×

প্রথম পাতা

যুদ্ধবিরতির আলোচনায় অগ্রগতি নেই

গাজায় হামলার তীব্রতা বাড়িয়েছে ইসরায়েল

Icon

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

গাজায় হামলার তীব্রতা বাড়িয়েছে ইসরায়েল

কাগজ ডেস্ক : গাজা উপত্যকায় সংঘাতের নবম মাসের শুরুতেই হামলার তীব্রতা বাড়িয়েছে ইসরায়েল। জাতিসংঘের একটি স্কুলে প্রাণঘাতী হামলা চালানোর একদিন পর এবার শরণার্থী শিবিরে বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। এদিকে যুদ্ধবিরতির আলোচনাতেও তেমন অগ্রগতি নেই। সর্বশেষ মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের উপস্থাপন করা খসড়া যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের কিছু অংশ নিয়ে এখনো হামাস-ইসরায়েলের আপত্তি রয়েছে বলে জানা গেছে।

গাজা উপত্যকার বিভিন্ন অংশে নতুন করে হামলা শুরু করেছে ইসরায়েল। এসব হামলার বেশির ভাগই ইসরায়েলের ‘নিরাপদ এলাকা’ হিসেবে ঘোষিত অবস্থানে সংঘটিত হয়েছে। একদিন আগে নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরের স্কুলে হামলার পর গতকাল শুক্রবারও সেখানে কামানের গোলার আঘাত ও বিমান থেকে বোমা হামলা চালানো হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, দেইর আল-বালাহ অঞ্চলের পূর্ব অংশে ইসরায়েল হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি, ইসরায়েলি সেনারা বুরেইজ শিবিরের পূর্ব অংশেও গুলি চালায়। এতে একটি সড়কের মোড়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আল-আকসা হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, বুরেইজ শরণার্থী শিবিরের একটি চিকিৎসা কেন্দ্রের কাছে অবস্থিত ঈসা পরিবারের বাসস্থানকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। এই হামলায় অনেকেই আহত হন। মাঘাজি শিবিরের ওয়াফাতি পরিবারের উপর হামলায় ৬ জন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।

গাজা সিটিতে আল-সালাম মসজিদের কাছে আসরাম পরিবারের বাসস্থানে ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে ব্যাপটিস্ট হাসপাতাল। দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর রাফার আল-সুলতান মহল্লাকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান। সমুদ্রপথেও গাজায় হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। গাজা সিটির পশ্চিম দিক থেকে ইসরায়েলি যুদ্ধজাহাজ ‘ফিশারম্যানস’ বন্দর এলাকার বাড়িগুলোর ওপর হামলা চালায়।

মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ অঞ্চলের আল-আকসা হাসপাতাল জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার নুসেইরাত শিবিরে জাতিসংঘ পরিচালিত স্কুলে ইসরায়েলি হামলায় নিহতের সংখ্যা ৩৭, যাদের মধ্যে নারী আর শিশুও আছে। ইসরায়েল দাবি করেছে, ৩টি শ্রেণিকক্ষে লুকিয়ে থাকা ৯ যোদ্ধা তাদের বিমান হামলায় নিহত হয়েছে। সেখানে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস ও ইসলামিক জিহাদের ৩০ যোদ্ধা লুকিয়ে ছিল।

গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলি ভূখণ্ডে অতর্কিত হামলা চালায় হামাস। এই হামলায় ১ হাজার ১৯৪ জন নিহত হন। এছাড়া ২৫১ জনকে জিম্মি করে হামাস। হামাসের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে সেদিনই গাজায় নির্বিচার বিমান হামলা শুরু করে ইসরায়েল। পরে স্থলবাহিনীও এতে যোগ দেয়। গত ৭ মাসে ফিলিস্তিনি নিহতের সংখ্যা অন্তত ৩৬ হাজার ৬৫৪ ছাড়িয়েছে। আহতের সংখ্যা ৮৩ হাজারেরও বেশি। হতাহতের বেশির ভাগই নারী ও শিশু।

ইসরায়েলের নির্বিচার হামলায় গাজা উপত্যকার বেশির ভাগ অংশ মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। ২৪ লাখ জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগই নিজ নিজ বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবে রাশিয়া ও চীনের উদ্বেগ : মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের দেয়া যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের আনুষ্ঠানিক জবাব এখনো দেয়নি হামাস। আর ইসরায়েল বলেছে, যুদ্ধ অব্যাহত রেখেই আলোচনা চলবে। হামাসের দাবি, সব জিম্মি মুক্তির আগে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চালু করতে হবে এবং ইসরায়েলের সব সেনাকে গাজা ছেড়ে চলে যেতে হবে। এই দাবি মানতে অস্বীকার করে ইসরায়েল বলেছে, হামাসকে নির্মূল না করা পর্যন্ত তাদের ‘যুদ্ধের লক্ষ্য’ পূরণ হবে না। মূলত এ বিষয়টি নিয়েই আলোচনায় অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে।

এদিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্র উত্থাপিত একটি খসড়া প্রস্তাব নিয়ে গত বৃহস্পতিবার উদ্বেগ জানিয়েছে ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন দেশ রাশিয়া ও চীন। ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতির জন্য বাইডেনের একটি পরিকল্পনায় সমর্থন চেয়ে প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হয়।

কূটনীতিকরা বলছেন, নিরাপত্তা পরিষদের একমাত্র আরব সদস্যদেশ আলজেরিয়াও প্রস্তাবটিতে সমর্থন দিতে প্রস্তুত নয় বলে ইঙ্গিত দিয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদে কোনো প্রস্তাব পাস হতে হলে এর পক্ষে অন্তত ৯টি ভোট পড়তে হয়। তবে প্রয়োজনীয় ভোট পাওয়ার পরও ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন পাঁচ দেশের কেউ যদি ভেটো দিয়ে দেয়, তবে প্রস্তাবটি পাস করা যাবে না। নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, চীন ও রাশিয়ার ভেটো ক্ষমতা আছে।

এক সপ্তাহ আগে প্রেসিডেন্ট বাইডেন গাজায় তিন ধাপে যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেন। তিনি একে ইসরায়েলি উদ্যোগ বলে উল্লেখ করেন। এই পরিকল্পনার প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র। পরিকল্পনাটি এখনো হামাসের বিবেচনাধীন।

গত সোমবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এক পৃষ্ঠার খসড়া প্রস্তাব এবং বুধবার এর সংশোধিত অনুলিপি উত্থাপন করা হয়েছে। খসড়া প্রস্তাবটিতে যুদ্ধবিরতির পরিকল্পনাকে স্বাগত জানানো হয়েছে। এটি ইসরায়েলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়। হামাসকেও প্রস্তাবটি মেনে নেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। অবিলম্বে ও নিঃশর্তভাবে পরিকল্পনাটি পরিপূর্ণভাবে কার্যকরের জন্য দুই পক্ষের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে।

প্রস্তাবে বলা হয়েছে, প্রথম ধাপে গাজা উপত্যকায় একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে হবে। দ্বিতীয় ধাপে লড়াইরত পক্ষগুলোকে তাদের মধ্যকার বৈরিতার স্থায়ী অবসান ঘটাতে হবে।

কূটনীতিকেরা বলছেন, নিরাপত্তা পরিষদের কয়েকটি সদস্য দেশ প্রস্তাবটি নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা প্রশ্ন তুলেছে যে আসলেই ইসরায়েল এ প্রস্তাব গ্রহণ করেছে কিনা। তারা চায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি কার্যকর এবং জিম্মিদের নিঃশর্ত মুক্তি দেয়ার দাবির ব্যাপারে পরিষদ অটল থাকুক।

যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনাটি সংশোধনের প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া। মস্কো চায়, দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে অবিলম্বে, নিঃশর্ত এবং স্থায়ীভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হোক। এছাড়া প্রথম ধাপে যুদ্ধবিরতি চলতে চলতেই দ্বিতীয় ধাপের বিষয়ে আলোচনা হোক।

মাসের পর মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র, মিসর ও কাতারের প্রতিনিধিরা হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতির চেষ্টা করছেন। হামাস বলছে, তারা গাজা উপত্যকায় যুদ্ধের স্থায়ী অবসান এবং গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহার চায়।

মার্কিন কংগ্রেসে নেতানিয়াহুর ভাষণ ২৪ জুলাই : ওয়াশিংটন সফরকালে আগামী ২৪ জুলাই মার্কিন কংগ্রেসে বক্তব্য রাখেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। হাউস স্পিকার মাইক জনসন এবং সিনেটের মাইনরিটি নেতা মিচ ম্যাককনেল এক বিবৃতিতে বলেছেন, প্রতিনিধি পরিষদ এবং সিনেটের যৌথ অধিবেশনে নেতানিয়াহু বক্তব্য দেবেন। তবে সফরকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে তিনি দেখা করবেন কিনা, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নেতানিয়াহু বলেছেন, মার্কিন কংগ্রেসে বক্তব্য দেয়ার সময় তিনি গাজা উপত্যকায় হামাসের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ নিয়ে প্রকৃত তথ্য উপস্থাপন করবেন।

আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ওই নির্বাচনে আবারো প্রতিদ্ব›িদ্বতা করছেন বাইডেন। ইসরায়েলকে সমর্থন দেয়ার কারণে নির্বাচনের আগে তিনি চাপের মধ্যে আছেন। গাজায় হাজার হাজার বেসামরিক মানুষের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কিছুসংখ্যক ডেমোক্র্যাট দলীয় নেতা এবং ভোটাররা ক্ষোভ জানিয়েছেন। অন্যদিকে ইসরায়েলকে সহযোগিতার জন্য বাইডেন যথেষ্ট ব্যবস্থা নিচ্ছেন না বলে রিপাবলিকানরাও মার্কিন প্রেসিডেন্টের সমালোচনা করেছেন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App