×

প্রথম পাতা

১৪ দিন পর জনসমক্ষে লাকী, মতিউর কোথায়

Icon

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

১৪ দিন পর জনসমক্ষে  লাকী, মতিউর কোথায়

কাগজ প্রতিবেদক : ছাগলকাণ্ডে আলোচনায় আসা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তা মতিউর রহমান ও তার স্ত্রী-সন্তানদের দীর্ঘদিন খোঁজ মিলছিল না। হঠাৎ ১৪ দিন পর মতিউরের প্রথম স্ত্রী নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা চেয়ারম্যান লায়লা কানিজ লাকীকে জনসমক্ষে দেখা গেল। গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে রায়পুরা উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে যান তিনি। তবে হঠাৎ লাকীর খোঁজ মিললেও হদিস মিলছে না মতিউরের। কর্মস্থলেও অনুপস্থিত থাকছেন তিনি। যদিও তিনি দেশত্যাগ করেছেন বলে গুঞ্জন আছে।

ঈদুল আজহার সময় মতিউর রহমানের দ্বিতীয় স্ত্রীর ছেলে মুশফিকুর রহমান ইফাতের ১২ লাখ টাকায় ছাগল কেনার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। এরপরই তা ‘টক অব দ্য কান্ট্রিতে’ পরিণত হয়। এরপর বেরিয়ে আসে এই কর্মকর্তা ও তার পরিবারের অঢেল অবৈধ সম্পদের খবর। মতিউর রহমানকে সবশেষ ঈদের দ্বিতীয় দিন (১৮ জুন) একটি বেসরকারি টেলিভিশনের ইন্টারভিউতে দেখা যায়। এরপর বসুন্ধরা, ধানমন্ডিসহ মতিউরের বিভিন্ন বাসভবনে খোঁজ নিয়েও সন্ধান মেলেনি তার। এমনকি কুরবানির ঈদের ছুটির পর অফিস খুললেও তিনি আর এনবিআর কার্যালয়ে আসেননি। মতিউরের সঙ্গে আড়ালে চলে যান মতিউরের প্রথম স্ত্রী-সন্তান। আর মতিউরের দ্বিতীয় স্ত্রী-সন্তান গত ১৮ জুন গোপনে মালয়েশিয়া চলে যান বলে জানা যায়।

তবে দীর্ঘ ১৪ দিন পর গতকাল মতিউর রহমানের প্রথম স্ত্রী ও রায়পুরা উপজেলা চেয়ারম্যান লায়লা কানিজ লাকী গতকাল হঠাৎ জনসম্মুখে আসেন। বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে আসন্ন এসএসসি পরীক্ষা এবং বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট সম্পর্কিত দুটি প্রস্তুতি সভায় অংশ নেন। মিটিং শেষে বের হলে সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি লাকী। সভায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সরকারি বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকলেও লাকীর অনীহার কারণে কোনো সাংবাদিককে সেখানে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। সভা শেষে দুপুর ১টার দিকে একটি কালো পাজেরো গাড়িতে করে উপজেলা পরিষদ থেকে বের হয়ে যান লাকী। তবে, সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় লাকীকে বলতে শোনা যায়, পাছে লোকে কত কিছুই বলে, তাতে আমার কোনো কিছু আসবে যাবে না। এ সময় অফিসের বাইরে তার বিপুল সংখ্যক কর্মী-সমর্থক উপস্থিত ছিলেন। এর আগে, ঈদের তিন দিন আগে গত ১৩ জুন সবশেষ অফিস করেছেন লায়লা কানিজ।

সরকারি তিতুমীর কলেজের সহযোগী অধ্যাপকের চাকরি ছেড়ে ২০২২ সালে রাজনীতিতে এসেই বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় রায়পুরা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হন লায়লা কানিজ। আছেন জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজ কল্যাণবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্বে। ছাগলকাণ্ডর পর তার নামে থাকা অঢেল সম্পদের বিবরণ শুনে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন স্থানীয় ব্যক্তিরা। লাকীর নির্বাচনী হলফনামায় দেয়া তথ্য অনুযায়ী তার অস্বাভাবিক সম্পদ রয়েছে। জানা যায়, বার্ষিক আয় বাড়ি-অ্যাপার্টমেন্ট-দোকান ও অন্যান্য ভাড়া থেকে ৯ লাখ ৯০ হাজার, কৃষি খাত থেকে ১৮ লাখ, শেয়ার-সঞ্চয়পত্র-ব্যাংক আমানতের লভ্যাংশ থেকে ৩ লাখ ৮২ হাজার ৫০০, উপজেলা চেয়ারম্যানের সম্মানী বাবদ ১ লাখ ৬৩ হাজার ৮৭৫, ব্যাংক সুদ থেকে ১ লাখ ১৮ হাজার ৯৩৯ টাকা পান তিনি। এছাড়া ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, নাটোরে অসংখ্য সম্পত্তির তথ্য তার নির্বাচনী হলফনামায় উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া নরসিংদীর মরজালে লাকীর নামে ৪০ বিঘা জমির ওপর ‘ওয়ান্ডার পার্ক’ নামে একটি পার্ক রয়েছে। এখানেই শেষ নয়, মরজালে চার বিঘা জমির ওপর আলিশান বাড়ি রয়েছে লাকীর নামে। স্থানীয়রা বলছেন- নির্বাচনী হলফনামার বাইরেও তার অঢেল সম্পত্তি রয়েছে। আর শিক্ষকতা করে এসব সম্পত্তি অর্জন করা সম্ভব নয়। এসব সম্পত্তির অনুসন্ধান করলেই মতিউরের দুর্নীতির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যাবে।

এদিকে, ছাগলকাণ্ডে আলোচনায় আসার পর গত ২৩ জুন মতিউর রহমানকে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট থেকে সরিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে সংযুক্ত করা হয়। বাদ দেয়া হয় সোনালী ব্যাংকের পরিচালক পদ থেকেও। এরপর তিনি সশরীরে উপস্থিত না হয়ে লোক মারফত যোগদানের চিঠি দেন তিনি। কিন্তু তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকছেন। এরপরই গুঞ্জন ছড়ায়, তিনি বিদেশে পালিয়েছেন। তিনি ভারতে পালিয়ে গেছেন বলে তার ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন। মতিউর সেখান থেকে উড়াল দেবেন দুবাই। যদিও সরকারি সংশ্লিষ্ট কোনো দপ্তরই এ তথ্য নিশ্চিত করতে পারেনি। মতিউর ঘনিষ্ঠরা বলেন, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে- এমন তথ্য পেয়ে পালিয়ে যান মতিউর। তবে অন্য একটি সূত্র বলছে- মতিউর দেশেই আত্মগোপনে আছেন। দেশে থেকেই তিনি সব নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি জব্দ হওয়ার আগে গোপনে সম্পদ বিক্রির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন পুরোদমে।

এদিকে, অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে টানা অনুপস্থিত থাকলে কিংবা বিনা অনুমতিতে বিদেশে চলে গেলে সরকারি কর্মকর্তাদের শাস্তির মুখে পড়তে হয়। এক্ষেত্রে মতিউরকেও শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরিয়ে মতিউর রহমানকে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে সংযুক্ত করার অর্থ হলো তাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে। সংস্থাপন বা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের জন্য ওএসডি করার বিধান আছে। এর বাইরে অন্য বিভাগ, সংস্থা বা মন্ত্রণালয়ের জন্য ওএসডির বদলে সংযুক্ত করার পদ্ধতি চালু আছে। মতিউর রহমানের ক্ষেত্রে সেটিই করা হয়েছে।

জানা যায়- অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে মতিউরের জন্য আলাদা কোনো কক্ষ নেই। এমনকি তার বসার জন্য কোনো চেয়ার-টেবিলও নেই। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে সংযুক্ত করার পর তিনি মন্ত্রণালয়েও আসেননি। সংযুক্ত থাকা কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট বসার জায়গা না থাকলেও তাদের কর্মস্থলে উপস্থিত হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

‘সরকারি কর্মচারী (নিয়মিত উপস্থিতি) বিধিমালা, ২০১৯’-এ বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো সরকারি কর্মচারী নিজ কাজে অনুপস্থিত থাকতে পারবে না। এ বিধান লঙ্ঘন করলে কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে কারণ দর্শানোর সুযোগ দিয়ে প্রতিদিনের অনুপস্থিতির জন্য এক দিনের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ কাটতে পারবে। ৩০ দিনের মধ্যে এ অপরাধ (বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিতি) একাধিকবার করলে কর্তৃপক্ষ কর্মচারীর সর্বোচ্চ সাত দিনের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ কাটতে পারবে। তবে ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’-এ বলা হয়েছে, ৬০ দিন বা এর চেয়ে বেশি সময় বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা বা বিনা অনুমতিতে দেশ ত্যাগ এবং ৩০ দিন বা এর চেয়ে বেশি সময় বিদেশের অবস্থান করা ‘পলায়ন’ হিসেবে গণ্য হবে। ‘পলায়ন’ এর ক্ষেত্রে তিরস্কার ছাড়া যে কোনো দণ্ড দেয়া যাবে।

এদিকে মতিউর ও তার পরিবারের সদস্যদের দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক। তিন সদস্যের একটি দল এ অনুসন্ধান কাজ করছে। দুদকের অনুসন্ধান সূত্র জানিয়েছে- মতিউর রহমান ও তার স্ত্রী-সন্তানদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে দুদক। শিগগিরই তাদের ফ্ল্যাট, প্লট, জমি, বাড়ি, গাড়ি ও কারখানা জব্দ করতে আদালতে আবেদন করা হবে। আদালতের আদেশের পরই সাবেক পুলিশপ্রধান বেনজীরের মতো মতিউর ও তার স্ত্রী-সন্তানদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App