×

প্রথম পাতা

মন্ত্রী-এমপিরা সোচ্চার > দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স প্রধানমন্ত্রীর

বিব্রত সরকার ও প্রশাসন

Icon

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বিব্রত সরকার ও প্রশাসন

এস এম মিজান : দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী গুটিকয়েক আমলার দুর্নীতির কারণে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে রয়েছে সরকার ও প্রশাসন। এই দুর্নীতিবাজ আমলাদের সীমাহীন ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, অহংবোধ ও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে প্রশাসনসহ সাধারণ মানুষের মধ্যেও ক্ষোভ বাড়ছে। এদের কারণে সরকারের অনেক অর্জন যেমন ¤øান হয়ে যাচ্ছে; তেমনি সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতার প্রচার-প্রচারণা বেশি হচ্ছে। এতে সরকারি দল ও সরকারের ক্ষতি হচ্ছে অপূরণীয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন- সরকারপ্রধান এর আগেও একাধিকবার দুর্নীতির বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিলেও প্রশাসনের দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের টনক নড়েনি, যা একের পর এক চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির ঘটনা ফাঁস হওয়ার মধ্য দিয়ে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

সম্প্রতি পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। দুদকের অনুসন্ধানে বেনজীর ও তার স্ত্রী-সন্তানদের নামে ঢাকায় মোট ১৮টি ফ্ল্যাট, বিভিন্ন জেলায় হাজারের বেশি বিঘা জমি, ১৯টি কোম্পানির শেয়ার, ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র, ৩৩টি ব্যাংক হিসাব ও তিনটি বিও হিসাব (শেয়ার ব্যবসার বেনিফিশিয়ারি ওনার্স অ্যাকাউন্ট) পাওয়া গেছে।

এছাড়া সাবেক ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়ার বিরুদ্ধে সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ উঠেছে। শুধু নিজের নামে নয়, স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ের নামেও বিপুল সম্পত্তি গড়েছেন তিনি। তার দুর্নীতি অনুসন্ধানের জন্য দুদকেও কয়েকটি আবেদন জমা পড়েছে। খবর প্রকাশিত হয়েছে কয়েকটি পত্রিকায়।

ছাগলকাণ্ডে আলোচিত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তা মতিউর রহমান সরকারি চাকরি করে দুই স্ত্রী, পাঁচ সন্তানের সাংসারিক দায়িত্ব পালনের পরও তাদের ও আত্মীয়-স্বজনদের নামে গড়েছেন বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ। এ পর্যন্ত দেশেই তার প্রায় ৫০০ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকাতেই অন্তত ২৪টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে মতিউর রহমানের স্ত্রী-সন্তান ও ঘনিষ্ঠদের নামে। এছাড়া সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে হাজার বিঘার বেশি জমি। দেশের বাইরে রয়েছে কয়েকশ কোটি টাকার সম্পদ।

এনবিআরের আরেক কর্মকর্তা (প্রথম সচিব) কাজী আবু মাহমুদ ফয়সাল ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক বনে গেছেন। দুদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে তার সম্পদের পাহাড়। প্রাথমিকভাবে দুদকের

অনুসন্ধান দল ঢাকায় তার কয়েকটি ফ্ল্যাট, প্লট ও সঞ্চয়পত্রসহ ১৬ কোটি টাকা মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের খোঁজ পেয়েছে। এছাড়া শ্বশুর-শাশুড়িসহ তার আত্মীয়-স্বজনদের নামে গড়েছেন অঢেল সম্পদ। অনুসন্ধান সূত্র জানায়, এনবিআরের এই কর্মকর্তা সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত আয়ের উৎস গোপনের জন্য নিজের নামসহ তার আত্মীয়-স্বজনের নামে ৭০০টির বেশি ব্যাংক হিসাব খোলেন। এসব হিসাবে রয়েছে বিপুল পরিমাণ টাকা।

আমলাদের এ ধরনের দুর্নীতিতে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে রয়েছে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা দল আওয়ামী লীগ। দলটির বিভিন্ন ফোরামের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আমলাদের দুর্নীতির আদ্যেপান্ত। তাদের অভিযোগ, আমলাদের দফায় দফায় বেতন বাড়ানোর পরও দুর্নীতি কেন হবে? প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে একের পর এক চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির ঘটনায় শুধু সরকারের অস্বস্তিই বাড়েনি, সাধারণ মানুষের মধ্যেও ক্ষোভের মাত্রা বাড়ছে। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা মনে করেন যেখানে সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা বারবার বলে আসছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স, সেখানে আমলারা কীভাবে সাহস পায় দুর্নীতিতে জড়াতে।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন- সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক পুলিশ ও প্রশাসনিক দুর্নীতি-লুটপাটের ভয়ংকর চিত্র গণমাধ্যমে উঠে আসায় ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের জিরো টলারেন্স’ নীতিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। গত কয়েকটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারে বর্ণিত বহুল আলোচিত সুশাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় কথার ফুলঝুরি না ছড়িয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সত্যিকার ও কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে সরকারকে উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে।

এদিকে গুটি কয়েক আমলার দুর্নীতির কারণে পুরো প্রশাসনের ভেতরে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এতে সৎ কর্মকর্তারা পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে। অল্পসংখ্যক কিছু লোকের জন্য পুরো প্রশাসনকে প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে এবং সবার গায়ে দুর্নীতির তকমা লাগছে। প্রশাসনিক ক্যাডারের উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তা ভোরের কাগজকে বলেন, একের পর এক কর্মকর্তাদের দুর্নীতিতে সত্যিই আমরা লজ্জিত, বিব্রত ও খুব অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে আছি। এখানে বেশির ভাগ কর্মকর্তাই সৎ। শুধু দু-চারজন ব্যক্তির অপকর্মের দায় আমাদের সবাইকে বহন করতে হচ্ছে।

এদিকে একের পর এক সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি-বাড়ি, জমিসহ বিপুল পরিমাণ ‘অবৈধ’ সম্পদ অর্জনের তথ্য সামনে আসার প্রেক্ষাপটে তাদের বিষয়ে সংসদে ক্ষোভ ঝেড়েছেন কয়েকজন সংসদ সদস্য। যারা দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের ‘বাগে আনতে’ নানা পরামর্শও দিয়েছেন। রাজনীতিবিদদের পাশ কাটিয়ে আমলাদের ওপর সরকারের অতিনির্ভরতা এবং আইন করে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের শাস্তি দেয়ার বিধান ‘শিথিল’ করায় উষ্মা প্রকাশ করে তা সংশোধনের দাবিও তোলেন তারা।

গত মঙ্গলবার সংসদে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, চাকরিতে নিয়োগের সময় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হলফনামা দেয়ার নিয়ম চালু করতে হবে। এরপর প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অন্তর বা পদোন্নতির সময় হলফনামা দিতে হবে। এ নিয়ম চালু করলে তাদের কী পরিমাণ আয় বা সম্পদ বাড়ছে তা জানা যাবে, দুর্নীতি কমবে। সরকারি কর্মকর্তারা হলফনামা না দিলেও একজন রাজনীতিবিদকে তো হলফনামা দিতে হয়। সরকারের জন্য দুর্নীতি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দুর্নীতি সব অর্জনকে মøান করে দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছেন। এখনো কিন্তু দুর্নীতি দমন করতে পারিনি। দুর্নীতির অবাধ প্রবাহ থাকলে কখনো বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, যেটা লক্ষ করা যাচ্ছে এখন। এনবিআর কর্মকর্তার ছেলের ‘ছাগলকাণ্ডের’ প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এরকম হাজার হাজার মতিউর আছেন। দফায় দফায় তাদের বেতন বাড়ানো হয়েছে, তারপরও দুর্নীতি কমানো সম্ভব হয়নি। এবার কুরবানির ঈদে একটি গরু ১ কোটি টাকায় বিক্রি হয়েছে। এ গরুটা কারা কিনল, কেন কিনল। যাদের অবৈধ আয় আছে, তারা নিশ্চয়ই কিনেছে। আবার ১৫ লাখ টাকায় অবৈধ আয়ধারীরা ছাগলও কিনেছে। এখনি এদের লাগাম টেনে ধরতে হবে। তিনি বলেন, অনেক সময় বড় বড় কর্মকর্তারা বড় ধরনের দুর্নীতিতে জড়িত থাকলেও তাদের সামান্য পরিমাণে শাস্তি হয়। অথচ নন-ক্যাডার কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তারা সরকারি চাকরিতে আর বহাল থাকতে পারে না। একজন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে মামলা হলে তাদের গ্রেপ্তারে কোনো পারমিশন লাগে না। কিন্তু যদি সরকারি কর্মীদের একই অভিযোগে মামলা হয়, তাহলে গ্রেপ্তার করতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমতি লাগে। এই সরকারি কর্মকর্তা আইন-২০১৮ দুর্নীতি করতে উৎসাহিত করছে। আইনটি পুনর্বিবেচনার দাবি জানান তিনি।

আওয়ামী লীগের আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, যখন কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আসে; তখন ওই গোষ্ঠীর বা অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সাফাই বিবৃতি যাতে না দেয়া হয়। এতে দুর্নীতির অভিযোগ প্রকারান্তরে সেই গোষ্ঠীর ওপর গিয়েই পড়ে। আমরা কেউই দুর্নীতিবাজদের পক্ষ অবলম্বন করব না। মতিউর রহমানের মতো দুর্নীতিবাজকে দুদক, সরকারি সংস্থা, মিডিয়া, আমরা কেউই চিহ্নিত করতে পারিনি। তাকে চিহ্নিত করেছে একটি বোবা প্রাণী, ছাগল। সরকারে মতিউরের মতো এমন কোনো দুর্নীতিবাজ আর আছে কিনা- তা কোনো বোবা প্রাণী বের করে আনার আগে সরকারি সংস্থাগুলোকে খুঁজে বের করতে হবে। কোনো দুর্নীতিবাজকে রেহাই দেয়া যাবে না।

আমলাদের দুর্নীতির দিকে ইঙ্গিত করে বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেছেন, দুর্নীতির বিস্তার রোধ করা না গেলে হিমশৈলের ধাক্কায় দেশের উন্নয়ন অগ্রগতির সলিল সমাধি হবে। দুর্নীতির মচ্ছব বন্ধ করতে এখনই ‘বিশেষ কমিশন’ গঠন করুন। দুর্নীতিবাজদের অর্থ সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও বিচার করে কঠিন শাস্তি নিশ্চিত করুন। ঋণখেলাপি অর্থ আত্মসাৎকারীদের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠন করুন।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান জিরো টলারেন্স। তিনি এক্ষেত্রে অটল। দুর্নীতি যেই করুক- এক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। দুদকের দুর্নীতির তদন্ত করার অধিকার রয়েছে। এখানে সরকার তাদের স্বাধীনতায় কোনো হস্তক্ষেপ করবে না।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App