×

প্রথম পাতা

জাতিসংঘের তদন্ত

গাজায় হত্যাযজ্ঞ মানবতাবিরোধী অপরাধ

Icon

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কাগজ ডেস্ক : গাজা যুদ্ধের প্রথম দিকেই ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস যুদ্ধাপরাধ করেছে। জাতিসংঘ সমর্থিত একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানিয়ে বলেছে, শুধু যুদ্ধাপরাধ নয়, মানবতাবিরোধী অপরাধও করেছে ইসরায়েল। কারণ তাদের হামলায় বেসামরিক অসংখ্য মানুষ নিহত হয়েছেন। এদিকে শিশুদের ওপর করা সহিংসতার দায়ে ইসরায়েলের সশস্ত্র ও নিরাপত্তা বাহিনী, ফিলিস্তিনের হামাস ও ইসলামিক জিহাদ এবং সুদানের বিদ্রোহী দলগুলোর নাম জাতিসংঘের কালো তালিকায় উঠেছে।

জাতিসংঘের ইনকোয়ারি কমিশন (সিওআই) দুটি প্রতিবেদনের মাধ্যমে গাজা যুদ্ধের পরিস্থিতি তুলে ধরেছে। একটিতে ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের অভ্যন্তরে হামাসের হামলার বিষয়ে বলা হয়েছে, অন্যটিতে গাজায় ইসরায়েলি অভিযানের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। তদন্ত কমিশন আরো জানায়, ইসরায়েল তাদের কাজে বাধা দিয়েছে। ইসরায়েল ও গাজায় প্রবেশের ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে তেল আবিব প্রশাসন।

ইসরায়েলের ভাষ্য মতে, গত বছর ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালিয়ে প্রায় ১২শ জনকে হত্যা ও ২৫০ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে আসে হামাস। এই হামলার প্রতিশোধ হিসেবে সেদিনই গাজার বিরুদ্ধে নির্বিচার বিমানহামলা শুরু করে ইসরায়েল। পরে স্থলবাহিনীও এতে যোগ দেয়। গত ৮ মাসে ফিলিস্তিনি নিহতের সংখ্যা ৩৭ হাজারেরও বেশি। তাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু।

জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উভয়পক্ষই নির্যাতন, ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা, অমানবিক এবং নিষ্ঠুর আচরণ করে যুদ্ধাপরাধ করেছে। তাছাড়া, গাজায় মানুষজনকে অনাহারে রেখে ইসরায়েল আরেকটি যুদ্ধাপরাধ করেছে। তারা কেবল গাজাবাসীদের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার, পানি, আশ্রয়, চিকিৎসা দিতেই ব্যর্থ হয়নি বরং এসব প্রয়োজনীয় জিনিসের সরবরাহও আটকে দিয়েছে।

হত্যার মতো ইসরায়েলের কিছু যুদ্ধাপরাধ মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধেরও সামিল হয়েছে বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে সিওআই। এতে বলা হয়েছে, গাজায় বিপুল সংখ্যক মানুষ হতাহতের ঘটনাসহ বেসামরিক অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছে। ইসরায়েল গাজায় সর্বোচ্চ ক্ষয়ক্ষতি করার অভিপ্রায় নিয়ে সেখানে হামলা চালিয়েছে। এক্ষেত্রে, সুনির্দিষ্ট নিশানায় হামলা, পর্যাপ্ত পূর্ব সতর্কতা এবং আনুপাতিকতার দিকটি বিবেচনায় নেয়া হয়নি। যুদ্ধের শিকার ব্যক্তি, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষাৎকার, স্যাটেলাইট ছবি, মেডিকেল রিপোর্ট এবং যাচাই করা অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে সিওআই এই প্রতিদেন তৈরি করেছে।

জেনেভায় জাতিসংঘের মিশনে নিযুক্ত ইসরায়েলি কূটনীতিক জাতিসংঘের তদন্ত কমিশনের এই প্রতিবেদনকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই প্রতিবেদনকে ইসরায়েলবিরোধী রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা বলেও আখ্যা দিয়েছেন তিনি।

জাতিসংঘের শিশু হত্যাকারীর তালিকায় ইসরায়েল, হামাস ও সুদানি বিদ্রোহীরা : ইসরায়েলের সশস্ত্র ও নিরাপত্তা বাহিনী, ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস ও ইসলামিক জিহাদ এবং সুদানের বিদ্রোহী দলগুলোর নাম জাতিসংঘের কালো তালিকায় রাখা হয়েছে। ২০২৩ সালে শিশুদের ওপর করা সহিংসতার দায়ে তাদের নাম তালিকাভুক্ত করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। গত মঙ্গলবার একটি বার্ষিক বৈশ্বিক তালিকায় এসব নাম যুক্ত করেছেন তিনি।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ওই প্রতিবেদনে স্কুল ও হাসপাতালে হামলার জন্য ইসরায়েল ও সুদানের সশস্ত্র বাহিনী এবং শিশুদের অপহরণের জন্য হামাস ও ইসলামিক জিহাদের নিন্দা করেছেন গুতেরেস। গত বছরের এপ্রিল থেকে সুদানের সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করছে আধাসামরিক র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্স। শিশুদের নিয়োগ ও ব্যবহার, ধর্ষণ ও অন্যান্য যৌন সহিংসতা এবং স্কুল ও হাসপাতালে হামলার জন্য তাদের নামও তালিকায় রাখা হয়।

শিশু ও সশস্ত্র সংঘাতের জন্য গুতেরেসের দূত ভার্জিনিয়া গাম্বা সংকলিত এই প্রতিবেদনে ৬টি গুরুতর সহিংসতার কথা বলা হয়েছে। সেগুলো হলো- হত্যা ও বিকলাঙ্গ করা, যৌন সহিংসতা, অপহরণ, শিশুদের নিয়োগ ও ব্যবহার, সাহায্য প্রবেশে অস্বীকার এবং স্কুল ও হাসপাতালে হামলা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে সশস্ত্র সংঘাতে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মাত্রা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর মধ্যে গুরুতর লঙ্ঘন বৃদ্ধি পেয়েছে ২১ শতাংশ। আর হত্যা ও বিকলাঙ্গের ঘটনার সংখ্যা বিস্ময়করভাবে ৩৫ শতাংশ বেড়েছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ইসরায়েল ও অধিকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চল, কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, মিয়ানমার, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া এবং সুদানে সর্বোচ্চ সংখ্যক গুরুতর লঙ্ঘনের ঘটনা নিশ্চিত করা হয়েছে। ইউক্রেনে শিশুদের হত্যা ও বিকলাঙ্গ করা এবং স্কুল ও হাসপাতালে হামলার জন্য রুশ সশস্ত্র বাহিনী ও সহযোগী গোষ্ঠীগুলোকে গত বছর এ তালিকায় যুক্ত করা হয়। এ বছরও গোষ্ঠীগুলো তালিকায় রয়ে গেছে।

বল এখন ইসরায়েলের উঠানে : ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস বলেছে, গাজায় যুদ্ধবিরতির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় ‘ইতিবাচক’ সাড়া দিয়ে তারা একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে ‘বিস্তৃত সম্ভাবনা’ তৈরি করেছে। কিন্তু হামাস বা ইসরায়েল একটি চুক্তি করতে প্রকাশ্যে প্রতিশ্রæতিবদ্ধ না হওয়ায় অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, ইসরায়েল তাদের প্রস্তাব গ্রহণ করেছে, কিন্তু ইসরায়েল প্রকাশ্যে একথা জানায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ৩১ মে গাজায় যুদ্ধবিরতির বিষয়ে যে রূপরেখা প্রস্তাব করেছেন মঙ্গলবার তাতে আনুষ্ঠানিক সম্মতি দিয়েছে হামাস। কিন্তু ইসরায়েল বলছে, হামাসের এই সম্মতি প্রত্যাখ্যানের সমতুল্য যখন হামাসের একজন কর্মকর্তা বলেন যে তারা কেবল তাদের দীর্ঘদিনের দাবিগুলো পুনর্ব্যক্ত করেছেন, প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনায় তা পূরণ হয়নি।

মিসর ও কাতার জানিয়েছে, তারা হামাসের আনুষ্ঠানিক সম্মতিপত্র গ্রহণ করেছে কিন্তু তাতে কী আছে তা প্রকাশ করেনি।

গতকাল বুধবার হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য ইজ্জত আল-রিশক এক বিবৃতিতে বলেছেন, যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের বিষয়ে তাদের জবাব ‘দায়িত্বপূর্ণ, ঐকান্তিক ও ইতিবাচক’ এবং তা একটি চুক্তির বিষয়ে ‘একটি প্রশস্ত পথ খুলে দিয়েছে’। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন হামাস কমকর্তা মঙ্গলবার বলেছেন, একটি যুদ্ধবিরতি অবশ্যই গাজায় শত্রæতার স্থায়ী অবসান, ইসরায়েলি বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার, গাজার পুনর্গঠন এবং ইসরায়েলের কারাগারে বন্দি ফিলিস্তিনিদের মুক্তি নিশ্চিত করবে- সম্মতিপত্রে নিজেদের এ অবস্থানই পুনর্ব্যক্ত করেছেন তারা। তিনি বলেন, আমাদের আগের অবস্থানই পুনর্ব্যক্ত করেছি আমরা। আমার বিশ্বাস সেখানে বড় কোনো ফাঁক নেই। বল এখন ইসরায়েলের উঠানে।

লেবাননে হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ কমান্ডার নিহত : লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে জুয়াইয়া শহরে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় হিজবুল্লাহর একজন জ্যেষ্ঠ কমান্ডারসহ মোট ৪ জন নিহত হয়েছেন। নিহত কমান্ডারের নাম সামি আবদুল্লাহ ওরফে আবু তালেব। তার জন্ম ১৯৬৯ সালে। গাজায় হামাস ও ইসরায়েলি বাহিনীর যুদ্ধ শুরুর পর হিজবুল্লাহর যেসব সদস্য নিহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন আবু তালেব।

মঙ্গলবারের এই হামলার বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে তারা দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর বেশ কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলের দাবি, মঙ্গলবার সকালে হিজবুল্লাহ গোলান মালভূমিতে অন্তত ৫০টি রকেট হামলা চালানোর পর তারা এই পাল্টা হামলা চালায়।

এদিকে সিনিয়র ফিল্ড কমান্ডার নিহত হওয়ায় ইসরায়েলে প্রতিশোধমূলক হামলা চালিয়েছে হিজবুল্লাহ। গতকাল বুধবার ইসরায়েলে শতাধিক রকেট ছুড়েছে তারা। অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় রকেট হামলার ঘটনা এটি।

গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলি ভূখণ্ডে হামাসের হামলার পর থেকে গাজায় নির্বিচার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। এই সংঘাত শুরুর পর ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে লেবানন-ইসরায়েল সীমান্তে হামলা শুরু করে সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ। ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে এ পর্যন্ত ৪৬৭ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অন্তত ৯০ জন বেসামরিক ব্যক্তি ও ৩০৪ জন হিজবুল্লাহর যোদ্ধা। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অন্তত ১৫ ইসরায়েলি সেনা ও ১১ বেসামরিক ব্যক্তি এসব হামলায় নিহত হয়েছেন। সংঘাত এড়াতে দুই দেশের সীমান্তবর্তী এলাকার হাজারো মানুষ ঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App