×

প্রথম পাতা

হাসিনা-মোদি বৈঠকে সামরিক, নিরাপত্তা ও পানিসহ নানা বিষয়ে সমঝোতা

উন্নয়ন-বন্ধুত্বের পথে নবযাত্রা

Icon

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

উন্নয়ন-বন্ধুত্বের পথে নবযাত্রা

কাগজ প্রতিবেদক : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সামরিক, নিরাপত্তাসহ নানা বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। সপ্তাহ দুয়েক পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন যাচ্ছেন। আর আগে ভারতের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ এই সমঝোতা তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আলোচনার পর দুই দেশের মধ্যে ৭টি নতুন এবং পুরনো ৩টি নবায়নসহ মোট ১০টি সমঝোতা স্মারক সই হয়। তবে তিস্তা নদীর পানি বণ্টনের চুক্তি অধরা রয়ে গেছে। শুধু বলা হয়েছে, তিস্তা নিয়ে গবেষণার জন্য ভারত থেকে একটি কারিগরি দল বাংলাদেশ সফর করবে। তারা পানিবণ্টন না তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করবে তা বলা হয়নি। তবু সফর নিয়ে দুই প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত খুশি। তারা বলেছেন, বন্ধুত্ব ও উন্নয়নের পথে নবযাত্রা শুরু হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলেছেন, বৈঠকে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, মহাসাগরীয় অর্থনীতি, মহাকাশ ও টেলিযোগাযোগ এবং সামরিক খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের জন্য সমঝোতা সই হয়েছে। এর মাধ্যমে নয়াদিল্লি নিজেকে একটি আঞ্চলিক ও চীনের পাল্টা শক্তি হিসাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে। দুই সপ্তাহ আগে নরেন্দ্র মোদি তৃতীয় মেয়াদে দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর নয়াদিল্লি সফরকারী প্রথম বিদেশি নেতা হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় গতকাল শনিবার চুক্তিগুলো স্বাক্ষরিত হয়।

জানতে চাইলে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও কূটনৈতিক বিশ্লেষক শমসের মবিন চৌধুরী ভোরের কাগজকে বলেন, সফরটি সময়োপযোগী। দুই দেশেই নতুন সরকার ক্ষমতায় ফিরে এসেছে। শুরুতেই তিস্তা, সেপা ও গঙ্গাচুক্তি নিয়ে দুই সরকার প্রধানের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। এটা বেশ ইতিবাচক। দুই দেশের মধ্যে সই হওয়া সামরিক সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে দুই দেশের মধ্যে শুধু মহড়া নয়; প্রয়োজনীয় অস্ত্র সরবরাহ করার কথাও বলা হয়েছে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে সামরিক সহযোগিতায় নতুন ধরনের ক্ষেত্র তৈরি হলো বলে মনে করেন তিনি। তিস্তায় পানি চুক্তি না হলেও পানি সংরক্ষণ করে ব্যবস্থাপনার কথা বলা হয়েছে। এটাও একটি অগ্রগতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই পরিকল্পনাটি আরো আগে থেকে করলে দুই দেশই লাভবান হতো।

বৈঠকের পর নয়াদিল্লির হায়দ্রাবাদ হাউসে যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ভারত আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী এবং বিশ্বস্ত বন্ধু। দুই দেশের রাষ্ট্রনেতা এবং প্রতিনিধিদের এই বৈঠকে চূড়ান্ত হয়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির পথরেখা। তার মধ্যে অন্যতম, ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় সমুদ্রাঞ্চলে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা চুক্তি। সে প্রসঙ্গের উল্লেখ করে শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে মোদি বলেন, এই সমুদ্র সহযোগিতার মাধ্যমে নীল অর্থনীতির পথে একসঙ্গে চলবে দুই দেশ। আঞ্চলিক সমুদ্রপথের নিরাপত্তায় এই দ্বিপক্ষীয় চুক্তি আগামী দিনে নয়াদিল্লি ও ঢাকার মধ্যে বন্ধন আরো নিবিড় করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে দুই প্রধানমন্ত্রী জানান, ভারত ও বাংলাদেশ একটি সার্বিক অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তিতে আলোচনা শুরু করতে সম্মত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে নরেন্দ্র মোদি বলেন, বাংলাদেশ আমাদের বৃহত্তম উন্নয়ন-সঙ্গী। তাদের স্বার্থকে ভারত সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক সহযোগিতার পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, সামরিক সহযোগিতা, রেল যোগাযোগ এবং পরমাণু গবেষণার ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে শনিবারের বৈঠকে। ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হয়েছে অংশীদারি নিয়েও। ভারতের সামুদ্রিক প্রতিবেশীদের আঞ্চলিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ ও সুবিধার্থে তার ইন্দো-প্যাসিফিক মহাসাগর উদ্যোগে যোগদানের বাংলাদেশের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে মোদি বলেন, ঢাকার সঙ্গে চুক্তিগুলো তার দেশের প্রতিবেশী-প্রথম পদ্ধতি অনুসরণের অংশ। প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেন, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ও সেনার আধুনিকীকরণে সাহায্য করবে ভারত। সন্ত্রাসবাদ ও কট্টরপন্থার মোকাবিলায় দুই দেশ সহযোগিতা করবে। গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির নবীকরণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। তিস্তার সংরক্ষণ নিয়ে শিগগিরই টেকনিক্যাল টিম বাংলাদেশ সফর করবে। মোদি বলেন, বাংলাদেশ থেকে যারা চিকিৎসার জন্য ভারতে আসেন, তাদের জন্য দ্রুত ই-মেডিকেল ভিসা চালু করবে ভারত। বাংলাদেশের মানুষের সুবিধার জন্য রংপুরে অ্যাসিসটেন্ট হাই কমিশন অফিস খোলা হবে। এছাড়া মহাকাশের ক্ষেত্রে দুই দেশ সহযোগিতা করবে। মৈত্রী উপগ্রহ নিয়েও বৈঠকে কথা হয়েছে। ডিজিটাল ও বিদ্যুৎ ক্ষেত্র নিয়ে সমঝোতা হয়েছে। সিরাজগঞ্জে ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপোর কাজ ভারত শেষ করবে।

প্রসঙ্গত, আগামী ৯ জুলাই চীন সফরে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা। তার আগে হাসিনাকে পাশে নিয়ে নরেন্দ্র মোদি বলেন, ভারত মহাসাগর নিয়ে ভারতের ভিশনকে সমর্থন করেছে বাংলাদেশ। সেজন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশ ২০২৬ সালে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পাবে। আর ২০৪১ সালে স্মার্ট বাংলাদেশ হবে। ভারতও ২০২৭ সালের মধ্যে বিকশিত ভারত হবে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ভারত হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী। ভারত বাংলাদেশকে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে সাহায্য করেছে। মুক্তিযোদ্ধার পাশাপাশি ভারতের সেনাও শহীদ হয়েছে। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে মোদি যোগ দিয়েছিলেন। তার জন্য তিনি কৃতজ্ঞ। শেখ হাসিনা বলেন, আমি ২০২২ সালে এসেছি। ২০২৩ সালে জি-২০ বৈঠকে ভারতের আমন্ত্রণে এসেছি। কয়েকদিন আগে মোদির শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে এসেছি। মোদি তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন বলে তাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। জলবণ্টন, জ্বালানি, শক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমঝোতা হয়েছে। দুই দেশের বন্ধুত্ব বাড়তে থাকবে। মোদিকে বাংলাদেশ সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন হাসিনা।

বিশ্লেষকরা বলেছেন, চীন সফরের আগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশে মহাসাগরে নিরাপত্তাসংক্রান্ত সমঝোতার কারণে নতুন বার্তা পাওয়া যাচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারসাম্যের কূটনীতি বজায় রাখতে হবে। কারণ বাংলাদেশ চীনের সঙ্গেও সুসম্পর্ক উপভোগ করে। পাশাপাশি বেশির ভাগ কাঁচামাল আমদানির জন্য চীন বাংলাদেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার। কিন্তু বেইজিংয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখাও বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জিং। কারণ চীনের প্রধান প্রতিদ্ব›দ্বী ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে হবে বাংলাদেশকে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প, যা রপ্তানি থেকে ৮০ শতাংশর বেশি বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে আসে, সেই পোশাক শিল্পের কাঁচামালের জন্য চীনের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল বাংলাদেশ। এর আগে শেখ হাসিনা নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের বলেন, দুই দেশ নদীর পানি বণ্টন এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভারতীয় শিল্প খাতের নেতারা তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় শেখ হাসিনা তাদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য আমন্ত্রণ জানান- যাতে বড় বন্দর, নৌপথ, রেল ও সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নের পরিকল্পনা নয়েছে। সেই অবকাঠামো সম্প্রসারণে সহায়তার জন্য ভারত গত আট বছরে বাংলাদেশকে ৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে। শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ দল ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে, তিনি বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া ভারতীয় জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর বিষয়ে নয়াদিল্লির উদ্বেগের সমাধান করার জন্য কাজ করেছেন।

যেসব সমঝোতা স্মারক সই করল বাংলাদেশ-ভারত : বাংলাদেশ-ভারত ডিজিটাল পার্টনারশিপ ও গ্রিন পার্টনারশিপ চুক্তি, ৩টি নবায়নসহ মোট ১০টি সমঝোতা স্মারক সই করেছে বাংলাদেশ ও ভারত। গতকাল শনিবার দিল্লির হায়দ্রাবাদ হাউসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর এগুলো সই করা হয়। নতুন সমঝোতা স্মারকের মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশ-ভারত ডিজিটাল পার্টনারশিপ (চুক্তি), ভারত-বাংলাদেশ গ্রিন পার্টনারশিপ (চুক্তি), সমুদ্র সহযোগিতা ও ব্লু-ইকোনোমি, ভারতের ইন-স্পেস এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সমঝোতা, দুই দেশের রেল মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সংযোগসংক্রান্ত সমঝোতা, সমুদ্রবিষয়ক গবেষণায় দুই দেশের সমঝোতা, কৌশলগত ও অপারেশনাল খাতে সামরিক শিক্ষা সহযোগিতায় ডিফেন্স সার্ভিসেস স্টাফ কলেজ, ওয়েলিংটন-ইন্ডিয়া এবং মিরপুর ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজের মধ্যে সমঝোতা। নবায়ন করা সমঝোতার মধ্যে রয়েছে- স্বাস্থ্য ও ওষুধসংক্রান্ত পুরনো সমঝোতা নবায়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও প্রশমনে ভারতের ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি, বাংলাদেশ ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান সমঝোতা নবায়ন, মৎস্য সম্পদের উন্নয়নে বিদ্যমান সমঝোতা নবায়ন।

এদিকে, শেখ হাসিনা-মোদির বৈঠক নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক বন্ধন আরো গভীর করার লক্ষ্যে আলোচনা করেছেন। এই আলোচনায় উন্নয়ন অংশীদারত্ব, জ্বালানি, পানিসম্পদ, বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং আরো অনেক কিছুসহ দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এদিন, সকালে রাষ্ট্রপতি ভবনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয়। এ সময় শেখ হাসিনা সশস্ত্র সালাম গ্রহণ ও গার্ড অব অনার পরিদর্শন করেন। সকাল ৯টায় রাষ্ট্রপতি ভবনে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বিকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সচিবালয়ে ভারতের উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এরপর শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতি ভবনে ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সন্ধ্যা ৬টায় প্রধানমন্ত্রী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে নয়াদিল্লি ত্যাগ করেন। রাত ৯টার দিকে ঢাকায় পৌঁছেন তিনি।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App