×

প্রথম পাতা

চাপে নেতানিয়াহু

৪ জিম্মি উদ্ধারে ২৭৪ জনকে হত্যা

Icon

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কাগজ ডেস্ক : গাজার নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরে ৪ জিম্মিকে জীবিত উদ্ধারের সময় ইসরায়েলের অভিযানে শিশু ও অন্য বেসামরিক ব্যক্তিসহ ২৭৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে। গাজায় চলমান সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু দেশে-বিদেশে প্রবল চাপের মুখে রয়েছেন। বিশেষ করে তার যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক বেনি গ্যান্টজের পদত্যাগে সরকারের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে।

জিম্মি উদ্ধার অভিযানে ২৭৪ ফিলিস্তিনি নিহতের দাবি সত্যি হলে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এটি ফিলিস্তিনিদের জন্য আরেকটি ভয়াবহ দিন হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। গত শনিবার নুসেইরাত শরণার্থী শিবির ঘিরে ইসরায়েলের জিম্মি উদ্ধার অভিযানে দেশটির সেনাদের সঙ্গে হামাস যোদ্ধাদের তীব্র বন্দুকযুদ্ধ হয়। অভিযানে ইসরায়েলের বিমান বাহিনীও অংশ নেয়। গাজার হামাস পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, ইসরায়েলের দুই ঘণ্টার অভিযানে মোট ২৭৪ ফিলিস্তিনি নিহত হন। এরই মধ্যে নিহত ৮৬ জনের নাম প্রকাশ করা হয়েছে। বর্বর ওই হামলায় আরো ৬৯৮ জন আহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে গুরুতর আহতরাও রয়েছেন।

ইসরায়েলের প্রতিরোধ বাহিনীর (আইডিএফ) মুখপাত্র রিয়ার অ্যাডমিরাল ড্যানিয়েল হ্যাগারি জানান, নুসেইরাতের এক আবাসিক মহল্লায় এই অভিযান পরিচালিত হয়। দুটি পৃথক অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকে জিম্মিদের লুকিয়ে রেখেছিল হামাস। তাদের উদ্ধার করতে গেলে আইডিএফের সদস্যরা তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়েন। এ সময় সেনাদের সহায়তার জন্য বিমানহামলা চালানো হয়। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমরা জানি ১০০ জনের কম ফিলিস্তিনি মারা গেছেন। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট জানান, বিপুল গোলাগুলির মধ্যে ইসরায়েলের বিশেষ বাহিনী এ অভিযান পরিচালনা করেছে। অভিযানে আহত বিশেষ বাহিনীর এক কর্মকর্তা পরবর্তী সময়ে হাসপাতালে মারা গেছেন।

উদ্ধার ৪ জিম্মিকে গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের নোভা সংগীত উৎসব থেকে অপহরণ করেছিল হামাস। এখন তারা পরিবারের কাছে ফেরায় ইসরায়েলের মানুষকে উৎসব করতে দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনসহ অনেক বিশ্বনেতা জিম্মি উদ্ধারকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে গাজার অভ্যন্তরে অভিযানে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের প্রাণহানি বাড়ায় বিশ্বে ইসরায়েলের সমালোচনা বাড়ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান জোসেফ বোরেল জিম্মি উদ্ধার অভিযানের তীব্র সমালোচনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) তিনি লিখেছেন, গাজায় আরেকটি হত্যাকাণ্ডের খবর শোনা যাচ্ছে, এটা অত্যন্ত ভয়ংকর।

গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের ভূখণ্ডে ঢুকে হামাস যোদ্ধাদের হামলায় ১ হাজার ১৯৪ জন নিহত হন। প্রায় আড়াইশ জনকে গাজায় নিয়ে জিম্মি করে হামাস। সেদিন থেকেই গাজায় হামলা চালিয়ে আসছে ইসরায়েল। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ইসরায়েলি হামলায় গাজায় এখন পর্যন্ত ৩৭ হাজার ৮৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছে ৮৪ হাজার ৪৯৪ জন।

গত নভেম্বরে এক চুক্তির মাধ্যমে হামাস ১০৫ জিম্মিকে মুক্তি দেয়। বিনিময়ে ইসরায়েলের কারাগার থেকে ২৪০ ফিলিস্তিনিকে মুক্তি পান। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে এখনো প্রায় ১১৬ জন ইসরায়েলি জিম্মি রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যাদের মধ্যে সামরিক বাহিনীর সদস্য ৪১ জন।

মন্ত্রীর পদত্যাগে চাপের মুখে নেতানিয়াহু : অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে ইসরায়েলে নেতানিয়াহু সরকারের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে। ৭ অক্টোবর হামাসের নৃশংস হামলার পর জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে বিরোধী নেতা বেনি গ্যান্টজ যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়ে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থান অনেকটা জোরালো করেছিলেন। কিন্তু গত রবিবার তিনি পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী পদত্যগ করেন এবং চলতি বছরেই ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচনের জন্য রাজি হতে নেতানিয়াহুর প্রতি আহ্বান জানান। এর প্রতিক্রিয়ায় নেতানিয়াহু এক্স পোস্টে লিখেছেন, বেনি, যুদ্ধ থেকে সরে যাওয়ার সময় এখন নয়, যোদ্ধা হিসেবে যোগ দেয়ার সময় এটা।

উগ্র দক্ষিণপন্থি জোট সরকারের একমাত্র মধ্যপন্থি দলের প্রস্থান একাধিক সংকটের সময়ে ইসরায়েলে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এখনই সরকার পতনের আশঙ্কা না থাকলেও নেতানিয়াহুকে এবার জোটের কট্টরপন্থি সদস্যদের ওপর আরো বেশি নির্ভর করতে হবে। ফলে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগী দেশ আমেরিকার সঙ্গে মনোমালিন্য আরো তীব্র হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নেতানিয়াহু নিজের সরকারের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে মার্কিন প্রশাসনের অনেক চাপ উপেক্ষা করার চেষ্টা করে চলেছেন।

গাজায় বিতর্কিত সামরিক অভিযানের পাশাপাশি উত্তরে লেবানন সীমান্তের অপর প্রান্তে হিজবুল্লাহর সঙ্গে আরো তীব্র সংঘাতের আশঙ্কা ইসরায়েলে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। গাজায় হামাসের কবল থেকে ৪ জিম্মিকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এখনো অনেক বন্দি থেকে যাওয়ায় ইসরায়েলে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ চলছে।

ইসরায়েলের একাধিক সামরিক কর্মকর্তার মতে, গ্যান্টজও গাজায় সামরিক অভিযানের সমাপ্তির পর কোনো রাজনৈতিক সমাধানসূত্রের পরিকল্পনার অভাবের সমালোচনা করে আসছিলেন। গত মাসেই তিনি বলেছিলেন, ৬টি ‘কৌশলগত লক্ষ্য’ অর্জনে ৮ জুনের মধ্যে গাজার জন্য একটি যুদ্ধোত্তর পরিকল্পনা ঠিক না করলে তিনি পদত্যাগ করবেন। ওইসব লক্ষ্যের মধ্যে গাজায় হামাসের শাসন অবসান ঘটিয়ে সেখানে একটি বহুজাতিক বেসামরিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠার দাবিও ছিল। নেতানিয়াহু এসব মন্তব্যকে ‘অর্থহীন কথা’ বলে উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, এর অর্থ হবে ‘ইসরায়েলের জন্য পরাজয়’।

প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সাবেক জেনারেল ও নেতানিয়াহুর সমালোচক গ্যান্টজকেও যুদ্ধকালীন সরকারে গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক হিসেবে বিবেচনা করা হত। সরকারে গ্যান্টজের যে প্রভাব, সেটা নেতানিয়াহুর জোট সরকারে ডানপন্থিদের কর্মকাণ্ডে ‘ভারসাম্য’ রাখছিল বলে বিবেচনা করা হচ্ছিল।

দেশের এমন সংকটের সময় মন্ত্রিসভা থেকে বিদায়ের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সাবেক কমান্ডার ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেনি গ্যান্টজ। রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, নেতানিয়াহু আমাদের প্রকৃত জয়ের দিকে এগোনোর পথে বাধা সৃষ্টি করছেন। তাই ভারাক্রান্ত মনে আমাদের মন্ত্রিসভা ত্যাগ করতে হচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনে তিনি কেবল সরকার থেকে পদত্যাগ নয়, ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টির প্রধানের পদও ছেড়ে দেয়ার কথা জানান।

গ্যান্টজের এই সিদ্ধান্ত ইসরায়েলি সরকারকে কোনো সমস্যায় ফেলবে না। কারণ নেসেটের ১২০ আসনের মধ্যে ৬৪ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে নেতানিয়াহুর। তবে প্রধানমন্ত্রী যে আরো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন এবং তার যুদ্ধ পরিচালনার কৌশল নিয়ে রাজনৈতিক বিভেদ আরো গভীর হচ্ছে, তা গ্যান্টজের এই সিদ্ধান্তে প্রকাশ পাচ্ছে।

উল্লেখ্য, নেতানিয়াহু সরকারের পতন ঘটলে গ্যান্টজই পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন বলে ইসরায়েলের রাজনৈতিক মহলে মনে করা হচ্ছে। নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রতিদ্ব›দ্বী বেনি গ্যান্টজ ইসরায়েলের ডিফেন্স ফোর্সের সাবেক চিফ অব স্টাফ। ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভা গঠনের আগ পর্যন্ত তার মধ্যপন্থি দল ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টি বিরোধী দলে ছিল। ৭ অক্টোবর হামাসের আক্রমণের পর তিনি নেতানিয়াহুর সঙ্গে যুদ্ধকালীন সরকার গঠনে সায় দেন। যুদ্ধকালীন সরকারে ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টির ৫ জন মন্ত্রী আছেন।

বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ গ্যান্টজের সিদ্ধান্তকে ‘গুরুত্বপূর্ণ ও সঠিক’ বলে বর্ণনা করেছেন। আর গ্যান্টজের পদত্যাগের ঘোষণার পরপরই মন্ত্রিসভায় জায়গা চেয়েছেন উগ্র ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গাভির।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App