×
Icon এইমাত্র
কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কোটা আন্দোলনকারীরা বাংলাদেশ টেলিভিশনের মূল ভবনে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ। কোটা সংস্কার আন্দোলনে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ১৯ জন নিহত কোটা ইস্যুতে আপিল বিভাগে শুনানি রবিবার: চেম্বার আদালতের আদেশ ছাত্রলীগের ওয়েবসাইট হ্যাক ‘লাশ-রক্ত মাড়িয়ে’ সংলাপে বসতে রাজি নন আন্দোলনকারীরা

প্রথম পাতা

বাজেট বিশ্লেষণ

মূল্যস্ফীতির পারদ চড়ছেই

Icon

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মূল্যস্ফীতির পারদ চড়ছেই

মরিয়ম সেঁজুতি : বাংলাদেশের অর্থনীতির চলমান সংকটগুলোর অন্যতম উচ্চ মূল্যস্ফীতি। দেশে টানা ১৪ মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। মূল্যস্ফীতি বাড়তে বাড়তে প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছে গেছে। এ অবস্থায় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এদিকে, নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণসহ সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন তিনি। কিন্তু মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য তেমন কোনো পদক্ষেপ এবারের বাজেটে দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি অর্জনের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটি ‘বাস্তবসম্মত নয়’ বলে মনে করছেন তারা।

যদিও মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে, বাজেটে ‘সামাজিক সুরক্ষা খাতে’ বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। টিসিবির ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে ১ কোটি পরিবারকে স্বল্পমূল্যে চাল, ভোজ্যতেল, চিনিসহ বিভিন্ন পণ্য দেয়া হবে। এর মাধ্যমে মূল্যস্ফীতিকে কমিয়ে আনা যাবে বলে মনে করেন তিনি। তবে সরকারের হিসাবে দেখা যায়, মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বাড়ানোর হার কম। ২০২৩ সালের মে থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিলে মূল্যস্ফীতির হার যখন ছিল ৯ দশমিক ৪১ থেকে ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশের ঘরে, তখন মজুরি বাড়ার হার ৭ দশমিক ৩২ থেকে ৭ দশমিক ৮৫ শতাংশে থেকেছে।

টিসিবির তথ্য বলছে, গত বছরের এ সময়ের তুলনায় এখন অন্তত ১০টি পণ্যের দাম বেড়েছে। এর মধ্যে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ১০৫ দশমিক ২৬ শতাংশ। আর আলুর দাম বেড়েছে ৬০ শতাংশের বেশি। এছাড়া ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে

মুগডাল, রসুন ও হলুদের দাম। মূল্যবৃদ্ধির দৌড়ে আছে পেঁয়াজ থেকে শুরু করে মাছ-মাংসও। দামের ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই চালও। অবশ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, ভুট্টা, ভোজ্যতেল, লবণ এবং চিনির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের সরবরাহকারীদের ঋণপত্রের ওপর কর হার কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে, যা আগে ২ শতাংশ ছিল।

এদিকে, গত জানুয়ারিতে মুদ্রানীতি ঘোষণার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এনে মানুষকে স্বস্তি দেয়ার আশ্বাস দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। পরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ঋণের সুদহার বাড়ায় সংস্থাটি। তবে সুদহার বাড়ানোর প্রভাব মূল্যস্ফীতিতে দেখা যায়নি। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার। এমন বাস্তবতায় আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা ও জিডিপি ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, একই লক্ষ্য ঠিক রেখে বাংলাদেশ ব্যাংকও মুদ্রানীতি প্রণয়ন করে ঘোষণা করবে বলে জানা গেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন বাজেট বাস্তবায়নের মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। সরকারি হিসাবেই বলা হচ্ছে- গত ২২ মাস ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি গড়ে ৯ শতাংশের ওপরে। অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, এবারের বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে কমানোর অঙ্গীকার থাকলেও প্রকৃতপক্ষে এ লক্ষ্য অর্জনে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। পাশাপাশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বিশেষ উদ্যোগ না থাকায় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন হবে। ড. আজিজুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে যে পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ রয়েছে তা পরিশোধে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি ঋণের যে তথ্য দিয়ে থাকে- তা সঠিক নয়। তথ্য গোপন করার কৌশল সুশাসনের অন্তরায়। বাজেট অর্থায়নে দেশীয় ব্যাংকের উপর অতিমাত্রায় ঋণ নির্ভর হলে উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান ব্যাহত হবে। তিনি বলেন, দারিদ্র্য বিমোচনে বৈষম্যের পাশাপাশি শহর ও গ্রামীণ এলাকায় বৈষম্য বাড়ছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির উপকারভোগী নির্ধারণে রাজনৈতিক বিবেচনা ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের কর্তৃত্বের কারণে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এ কর্মসূচির সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, দেশে যে অর্থনৈতিক সংকট চলছে, তাতে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ও কর সুবিধা দিয়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ কমিয়ে জনজীবনে স্বস্তি আনার পদক্ষেপ নেয়া দরকার ছিল। কিন্তু নতুন বাজেটে সে বিষয়ে দৃষ্টি দেয়া হয়নি। ফলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি অর্জনের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটি ‘বাস্তবসম্মত নয়’। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনতে হলে বাজারের সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। সরকারি তরফে তেমন উদ্যোগ নেই। আবার ডলারের বাড়তি দামে আমদানি খরচ বেড়েছে। এমন অবস্থায় মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা অসম্ভব। প্রবৃদ্ধির চেয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত। তিনি বলেন, তিন মাস পরপর জ্বালানি পণ্যের দাম সমন্বয়ের ফলে মানুষের মধ্যে মূল্যবৃদ্ধির শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আবার ডলারের দাম বাড়ায় সৃষ্ট অস্থিরতাও বাজারে প্রভাব ফেলছে। এই মূল্যবৃদ্ধি কমানো না গেলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে।

করোনা ভাইরাস মহামারি শেষে বিশ্ব অর্থনীতির চাকা ঘুরতে শুরু করলে ২০২১ সালের শেষে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম চড়তে থাকে বিশ্ববাজারে। তখন থেকেই বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির পারদ চড়তে থাকে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির শেষে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা শুরুর পর পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়। ২০২২ সালে দেশে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। ২০২৩ সালের ১২ মাসের গড় আরো বেড়ে হয় ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ। বিবিএসের তথ্যে দেখা যায়, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের ‘ঘর’ অতিক্রম করে ৬ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে ওঠে। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে তা কমে ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশে নেমে আসে। এরপর প্রতি মাসেই বাড়তে থাকে।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, মূল্যস্ফীতির সমস্যা সমাধানের জন্য মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি, অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনাসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর মধ্যে একটি সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা এবং পদক্ষেপ বাজেটে দেখা যায়নি। ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সমস্যা থেকেই যাবে বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) সম্প্রতি প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ বাজার তদারকি প্রতিবেদন এপ্রিল ২০২৪’ থেকে তথ্যে জানা গেছে, দেশে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত এক বছরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৫ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। আর মাসিক ভিত্তিতে গত এপ্রিলে এটি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ২২ শতাংশে। এ অবস্থায় ৭০ শতাংশ মানুষ খাদ্যমূল্য নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিল। তবে এপ্রিলে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এপ্রিলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি এর আগের মাসের তুলনায় সামান্য (শূন্য দশমিক ৭) কমে ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ হয়েছে। তবে বেড়ে গেছে খাদ্য মূল্যস্ফীতি। এপ্রিলে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি ৩ দশমিক ১ শতাংশ কমে ৯ দশমিক ৩৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অবশ্য এসব পণ্যের মূল্য সাধারণ ক্রেতা বা দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের ক্রয়সীমায় আসেনি। ডব্লিউএফপির জরিপে দেখা গেছে, খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির ফলে দেশের ৬৭ শতাংশ মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ মানুষ খাদ্যমূল্য নিয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় আছে বলে জানিয়েছে। এপ্রিলে প্রতি চারটি পরিবারের তিনটির মাসিক খরচ বেড়ে যায়। এসব পরিবারের ১০ শতাংশে ছিল কাজ করতে সক্ষম নয়, এমন সদস্য।

এদিকে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, গত এক সপ্তাহে দেশে সরু চালের দাম প্রায় দেড় শতাংশ বেড়ে কেজিতে ৬০ থেকে ৭৮ টাকা হয়েছে। মাঝারি ও মোটা চাল যথাক্রমে ৫২ থেকে ৫৮ টাকা ও ৪৮ থেকে ৫২ টাকায় দাঁড়িয়েছে। খোলা ও প্যাকেটজাত আটার দাম কিছুটা কমেছে। খোলা আটা ৪০ থেকে ৪৫ টাকা ও প্যাকেটজাত ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সানেম এর গবেষণা পরিচালক সায়মা হক বিদিশা বলেন, সার্বিকভাবে মূল্যস্ফীতি ৯-১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার সাধারণ কিছু উদ্যোগ ছাড়া বিশেষ কিছু বাজেটে নেই। ফলে মূল্যস্ফীতি কমার সম্ভাবনাও কম। রপ্তানি, রেমিট্যান্স আয় বাড়ানোর উদ্যোগও গতানুগতিক। তিনি বলেন, হুন্ডি বন্ধে পদক্ষেপ, কালো টাকার সার্কুলার বন্ধে উদ্যোগ দরকার ছিল। এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেই। আমদানি বিকল্প কৃষি পণ্য উৎপাদন উৎসাহিত করতে কৃষকদের প্রণোদনার উদ্যোগ নেই। বিদিশা বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা থেকে পেনশন, সুদ প্রভৃতি বাদ দিলে এ খাতে বরাদ্দ বাজেটের ১১ শতাংশ। মূল সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ বাড়াতে হবে। বর্তমান মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় ভাতার পরিমাণ যথেষ্ট নয়। অন্যদিকে খোলা বাজারে বিক্রি কার্যক্রমের ট্রাকের সংখ্যা, পণ্যের পরিমাণ ও সংখ্যা বাড়ানো দরকার। শহরের দরিদ্রদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে আনতে হবে। বাজেটে এর জন্য কোনো উদ্যোগ নেই।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App