×

প্রথম পাতা

আজ বাজেট পাস

কালো টাকার সুযোগ থাকছেই

এমপিদের করমুক্ত গাড়ির সুবিধা বহাল, পুঁজিবাজারের গেইনট্যাক্স প্রত্যাহার হচ্ছে না

Icon

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কালো টাকার সুযোগ থাকছেই

কাগজ প্রতিবেদক : ‘সুখী সমৃদ্ধ উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে অঙ্গীকারের’ প্রস্তাবিত ২০২৪-২৫ নতুন অর্থবছরের বাজেট জাতীয় সংসদে পাস হচ্ছে আজ রবিবার, যা কাল সোমবার (১ জুলাই) থেকে কার্যকর করা হবে। ছোটখাটো কয়েকটি সংশোধনীর মধ্য দিয়ে গতকাল শনিবার পাস হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটের অর্থবিল। নানা সমালোচনার মধ্যেও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকছেই, পুঁজিবাজারের গেইনট্যাক্স প্রত্যাহার হচ্ছে না। এমনকি এমপিদের শুল্কমুক্ত সুবিধায় গাড়ি আমদানিতে শুল্ক আরোপের যে প্রস্তাব করা হয়েছিল, সেটিও বাজেটে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। তবে হাইটেক পার্ক ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাঁচামাল আমদানিতে ১ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসছে এনবিআর। শেষ পর্যন্ত এসব খাতে শুল্ক আরোপ করা হবে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে বিনা প্রশ্নে ব্যক্তি ও কোম্পানির ক্ষেত্রে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় মাত্র ১৫ শতাংশ শুল্ক দিয়ে তা বৈধ করার প্রস্তাব রেখেছেন। তবে এ ঘোষণার পরই দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। বলা হয়, এটা সৎ করদাতাদের সঙ্গে বৈষম্য করা হবে। যেখানে একজন সৎ করদাতা তার কষ্টার্জিত আয়ের ওপর সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কর দেবেন, সেখানে একজন অসৎ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তা করবেন মাত্র ১৫ শতাংশ কর দিয়ে। সমালোচনার একপর্যায়ে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ ব্যক্তি খাতে না দিয়ে কোম্পানি খাতে দেয়ার দাবি জানিয়ে এনবিআরকে চিঠি দেয়। তবে শেষ পর্যন্ত এনবিআর কালো টাকার সুযোগ দেয়ার যে ঘোষণা দিয়েছে, তাতে আর কোনো পরিবর্তন আসছে না। ফলে ১৫ শতাংশ কর দিয়েই আসছে বাজেটে সব ধরনের করদাতা ও কোম্পানি অবৈধ অর্থ বৈধ করতে পারবেন।

জানতে চাইলে অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান ড. কাজী খলিকুজ্জমান আহমদ ভোরের কাগজকে বলেন, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়ার বিষয়ে ঘোর আপত্তি করছি। এটা দুর্নীতিকে উসকে দেবে। তিনি বলেন, আমি আশা করছি বাজেট পাশে এ বিষয়টি বাদ দেয়া হবে। এ অর্থনীতি বিশ্লেষক বলেন, বাজেটে কোথায় বেশি দিল; আর কোথায় কম দিল- তা নিয়ে আমি চিন্তা করছি না।

আমার চিন্তা হচ্ছে, বাস্তবায়ন নিয়ে। কারণ কম বরাদ্দ দিলেও বাস্তবায়ন হয় না, বেশি দিলেও বাস্তবায়ন হয় না। তাই বাজেটপরবর্তী দ্রুত বাস্তবায়ন করার বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, গত কয়েক বছর ধরে দেখা গেছে, অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বাস্তবায়ন হয় মাত্র ৫ শতাংশ। ৬ মাসে হয় ১৫-১৬ শতাংশ। আর ৯ মাসে হয় ২৬-২৭ শতাংশ। অর্থাৎ কাজের কাজ কিছ্ইু হয় না। এছাড়া শেষ সময়ে তাড়াহুড়ো কাজ কাজ করা হয়। এতে কাজের মান যেমন নষ্ট হয়, তেমনি দুর্নীতি হওয়ার সুযোগও তৈরি হয়।

কাজী খলিকুজ্জমান বলেন, আরেকটা বিষয় আমরা দীর্ঘদিন থেকে বলে আসছি, তা হচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে পেনশনকে যুক্ত করা। তিনি বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ দেখা যায় অনেক বড়। কিন্তু এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশই চলে যায় পেনশন খাতে। তিনি বলেন, পেনশন নিরাপত্তার কোনো বিষয় হতে পারে না, এটা হচ্ছে চাকরির একটি চুক্তি। চাকরি করবে, সময় শেষে তার একটি প্রাপ্য সে বুঝে পাবে। এটা সামাজিক নিরাপত্তা কেন হবে? যদিও সামাজিক সুরক্ষা খাতে এবারে বাজেট বরাদ্দ বেড়েছে। এ অর্থনীতিবিদ বলেন, কর আদায়ের বিষয়ে কোথাও কোথাও বাড়ানো হয়েছে, কোথাও কমানো হয়েছে। কিন্তু প্রত্যক্ষ কর বাড়ছে না। পরোক্ষ কর বাড়ানো হচ্ছে। যা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরো বাড়াবে। এছাড়া সাড়ে ৬ শতাংশ মূল্যস্ফিতি, পৌণে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে- এর রোডম্যাপ আসলে কি? তার সঠিক কোন সঠিক দিকনির্দেশনা নেই। এ বিষয়টিকেও বাজেট পাসের সময় গুরুত্ব দিতে হবে।

তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত বাজেটে সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত সুবিধায় বিলাসবহুল গাড়ি আমদানির সুযোগ কমিয়ে কিছুটা শুল্ক-কর আরোপের চিন্তা করেছিলেন অর্থমন্ত্রী। বাজেটে তিনি সংসদ সদস্যদের এ খাতে কর আরোপ করতে আইনের সংশোধনী আনতে উদ্যোগী হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তবে এ রকম কোনো আভাস সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। বরং তাদের অনেকে আগের মতো শুল্কমুক্ত সুবিধায়ই গাড়ি আমদানির পক্ষে বলে বিভিন্ন সভা-সেমিনারে মত দিয়েছেন। ফলে আসছে বাজেটে এ উদ্যোগ কার্যকর হচ্ছে না।

বাজেটের কোন কোন খাতে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন- এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ভোরের কাগজকে বলেন, এডিপির সাইজ কমাতে পারলে ভালো হতো। এডিপি কিছুটা কাটছাঁট করলে বাজেটে ঘাটতি কমে আসত। তাতে সরকারের ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার মাত্রা কমিয়ে আনা যেত। অর্থাৎ অর্থের সংস্থান বাড়তি যা হতো, তা দিয়ে উন্নয়ন বা অনুন্নয়ন খাতে ব্যয় করা যেত। ড. সালেহউদ্দিন বলেন, মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে কোন কোন খাতে গুরুত্ব দিলে তা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে, সেটা নির্দিষ্ট করা উচিত। আমদানি করা কিছু পণ্যের উপর শুল্ককর কমিয়ে দিয়েছে; কিন্তু তাতে মূল্যস্ফীতিতে কতটা প্রভাব পড়বে? দেশিয় উৎপাদিত পণ্যের উপর ভ্যাট ট্যাক্স কমানোর ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেয়ার বিষয়ে এ অর্থনীতিবিদ আরো বলেন, সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে। এতে ব্যাংকগুলোর উপরে চাপ বাড়ছে। যা মূল্যস্ফীতিকে আরো উসকে দিচ্ছে। তিনি বলেন, দেশের ব্যবসায়িক উন্নতির দিকে সরকারকে মনোযোগ দিতে হবে। পুঁজিবাজারে কীভাবে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো যায় সে বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া দরকার ছিল। এতে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরেকটু স্বাস্থ্যবান করা যেত। সার্বিকভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ যা আছে; সেটা ভালোভাবে মনিটরিং করতে হবে। এসব খাতে বরাদ্দ দেয়া হলেও তা খরচ করতে পারে না। এছাড়া দুর্নীতি তো আছেই। একই সঙ্গে পরোক্ষ করের উপর নির্ভর না করে প্রত্যক্ষ করের আওতা বাড়াতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

জানা গেছে, প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ থেকে অর্জিত ক্যাপিটাল গেইনের ওপর এবার কর আরোপ করা হয়েছে। যাদের মুনাফা ৫০ লাখ টাকার বেশি, আসছে বাজেটে ১৫ শতাংশ হারে তাদের গেইনট্যাক্স দেয়ার কথা বলা হয়। এর ফলে পতনের মধ্যে থাকা বাজার আরো খারাপের দিকে যাবে মন্তব্য করে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার এ কর বাতিলের দাবিতে বিবৃতি দিয়েছে। যদিও এনবিআর এ কর প্রত্যাহার করছে না বলে জানা গেছে।

জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান ভোরের কাগজকে বলেন, কালো টাকা সাদা করার যে সুযোগ দেয়া হয়েছে- তা আমি মনে করি তুলে দেয়া উচিত। কিছু কিছু প্রস্তাব, যেমন মোবাইলের উপর ট্যাক্স বাড়ানো, গিফট ট্যাক্স- এ বিষয়গুলো পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। ভোক্তাকল্যাণ ও মূল্যস্ফীতি কমানোর নিরিখে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উপর কর কিছুটা কমানো যেতে পারে। তিনি বলেন, আমাদের এডিপির পুরোটাই যেহেতু ঋণনির্ভর। তাই বাজেটে নতুন প্রকল্পের যে প্রস্তাব করা হয়েছে সেগুলো আরেকবার যাচাই বাছাই করা যেতে পারে। ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আর্থিক খাত বিশেষ করে ব্যাংকখাতে সংস্কারের কথা আমরা বছরের পর বছর শুনছি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কীভাবে জোরালো পদক্ষেপ নেয়া যায়; সে বিষয়টি এখন ভাববার সময় এসেছে। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও জোরালো বক্তব্য প্রয়োজন।

এ অর্থনীতিবিদ বলেন, পরোক্ষ করের দিকে বেশি গুরুত্ব না দিয়ে কীভাবে প্রত্যক্ষ করের দিকে যেতে পারি, অর্ধেক অর্ধেক করতে পারি- এ বিষয়েও বিবেচনা করতে হবে। ডিজিটালাইজেশনকে আরো গুরুত্ব দিতে হবে।

তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত বাজেটে হাইটেক পার্ক ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্পের যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল আমদানিতে ১ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়। এরপরই এ নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। ফরেন চেম্বারসহ সংশ্লিষ্টরা আপত্তি করেন। তারা দাবি করেন, এর ফলে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শূন্য শুল্কে কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানির সুযোগ থাকার কারণেই এ দেশে বিনিয়োগে এগিয়ে আসেন। কিন্তু আকস্মিক শুল্ক আরোপ করায় তাদের বিনিয়োগে খরচ বেড়ে যাওয়ার যুক্তিতে তারা পিছিয়ে যাবেন বলে মনে করা হয়। তাই বাজেটে এ শুল্ক প্রত্যাহার করার দাবি জানান। এসব বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত বাজেটে ১ শতাংশ শুল্ক বাতিল হতে পারে। এ বিষয়ে এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, যেহেতু এটি অর্থ আইন সংক্রান্ত বিষয় নয়, তাই অর্থ বিলে রাখা হয়নি। এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন দ্রুত সময়ের মাঝে এনবিআরের ওয়েবসাইটে প্রকাশ হবে এবং সেটি বাজেট প্রস্তাবের দিন থেকেই কার্যকর ধরে নেয়া হবে।

বাংলাদেশে মোট ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার জন্য কাজ করছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে ৯৭টি অনুমোদন পেয়েছে। ১১টি অর্থনৈতিক অঞ্চল ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আরো কয়েকটির কাজ এগিয়ে চলেছে। অন্যদিকে দেশে সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে হাইটেক পার্ক অথবা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক অথবা আইটি প্রশিক্ষণ ও ইনকিউবেশন সেন্টারের অনুমোদন দেয়া হয়েছে ৯২টি। ১১টি হাইটেক পার্ক এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠা হয়েছে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App