×

প্রথম পাতা

পশ্চিমবঙ্গে বড় জয় পেল তৃণমূল

মোদিকে ক্ষমতার বাইরে রাখার অঙ্গীকার মমতার

Icon

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মোদিকে ক্ষমতার বাইরে রাখার অঙ্গীকার মমতার

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

লোকসভার নির্বাচনে জনগণের দেয়া ম্যান্ডেট মেনে নিয়ে অবিলম্বে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একই সঙ্গে রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি। গতকাল মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশন লোকসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার সময় এক সংবাদ সম্মেলনে এ আহ্বান জানান মমতা।

এ সময় তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এখনই পদত্যাগ করা উচিত। কারণ তিনি বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছেন, তিনি অনেক দল ভেঙে দিয়েছেন। মানুষ তার মনোবল ভেঙে দিয়েছে... ভারত জিতেছে এবং মোদি হেরেছে... আমি মোদিকে ক্ষমতার বাইরে রাখার এবং ইন্ডিয়া জোটের ক্ষমতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করব। আমি আমার সমস্ত ‘ইন্ডিয়া’র সঙ্গীদের সমর্থন জানাচ্ছি।

মমতা বলেন, আমরা বসিরহাট লোকসভা আসনে জিতেছি, যেখানে সন্দেশখালি অবস্থিত। আমাদের মা ও বোনদের বিরুদ্ধে গুজব ছড়ানো সত্ত্বেও আমরা সেখানে জয় পেয়েছি। বিজেপি যে এবার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না, সে প্রসঙ্গে মমতা বলেন, দুই-তৃতীয়াংশ মেজরিটি আর নেই। যা খুশি আইন পাস করাতে পারবে না। মানুষ স্বাধীনতা ফিরে পাক।

তিনি বলেন, মোদি ও তার দল তাদের ‘অহংকারের’ জন্য হেরেছে। যে অযোধ্যাকে নিয়ে এত কিছু করেছে, সেই অযোধ্যাতেও বিজেপি হেরেছে। এত অহংকার কারোর জন্য ঠিক নয়। তিন মাস ধরে নির্বাচন চলতে পারে না। ডেভেলপমেন্টের কাজ হয় না। আমাদের পার্টির যারা হেরেছে তাদের টাকা দিয়ে হারিয়ে দেয়া হয়েছে। আমি চাই মোদিজি পদত্যাগ করুক, হোম মিনিস্টার পদত্যাগ করুক। এই জয় ইন্ডিয়ার জয়। দেশের জয়।

ভারতের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বুথফেরত জরিপের সমস্ত আভাসকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জয়ের পথে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। বুথফেরত সমীক্ষার সব ভবিষ্যৎবাণী ভুল প্রমাণ করলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ পর্যন্ত পাওয়া ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, এই রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস সব ক্ষেত্রে বিজেপির চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে। রাজ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতা জানিয়ে দিল, মমতা বাংলার এবং বাংলা মমতারই। পশ্চিমবঙ্গে গতকাল দুপুর ২টা নাগাদ ভোট গণনার অর্ধেক শেষ হওয়ার পর নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, তৃণমূল কংগ্রেস গতবারের তুলনায় সাড়ে ৩ শতাংশ বেশি ভোট পেয়েছে।

২০১৯ সালে তৃণমূল পেয়েছিল ৪৩ দশমিক ৩ শতাংশ ভোট এবং এবার পেয়েছে ৪৬ দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যদিকে বিজেপির ভোট কমেছে ৩ দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু বুথফেরত জরিপে বলা হয়েছিল যে এবার এই রাজ্যে বিজেপির ২ থেকে ৩ শতাংশ ভোট বাড়বে। ২০১৯ সালে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বিজেপি পেয়েছিল ৪০ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট। এবার পেয়েছে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ। বিজেপি যেখানে গতবার পেয়েছিল ১৮ আসন, সেখানে কমে এবার তারা এগিয়ে আছে মাত্র ১২ আসনে। আর তৃণমূল কংগ্রেস গতবার ২০ আসনে জয় পেলেও এবার তারা রাজ্যের ৪২ আসনের মধ্যে ৩১টিতে এগিয়ে রয়েছে।

নিয়োগ দুর্নীতি, রেশন দুর্নীতি, গরু পাচার, একের পর এক মামলায় নাম জড়িয়েছে দলের নেতা-মন্ত্রীদের। ঘন ঘন কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার ঘরে ডাক পড়ে অন্য নেতাদেরও। তা নিয়ে লাগাতার আক্রমণ করেছে বিরোধীরা। কিন্তু তৃণমূলের ভোটবাক্সে তার কোনো প্রভাবই পড়তে দেখা যায়নি। লোকসভা নির্বাচনের প্রস্তুতিপর্ব থেকেই পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা বৃদ্ধির দাবি করে আসছিল বিজেপি। এই রাজ্যে ৩০টির বেশি আসন পাওয়া থেকে এবার তাদের কেউ আটকাতে পারবে না বলেও দাবি উঠেছে গেরুয়া শিবির থেকে। প্রায় সমস্ত বুথফেরত সমীক্ষাতেও দেখা গিয়েছিল, রাজ্যে বিজেপি ৩০টির কাছাকাছি আসন পাবে। কিন্তু গতকাল দুপুর পর্যন্ত সেই লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে ছিল বিজেপি। বরং তৃণমূল কখনো ২৯ থেকে ৩০, কখনো আবার ৩১টি আসনে এগিয়ে গিয়েছে।

বারবার দুর্ঘটনার মুখে পড়েছেন, অসুস্থ হয়েছেন, ঝড়-জল মাথায় নিয়ে গত আড়াই মাস লাগাতার প্রচারণায় মাঠে ছিলেন মমতা। আর সে লড়াইয়ে দোসর ছিলেন দলের যোগ্য সেনাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এবারের লোকসভায় বাংলার এই চমকপ্রদ ফলাফল জানান দিল, মমতার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা আর অভিষেকের পরিশ্রমী সাংগঠনিক শক্তির যুগিলবন্দির কাছে ডাহা ফেল বিজেপির প্রবল পরাক্রমশালী ‘ভোট মেশিনারি’।

এবার লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং তুষ্টিকরণের অভিযোগকে হাতিয়ার করেছিল বিজেপি। এর পাল্টা, কেন্দ্রীয় বঞ্চনা, বাংলা বিরোধী আচরণ এবং মেরুকরণের রাজনীতির অভিযোগ তুলে বিজেপির বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছিল তৃণমূল। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, যত কমই হোক না কেন, ২০১৯ সালের চেয়ে একটি হলেও বেশি আসন পাবেন তারা। এর আগে, ২০১৪ সালে তৃণমূল ৩৪টি আসনে জয়ী হয়েছিল। ২০১৯ সালে তা কমে ২২-এ দাঁড়ায়।

অথচ বুথফেরত সমীক্ষা বলছিল অন্য কথা। এক্সিট পোল দাবি করেছিল, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল নাকি ১৩-১৮-র বেশি আসন পাবে না। তা নিয়ে গত কদিনে আলাপ-আলোচনাও কম হয়নি। তবে তাতে আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরেনি তৃণমূলের। পাল্টা তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘এক্সিট পোল ফেক। মানি না।’ এখন ফলাফলে স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যাচ্ছে, এই রাজ্যে মোদি গ্যারান্টি মুখ থুবড়ে পড়েছে।

একের পর এক জনকল্যাণমূলক প্রকল্প, সুশাসন, কৌশলী স্ট্র্যাটেজি। এগুলো নিশ্চিতই তৃণমূলের জয়ের অন্যতম কারণ। তবে সব থেকে বড় কারণ মমতা এবং অভিষেকের ৫ মাসের অক্লান্ত পরিশ্রম। বাংলার রাজনীতির মানচিত্র তারা ভালো করেই চেনেন। আরো ভালো চেনেন বাঙালির মন। তার পরেও অবশ্য কিছু অভাব-অভিযোগ জমে। রাজনীতিতে তা অস্বাভাবিক নয়। তা তারা উড়িয়ে দেননি, বরং শুনেছিলেন মন দিয়ে। সমাধান করার চেষ্টা করেছিলেন আরো গুরুত্ব দিয়ে।

জনতার দাবি মেনেই দলের সংগঠন চাঙা করতে নেমেছিলেন অভিষেক। ২০২৩ সালে নবজোয়ার কর্মসূচি নিয়ে চষে ফেলেন গোটা রাজ্য। কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ, সেরেছিলেন টানা জনসংযোগ। কার কী অভিযোগ রয়েছে শুনেছিলেন মন দিয়ে। কোথায় প্রশাসনিক ঘাটতি রয়েছে, কোথায় সংগঠন দুর্বল, কোথায়-কোথায় দলের ভেতরে সমস্যা তার সমাধানের চেষ্টা করেন। অবশ্যই সবই করেন দলনেত্রীর সবুজ সংকেত নিয়ে। আর তারই সুফল মিলল এবারের লোকসভা ভোটে।

কী কী করেছেন মমতা-অভিষেক?

শুরুটা হয়েছিল উত্তর থেকে। চা বাগানের শ্রমিকদের পাট্টা বিলি, সেখানকার শ্রমিকদের সন্তানের জন্য ক্রেস তৈরি, ধূপগুড়িকে মহকুমা ঘোষণার মতো একাধিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেয় রাজ্য সরকার। তেমনই আবার চা বাগানগুলোতে তৃণমূলের সংগঠন শক্ত করেছেন অভিষেক। চা শ্রমিকদের প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা পাইয়ে দেয়ার জন্য আন্দোলন করেছে তৃণমূল নেতৃত্ব। আর তারই সুফল মিলেছে ভোট বাক্সে। শুধু উত্তর কেন, জঙ্গলমহল, রাঢবঙ্গ, উপকূল অঞ্চলের সমস্যা আলাদা আলাদা করে চিহ্নিত করে, তার সমাধান করেছে মমতা-অভিষেক। প্রতি লোকসভা কেন্দ্রে তার সুফল পেয়েছে তৃণমূল।

একদিকে অভিভাবক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব, জনপ্রিয়তা, প্রশাসনিক দক্ষতা, অন্যদিকে সেনাপতি অভিষেকের মাটি কামড়ে পড়ে থাকার মানসিকতা, কড়া হাতে সংগঠন সামলানোর দক্ষতা, অদম্য জেদ কাজে লেগেছে এবার জনসমর্থন লাভে। গতকাল দুপুর পর্যন্ত ২ লাখ ৬৫ হাজার ভোটে ডায়মন্ড হারবারে এগিয়ে ছিলেন তৃণমূলের অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। মেদিনীপুরে ১১ হাজারের বেশি ভোটে এগিয়ে রয়েছেন জুন মালিয়া। ঘাটালে ৩৭ হাজারের বেশি ভোটে এগিয়ে রয়েছেন দেব। কলকাতা দক্ষিণে মালা রায় এগিয়ে ৯৮ হাজার ভোটে। মথুরাপুরে ৬৫ হাজারের বেশি ভোটে এগিয়ে তৃণমূলের বাপি হালদার। বসিরহাটে তৃণমূল প্রার্থী হাজি নুরুল এগিয়ে ১ লাখ ৪২ হাজারের বেশি ভোটে। শ্রীরামপুরে ৮ হাজারের বেশি ভোটে এগিয়ে রয়েছেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। ব্যারাকপুরে ৩৩ হাজারের বেশি ভোটে এগিয়ে রয়েছেন পার্থ ভৌমিক। যাদবপুরে সায়নী ঘোষ এগিয়ে আছেন ৪৫ হাজার ভোটে।

বামফ্রন্ট-কংগ্রেসের ভোট আরো কমলো 

অর্ধেক রাউন্ডের গণনা শেষে দেখা যাচ্ছে, গতবারের চেয়ে প্রায় ১ শতাংশ কমে গেছে সিপিআইএম দলের ভোট। ২০১৯ সালে যেখানে তারা পেয়েছিল ৬ দশমিক ৩ ভোট, সেখানে এবার পেয়েছে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। যদিও প্রচার পর্যায়ে এবার সিপিআইএমকে ভালোভাবে মাঠে দেখা গিয়েছিল। কংগ্রেসের ভোট কমেছে ঠিক ১ শতাংশ। ২০১৯ সালে ৫ দশমিক ৭ থেকে কমে ৪ দশমিক ৬ হয়ে গেছে। তারা অন্তত একটি আসন পাবে কিনা, তা এখনো খুব স্পষ্ট নয়। গতবার পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস পেয়েছিল দুটি আসন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App