×

প্রথম পাতা

আলোচনায় পৃষ্ঠপোষকরাও

ছাগলকাণ্ডের মতিউরের উত্থান বিএনপি আমলে

Icon

এস এম মিজান

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ছাগলকাণ্ডের মতিউরের  উত্থান বিএনপি আমলে

ছেলের ছাগলকাণ্ডে আলোচনায় এসে পদ হারিয়ে লাপাত্তা হয়ে যাওয়া রাজস্ব কর্মকর্তা মতিউর রহমানের বিষয়টি বর্তমানে ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’। তার ছেলে ইফাতের ‘ছাগলকাণ্ডে’ বেরিয়ে আসে ‘থলের বিড়াল’। দুদকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে এই রাজস্ব কর্মকর্তার সম্পদের পাহাড়। বর্তমানে সব জায়গায় একই আলোচনা- রাজস্ব বিভাগের এই কর্মকর্তা কীভাবে এত সম্পদশালী হলেন? তার প্রভাবের উৎসই বা কী? কাদের পৃষ্ঠপোষকতায় কিংবা আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এই বিপুল সম্পদ এবং রত্নাভাণ্ডারের মালিক হলেন তিনি?

অনুসন্ধানে জানা যায়- মতিউরের গ্রামের বাড়ি বরিশালের মুলাদী উপজেলার কাজীর চর ইউনিয়নের বাহাদুরপুরে। তার বাবা আব্দুল হাকিম হাওলাদার পেশায় ছিলেন স্কুলশিক্ষক। একজন সৎ ব্যক্তি হিসাবে তিনি এলাকায় পরিচিত ছিলেন। জীবদ্দশায় তিনি কাজীর চর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি ছিলেন। স্কুল জীবন থেকেই তুখোড় মেধাবী ছিলেন মতিউর। তিনি মুলাদীর পাশের উপজেলা বাবুগঞ্জে খালার বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করেছেন। পরিবারে ৩ ভাই আর ২ বোনের মধ্যে সবার বড় তিনি। রাজস্ব কর্মকর্তা হিসাবে মতিউর ক্ষমতাবান হয়ে ওঠার আগ পর্যন্ত হাকিম হাওলাদারের পরিবারে তেমন সচ্ছলতা ছিল না। গ্রামে জায়গা-জমির পরিমাণও খুব বেশি ছিল না। তবে ৯১ পরবর্তী সময়ে বিএনপির শাসনামলে রাজস্ব কর্মকর্তা হিসাবে মতিউরের উত্থানের পর থেকেই পাল্টে যেতে থাকে এ পরিবারের অর্থবিত্তের চিত্র।

নাম পরিচয় গোপন রাখার শর্তে মতিউরের ঘনিষ্ঠ একজন কর্মকর্তা বলেন, বিএনপি শাসনামলের অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের অত্যন্ত স্নেহের পাত্র ছিলেন মতিউর। সাইফুরের ছেলেরা ছিলেন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। রাজস্ব ক্যাডারে যাওয়ার আগে ১১তম বিসিএসে ট্রেড ক্যাডারে চাকরি হয়েছিল মতিউরের। ট্রেড ক্যাডার বিলুপ্ত হলে পছন্দ অনুযায়ী অন্যান্য ক্যাডারে যাওয়ার সুযোগ পান ট্রেড ক্যাডারের কর্মকর্তারা। সাইফুর রহমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ হিসাবে তখনই রাজস্ব ক্যাডারে ঢুকে পড়েন মতিউর।

তাছাড়া সাইফুর রহমানের সূত্র ধরে চাকরি জীবনেও তিনি আরো অনেক সুযোগ বাগিয়ে নেন। এই কর্মকর্তা বলেন, শুধু বিএনপির আমলে নয়, ৯৬-এর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার সঙ্গেও তার সখ্যতা গড়ে ওঠে। ৯১ পরবর্তী সময়ে সব সরকারের অর্থমন্ত্রী ও এনবিআর চেয়ারম্যানদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলতেন তিনি। এক পর্যায়ে অর্থমন্ত্রী ও এনবিআর চেয়ারম্যানের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও সুকৌশলে ঘনিষ্ঠ হয়ে যেতেন। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সব সরকারের আমলেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে ধনকুবের হয়েছেন দুরন্ধর মতিউর।

এদিকে, অবৈধভাবে বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক বনে যাওয়া রাজস্ব কর্মকর্তা মতিউর রহমানের পৃষ্ঠপোষকদের নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকজনের নামও সামনে এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের দাবি ওঠেছে সর্বত্র। এদের মধ্যে একজন ছিলেন ক্ষমতাধর সচিব, যিনি গত মাসেই অবসরে গেছেন। আরেকজন বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম শীর্ষ পদে আছেন। এই দুজনের বদৌলতে মতিউর রহমান সোনালী ব্যাংকের পর্ষদে পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান বলে গুঞ্জন রয়েছে।

এছাড়া বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অন্যতম শীর্ষ এক কর্মকর্তার নামও রয়েছে আলোচনায়। এর বাইরে প্রশ্রয়দাতা হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক এক চেয়ারম্যানের নামও শোনা যাচ্ছে। তার সময়কালেই মতিউরের উত্থান শুরু হয়। অভিযোগ আছে, রাজস্ব কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের পরিচালক হওয়ার সুবাদে পুঁজিবাজারসহ বিভিন্ন ব্যবসায় সুযোগ-সুবিধা নিয়ে মতিউর দেশ-বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন।

মতিউরের এমন উত্থানের কাহিনী সামনে আসার পর এখন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, ব্যাংকপাড়া, শেয়ারবাজারসহ সর্বত্র তার উত্থানের পেছনের পৃষ্ঠপোষকদের নাম নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তারা বলছেন- মতিউর রহমানের উত্থান মূলত ২০০৯ সালে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের যুগ্ম কমিশনার থাকাকালে। পরে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক জায়গায় পদায়ন হয়েছে তার। এনবিআরের সাবেক এক চেয়ারম্যানের আস্থাভাজন হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ) ভ্যাটের কমিশনার হিসেবে। সে সময় বিভিন্ন কোম্পানিতে ভ্যাট ডিমান্ড করে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে মতিউরের বিরুদ্ধে। এরপর ২০১৫ সালে পদোন্নতি পেয়ে কমিশনার হন। ২০২১ সালের ১২ আগস্ট তাকে কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনালে সদস্য (টেকনিক্যাল) হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে পদ হারানো পর্যন্ত ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি।

এর আগে ২০২২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তিন বছরের জন্য সোনালী ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে মতিউর রহমানকে নিয়োগ দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। তৎকালীন অর্থ সচিবের সঙ্গে সখ্যতার সুযোগে তিনি ওই পদে নিয়োগ পান বলে আলোচনা রয়েছে। তখনকার ওই অর্থসচিব এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম শীর্ষ পদে কর্মরত রয়েছেন। এছাড়া মতিউরকে যখন সোনালী ব্যাংকের পরিচালক করা হয়, তখন আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ছিলেন শেখ মোহাম্মদ সলীম উল্লাহ। মতিউরের উত্থানের পেছনে তার পৃষ্ঠপোষকতাও ছিল বলে গুঞ্জন রয়েছে।

বিসিএস (শুল্ক ও আবগারি) ক্যাডারের কর্মকর্তা মতিউর রহমানকে গত রবিবার তার বর্তমান পদ থেকে সরিয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে সংযুক্ত করা হয়েছে। একইদিন তাকে সোনালী ব্যাংকের পরিচালক পদ থেকে অপসারণ করা হয়। এছাড়া প্রথম স্ত্রী ও এক ছেলেসহ মতিউরের বিরুদ্ধে বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। ছেলের ছাগলকাণ্ডে বাবার পরিচয় নিশ্চিতের পর থেকেই আত্মগোপনে আছেন মতিউর। সবশেষ গুঞ্জন রয়েছে গত রবিবার বিকালে আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে গোপনে দেশত্যাগ করেন তিনি। মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে গত ৪ জুন বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ জমা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)। অভিযোগটি যাচাই-বাছাই করে কমিশন অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় এবং অনুসন্ধান টিম গঠন করে। যদিও এর আগে তার বিরুদ্ধে চারবার তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল দুদক। কিন্তু রহস্যজনকভাবে প্রতিবারই দুদক থেকে ক্লিনচিট পান তিনি।

জানা যায়, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত টাকা দিয়ে ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, নরসিংদী, বরিশালসহ বিভিন্ন জায়গায় মতিউরের নামে বাড়ি, জমি, ফ্ল্যাট, প্লটসহ অন্যান্য স্থাবর সম্পদের খোঁজ মিলেছে। তার দুই স্ত্রীর নামেও বিপুল সম্পত্তি করার তথ্য বেরিয়ে এসেছে। এছাড়া সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকে নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের নামে এফডিআর এবং শেয়ারবাজারে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের খবর পাওয়া গেছে। এখন পর্যন্ত শেয়ারবাজারে এক ডজনের বেশি কোম্পানিতে মতিউর রহমান, তার ছেলে আহমেদ তৌফিকুর রহমান অর্ণব, মেয়ে ফারজানা রহমান ইপ্সিতা, প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজ, দ্বিতীয় স্ত্রী শাম্মী আখতার শিবলী, বোন হাওয়া নূর বেগম, ভাই এম এ কাইয়ূম হাওলাদার, নূরুল হুদাসহ তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট একাধিক প্রতিষ্ঠানের প্লেসমেন্ট বাণিজ্যের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর বাইরে গ্রামের বাড়ি বরিশালের মুলাদী উপজেলার কাজীরচর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামেও হাজার বিঘার বেশি জমির মালিক তিনি। শুধু দেশে নয়, মতিউরের বিরুদ্ধে সিঙ্গাপুর, কানাডা, মালয়েশিয়া, দুবাই ও যুক্তরাষ্ট্রে অন্তত তিন হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ উঠেছে।

টাইমলাইন: ছাগলকাণ্ডে বিপাকে মতিউর

আরো পড়ুন

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App