×

প্রথম পাতা

স্বীকৃতিতে নয়, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব শুধুই ইসরায়েলের হাতে

Icon

প্রকাশ: ৩০ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

স্বীকৃতিতে নয়, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের  অস্তিত্ব শুধুই ইসরায়েলের হাতে

কাগজ ডেস্ক : ইউরোপের তিন দেশ- আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে ও স্পেন পূর্বঘোষণা অনুযায়ী গত মঙ্গলবার ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছে। ইসরায়েলি দখলদারির পর ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের এখন যে ভূখণ্ড অবশিষ্ট আছে, তা হলো- দখলকৃত পশ্চিম তীর ও অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা। গাজায় গত প্রায় ৮ মাস ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। এই সময়ে ৩৬ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নারী-পুরুষকে হত্যা করেছে তারা।

এরপরও নরকে পরিণত হওয়া গাজা উপত্যকাজুড়ে ও পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিরা নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদ ও গর্ব প্রকাশ করেছেন। তাদের এ আশা আরো ব্যাপকভাবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের জন্য এ স্বীকৃতির অর্থ কী- এখন সেই প্রশ্ন উঠছে।

স্পেন, আয়ারল্যান্ড ও নরওয়ে যা করেছে, সেটি কোনো বিদ্যমান রাষ্ট্রের স্বীকৃতি নয়, বরং একটি স্বাধীন রাষ্ট্র (স্বাধীন ফিলিস্তিন) প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনার স্বীকৃতিমাত্র। এ পদক্ষেপের ফলে ওই তিন দেশ ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং যোগাযোগ আরো বাড়বে। তিন দেশই ঘোষণা করেছে, তারা ফিলিস্তিনকে ১৯৬৭ সালের আগের সীমানার ভিত্তিতে ও পূর্ব জেরুজালেমকে এর রাজধানী ধরে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে।

আয়ারল্যান্ড বলেছে, তারা ডাবলিনে ফিলিস্তিনি মিশন ও ফিলিস্তিনে নিজেদের কার্যালয়কে দূতাবাসে উন্নীত করবে। আর একই রকম পদক্ষেপ আগেই নিয়েছে নরওয়ে ও স্পেন। আশার কথা হলো, বাস্তবে না হলেও এর আক্ষরিক স্বাধীনতা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ফিলিস্তিনের অবস্থান জোরদার করবে। পাশাপাশি, ঠিক এই মুহূর্তে গাজায় যুদ্ধ বন্ধে সমঝোতায় বসার জন্য ইসরায়েলের ওপর এটি আরো চাপ সৃষ্টি করবে। তিন দেশের এ স্বীকৃতি একই রকম পদক্ষেপ নিতে এরই মধ্যে স্লোভেনিয়াকে উৎসাহিত

করেছে। আগামী ১৩ জুন দেশটি ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

২৭ জাতির ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য আয়ারল্যান্ড ও স্পেন। আশা করা হচ্ছে, ফিলিস্তিনকে দেশ দুটির স্বীকৃতি ৬ থেকে ৯ জুন ইইউর নির্বাচনকালীন এজেন্ডায় ফিলিস্তিনের মর্যাদার বিষয়টিকে জোরালো করবে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১৯৩টি সদস্যদেশের মধ্যে ফিলিস্তিনকে আগেই স্বীকৃতি দিয়েছে ১৪৩টি। নতুন করে তিনটি দেশ যুক্ত হওয়ায় এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ১৪৬।

তিন দেশের স্বীকৃতি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে জোরালো এই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এ পদক্ষেপ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে শক্তিশালী পশ্চিমা ইউরোপীয় দেশগুলোকে আকৃষ্ট করতে পারে। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ গত মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে একটি শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ অর্জনের একমাত্র সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে যেটিকে সবাই স্বীকার করে, সেদিকে অগ্রসর হওয়ার একমাত্র উপায় এ পদক্ষেপ। আর এ সমাধান হলো, ইসরায়েলের পাশে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের উপস্থিতি।

কী পরিবর্তন আসতে পারে : ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিলে বাস্তবিক অর্থে, খুব বড় পরিবর্তন আসে না। তবে ফিলিস্তিনকে আরো বেশি স্বীকৃতি দেয়ার পথে যে কোনো আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে কোনো সমঝোতার টেবিল বা সম্মেলনে বাড়তি কূটনৈতিক প্রভাব রাখার সুযোগ করে দেয়। এমনকি ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মতো দ্বিপক্ষীয় কোনো চুক্তিতে পৌঁছার সক্ষমতা দেয় আন্তর্জাতিক এমন স্বীকৃতি।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ২০১২ সাল থেকে ‘অসদস্য পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের’ মর্যাদা পেয়ে আসছে ফিলিস্তিন। এতে পরিষদে নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপন করার সুযোগ পেয়ে আসছেন ফিলিস্তিনের প্রতিনিধিরা। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সদস্যপদ নিশ্চিত করেছে ফিলিস্তিন। এর আগে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ তার ভূখণ্ডে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ এ আদালতের এখতিয়ার মেনে নেয়।

তবে আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থায় ফিলিস্তিনের প্রবেশাধিকার এখনো সীমিত। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজারে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) প্রবেশাধিকার নেই। যার অর্থ, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের বাজেটে ঘাটতি দেখা দিলে ইসরায়েলের মধ্য দিয়ে কোনো চ্যানেলে সহায়তা আসতে হবে। নইলে এ ঘাটতি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকেই মেটাতে হবে। এদিকে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস-শাসিত গাজা পুরোপুরি বাইরের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।

ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অস্তিত্ব নির্ধারণ করতে পারে শুধু একটি দেশ- ইসরায়েল। কেননা এটি ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখলকারী শক্তি। ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানকারী আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে, স্পেন ও জাতিসংঘের আরো ১৪৩টি দেশের আশা, ইসরায়েলের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ ১৯৯০-এর দশকের অসলো চুক্তির প্রতিশ্রæতি পূরণে দেশটিকে বাধ্য করতে পারে। এ চুক্তিতে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধানে সম্মত হয় ইসরায়েল।

রাফায় লড়াইয়ে তিন ইসরায়েলি সেনা নিহত : গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় নগরী রাফায় হামাসের বিরুদ্ধে চলমান লড়াইয়ে মঙ্গলবার রাতে তিন ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছে। তারা রাফার একটি ভবনে প্রবেশ করলে সেখানে আগে থেকেই পেতে রাখা বিস্ফোরকের বিস্ফোরণে মারা যায়। বিস্ফোরণে আরো তিন ইসরায়েলি সেনা গুরুতর আহত হয়েছেন বলে গতকাল বুধবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী।

তিন সপ্তাহ আগে গাজার মিসর সীমান্তবর্তী নগরী রাফায় অভিযান শুরু করে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। মঙ্গলবার নিহত তিন সেনা সদস্য হলেন- সার্জেন্ট আমির গ্যালিলভ (২০), সার্জেন্ট উরি বার ওর (২১) এবং সার্জেন্ট আইদো অ্যাপেল (২১)। তারা সবাই নাহাল ব্রিগেডের ৫০তম ব্যাটালিয়নের সদস্য ছিলেন। এই তিনজনের মৃত্যুতে গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধে ২৯১ ইসরায়েলি সেনার প্রাণ গেল।

আইডিএফ তাদের প্রাথমিক তদন্তে জানিয়েছে, ‘ববি ট্র্যাপের’ মাধ্যমে রাফার ওই ভবনে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। বিস্ফোরণে একজন সেনা কর্মকর্তা এবং দুই সৈন্য গুরুতর জখম হওয়া ছাড়াও অন্য একজন সেনা কর্মকর্তা মাঝারি আহত হয়েছেন। একই দিন উত্তর গাজায় যুদ্ধ করার সময় ইসরায়েলের আরো এক সেনা কর্মকর্তা এবং সৈন্য গুরুতর আহত হন। এদিন ভোরে মাল্টি-ডোমেইন ইউনিটের আরেক সেনা সদস্য গুরুতর আহত হন।

ইসরায়েলি জিম্মিদের নতুন ভিডিও প্রকাশ : ইসরায়েলি জিম্মিদের একটি নতুন ফুটেজ প্রকাশ করেছে ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ গোষ্ঠী ইসলামিক জিহাদ। গত মঙ্গলবার প্রকাশিত ওই ভিডিওতে ২৮ বছর বয়সি ইসরায়েলি জিম্মি আলেকজান্ডার ট্রুফানোভকে দেখা গেছে। ৭ অক্টোবর তাকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়।

গাজার সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও একই ধরনের ভিডিও প্রকাশ করেছে। ইসরায়েল সেগুলোকে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। ট্রুফানোভের পরিবার প্রকাশিত একটি ভিডিওতে তার মা বলেছেন, ছেলেকে দেখে তিনি খুশি হয়েছেন। তবে এত দিন ধরে ছেলের জিম্মি থাকা একটি ‘হৃদয়বিদারক’।

গাজায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় ৭ অক্টোবর হামাসের হাতে জিম্মি হওয়া ১২০ জনেরও বেশি ইসরায়েলিকে মুক্ত করার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এজন্য উভয় পক্ষই একে অপরকে দায়ী করেছে। ইসরায়েল বলেছে, হামাসের যে দাবি তা তারা মেনে নিতে পারে না। অন্যদিকে, ইসরায়েলি কারাগারে বন্দি ফিলিস্তিনিদের মুক্তি চায় ফিলিস্তিনিরা।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App