×

প্রথম পাতা

গাজায় ৪ জিম্মিকে জীবিত উদ্ধারের দাবি

শিশুদের ক্ষতি করায় জাতিসংঘের কালো তালিকায় ইসরায়েলি সেনা

Icon

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

শিশুদের ক্ষতি করায় জাতিসংঘের  কালো তালিকায় ইসরায়েলি সেনা

কাগজ ডেস্ক : সশস্ত্র সংঘাতে শিশুদের ক্ষতি করার দায়ে ইসরায়েলের সেনাবাহিনীকে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতিসংঘ। নিরাপত্তা পরিষদের সভায় উত্থাপনের পর সপ্তাহখানেক বাদে আনুষ্ঠানিকভাবে এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার কথা রয়েছে। এদিকে গাজা উপত্যকার মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলে আবারো ব্যাপক হামলা চালিয়ে অন্তত ২৮ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।

যুদ্ধনীতি ভেঙে যেসব দেশ শিশুদের ওপর চড়াও হয়েছে, সেসব দেশকে নিয়ে কালো তালিকা করেছে সংস্থাটি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, হামাস ও ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদকেও এই তালিকাভুক্ত করা হবে। তালিকাটিতে ছয় ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শিশু অধিকার লঙ্ঘনের কথা বলা হয়েছে। এগুলো হলো- হত্যা, পঙ্গুত্ব, যৌন সহিংসতা, অপহরণ, শিশুশ্রমিক নিয়োগ ও ব্যবহার, ত্রাণ সরবরাহে বাধা এবং স্কুল ও হাসপাতালে হামলা। তবে ইসরায়েল, হামাস বা ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদের বিরুদ্ধে ঠিক কী ধরনের অভিযোগ রয়েছে তা এখনো পরিষ্কার নয়।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যের বরাতে জাতিসংঘ জানায়, ৮ মাস ধরে চলা যুদ্ধে হামাসশাসিত এই ভূখণ্ডে কমপক্ষে ৭ হাজার ৭৯৭ শিশু নিহত হয়েছে। তবে গাজার সরকারি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার শিশু নিহত হয়েছে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় খাদ্য, পানি, ওষুধ, এমনকি অতি জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহে বাধা দিয়ে আসছে। এতে সেখানে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। গাজার অনেক অংশে দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ জানিয়েছে, ফিলিস্তিনের প্রতি ১০ শিশুর ৯টিই তীব্র খাবারসংকটে ভুগছে।

ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূতের কাণ্ডে ডুজারিকের বিস্ময় : জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত গিলাদ এরদান শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তাদের সেনাবাহিনীকে কালো তালিকাভুক্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এদিকে এ-সংক্রান্ত এক ফোনকলের ভিডিও তিনি এক্সে প্রকাশ করায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক। গিলাদকে জাতিসংঘের ওই সিদ্ধান্তের কথা জানাতে ফোন করেছিলেন সংস্থাটির এক কর্মকর্তা। এ সময় গিলাদ ফোনকলে তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত

করেন এবং এর অংশবিশেষ এক্সে পোস্ট করেন। ভিডিও কলে গিলাদকে দাবি করতে শোনা যায়, বিশ্বের সবচেয়ে নৈতিক সেনাবাহিনী ইসরায়েলের। এ সময় তিনি আন্তোনিও গুতেরেসকে কালো তালিকাভুক্ত একমাত্র মহাসচিব হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তার দাবি, গুতেরেস সন্ত্রাসবাদকে উৎসাহিত করেন এবং তিনি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ঘৃণা উসকে দেন। তিনি জাতিসংঘের এমন সিদ্ধান্তকে আপত্তিজনক ও ভুল পদক্ষেপ বলেও উল্লেখ করেন।

ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতের এমন আচরণে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন স্টিফেন ডুজারিক। তিনি বলেন, তার ২৪ বছরের চাকরিজীবনে কোনো কূটনীতিককে এমন অপেশাদারি আচরণ করতে দেখেননি। ডুজারিক সাংবাদিকদের বলেন, সশস্ত্র সংঘাতে শিশুদের প্রতি আইন লঙ্ঘনকারী দেশগুলোর তালিকা সংবলিত একটি প্রতিবেদন ১৪ জুন নিরাপত্তা পরিষদের সভায় উপস্থাপন করা হবে। এর কয়েক দিন পর এ সিদ্ধান্তের কথা জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করবে। তালিকায় ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর নামও রয়েছে। এ তথ্য জানাতেই কাজের অংশ হিসেবে তাদের একজন কর্মকর্তা গিলাদকে ফোন করেন। অথচ গিলাদ ওই ফোনকলের কথোপকথনের ভিডিও করেন এবং অংশবিশেষ এক্সে প্রকাশ করেন।

গাজার মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপক হামলা : ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠনের হামাসের শেষ অক্ষত যুদ্ধ ইউনিটগুলো রাফায় লুকিয়ে আছে আর তাদের নির্মূল করা দরকার- এমন কারণ দেখিয়ে এক মাস আগে মিসরের সীমান্তবর্তী শহর রাফায় হামলা শুরু করে ইসরায়েল। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মিসরের সঙ্গে গাজার সীমান্তের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্ত দিয়ে ট্যাংক বহরকে সামনে রেখে ইসরায়েলি বাহিনী অগ্রসর হয়েছে। ভূমধ্যসাগরের উপকূলে আল-ইজবা এলাকায় ট্যাংকগুলো অবস্থান নিয়েছে। স্নাইপাররা কিছু ভবনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেগুলোতে ও উঁচু স্থানগুলোতে পজিশন নিয়েছে, এভাবে তারা শহরের বাসিন্দাদের তাদের ঘরবাড়িতে আটকে ফেলেছে। ইসরায়েলি মেশিনগানগুলো গুলিবর্ষণ করতে থাকায় বাইরে বের হওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।

গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্যাংকের গোলায় রাফার পশ্চিমাংশে দুই ফিলিস্তিনি নিহত ও আরো বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। আর গাজার মধ্যাঞ্চলে রাতভর ইসরায়েলের বোমা হামলায় অন্তত ১৫ জন নিহত হয়েছেন। ফিলিস্তিনি এক বাসিন্দা রয়র্টার্সকে বলেছেন, আমার মনে হয় দখলদার বাহিনী রাফার সৈকত এলাকায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। রাতে তাদের চালানো অভিযান ও বোমাবর্ষণ কৌশলগত ছিল, প্রচণ্ড গোলাগুলির মধ্যে তারা প্রবেশ করে আর তারপর পিছু হটে।

গাজার উত্তরাঞ্চলে গাজা সিটির এক স্কুল ভবনে ইসরায়েলের বিমান হামলায় ৩ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এই স্কুলটি বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল বলে উদ্ধারকর্মীরা জানান। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, ওই স্কুলের প্রাঙ্গণে থাকা একটি কন্টেইনারের ভেতর থেকে হামাসের বন্দুকধারীরা গুলি চালাচ্ছিল, তাদেরই লক্ষ্যস্থল করেছে তারা।

এর আগে বৃহস্পতিবার গাজার মধ্যাঞ্চলে নুসেইরাতে জাতিসংঘের একটি স্কুল ভবনে বিমান হামলার কারণ হিসেবেও একই ধরনের ব্যাখ্যা দিয়েছিল ইসরায়েল। ওই হামলায় ১৪টি শিশুসহ ৪০ জন নিহত হন বলে চিকিৎসাকর্মীরা জানান। জাতিসংঘ জানিয়েছে, ওই স্কুলটিতে প্রায় ৬ হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষ আশ্রয় নিয়ে ছিল।

৪ জিম্মিকে জীবিত উদ্ধারের দাবি ইসরায়েলের : ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী গতকাল শনিবার জানিয়েছে, গাজার মধ্যাঞ্চলে নুসেইরাত এলাকায় পৃথক দুটি অভিযান চালিয়ে ৪ জন জিম্মিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তারা হলেন- নোয়া আরগামানি (২৫), আলমগ মেইর জান (২১), আন্দ্রি কোজলভ (২৭) ও শলোমি জিভ (৪০)। গত বছরের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের একটি গানের উৎসব থেকে হামাস সদস্যরা তাদের অপহরণ করেন বলে দাবি করেছে ইসরায়েল।

ইসরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, মধ্য গাজার নুসেইরাতের দুটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৪ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। দিনের বেলায় চালানো এ অভিযানে ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে ছিল দেশটির নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ। উদ্ধার হওয়া ৪ জন সুস্থ আছেন। তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

৭ অক্টোবর ইসরায়েলে ঢুকে হামলা চালায় হামাস। ওই হামলায় দেশটিতে প্রায় ১ হাজার ১৩৯ জন নিহত হন। এছাড়া প্রায় আড়াইশ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যান হামাস সদস্যরা। সেদিন থেকেই গাজায় নির্বিচার হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। এতে এখন পর্যন্ত উপত্যকাটিতে অন্তত ৩৬ হাজার ৭৩১ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত সাড়ে ৮৩ হাজারের বেশি।

সমুদ্রপথে গাজায় আবারো ত্রাণ প্রবেশ করবে : যুক্তরাষ্ট্রের নির্মিত ভাসমান বন্দর দিয়ে গাজায় আবারো মানবিক সহায়তা প্রবেশ করবে বলে জানিয়েছে ইসরায়েল। গতকাল শনিবার ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, কাঠামোর মেরামত শেষ হলে আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই বন্দরটি দিয়ে ত্রাণ প্রবেশ করতে পারবে।

শুক্রবার ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড বলেছে, গাজার উপকূলের অস্থায়ী বন্দরটি পুনর্নির্মাণ করা হচ্ছে। এই বন্দর দিয়ে ত্রাণ প্রবেশ শুরু হওয়ার দুই সপ্তাহ পরই কাঠামোর কিছু অংশ ভেঙে গেলে সাময়িকভাবে এটি সরিয়ে নেয়া হয়।

৭ অক্টোবর শুরু হওয়া যুদ্ধে গাজায় যে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল তা প্রশমনে মানবিক সহায়তা প্রবেশের জন্য অস্থায়ী এই বন্দরটি স্থাপন করা হয়।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App