×

প্রথম পাতা

ইতিহাস গড়লেন নরেন্দ্র মোদি

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ইতিহাস গড়লেন নরেন্দ্র মোদি

ভারতের ১৮তম লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদি ইতিহাস সৃষ্টি করে টানা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। তবে এবার তার একদলীয় শাসনের ইতি ঘটতে চলছে। গতকাল প্রকাশিত দেশটির সবচেয়ে বড় নির্বাচনের ফলাফলে এমনটাই আভাস পাওয়া গেছে।

রাত ১০টায় ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এককভাবে এগিয়ে ছিল ২৪১ আসনে। আর বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট ‘ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স’ (এনডিএ) এগিয়ে ২৯৪ আসনে। অন্যদিকে বিরোধীদের জোট ইন্ডিয়া এগিয়ে ছিল ২৩২ আসনে। কংগ্রেস এককভাবে এগিয়ে ১০০ আসনে।

ভারতের লোকসভার আসন সংখ্যা ৫৪৩টি। এই পরিষদে কোনো দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ২৭২টি আসনে জয়ী হতে হয়। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি একাই ৩০৩টি আসনে জয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠাতা পেয়েছিল।

বিজেপি এবার তাদের জন্য ৩৭০ আসন আর এনডিএ জোটের জন্য ৪০০ আসনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু ভোটের চিত্রে দেখা যাচ্ছে, ২০১৪ এবং ২০১৯ সালের নির্বাচনী ফলের বিপরীতে এবার মোদির দল বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ম্যাজিক ফিগার ছুঁতে পারেনি। ফলে এবার আর সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না দলটি।

একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে কেন্দ্রে সরকার গড়ার জন্য মোদিকে নির্ভর করতে হবে জোট এনডিএর দুই শরিক- অন্ধ্র প্রদেশে চন্দ্রবাবু নাইডুর তেলেগু দেশম পার্টি (টিডিপি) এবং বিহারে মুখ্যমন্ত্রী নিতীশ কুমারের জনতা দল-ইউনাইটেড (জেডি-ইউ) এর ওপর।

নিতীশের নেতৃত্বাধীন জনতা দল (ইউনাইটেড) ১৪টি আসন পাবে এবং নাইডুর তেলেগু দেশম পার্টি (টিডিপি) ১৬ আসন পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অতীতে এ দুই দলের নেতারই একাধিকবার এনডিএ ত্যাগ এবং ফিরে আসার ইতিহাস রয়েছে।

এবার তারা কী করেন সেদিকেই নজর সবার। সমর্থন ছাড়া বিজেপির পক্ষে কেন্দ্রে সরকার গড়া সম্ভব নয়, সেটা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। আর এতেই দুই নেতার রাজনৈতিক গুরুত্ব বেড়ে গেছে। আর তারা সত্যিই শেষ পর্যন্ত বিজেপিকে সমর্থন করেন, নাকি আবারও ভোল পাল্টান- তা নিয়ে জল্পনা বাড়ছে।

চন্দ্রবাবু নাইডুর তেলেগু দেশম এবং নিতীশ কুমারের জেডি-ইউ ছাড়া আরো একাধিক এনডিএ শরিকের ওপর নির্ভর করতে হবে বিজেপিকে। তাদের মধ্যে রয়েছে মহারাষ্ট্রের শিবসেনার সিন্ধেগোষ্ঠী, বিহারে লোক জনশক্তি পার্টি এবং উত্তর প্রদেশের রাষ্ট্রীয় লোক দল। তবে শুধু এসব দলই নয়, আরো বেশ কিছু দল রয়েছে, যাদের কেউ দুই বা এক আসনে সারা ভারতে এগিয়ে রয়েছে।

তাদেরও সঙ্গে নিয়ে চলতে হবে ভবিষ্যতের বিজেপিকে। সে ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে অনেক কর্মসূচি বাস্তবায়নে নতুন ধরনের সমস্যায় পড়তে হবে বিজেপিকে। এ ধরনের সমস্যায় তারা গত দুবার পড়েনি। এর ফলে ভারতের রাজনীতির একটা নতুন অধ্যায় সূচিত হবে বলে মনে করছে পর্যবেক্ষকদের একাংশ।

অমর্ত্য সেনের প্রতিচী ইনস্টিটিউটের মুখ্য জাতীয় গবেষক সাবির আহমেদ বলেন, এত দিন বিজেপি একাই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেত। অবশ্যই এনডিএ ছিল। কিন্তু বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে কার্যকর ছিল না। সব সময় বিজেপির সিদ্ধান্ত বা নীতি অগ্রাধিকার পেত। বিশেষ করে বিভিন্ন বিলকে আইনে পরিণত করার প্রশ্নে। এবার কিন্তু তাদের শরিকদের কথা শুনতে হবে এবং এটা নিয়ে মোদি-শাহের সরকার বেশ খানিকটা চাপে থাকবে। বিশেষত যখন বিরোধীদের শক্তি অনেকটাই বাড়ল।

ভোট গণনায় কঠোর নিরাপত্তা : লোকসভা নির্বাচনে ৭ দফার ভোটগ্রহণ গত ১৯ এপ্রিল শুরু হয়ে ১ জুন শেষ হয়। গতকাল মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টায় কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে ভোট গণনা শুরু হয়। সারাদেশের ৫৪৩টি লোকসভা আসনের নির্বাচনী এলাকার গণনাকেন্দ্রগুলোতে একযোগে গণনা চলে। প্রথমে পোস্টাল ব্যালটগুলো গণনা করা হয়। এগুলো মূলত নির্বাচনী ও অন্যান্য দায়িত্বে নিজ এলাকা থেকে দূরে থাকা নাগরিকদের ভোট। ব্যালট পেপারের এসব ভোট গণনার পর ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) পড়া ভোট গণনা করা হয়।

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৫১-৫২ সালে দেশটিতে প্রথম লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর থেকে এবারই সবচেয়ে বেশি সময় ধরে ভোটগ্রহণ করা হয়। প্রথম ঘণ্টা গণনার পরই সাধারণত ভোটের ফল কোন দিকে যাচ্ছে তা সামনে আসতে শুরু করে আর বিকালের মধ্যেই ফলাফল পরিষ্কার হয়ে যায়। রাজস্থান রাজ্যের মোট ২৫ আসনের মধ্যে বিজেপি ১৪ আসনে জয় পেয়েছে। কংগ্রেস জিতেছে ৮টি আসনে। এছাড়া সিপিআই-এম, রাষ্ট্রীয় লোকতান্ত্রিক পার্টি ও ভারত আদিবাসী পার্টি একটি করে আসন পেয়েছে।

মোদি দেড় লাখ ভোটের ব্যবধানে জয়ী : গুজরাটের বারানসীতে ১ লাখ ৫২ হাজার ৫১৩ ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি পেয়েছেন ৬ লাখ ১১ হাজার ৪৩৯ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্ব›দ্বী কংগ্রেসের অজয় রায় পেয়েছেন ৪ লাখ ৬০ হাজার ৪৫৭ ভোট। বিজেপি নেতা অমিত শাহ প্রায় সাড়ে ৭ লাখ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। গুজরাটের গান্ধীনগর আসনে তিনি পেয়েছেন ১০ লাখ ১০ হাজার ৯৭২ ভোট।

৪ লাখ ভোটে জিতলেন রাহুল : লোকসভা আসনের বিচারে রাজনৈতিকভাবে উত্তর প্রদেশ ভারতের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজ্য। এ রাজ্যের ৮০টি আসন ভারতের জাতীয় নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে। উত্তর প্রদেশের রায় বেরেলি আসনে রেকর্ডগড়া ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন রাহুল গান্ধী। তার নিকটতম প্রার্থীর চেয়ে ৪ লাখের বেশি ভোটে জয়ী হয়েছেন এ কংগ্রেস নেতা।

রাহুলের মা সোনিয়া গান্ধী রায় বেরেলি আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য। এবার সেই আসনে নির্বাচন করেন তার পুত্র রাহুল গান্ধী। ২০১৯ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্ব›দ্বীকে যে ব্যবধানে হারিয়েছিলেন সোনিয়া, এবার সেই ব্যবধান প্রায় দ্বিগুণ করেছেন রাহুল। ৬ লাখ ৭০ হাজারের বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন তিনি। তার নিকটতম প্রতিদ্ব›দ্বী বিজেপি প্রার্থী দিনেশ প্রতাপ সিং। কংগ্রেসের দুর্গ বলে পরিচিত রায় বেরেলি আসনে ২০১৯ সালের নির্বাচনে সোনিয়া গান্ধীর কাছে ১ লাখ ৬৭ হাজার ভোটে হেরেছিলেন দিনেশ।

কেরালা ওয়েনাডেও জয় পেয়েছেন রাহুল গান্ধী। তিনি পেয়েছেন ৬ লাখ ৪৭ হাজার ৪৪৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্ব›দ্বী কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার (সিপিআই) প্রার্থী অ্যানি রাজা পেয়েছেন ২ লাখ ৮৩ হাজার ২৩ ভোট। দুজনের ভোটের ব্যবধান ৩ লাখ ৬৪ হাজার ৪২২।

হেরে গেলেন কাশ্মিরের সাবেক দুই মুখ্যমন্ত্রী : জম্মু ও কাশ্মিরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আব্দুল্লাহ তার প্রধান প্রতিদ্ব›দ্বী প্রার্থী শেখ আব্দুল রশিদের কাছে হেরে গেছেন। এছাড়া কাশ্মিরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতিও এবারের নির্বাচনে হেরে গেছেন।

নির্বাচন কমিশন গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষণা করার আগেই কাশ্মিরের বারমুল্লাহতে পরাজয় মেনে নেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ওমর আব্দুল্লাহ। ওমরের বিরুদ্ধে জয় পাওয়া শেখ আব্দুল রশিদ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছেন। কাশ্মিরের সশস্ত্র বিদ্রোহীদের সহায়তার অভিযোগ বর্তমানে তিনি দিল্লির কারাগারে বন্দি আছেন।

সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির মেহবুবা মুফতিও অনন্তনাগ-রাজৌরি আসনে মিয়া আলতাফের কাছে পরাজয় মেনে নেয়ার ঘোষণা দেন। দেশের সব জায়গায় প্রার্থী দিলেও বিরোধপূর্ণ জম্মু ও কাশ্মিরে কোনো প্রার্থীকে দাঁড় করায়নি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতাসীন দল বিজেপি।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App