×
Icon এইমাত্র
কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কোটা আন্দোলনকারীরা বাংলাদেশ টেলিভিশনের মূল ভবনে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ। কোটা সংস্কার আন্দোলনে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ১৯ জন নিহত কোটা ইস্যুতে আপিল বিভাগে শুনানি রবিবার: চেম্বার আদালতের আদেশ ছাত্রলীগের ওয়েবসাইট হ্যাক ‘লাশ-রক্ত মাড়িয়ে’ সংলাপে বসতে রাজি নন আন্দোলনকারীরা

প্রথম পাতা

বাজেট ২০২৪

নতুন বাজেটের তিন চ্যালেঞ্জ

Icon

মরিয়ম সেঁজুতি

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

নতুন বাজেটের তিন চ্যালেঞ্জ

 বৈশ্বিক সংকট সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে। একদিকে স্বস্তি দিতে গিয়ে অন্য দিকে টান পড়ছে। কৃচ্ছ্রসাধনের পাশাপাশি প্রতি মুহূর্তে খেয়াল রাখতে হচ্ছে আইএমএফের শর্তের বিষয়েও; যেন কোনো অবস্থাতেই ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার ঋণের বাকি কিস্তিগুলো আটকে না যায়। অন্যদিকে বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অর্থনীতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ সূচক মূল্যস্ফীতির পারদ চড়ছেই। প্রায় এক বছর ধরেই মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৯ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।

অর্থনীতিতে টানাপড়েন, আইএমএফের নানা শর্ত পূরণ আর অর্থনীতির স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখে আর মাত্র ৩ দিন পর আগামী অর্থবছরের (২০২৪-২৫) প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকার ব্যয় সংকোচনমুখী সতর্ক বা সাবধানী বাজেট দিতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী এ এইচ এম মাহমুদ আলী। আগামী বাজেটে ধারাবাহিক বাড়তে থাকা উচ্চ মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার শঙ্কায় দেশের সাধারণ মানুষ ও অর্থনীতিবিদরা।

পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী, সংকোচনমূলক বা বাজেট ছোট রাখাও এবার অন্যতম চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন তারা। সরকারও বাজেট বাস্তবায়নে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে মনে করছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। এছাড়া সরকার আগামী বাজেটে ঘাটতি রোধ, রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও কৃষকদের জন্য সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে সবার জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য ঠিক করতে চাইছে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, প্রতি বছর বাজেটের চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করলেই হবে না; এগুলোর সমাধানের পরিকল্পনাও থাকতে হবে। তাদের মতে, মূল চ্যালেঞ্জ দুটি। ডলার সঙ্কট ও মূল্যস্ফীতি। এ দুটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করলে বাকি চ্যালেঞ্জগুলোও মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। তারা আরো বলেন, চ্যালেঞ্জ খুঁজে বের করে তার বাস্তবায়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রশাসনিক দক্ষতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সম্প্রতি অক্সফ্যাম ও গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলনের (বিবিএম) যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেছেন, গত দুই-তিন বছর ধরে নিত্যপণ্যের দাম ১২ শতাংশ হারে বাড়ছে। কিন্তু গত দুই বছরে যারা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কেনেন, তাদের আয় ২০ থেকে ২৪ শতাংশ কমেছে। ফলে বর্তমান বাজেটেই আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। এতে কেউ বিদেশ যেতে; আবার কেউ স্কুলে বাচ্চা ভর্তি বা নাস্তায় ডিম খেতে পারছি না। যা আয় করছি, তাতে ব্যয় কুলাতে পারছি না। আবার দাম বাড়ার কারণগুলোই এত জটিল- তা দ্রুত সমাধান করা অসম্ভব। তাই সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আগামী বাজেট প্রণয়ন করতে হবে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ভোরের কাগজকে বলেন, এবারের বাজেটের মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বাজেট ছোট রাখা। আমাদের ডিমান্ড কন্ট্রোল করা দরকার। অর্থাৎ সরকারি ব্যয় কমিয়ে আনা দরকার। তিনি বলেন, এডিপির সাইজ বড় করা যাবে না। কারণ আমাদের বৈদেশিক ঋণে যে পরিমাণ চাপ পড়ছে এবং তা পরিশোধের ঝুঁকি বাড়ছে। যেহেতু অভ্যন্তরীণ আয় অর্থাৎ রাজস্ব আহরণের মাধ্যমেই প্রকল্পগুলো আগামীতে বাস্তবায়ন বেশি দেয়া দরকার। কারণ আমাদের ঋণ পাওয়া ব্যয়বহুল ও সময় সাপেক্ষ হবে; না পাওয়ার ঝুঁকিও আছে।

সুতরাং বাজেটের ব্যয় কমিয়ে আনা, পাশাপাশি আয় বাড়ানো দরকার। বিষয়গুলো সাধারণ মনে হতে পারে, তবে যেহেতু এখন একটি চ্যালেঞ্জিং টাইম চলছে এবং এখান থেকে সহজে উত্তরণ হচ্ছে না। তাই আমাদের নিজস্ব অর্থের উপরে নির্ভরতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। সুতরাং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে সাধারণ উদ্যোগের বাইরে সরকার এবার কি ধরনের অসাধারণ উদ্যোগ নেবে সেটাই দেখার বিষয়।

এ গবেষক বলেন, সাধারণ মানুষের জন্য যে সামান্য সুবিধা দেয়া হয়, বাজেট বাস্তবায়নের সময় সেটা দিতে নানা গড়িমসি করা হয়। সেটা নিতে সাধারণ মানুষকে হয়রানির শিকার হতে হয়। অন্যদিকে করপোরেট হাউস থেকে শুরু করে ধনীদের জন্য যে সুবিধাগুলো দেয়া হয়। সেটা নিয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়, দ্রুত দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। ফলে এটার যে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এছাড়া সরকারের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার যে অজুহাত দেখানো হয়, সেটাও সঠিক নয়। এই অবস্থায় জনস্বার্থে বাজেট করতে হলে বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া পরিবর্তন করতে হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আগের বছরগুলোর তুলনায় এবারের বাজেট খুব একটা বাড়ছে না। অতীতে দেখা গেছে, নতুন বাজেট আগের বছরের চেয়ে ১২ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। গত বছরের ১ জুন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেছিলেন, যা ছিল আগেরটির তুলনায় ১২ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি। বিশাল সেই বাজেটে ঘাটতি ছিল ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। চলতি বাজেটের তুলনায় মাত্র ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ বাড়িয়ে প্রায় ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের রূপরেখা তৈরি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের মতো আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটকেও ব্যয় সংকোচনমুখী করার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আগামী বাজেটেও বিলাসপণ্য আমদানিকে নিরুৎসাহিত করার পক্ষে মত দিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই হবে আগামী বাজেটের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেছেন, তিনি দেখতে চেয়েছিলেন বর্তমান মেয়াদের প্রথম বাজেটে নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিফলন থাকছে কিনা। অর্থ মন্ত্রণালয় বাজেটের যে কাঠামো দাঁড় করিয়েছে, তাতে সেই প্রতিফলন থাকছে বলে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।

জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন ভোরের কাগজকে বলেন, বাজেটের চ্যালেঞ্জগুলোর একটি থেকে আরেকটি আলাদা নয়। তিনি বলেন, আমরা একদিকে বলছি- মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জ, আবার বলছি বৈদেশিক মুদ্রার চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জও দেখছি। বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গেলে আরেকটি চ্যালেঞ্জ কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই যে একটির সঙ্গে আরেকটির সম্পর্ক- এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে ঠিক করতে হবে- কোন সমস্যাকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হবে।

এ অর্থনীতিবিদ বলেন, গত বছর বলা হয়েছিল, মূল্যস্ফীতি আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, তাতে মূল্যস্ফিতিকে আরো বেড়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার সংকট মোকাবিলা নিয়ে ড. জাহিদ বলেন, এক্ষেত্রে আমরা শুধু আমদানিকে নিয়ন্ত্রণ করেছি, আসল জায়গায় হাত দেইনি। অথচ আমদানিকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট তো কাটেইনি, আমরা মূল্যস্ফীতিকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছি।

এ অর্থনীতিবিদ বলেন, সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হলে সরকারি খরচ বাড়াতে হবে। খরচ বাড়লে মূল্যস্ফীতিও বাড়বে। বৈদেশিক মুদ্রার সংকট আরো গভীর হবে। কাজেই অবস্থা বুঝেই ব্যবস্থা নিতে হবে। তাই চ্যালেঞ্জের লম্বা তালিকা করলেই হবে না। এ বছরে প্রধান কোন দুটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে সেটা খুঁজে বের করতে হবে। যেগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখলে অন্য সমস্যাগুলো নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। তিনি বলেন, আমার মতে আমাদের চ্যালেঞ্জ দুটি। আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ডলার সংকট, দ্বিতীয়টি মূল্যস্ফীতি। ডলার না থাকলে বিনিয়োগ হবে কীভাবে? সুতরাং আগে ডলার সংকট কাটাতে হবে। ডলার সংকট যদি আমরা প্রধান চ্যালেঞ্জ ধরি; তাহলে সেই অনুযায়ী আমাদের বাজেট পলিসি তৈরি করতে হবে। এ দুটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করলে বাকি চ্যালেঞ্জগুলোও মোকাবিলা হয়ে হয়ে যাবে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, এমন এক সময় আগামী বাজেট আসছে, যখন দেশের অর্থনীতি বহু সংকটে নিমজ্জিত রয়েছে। অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সংকট এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি। এছাড়া চাপে সামষ্টিক অর্থনীতি, রিজার্ভের চাপ, রপ্তানি আয়-রেমিট্যান্সেও নেই সুখবর। ডলারের বাজারে খারাপ অবস্থা। ব্যাংক ও আর্থিক খাতেও চলছে দুর্দশা। এছাড়া দাতা সংস্থার ঋণ ও সহায়তা প্রাপ্তিও সন্তোষজনক নয়। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগেও চলছে খরা, নতুন কর্মসংস্থানেও চলছে হতাশা। আমি মনে করি, এত সমস্যার মধ্যে বাজেটে সবার আগে গুরুত্ব দেয়া উচিত উচ্চ মূল্যস্ফীতি কীভাবে কমিয়ে আনা যায় সে দিকটিতে। কারণ বিগত দুই-তিন বছরে দেশে প্রধান প্রধান খাদ্যপণ্যসহ সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের দাম এতটাই অস্বাভাবিক বেড়েছে- দেশের সাধারণ মানুষের এখন তিন বেলার আহার জোটানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এ অর্থ উপদেষ্টা একই কারণে আগামী বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তার দিকেও অধিক গুরুত্ব দেয়ার পরামর্শ দেন।

মির্জ্জা আজিজ আরো বলেন, ব্যাংক খাত এখন খাদের কিনারে। বলা যায়, ব্যাংক খাত এক রকম ঠেকা দিয়ে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে ব্যাংক খাত বিপর্যস্ত। এ জন্য আগামী বাজেটে ব্যাংক খাতের সংস্কারের বিষয়টির দিকেও নজর দিতে হবে। আমি দেখার অপেক্ষায় থাকব নতুন বাজেটে সরকার ব্যাংক ও আর্থিক খাতের সংস্কারের জন্য কি কি পদক্ষেপ নেয়।

টাইমলাইন: বাজেট ২০২৪-২৫

আরো পড়ুন

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App