×

প্রথম পাতা

কিলিং মিশনের সবাই ধরা পড়লেও অন্ধকারে মোটিভ

Icon

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কিলিং মিশনের সবাই ধরা   পড়লেও অন্ধকারে মোটিভ

কাগজ প্রতিবেদক : কলকাতার সঞ্জীবা গার্ডেন্সে ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার কিলিং মিশনে জড়িত ৭ জন গ্রেপ্তার হয়েছে। এখন পর্যন্ত তদন্তে যাদের নাম এসেছে, এদের মধ্যে শুধু মাস্টারমাইন্ড আখতারুজ্জামান শাহিন পলাতক রয়েছেন। হত্যাকাণ্ডের পর আমেরিকায় চলে যান তিনি। তবে গ্রেপ্তাররা রিমান্ডের জিজ্ঞাসাবাদে বিভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও দিয়েছেন বাংলাদেশে গ্রেপ্তার ৪ জন। এরপরও সংসদ সদস্য আনার হত্যায় কে বা কারা অর্থদাতা, রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতে চেয়েছেন কারা, স্বর্ণ পাচারের দন্ধ কার কার সঙ্গে, আর মোটিভই বা কি? সে সম্পর্কে এখনো সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারছে না ডিবি পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি সামনে আসার পর থেকে স্বর্ণ পাচার দন্ধ, রাজনৈতিক বিরোধকে সামনে আনা হলেও এ বিষয়ে পুলিশকে স্পষ্ট কোনো তথ্য দেয়নি গ্রেপ্তারদের কেউ।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আনার হত্যায় আর্থিক ও রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছে কে বা কারা- সেটা অবশ্যই বের হবে। মোটিভ অবশ্যই আছে। সম্ভাব্য সব কারণ আমলে নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তবে সুনির্দিষ্ট মোটিভ আখতারুজ্জামান শাহিন গ্রেপ্তার হলে স্পষ্ট হতো। এদিকে আনার হত্যা মামলায় চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থেকে গ্রেপ্তার ফয়সাল আলী ও মোস্তাফিজুর রহমানের ৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল বৃহস্পতিবার তাদের আদালতে হাজির করে পুলিশ। এরপর মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তাদের ১০ দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সহকারী কমিশনার মাহফুজুর রহমান। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আতাউল্লাহ তাদের ৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

এর আগে গতকাল দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) হারুন অর রশীদ বলেন, আনার হত্যার ঘটনার খবর যখনই আমাদের কাছে আসে, তখনই আমরা কিলিং মিশনে নেতৃত্ব দেয়া শিমুল ভূঁইয়া ও তার ভাতিজা তানভিরকে গ্রেপ্তার করি। এরপর সেলেস্টিকে গ্রেপ্তার করি। তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। এরপর আমরা নিজেরা কলকাতায় গিয়ে সঞ্জীবা গার্ডেন্স

পরিদর্শন করি। এই হত্যাকাণ্ডে আরো দুজন জড়িত বলে নাম জানতে পারি। তারা ফয়সাল ভূঁইয়া ও মোস্তাফিজুর রহমান। তারা আত্মগোপনের জন্য ফটিকছড়ি ও সীতাকুণ্ডের মাঝখানে পাতাল কালীমন্দিরে লাল ধুতি পরে অবস্থান করছিল। সেখানে তারা হিন্দু পরিচয়ে পাতাল মন্দিরে বাঁচার জন্য লুকিয়েছিল। এই দুজনকে গ্রেপ্তারের জন্য আমাদের একটি টিম ছিল ঝিনাইদহ ও সুন্দরবনেও গিয়েছিল। আর দুটি টিম খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, ফটিকছড়ি ও সীতাকুণ্ডে কাজ করছিল অনেকদিন ধরে। সবদিকে গোয়েন্দা জাল বিছিয়ে আমরা গতকাল সেই দুজনকে গ্রেপ্তার করি। শিমুল ভূঁইয়ার নেতৃত্বে হত্যাকাণ্ডের জন্য যা যা করার দরকার তারা তাই করেছে।

হারুন অর রশীদ বলেন, ১৩ মে সকালে এমপি আনার তার বন্ধু গোপালের বাসা থেকে বের হন। বিধানসভার কলকাতা পাবলিক স্কুলের সামনে অপেক্ষায় ছিল ফয়সাল। তিনি আনারকে রিসিভ করে লাল গাড়ির কাছে যান। যেখানে অপেক্ষায় ছিল শিমুল ভূঁইয়া। আর অন্যদিকে কলকাতা সঞ্জীবা গার্ডেন্সের ভাড়া বাসায় অপেক্ষায় ছিলেন মোস্তাফিজ, জিহাদ হাওলাদার। ফয়সাল, শিমুল ভূঁইয়া আনারকে নিয়ে ওই ফ্ল্যাটে নিয়ে গেলে রিসিভ করেন সেলেস্টি রহমান ও মোস্তাফিজুর রহমান। তারা নিচে কর্নারের রুমে যান। আনার যখন বুঝতে পারেন তিন চারজনের গতিবিধি, তখন তিনি অনেক কাকুতি-মিনতি করেন, বাঁচার চেষ্টা করেন। দৌড় দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টার সময় ফয়সাল তার নাকে মুখে ক্লোরোফর্ম মাখানো কাপড় ধরে নিস্তেজ করেন। এরপর হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত করা হয়।

সংসদ সদস্য আনার কিলিং মিশনে সাতজন অংশ নিয়েছেন; সাতজনই গ্রেপ্তার হয়েছেন জানিয়ে হারুন বলেন, তাদের মধ্যে শিমুল ভূঁইয়া, ফয়সাল, মোস্তাফিজুর, তানভীর ও সেলেস্টি; ভারতীয় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার জিহাদ হাওলাদার, আমাদের তথ্যের ভিত্তিতে নেপালে আত্মগোপনে থাকা গ্রেপ্তার সিয়াম; এর বাইরে আরো দুজন আমাদের কাছে গ্রেপ্তার রয়েছেন। তারা হলেন আওয়ামী লীগ নেতা মিন্টু ও গ্যাস বাবু।

আখতারুজ্জামান শাহিনের বিষয়ে ডিবি প্রধান বলেন, শাহিন মাস্টারমাইন্ড। তিনি তদন্ত থেকে শেষ হয়ে যাননি। কিলিং মিশনে সরাসরি জড়িত সাতজন। সাতজনই গ্রেপ্তার। এর বাইরে মাস্টারমাইন্ড, পরিকল্পনাকারী, মোটিভ, অর্থদাতা এগুলো তো অন্য বিষয়। এখনো আমাদের কাছে শাহিন মাস্টারমাইন্ড। কারণ তিনিই তো তার পাসপোর্ট দিয়ে কলকাতার সঞ্জীবা গার্ডেন্সে ফ্ল্যাটটি ভাড়া নিয়েছিলেন। হত্যার পরিকল্পনা, বাসা ভাড়া, এসবই তো শাহিন করেছেন। শাহিন ১০ মে দেশে ফিরে এসেছেন। জিহাদ বাদে হত্যার পর একে একে কিলিং মিশনে অংশ নেয়া সদ্যদের কেউ দেশে, কেউ নেপালে চলে যায়। শিমুল ভূঁইয়া গ্রেপ্তারের পর শাহিন কিন্তু প্রথমে দিল্লি, এরপর নেপাল তারপর দুবাই হয়ে আমেরিকা চলে যান। তিনি আমেরিকার নাগরিক।

চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তারকৃতরা হত্যার কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জাম সম্পর্কে কিছু বলেছে কিনা- জানতে চাইলে হারুন বলেন, কলকাতার একটি মার্কেট থেকে ১৭ হাজার টাকা দিয়ে একটি চেয়ার কিনে আনেন তারা। সঙ্গে আনেন ক্লোরোফর্ম। সেই চেয়ারে বেঁধে আনারকে বিবস্ত্র করা হয়। এই কাজগুলো করেছে ফয়সাল। আর হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র সিয়াম এনে দিয়েছিল ফয়সালকে। মোস্তাফিজ ও ফয়সাল হত্যার কাজ শেষ করে দেশে ফিরে শাহিনকে ফোন করে। বলে আমরা কোথায় থাকব। শাহিনের একটা বাসা আছে বসুন্ধরায়। তারা সেখানে যায়। সেখানে গিয়ে শিমুল ভূঁইয়ার সঙ্গে কথা বলতে বলতে ফোন বন্ধ হয়ে যায়। ফয়সাল ও মোস্তাফিজ ছিল ট্রাক ড্রাইভার। তাদের ৩০ হাজার টাকা দেয়া হয়। মোবাইল বন্ধ করে তারা চলে যায় খাগড়াছড়ির গহীন অঞ্চলে। সেখানে সীতাকুণ্ড পাহাড়ের নিচে পাতাল কালীমন্দির আছে। সেখানে তারা নিজেদের নাম বদলে ফেলে। ফয়সাল পলাশ রায় আর মোস্তাফিজুর শিমুল রায় নাম ধারণ করে হিন্দু সেজে মন্দিরে অবস্থান করে। মন্দিরের সবাইকে তারা বলে, মাকে তারা খুব ভালোবাসেন। কালীমন্দির ছাড়া থাকতে পারি না। তারা চুলের ধরন পরিবর্তন করেন, ধুতি পরেন।

এই অবস্থায় হত্যার মূল মোটিভটা কি? জানতে চাইলে হারুন বলেন, এই সংসদ সদস্য কিলিং মিশনে জড়িত সাতজনের সবাই গ্রেপ্তার হয়েছে। যে কোনো হত্যার পেছনে একটা মোটিভ থাকে। ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার জনপ্রিয় সংসদ সদস্য। তাকে টাকা-পয়সা লেনদেনের কথা বলে নিয়ে যান শাহিন। তাদের মধ্যে কি কথা হয়েছিল? কারা লাভবান? কারা আর্থিক ও রাজনৈতিকভাবে লাভবান- সেটা আশা করি বের হবে। সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার হত্যায় মোটিভ তো অবশ্যই আছে। তবে এখন পর্যন্ত আমরা সুনির্দিষ্ট মোটিভ বলতে পারছি না। আমরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিকসহ সম্ভাব্য সব কারণ আমলে নিয়ে তদন্ত করছি। সবশেষ গ্রেপ্তারদের হত্যার সম্ভাব্য সব মোটিভ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

উল্লেখ্য, গত ১২ মে চিকিৎসার জন্য ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ থেকে ভারতে যান এমপি আনার। ওঠেন পশ্চিমবঙ্গের বরাহনগর থানার মণ্ডলপাড়া লেনে গোপাল বিশ্বাস নামে এক বন্ধুর বাড়িতে। পরদিন চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন। এরপর থেকেই রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন আনোয়ারুল আজীম। এর ৫ দিন পর ১৮ মে বরাহনগর থানায় আনোয়ারুল আজীম নিখোঁজের বিষয়ে একটি জিডি করেন বন্ধু গোপাল বিশ্বাস। এরপরও খোঁজ মেলেনি তিনবারের এই সংসদ সদস্যের। ২২ মে হঠাৎ খবর ছড়ায়, কলকাতার পার্শ্ববর্তী নিউটাউন এলাকায় সঞ্জীবা গার্ডেন্স নামে একটি আবাসিক ভবনের বিইউ ৫৬ নম্বর রুমে আনোয়ারুল আজীম খুন হয়েছেন। ঘরের ভেতর পাওয়া গেছে রক্তের ছাপ। তবে ঘরে মেলেনি মরদেহ। এ ঘটনায় ২২ মে ঢাকার শেরেবাংলা নগর থানায় মামলা করেন তার মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিন। এই মামলায় পৃথক অভিযানে মোট ৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি পুলিশ। দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে কলকাতা সিআইডি।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App