×

প্রথম পাতা

আট মাত্রার ভূমিকম্প হলে ধ্বংসলীলা হবে কল্পনাতীত

Icon

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

আট মাত্রার ভূমিকম্প হলে  ধ্বংসলীলা হবে কল্পনাতীত

ইমরান রহমান : জনসংখ্যার ঘনত্ব, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বিল্ডিং কোড লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণ, অপ্রশস্ত সড়ক অবকাঠামো ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির অভাবে রাজধানী ঢাকা সবসময় ভূমিকম্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ শহর হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বিভিন্ন গবেষণা ও নিয়মিত ছোট ছোট ভূমিকম্প সেই পূর্বাভাসই দিচ্ছে। যদি তাই হয়; তাহলে ঢাকাসহ সারাদেশের অবস্থা কি হবে- এটিই গত কয়েক বছরে ভূমিকম্প ইস্যুতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে গতকাল বুধবার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মহিববুর রহমান ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের আশঙ্কা প্রকাশ করায় প্রশ্নটি আবারো সামনে এসেছে। বিশেষ করে বাস্তবে যদি ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হয়; তাহলে কি অবস্থা দাঁড়াবে ঢাকাসহ দেশের অন্য শহরগুলোর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হলে কল্পনাকেও হার মানাবে ধ্বংসলীলা।

তবে, ভূমিকম্পের ইতিহাস ইঙ্গিত দিচ্ছে- এখনই ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা নেই। যে কোনো সময় ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে। যদি ৭ মাত্রারও হয় তাহলে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হবে

ঢাকাসহ অন্যান্য শহর। ধসে পড়বে ৮ লাখেরও বেশি ভবন। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা গ্যাসের সংযোগে বিস্ফোরণ ঘটে অগ্নিকাণ্ডে ছেয়ে যাবে চারিদিক। যা সামাল দেয়ার মতো সক্ষমতা আমাদের দেশে নেই।

ভূতত্ত্ববিদরা বলছেন, বাংলাদেশে তিনটি টেকটনিক প্লেটের সংযোগ স্থলে অবস্থিত। উত্তরে তিব্বত প্লেট, পূর্বে বার্মা সাব-প্লেট এবং পশ্চিমে ইন্ডিয়া প্লেট। এগুলোর বিস্তৃতি সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার। এই জোনে বড় বড় ভূমিকম্প হয়েছে। আবার শতবর্ষে বড় ভূমিকম্প ফিরে আসার সুদীর্ঘ ইতিহাসও রয়েছে। সে হিসেবে দেশে বড় ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের একটি গবেষণায় উঠে এসেছিলো- বাংলাদেশের সিলেট থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত অঞ্চলে দুটো প্লেটের সংযোগস্থল রয়েছে। এখানে একটি প্লেট আরেকটার নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। সেটি হলো, ইন্ডিয়া প্লেট বার্মা প্লেটের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ থেকে কিশোরগঞ্জের হাওর হয়ে মেঘনা নদী হয়ে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর বরাবর ওই প্লেটটি তলিয়ে যাচ্ছে। এই জোনই হলো ভূমিকম্পের উৎস স্থল। এখানে যে পরিমাণ শক্তি সঞ্চয় হয়ে আছে তার মাত্রা ৮ দশমিক ২ থেকে ৯ মাত্রা পর্যন্ত হতে পারে। বাংলাদেশ অঞ্চলে ভূমিকম্পের আরেকটি উৎস হলো ডাউকি ফল্ট, যেটি শেরপুর থেকে শুরু জাফলং হয়ে ভারতের করিমগঞ্জ থেকে বিস্তৃত। বিশেষ করে এর পশ্চিমাংশ আরেকটা ভূমিকম্পের উৎস। যেখান থেকে বড় ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়ে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আরবান রেজিলিয়েন্স প্রজেক্টের অধীনে পরিচালিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে, রাজউক এলাকার অধীনে ঢাকায় ২১ লাখ ৪৭ হাজার ২১৯টি ভবন রয়েছে। টাঙ্গাইলের মধুপুর ফল্টে ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকার ৮ লাখ ৬৪ হাজার ৬১৯টি থেকে ১৩ লাখ ৯১ হাজার ৬৮৫টি ভবন ধসে বা ভেঙে পড়বে, যা মোট ভবনের ৪০ দশমিক ২৮ থেকে ৬৪ দশমিক ৮৩ শতাংশ। এছাড়া যদি সিলেট লাইনমেন্টে ৭ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্প হয় তাহলে ঢাকার ৪০ হাজার ৯৩৫টি থেকে ৩ লাখ ১৪ হাজার ৭৪২টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যা মোট ভবন সংখ্যার ১ দশমক ৯১ থেকে ১৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

মধুপুর ফল্টে যদি সকালের দিকে ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হয় তাহলে ঢাকায় ২ লাখ ১০ হাজার থেকে ৩ লাখ ১০ হাজার মানুষ নিহত হবে। ভূমিকম্প দুপুরে হলে ২ লাখ ৭০ হাজার থেকে ৪ লাখ এবং রাতে হলে ৩ লাখ ২০ হাজার থেকে ৫ লাখ মানুষ নিহত হবে। বুয়েটের বিভিন্ন সময়ে করা জরিপে দেখা যায়, ঢাকায় ১৩ লাখ, চট্টগ্রামে ৩ লাখ ও সিলেটে ১ লাখ বহুতল ভবন রয়েছে। এসব ভবনের ৭৫ শতাংশ হচ্ছে ছয় তলা বা তার চেয়েও উঁচু। ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে এই ভবনগুলো ও এর বাসিন্দারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। সরকারের সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির সমীক্ষাতেই বলা হয়েছে, ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হলে রাজধানীতে প্রায় ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে। আর ৮ মাত্রার হলে পরিস্থিতি কোথায় যাবে- সেটি ভাবনারও বাইরে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী ভোরের কাগজকে বলেন, ৮ মাত্রার ভূমিকম্প এই মুহূর্তে হবে কিনা- বলাটা মুশকিল। কারণ এই অঞ্চলে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল ১৫৪৮ ও ১৮৯৭ সালে। এই হিসাবে ১৮৯৭ সালের ৩০০-৩৫০ বছর পর আবারো ৮ মাত্রা বা এর বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হবে। তবে আমরা বারবার বলছে, যে কোনো সময় ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হবে। যদি ৭ মাত্রারও হয়- তাহলে পরিস্থিতি হবে ব্যাপক ভয়াবহ। রানা প্লাজা ধসের পর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকাসহ সারাদেশের ৪০ শতাংশ বহুতল ভবনই ঝুঁকিপূর্ণ। ৭ মাত্রায় এই সব ভবনই ধসে পড়বে। যদি ৮ মাত্রার হয়- তাহলে ভবন ধসের পরিমাণ আরো বাড়বে। যদি ৪০ শতাংশও ধসে পড়ে ঢাকাতে ৮ লাখেরও বেশি ভবন ধস ঘটবে। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে আমাদের ইঞ্জিনিয়ারদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। আর ১০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনকে আরো শক্তিশালী করার কাজ বাস্তবায়ন করতে হবে। এই দুই পদক্ষেপ বাঁচিয়ে দিতে পারে লাখ লাখ প্রাণ। কিন্তু দুঃখের বিষয় সংশ্লিষ্টরা এই বিষয়ে উদাসীন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) মো. মিজানুর রহমান ভোরের কাগজকে বলেন, ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হলে কি হবে- সে বিষয়ে বলা মুশকিল। তবে আমাদের ধারণার বাইরের রয়েছে এমন ধ্বংসলীলার ঘটনা ঘটতে পারে। ভবন ধসের পাশাপাশি গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকে শত শত বিস্ফোরণে আগুনে ছেয়ে যেতে পারে গোটা ঢাকার শহর। এই শঙ্কা থেকেই ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরকে শক্তিশালী করা হচ্ছে। এই বছর নতুন ১১টি গাড়ি সরবারহ করা হবে। ইতোমধ্যে কয়েকটি অত্যাধুনিক টিটিএল গাড়ি সরবারহ করা হয়েছে। এর বাইরে সশস্ত্র ৩ বাহিনীরও দুর্যোগ মোকাবেলার সক্ষমতা রয়েছে। ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ওই ৩ বাহিনীও যুক্ত হবে উদ্ধার কাজে। এছাড়াও সবধরনের ঝুঁকি মাথায় রেখে দুর্যোগ সহনশীল নগরী গড়ে তুলতে আমরা বিভিন্ন কাজ করে যাচ্ছি।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন বলেন, অনেকেই বলছেন ঢাকা শহরে যে কোনো সময় ভূমিকম্প অনুভূত হতে পারে। সেসব বিষয় মাথায় রেখেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি। অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি কিনেছি। জনবল প্রশিক্ষিত করা হচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ আমাদের জন্য ঝুঁকি। পুরান ঢাকার মতো যেসব সরু রাস্তা রয়েছে, কোনো ঘটনা ঘটলে সেসব জায়গায় পৌঁছানো কতটুকু সম্ভব হবে, তা এখনই চিন্তা করা উচিত।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App