×

প্রথম পাতা

ছাগলকাণ্ড

সাদিক অ্যাগ্রোর গোমর ফাঁস

যশোর থেকে ১ লাখ টাকায় ছাগল কিনে বিদেশি ‘ব্রিটল’ জাতের বলে ফেসবুকে প্রচার চালিয়ে ক্রেতা আকর্ষণ

Icon

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সাদিক অ্যাগ্রোর গোমর ফাঁস

কাগজ প্রতিবেদক : ২০১৬ সালে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা হয় ব্রাহমা জাতের গরু। কিন্তু সম্প্রতি সেই গরুরই বংশ মর্যাদার নামে নানা মিথ্যাচারে মানুষকে প্রলুব্ধ করে কোটি টাকা দাম হাঁকান সাদিক অ্যাগ্রো ফার্মের মালিক ইমরান হোসেন। অনুসন্ধান বলছে, নিষিদ্ধ ব্রাহমা জাতের গরু দিয়ে ইমরানের কোটি টাকার ব্যবসা নতুন নয়। কুরবানির ঈদ এলেই নিষিদ্ধ জাতের গরু দিয়ে ক্রেতার পকেট কাটার ধান্ধায় নেমে পড়েন তিনি। গত কয়েক বছর ধরেই কুরবানির জন্য বিভিন্ন আকর্ষণীয় নাম দিয়ে লাখ লাখ টাকায় বিক্রি করেন ব্রাহমা জাতের গরু। এবারের ঈদেও তিনি তাই করেছেন।

মাস দুয়েক আগে রাজধানীতে প্রাণিসম্পদ মেলায় কোটি টাকার একটি গরু এনে আলোচনায় আসে সাদিক অ্যাগ্রো। সত্যিই কি গুণে-মানে ভরপুর সাদিক অ্যাগ্রোর এই কোটি টাকার গরু? নাকি এর মালিক ইমরান হোসেনের ভেল্কিবাজি ভোক্তাদের সঙ্গে? এমন প্রশ্নের মুখেই এবার কুরবানির ঈদে ‘টপ অব দ্য কান্ট্রি’ হয়ে ওঠে ইমরানের ১৫ লাখ টাকার ছাগল। এসব নিয়ে একাধিক শিরোনাম হয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। নানা বিতর্কের মুখে ‘গোমড় ফাঁস’ হতে থাকে ইমরানের সাদিক অ্যগ্রোর।

সাদিক অ্যাগ্রোর ‘উচ্চবংশীয়’ ১৫ লাখ টাকা দামের ছাগল কিনতে গিয়ে আলোচনায় আসেন এনবিআরের সদ্য সাবেক কর্মকর্তা মতিউর রহমানের ছেলে মুশফিকুর রহমান ওরফে ইফাত। কুরবানির ঈদের আগে এই ছাগল কেনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর ছাগলটি আর নেননি ইফাত।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছাগলকাণ্ডের সেই ১৫ লাখ টাকার ছাগল নিয়ে দেশব্যাপী তুলকালাম হয়ে গেলেও আলোচিত সেই ছাগলটি দেশীয় জাতের। সাদিক অ্যাগ্রোর কর্মচারীরা জানিয়েছেন, ওই ছাগলটি যশোরের একটি বাজার থেকে মাস দুয়েক আগে ১ লাখ টাকায় আনা হয়। তবে ঈদ সামনে রেখে সেটি বিদেশি ব্রিটল জাতের ছাগল বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল করেন ইমরান হোসেন। এরপর এর দাম নির্ধারণ করা হয় ১৫ লাখ টাকা। সাফদক অ্যাগ্রোর ইনচার্জ মো. শরীফও যশোর থেকে ছাগল আনার এ তথ্য গণমাধ্যমের কাছে স্বীকার করেছেন।

চোখ ধাঁধানো বিজ্ঞাপন আর নানা চমকের কারণে বারবার আলোচনায় আসা সাদিক অ্যাগ্রো এবং এর মালিক মোহাম্মদ ইমরান হোসেনের বিরুদ্ধে গরু চোরাচালান সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণসহ নানাভাবে গ্রাহকদেরকে ঠকানোর অভিযোগ উঠেছে। মিথ্যা বলে অতিরিক্ত মূল্য ধরা এবং দেশি গরু-ছাগল বিদেশি বলে বিক্রি করারও অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

গবাদি পশুর খামারিদের সংগঠন বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিএফএ) সভাপতি ইমরান হোসেন প্রভাব খাটিয়ে খালের জায়গা দখল করে গড়ে তোলেন সাদেক অ্যাগ্রো। অভিযোগ রয়েছে, এই খামারের জন্য তিনি রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বেড়িবাঁধ সড়কসংলগ্ন এলাকায় ঢাকা উত্তর সিটি কপোরেশনের (ডিএনসিসি) রামচন্দ্রপুর খালের জমি দখল করেছেন। ডিএনসিসি জানায়, জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে একাধিকবার উচ্ছেদ নোটিস দেয়ার পরেও বহাল তবিয়তেই ছিল সাদিক অ্যাগ্রো।

গতকাল বৃহস্পতিবার সাদিক অ্যাগ্রো ফার্মে উচ্ছেদ অভিযান চালায় ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ। অভিযানের একপর্যায়ে খামারের আবাসিক কয়েকজন কর্মচারী বাধা দেন। পরে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়। ছাগল কাণ্ডে নানা সমালোচনা শুরু হওয়ার পরপরই ইমরান খামার থেকে তড়িঘরি করে ব্রাহমা জাতের গরুগুলো নবীনগরে পাঠিয়ে দেন। গতকাল উচ্ছেদ অভিযান শুরু হওয়ার আগে বাকি পশুগুলো ও স্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ জিনিসও নিজেদের লোকজন দিয়ে সরিয়ে নেন।

গতকাল দুপুর ১২টার পর সাদিক অ্যাগ্রোর খামারে স্থাপনা ভাঙার কাজ শুরু হয়। ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ জানায়, সাদিক অ্যাগ্রো লিমিটেড অবৈধভাবে খাল ও সড়কের জায়গা দখল করেছে। এছাড়া ওই অংশে রিকশার গ্যারেজ ও বস্তিঘরের মতো বেশ কিছু অবৈধ স্থাপনা রয়েছে। সেগুলোই উচ্ছেদ করা হয়েছে।

উচ্ছেদ অভিযান চলাকালে ডিএনসিসির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোতাকাব্বির আহমেদ বলেন, রামচন্দ্রপুর খালের দুই ধারে যারা অবৈধ দখলদার ছিল তাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছি। খালের জমি পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর আগে এখান থেকে উত্তর সিটির মেয়র ট্রাকস্ট্যান্ড সরিয়েছেন, বহু তল ভবন ভেঙেছেন। এটা আমাদের নিয়মিত অভিযান।

তিনি বলেন, সাদেক অ্যাগ্রোর মালিককে ঈদের আগেও আমরা নোটিস দিয়েছি। অবৈধ স্থাপনা থাকলে সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে। আমরা ঈদের আগে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করিনি। কারণ, এর ফলে বাজারে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হতো। আমরা এমনটা চাইনি বলে উচ্ছেদে যাইনি। সেই নোটিসের কোনো ব্যবস্থা নিইনি।

জমির মালিকের অভিযোগ, তিনি কোনো নোটিস পাননি, তাহলে সাদিক অ্যাগ্রো ভাড়াটিয়া হিসেবে নোটিস কীভাবে পায়- জানতে চাইলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, খালের একটা নীতিমালা আছে। খালের পানি প্রবাহের সীমানা থেকে ৩০ ফুটের ভেতরে কোনো স্থাপনা থাকতে পারবে না। জমির মালিক কাগজ দেখিয়েছেন ৪ শতাংশের, কিন্তু দখল করেছেন এক বিঘা। আর আমরা উচ্ছেদ করছি অবৈধ স্থাপনা, জমির মালিককে নয়। খালের ভেতরে যে অংশ আছে, সেটা আমরা উচ্ছেদ করেছি।

উত্তর সিটির এ কর্মকর্তা বলেন, অভিযানে একজন জমির মালিক এসেছিলেন। সাদেক অ্যাগ্রোর মালিক বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কেউ আসেননি। আর সাদেক অ্যাগ্রোকে গত ১৮ জুন নোটিস করা হয়েছে যেন খালে বর্জ্য না ফেলে। কিন্তু তারা কোনো সহযোগিতা করেনি। আমরা খালের অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করছি। এরপর আমরা খাল পরিষ্কার অভিযান চালাব।

সাদিক অ্যাগ্রোর মালিক ইমরান হোসেন বলেন, আমি তো এই জমির মালিক নই, একজন ভাড়াটিয়া হিসেবে ছিলাম। তাই উচ্ছেদ অভিযানে আমার কিছু যায়-আসে না। আমি অন্য কোথাও চলে যাব।

সরজমিন দেখা যায়, উচ্ছেদ অভিযানের সংবাদ পেয়ে খাল ভরাট করে বসানো বস্তিঘরের বাসিন্দারা ছাউনির টিন ও বাঁশ-কাঠ খুলে ফেলতে শুরু করেন। বেলা সাড়ে ১১টার পর ওই স্থানে সিটি করপোরেশনের ভারী যন্ত্র আনা হয়। কিছুক্ষণ পর আসেন সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহে আলম, ঢাকা উত্তর সিটির অঞ্চল-৫ এর নির্বাহী কর্মকর্তা মোতাকাব্বির আহমেদসহ অন্য কর্মকর্তারা। পরে অবৈধ স্থাপনা ভাঙার কাজ শুরু হয়।

অভিযানের শুরুতে খামারের পশ্চিম অংশ ভাঙার কাজ শুরু হয়। দোতলা ওই স্থাপনার নিচ তলায় ছিল সাদিক অ্যাগ্রোর কার্যালয়। এর ওপরে টিনের ছাউনির একটি কক্ষে খামারের কর্মচারীদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। স্থাপনাটি ভাঙার কাজ চলাকালে দোতলার কক্ষের দুজন অবস্থান নিয়ে উচ্ছেদ কার্যক্রমে বাধা দেন। পরে পুলিশ সদস্যদের সাহায্যে তাদের সেখান থেকে সরানো হয়। পরে ওই অংশ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। বেলা সোয়া ২টার গাবতলী-সদরঘাট বেড়িবাঁধ সড়কের পাশে মোহাম্মদপুরের নবীনগর হাউজিংয়ের ৭ নম্বর সড়কে সাদিক অ্যাগ্রোর আরেকটি খামারও উচ্ছেদ করে ডিএনসিসি।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App