×
Icon ব্রেকিং
রংপুরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ

প্রথম পাতা

ঈদের পর বাজারে ফের বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম

Icon

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ঈদের পর বাজারে ফের বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম

মরিয়ম সেঁজুতি : বছরজুড়েই বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে অস্থির নিত্যপণ্যের বাজার। সরকার বিভিন্ন সময় নানা কর্মসূচি নিলেও তার কোনো প্রভাব থাকে না বাজারে। ঈদের পর হঠাৎ করে আবারো নতুন করে উত্তাপ ছড়াচ্ছে বাজারে। সবজি থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের সবকিছুর দাম বাড়তি। ভরা মৌসুমে সবজির পাশাপাশি বাড়তি দাম চালের বাজারে। সরবরাহের ঘাটতি ও পরিবহনের সমস্যা দেখিয়ে নতুন করে দাম বাড়াচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। চাল, সবজি ও গরুর মাংসের দাম নিয়ে তেলেসমাতির তালিকায় এবার যুক্ত হয়েছে আলু। বাজারে চালের চেয়ে এখন আলুর দাম বেশি।

সপ্তাহের ব্যবধানে সব ধরনের সবজির দাম বেড়েছে ১০ থেকে ২০ টাকা। গত সপ্তাহের তুলনায় ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়ে সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছে বেগুন ও পেঁয়াজ। ভালোই বেড়েছে কাঁচা মরিচের দাম; ঈদের পর এ পণ্যের দাম ছিল ৪০০ টাকার কাছাকাছি। তবে বর্তমানে কিছুটা কমে বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়। ব্যবসায়ীদের দাবি, ঈদের ছুটির শেষেও চাহিদা কম থাকায় কৃষকরা ক্ষেত থেকে সবজি তুলছেন না। ব্রয়লারের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ কম। সেজন্য পণ্যগুলোর দাম বাড়তি। সরবরাহ স্বাভাবিক হলে দাম কমে আসবে। ক্রেতাদের অভিযোগ, সিন্ডিকেট করে প্রতিনিয়ত সবকিছুর দাম বাড়াচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। গতকাল রাজধানীর কারওয়ান বাজার, মালিবাগ বাজার, রামপুরা কাঁচাবাজারসহ বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারা সরকারের জন্য বড় ধরনের ব্যর্থতা। তিনি বলেন, ২০১৯ সাল থেকে খাদ্যমূল্য বিবেচনা করলে মূল্যস্ফীতি অস্বাভাবিক। আয় কম, কিন্তু খাবারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করতে হয়। যার ভুক্তভোগী গরিব ও সাধারণ মানুষ। ধনী ও গরিবের বৈষম্য বেড়েছে। মূল্যস্ফীতিতে আমরা ৯ ও ১০ শতাংশে অবস্থান করছি, যা বর্তমানে শ্রীলঙ্কার চেয়েও বেশি। তিনি আরো বলেন, সরকারের প্রচেষ্টা রয়েছে। সরকার অনেক সময় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের শুল্ক ট্যারিফ কমিয়ে দেয়। তার সুফল তোলেন একধরনের ব্যবসায়ীরা।

চালের বাজারে অস্থিরতা : অভিযোগ রয়েছে, কর্পোরেট সিন্ডিকেটের কারসাজিতে চালের বাজারে অস্থিরতা লেগেই থাকে। মিলার ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যে সরকারের বেঁধে দেয়া দামের চেয়েও বেশিতে ধান কেনাবেচা হয়। এতে বাজারে চালের দাম বেড়ে যায়। এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নতুন কৌশল হাতে নেয় সরকার। ঈদুল আজহার পর এ বিষয়ে ঘোষণা আসার কথা। কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন কোনো কৌশল দৃশ্যমান হয়নি। অথচ ঈদের পর চালের দাম ফের বেড়েছে। সপ্তাহের ব্যবধানে ২ থেকে ৫ টাকা বেড়েছে কেজিতে। অবশ্য মোটা চালের দাম কিছুটা কমেছে। বাজারে প্রতি কেজি মাঝারি মানের চিকন চালের কেজি ৭৫ টাকা। আর ভালো মানের চিকন চালের কেজি ৮৫ টাকা। মোটা চালের দাম ৪৮ থেকে ৫০ টাকা, বি আর-আটাশ ৫৫ থেকে ৫৮ টাকা, পাইজাম ৫৮ থেকে ৬০ টাকা।

বাজারগুলোতে আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে ডাল। দেশি ও আমদানি করা মসুর ডাল ১৫০ টাকা, আমদানি করা মোটা ডালের কেজি ১২০ টাকা, ছোলার ডাল ১৩০ টাকা, অ্যাংকর ডালের কেজি ৯০ টাকা।

চালকে টেক্কা দিল আলু : ‘বেশি করে আলু খান ভাতের ওপর চাপ কমান’- দেশের বাজারে চালের দাম ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতি থাকায় সরকারের পক্ষ থেকে এমন কথা বলা হয়েছিল। তখন মানুষও সত্যি সত্যি আলুতে ঝুঁকেছিল। কিন্তু এখন আর সেই দিন নেই। কেননা ১৫-২০ টাকার আলু এখন ঠেকেছে ৭০ থেকে ৭৫ টাকায়। বাজারে কেজিপ্রতি চালের চেয়ে আলুর দাম বেশি। তাই গরিবের পাতে সচরাচর উঠছে না আলু। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে ৭০ টাকা কেজিতে আলু বিক্রি হয়েছে, যা গত সপ্তাহেও ৬০ থেকে ৬৫ টাকার মধ্যে ছিল। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ বছর যে আলুর সংকট রয়েছে সেটা সবাই জানে; তাই দাম কোথায় গিয়ে ঠেকবে, বলা মুশকিল।

দেশের একমাত্র নিত্যপণ্য বিপণনকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, আলুর যে দাম, বাজারে তার চেয়ে বেশি। কারণ একটাই, দু-তিন বছর আগেও আলুর বাড়তি উৎপাদনের যে তৃপ্তিতে ছিল, সে অবস্থা আর নেই। গত মৌসুমে আলুর উৎপাদনও কমেছে। যে কারণে হু হু করে বাড়ছে আলুর দাম। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সূত্রে জানা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে আলু রপ্তানি হয়েছে। যদিও তা তার আগের তিন বছরের রপ্তানির তুলনায় অনেক কম ছিল। কিন্তু বর্তমানে রপ্তানি তো দূরের কথা, আমদানি করেও বাজার সামাল দিতে পারছে না সরকার। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন বলছে, প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি থেকে মৌসুমের আলু কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণ শুরু হয়। এ বছর এলাকাভেদে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কম আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে উৎপাদন কম হওয়ার কারণে এবারে নির্দিষ্ট সময়ের আগে থেকেই কোল্ড স্টোরেজের আলু বিক্রি শুরু হয়েছে। তবে এ মৌসুমে আলু উৎপাদনের তথ্য এখনো প্রকাশ করেনি বিবিএস। গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে আলুর

উৎপাদন ছিল ১ কোটি ৪ লাখ টন।

ডিমের বাজারেও অস্থিরতা : ঈদের সময়ে কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও বর্তমানে বেড়েছে ডিমের দাম। কয়েক দিন ধরে অস্থির হয়ে উঠেছে ডিমের বাজার। সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় ২ টাকা বেড়ে ভোক্তাপর্যায়ে একটি ডিম কিনতে গুনতে হচ্ছে ১৫ টাকা। সেই হিসাবে ডজন পড়ে ১৮০ টাকা। কমলাপুরের কয়েকটি বাজারেও ৬০ টাকা হালিতে ডিম বিক্রি করতে দেখা যায়। এ অবস্থায় ডিমের বাজারে কারসাজি বন্ধ করতে তৎপর হয়ে উঠেছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। গত বৃহস্পতিবার ভোরে সংস্থাটির পরিচালক আব্দুল জব্বার মণ্ডল অভিযান চালিয়েছেন রাজধানীর তেজগাঁওয়ে পাইকারি ডিমের আড়তে। এ সময় তিনটি প্রতিষ্ঠানকে ৬০ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়েছে। এর মধ্যে মেসার্স আমানত এন্টারপ্রাইজকে ৫০ হাজার টাকা এবং বাকি দুটি প্রতিষ্ঠানকে পাঁচ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়।

পাইকারি ডিম বিক্রেতা আরিফ বলেন, গত দুই দিনে ১০০ ডিমের দাম ৮০ টাকার বেশি বেড়েছে। আর প্রতি ডিমে বেড়েছে ৮০ পয়সার উপরে। ডজন হিসাবে বললে এখন বিক্রি করছি ১৫০ টাকা, আর দুই দিন আগে ছিল ১৪০ টাকা। দাম কারা বাড়াচ্ছে- এমন প্রশ্ন শুনে তিনি বলেন, যারা খামারিদের থেকে কিনে, তারাই দাম বাড়ায়। ঈদের পর ডিমের চাহিদা বাড়ছে। দামও হু হু করে বাড়ছে। বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুমন হাওলাদার বলেন, সবকিছুতে চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পণ্যের দাম বাড়ে। কিন্তু ডিমের দাম বাড়ে সিন্ডিকেটের কারণে। কর্পোরেটদের তো হাত আছেই। কিন্তু প্রধান দায় ডিম সমিতির। তারা ঈদের পাঁচ দিন দাম কমিয়েছিল। আর এই কম দামে ডিম সংগ্রহ করে রেখেছিল। এবার দাম বাড়িয়ে তাদের সংগ্রহ করা ডিম বাজারে ছাড়তে শুরু করেছে। দিনের বাজার ঠিক আছে। ঘোষণা অনুযায়ী ডিম বেচাকেনা হয়। কিন্তু রাতের বাজারে খামারির কাছ থেকে আনা ডিমের দাম তারা বসিয়ে দেয়।

পেঁয়াজে সেঞ্চুরি : ঈদের আগে ৭৫-৮০ টাকা কেজি দেশি ও আমদানি করা পেঁয়াজ বর্তমানে সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছে। সপ্তাহের ব্যবধানে তা ১০ টাকা বেড়ে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ১০০ টাকায়। ঈদের পর ভারতীয় পেঁয়াজ হিলি বন্দরে আমদানি না হওয়ায় এবং দেশের মোকামে সরবরাহ কম হওয়ায় দাম বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। খিলগাঁও কাঁচাবাজারে পেঁয়াজ কিনতে আসা মজিবর রহমান বলেন, আজ ১০০ টাকা কেজিতে পেঁয়াজ কিনতে হলো। অথচ ঈদের আগে ৮০ টাকা করে পেঁয়াজ কিনেছি। তিনি বলেন, এভাবে দাম বাড়লে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কী হবে?

একই বাজারে পেঁয়াজ ব্যবসায়ী ফেরদৌস রহমান বলেন, দেশের বাজারে দেশি পেঁয়াজ আমদানি কম এবং ঈদের পর ভারতীয় পেঁয়াজ আমদানি তেমন হয়নি, যে কারণে পেঁয়াজের দাম বাড়ছে। গতকাল মাত্র এক গাড়ি ভারতীয় পেঁয়াজ এসেছে। পেঁয়াজ আমদানি বেশি হলে দামও কমে যাবে বলে জানান তিনি।

আদা ও রসুনের দামও ঈদের আগে হু হু করে বেড়েছিল। বর্তমানে তা কিছুটা কমতে শুরু করেছে। ঈদের আগে আদার দাম কেজিপ্রতি ৩৩০ থেকে ৩৫০ টাকায় উঠলেও তা কমে এখন ২৮০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রসুনের দামও কেজিতে কিছুটা কমেছে। ঈদের আগে রসুন বিক্রি হচ্ছিল ২৫০ টাকায়, যা বর্তমানে ২২০ থেকে ২৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আর দেশি পেঁয়াজের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। বর্তমানে পেঁয়াজের কেজি ৮৫ থেকে ৯০ টাকা। ঈদের আগে মুরগির দাম কিছুটা কমলেও তা বাড়তে শুরু করেছে। ঈদের আগে ও পরে ব্রয়লার মুরগি ১৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও বর্তমানে তা কিনতে হচ্ছে ১৯০ থেকে ২০০ টাকায়। সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩২০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে। বাজারে দেশি মুরগি খুবই কম, দামও চড়া। দেশি মুরগির কেজি ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা।

লাগামছাড়া সবজির দাম : সপ্তাহের ব্যবধানে অধিকাংশ সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা করে বেড়েছে। ৬০ থেকে ৮০ টাকার বেগুন ৮০ থেকে ১০০ টাকার কমে পাওয়া যাচ্ছে না। ঈদের পরপর কাঁচা মরিচের কেজি ৪০০ কাছাকাছি গেলেও বর্তমানে তা ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৪০ থেকে ৫০ টাকার পটোল, ঝিঙে ও ধুন্দুল ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি করছেন খুচরা বিক্রেতারা। ৪০-৫০ টাকার করলা এখন ৭০-৮০ টাকা। ঈদের পর থেকে বাজারে ব্যাপক চাহিদা থাকায় ৬০-৮০ টাকার শসা ১৪০-১৬০ টাকা, ২০-৩০ টাকার লেবুর হালি ৪০-৫০ টাকা। এভাবে অধিকাংশ সবজি বেশি দামে বিক্রি হতে দেখা গেছে। পেঁপে ৫০ টাকা, টমেটোর কেজি ১২০ টাকা। ঢ্যাঁড়শ ৪০-৫০, মিষ্টিকুমড়া ৩০-৪০, সজনে ডাঁটা ৮০-১২০ টাকা কেজি। লাউ ও চালকুমড়ার পিস ৬০-৭০ টাকা, লাল শাক, পাট ও কচু শাকের আঁটি ১৫-২০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে বলে খুচরা বিক্রেতারা জানান। আগামী সপ্তাহ থেকে শসা ও লেবুর দাম কমে আসতে পারে বলে ধারণা বিক্রেতাদের।

বাজারে অতিরিক্ত দামের কারণ জানতে চাইলে কাওরান বাজারের ব্যবসায়ী আলী আহমদ বলেন, ঈদের সময় থেকে এখন পর্যন্ত রাস্তায় যানজট, ট্রাকে করে পরিবহন করার ভাড়া অনেক বেশি, সে কারণে ঢাকায় সরবরাহ তুলনামূলক কম আসছে। যার ফলে আমাদের দাম বাড়তি রাখতে হচ্ছে। বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী আমিন উল্লাহ্ বলেন, কয়েকদিন টানা মাংস খাওয়া হয়েছে। এখন সবজি কেনা দরকার। কিন্তু সব সবজির দামই বাড়তি। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে দাম বেড়ে যায়। সরকারের তদারকির কোনো খোঁজখবর নেই। আমাদের মতো সাধারণ মানুষ জীবনযাপন করতে হাঁপিয়ে যাচ্ছি।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App