মপদ্ধতির মধ্যেও বেশ ব্যবধান রয়েছে। তারপরও তারা জোট গঠন করেছে যেন কট্টর ডানপন্থিরা কোনোভাবেই রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে না পারে। বস্তুত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কট্টর ডানপন্থি কোনো দল ফ্রান্সের রাষ্ট্রক্ষমতায় বসতে পারেনি।

নিউ পপুলার ফ্রন্টের পক্ষ থেকে বর্তমান সরকারের পাস করা পেনশন ও অভিবাসনবিষয়ক সংশোধিত আইন বাতিলের প্রতিশ্রæতি দেয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে অবৈধ অভিবাসীদের ব্যবস্থাপনা এবং ভিসা আবেদনের বন্দোবস্ত করার জন্য একটি সহায়তাকারী সংস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্রæতি দেয়া হয়েছে। এছাড়া জীবনযাপনের ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নির্ধারণ করা এবং ন্যূনতম বেতন বাড়ানোরও ঘোষণাও দিয়েছে বামপন্থিদের নতুন এই জোট।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বামপন্থি জোট নিউ পপুলার ফ্রন্ট (এনএফপি) জয়ী হলেও তারা প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। এমন অবস্থায় সরকার গঠনের ক্ষেত্রে এনএফপির সামনে দুটি পথ খোলা আছে। এনএফপিকে হয় কমসংখ্যক আসন নিয়েই সংখ্যালঘু সরকার হিসেবে কাজ করতে হবে। এতে ঝুলন্ত পার্লামেন্ট হবে এবং কোনো আইন পাস করাতে অন্য পক্ষের সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে হবে। আর কম সংখ্যক আসন নিয়ে সরকার গঠন করতে না চাইলে অন্য কাউকে নিজেদের জোটের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

এনএফপি জোটভুক্ত দলের মধ্যে আছে- ফ্রেঞ্চ কমিউনিস্ট পার্টি, ফ্রান্স আনবোয়েড পার্টি, গ্রিনস এবং সোশ্যালিস্ট পার্টি। সামনের কাজগুলো কী হবে তা নিয়ে দলগুলোর নেতারা রবিবার রাতেই প্রথম দফার আলোচনা সেরেছেন।

সমঝোতা না হলে যা হবে : নির্বাচন পরবর্তী সময়ে জোট গড়ে সরকার গঠনের ব্যাপারে সমঝোতা না হলেও ফ্রান্সের সংবিধান অনুসারে আগামী ১২ মাসের মধ্যে ম্যাক্রোঁ নতুন পার্লামেন্ট নির্বাচনের আয়োজন করতে পারবেন না।

সংবিধানে বলা আছে, কাকে সরকার গঠন করতে বলা হবে সে সিদ্ধান্তটি নেবেন প্রেসিডেন্ট তথা ম্যাক্রোঁ। তবে তিনি যাকেই বেছে নেন না কেন, তাকে জাতীয় পরিষদে আস্থা ভোটের মুখোমুখি হতে হবে। ১৮ জুলাই এ ভোটাভুটি হতে পারে। এর মানে হলো, ম্যাক্রোঁকে এমন কোনো নাম প্রস্তাব করতে হবে, যেটি বেশির ভাগ আইনপ্রণেতার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।

ইউরোপীয় মিত্রদের প্রতিক্রিয়া : ফ্রান্সের নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থিদের সরকার গঠনের আশঙ্কা আপাতত এড়ানো সম্ভব হওয়ায় উচ্ছ¡াস প্রকাশ করেছে ইউরোপের অনেক মিত্রদেশ। তারা মনে করছে, এর মধ্য দিয়ে সবচেয়ে বাজে পরিস্থিতি অন্তত এড়ানো গেছে।

ইউক্রেনের মিত্রদের আশঙ্কা ছিল, ফ্রান্সে লে পেনের নেতৃত্বাধীন সরকার এলে তারা মস্কোর প্রতি নমনীয় হতে পারে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রুশ অভিযান শুরুর পর থেকে ফ্রান্সসহ অন্যান্য পশ্চিমা মিত্রের সহায়তার ওপর নির্ভর করে আসছে কিয়েভ। লে পেন সরকার গঠন করলে এ সহায়তা কমিয়ে দিতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল। যদিও স¤প্রতি তার দল রাশিয়াকে ‘হুমকি’ বলে আখ্যা দিয়েছে।

পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, প্যারিসে উদ্দীপনা, মস্কোয় হতাশা, কিয়েভে স্বস্তি। ওয়ারশের (পোল্যান্ডের রাজধানী) খুশি হওয়ার জন্য যথেষ্ট।

জার্মানির চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজের দল সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটসের বৈদেশিক নীতির মুখপাত্র নিলস স্কিমিড বলেন, ভয়াবহ খারাপ পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে অস্পষ্টতার মধ্যেই কেন্দ্রীয় ভূমিকায় থাকলেও রাজনৈতিকভাবে প্রেসিডেন্টের অবস্থান এখন দুর্বল। এর জন্য সরকার গঠন করা কঠিন হয়ে পড়বে।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের দল ফ্রান্সের বাম জোট নিউ পপুলার ফ্রন্টকে নির্বাচনে জেতায় অভিনন্দন জানিয়েছে। দলটির ভাষ্য, বাম জোট কট্টর ডানপন্থিদের সরকার গঠনের পথ রুখে দিয়েছে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App