×
Icon এইমাত্র
কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কোটা আন্দোলনকারীরা বাংলাদেশ টেলিভিশনের মূল ভবনে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ। কোটা সংস্কার আন্দোলনে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ১৯ জন নিহত কোটা ইস্যুতে আপিল বিভাগে শুনানি রবিবার: চেম্বার আদালতের আদেশ ছাত্রলীগের ওয়েবসাইট হ্যাক ‘লাশ-রক্ত মাড়িয়ে’ সংলাপে বসতে রাজি নন আন্দোলনকারীরা

প্রথম পাতা

ড. আতিউর রহমান

বাঙালির মুক্তির চিরসারথি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

Icon

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

 বাঙালির মুক্তির চিরসারথি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

স্বাধীনতা-পূর্বকালে বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম থেকে শুরু করে স্বাধীনতার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তীকালে আপামর জনগণের ভাগ্যোন্নয়ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অভিযানে বাঙালিকে পথ দেখিয়ে চলেছে যে রাজনৈতিক মঞ্চ তার নাম বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। প্রায় সব শ্রেণির মানুষের প্রতিনিধিই এ দলের শুভাকাক্সক্ষী। ধীরে ধীরে দলটির কাঠামোগত রূপান্তর ঘটেছে। মূল সংগঠক যারা, তাদের মধ্যেও এখন ধনিক ও ব্যবসায়ী শ্রেণির প্রাধান্য লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে উচ্চ শিক্ষিত পেশাজীবীরাও এই দলের নেতৃত্বের নানা পর্যায়ে যুক্ত হয়েছেন। আর দীর্ঘদিন ধরে দলটি ক্ষমতায় রয়েছে বলে বুদ্ধিজীবীসহ অনেক পেশাজীবী দলটির সরকারে এবং বিভিন্ন কমিটিতে স্থান করে নিয়েছেন। বিশেষ করে দলের উপদেষ্টামণ্ডলীতেও তাদের সংখ্যা বেশ। এখনো দলের প্রাণশক্তি তার তৃণমূল। দল-অন্তপ্রাণ তৃণমূল কর্মী ও নেতাদের সজাগ সক্রিয়তার কারণে মাঠের আওয়ামী লীগ এখনো প্রধানতম রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উপস্থিতি বজায় রেখেছে। সবারই নিরঙ্কুশ আনুগত্য দলীয় সভাপতির প্রতি। আর তার উৎস আবার দলের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পরবর্তী সময়ে তিনিই হয়ে ওঠেন দলের প্রধান মুখপাত্র এবং প্রতীক। এই বাংলাদেশ কিছুতেই এত অল্প সময়ে অর্জন সম্ভব ছিল না বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী নেতৃত্ব ছাড়া। পাকিস্তান রাষ্ট্রকে

‘ভ্রান্তপ্রত্যুষ’ হিসেবে চিহ্নিত করে যিনি নতুন করে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তির বিকাশে মনোনিবেশ করেছিলেন তাঁর নাম শেখ মুজিব।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই মহান ভাষা আন্দোলনের দুই পর্যায়েই বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সহনেতারা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫৪-এর নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু আরো বেশি করে পাদপ্রদীপের আলোয় চলে আসেন। ফলে পাকিস্তানি অপশাসকরা বারবার বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে আওয়ামী লীগকে স্তব্ধ করতে সচেষ্ট হয়েছে। তবু বঙ্গবন্ধু ও তাঁর আওয়ামী লীগকে দমিয়ে রাখা যায়নি। ১৯৬৩ সালে সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পরেই শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের প্রধানতম নেতা হিসেবে আরো বিকশিত হতে থাকেন। তখন বিচক্ষণ তাজউদ্দীন আহমদ তাঁর দলের সাধারণ সম্পাদক। এসবের মাধ্যমেই শেখ মুজিব আওয়ামী লীগকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত করেছিলেন। তাঁর নান্দনিক নেতৃত্ব, ৬ দফা, অসহযোগ আন্দোলন, একাত্তরের ৭ মার্চের অমর ভাষণ বাঙালির জাতীয়তাবাদী সংগ্রামে নতুন মাত্রা যোগ করে। এসবই ছিল তাঁর নেতৃত্বে বাঙালির মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার পেছনে ‘চালিকা শক্তি’।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আওয়ামী লীগ নেতারা মুজিবনগর সরকার পরিচালনা এবং আঞ্চলিক প্রশাসক হিসেবে দেশব্যাপী মুক্তিযোদ্ধাদের দেখভালের দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বন্দি জীবন থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৭২-৭৫ সময়টায় আওয়ামী লীগের নেতা ও কর্মীরা বঙ্গবন্ধুর সরকারকে ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক ও সামাজিক সমর্থন দেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও সার্বিকভাবে এ সময়টি ছিল বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির বেড়ে ওঠার শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপনের। বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী নেতৃত্বে জাতীয় সার্বভৌমত্ব, সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরতার লক্ষ্যসমূহ পূরণের দিকে বিশেষ নজর দেয় এই সরকার।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর জন্য শিল্প ও ব্যাংকগুলো রাষ্ট্রীয় মালিকানায় আনলেও আইনের আওতায় ব্যক্তি খাতকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছিল সংবিধানে। কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এই সরকার প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল।

তবে এই সময়ে বিশ্ব অর্থনীতি ছিল টালমাটাল। সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো প্রকট রূপ নিলে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সাংবিধানিক অনুমোদন নিয়েই একক রাজনৈতিক মঞ্চের সরকার গঠন করেন। আওয়ামী লীগ বিলুপ্ত করে আরো দুটো প্রগতিশীল দল ও সামাজিক শক্তির সমন্বয়ে গড়ে তোলেন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল)। যদিও তার চিরদিনের বহুদলীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতি থেকে কিছুটা ব্যতিক্রম, তবুও এই দলের বা মঞ্চের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র মজবুত করার সুযোগ ছিল। মূলত প্রশাসনকে জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে সমবায় পদ্ধতিতে কৃষি পরিচালনার লক্ষ্যে তিনি দ্বিতীয় বিপ্লবের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এই পদ্ধতিটি ভালোভাবে চালু হওয়ার আগেই বিশ্বাসঘাতকদের নির্মম আক্রমণে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের প্রায় সবাইকে প্রাণ দিতে হয়। স্বদেশ এক অন্ধকার যুগে প্রবেশ করে। ওই দুঃসময়েই বাংলাদেশের মানুষ অনুভব করতে পারেন, কী মানবিক, দূরদর্শী, বৈশ্বিক মাপের এবং জাতীয় ঐক্যের প্রতীক এক অসামান্য নেতাকে তারা হারিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে বেশ কিছু কাল পরে নেতৃত্বের কোন্দল এবং সামরিক শাসনের যাতাকলে নিষ্পেষিত আওয়ামী লীগ কর্মীদের মনে ফের আশা ও ভরসা দেয়ার লক্ষ্য নিয়েই বিদেশে থাকার কারণে বেঁচে যাওয়া বঙ্গবন্ধুকন্যাদ্বয় ফের দেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

১৯৮১ সালের ১৭ মে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ছিল আসলেই মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশের প্রত্যাবর্তন। এক অনিশ্চিত সময়ে দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেই সারাদেশ চষে বেড়ান এবং বঙ্গবন্ধুপ্রেমী কর্মী, নেতা ও শুভাকাক্সক্ষীদের জাগ্রত ও সংগঠিত করতে শুরু করেন। বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমৃদ্ধ সোনার বাংলার স্বপ্ন পূরণে তিনি দলকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করার পাশাপাশি নিজে বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীদের সঙ্গে সংযোগ বাড়াতে থাকেন। নানা প্রতিকূলতার মুখে শেখ হাসিনা দারুণ সহিষ্ণুতা ও সাহস দেখিয়ে পুরো মুক্তিকামী জাতিকে আশার বন্ধনে বেঁধে ফেলেন। এ কারণেই তিনি প্রথমে ১৯৯৬ সালে এবং এরপর ২০০৯ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সরকার পরিচালনায় শেখ হাসিনা উপরে উল্লিখিত রাষ্ট্রীয় আদর্শ বাস্তবায়নে নিবেদিত রয়েছেন। এরপর আরো তিনবার পরপর ক্ষমতাসীন হয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতির চেহারাই বদলে ফেলেছেন। ইতোমধ্যে জাতিসংঘসহ বিশ্ব সংস্থা থেকে নানাভাবে পুরস্কৃত হয়েছেন। বিগত দেড় দশকে মোট জিডিপি পরিমাণ বেড়েছে পাঁচ গুণ, মাথাপিছু আয় বেড়েছে সাড়ে চার গুণ, দারিদ্র্যের হার কমেছে আড়াই গুণ, অতিদারিদ্র্য কমে হয়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ , জীবনের গড় আয়ু বেড়েছে ৯ বছর। শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। শিল্প ও স্বাস্থ্যের সুযোগ বেড়েছে অভাবনীয় হারে এবং নারীর ক্ষমতায়ন প্রায় বিপ্লব ঘটিয়েছে। ৪২ শতাংশ আনুষ্ঠানিক কর্মী এখন নারী। যদিও ২০০১ সালের পর বৈরী সরকার ও পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রোষানলে পড়ে তাকে জেলেও যেতে হয়েছিল। তা সত্ত্বেও তিনি একদম লক্ষ্যচ্যুত হননি। আজ পর্যন্ত সুদৃঢ় নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন সবল এক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নজাত ‘সোনার বাংলা’ তার আরাধ্য। আওয়ামী লীগের প্লাটিনাম জুবিলিতে জাতির প্রত্যাশা বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া এবং বঙ্গবন্ধুকন্যার সুশৃঙ্খলায় বেড়ে ওঠা আওয়ামী লীগ নিশ্চয় দীর্ঘজীবী হবে। তাই যেন হয়।

জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

*লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App