×

প্রথম পাতা

ঘূর্ণিঝড় রেমালের ছোবল

রেমালের তাণ্ডবে ফের ঢাল হয়ে লড়াই করল সুন্দরবন

Icon

প্রকাশ: ২৯ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

রেমালের তাণ্ডবে ফের ঢাল  হয়ে লড়াই করল সুন্দরবন

কাগজ প্রতিবেদক : প্রবল ঘূর্ণিঝড় রেমালের তাণ্ডব থেকে এবারো উপকূলের জনপদকে রক্ষা করেছে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন। এতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কম হয়েছে। তবে বনের বিভিন্ন স্থানে প্রাণ-প্রকৃতির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় থেমে যাওয়ার পর সুন্দরবনে সেই ক্ষত এখন স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।

মূলত রেমালের আঘাত, ভারি বৃষ্টিপাত ও জলোচ্ছ¡াসে প্রায় ৩০ ঘণ্টা পানিতে নিমজ্জিত ছিল সুন্দরবন। রেমালের তাণ্ডবে সুন্দরবনের গাছপালা, বন স্টেশন ক্ষতির পাশাপাশি হরিণ, বানর, বাঘসহ বেশ কিছু প্রাণী মারা গেছে। গতকাল মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত সুন্দরবন এলাকা থেকে ২৬টি মৃত এবং ১৭টি জীবিত হরিণ উদ্ধার করেছে বন বিভাগের কর্মীরা।

জানা গেছে, পূর্ব মধ্য বঙ্গোপসাগর ও পশ্চিমবঙ্গের সাগরদ্বীপে সৃষ্ট লঘুচাপ থেকে ঘূর্ণিঝড় রেমালের উৎপত্তি। গভীর নি¤œচাপ থেকে এটি গত শনিবার সন্ধ্যায় ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়। প্রবল শক্তি বাড়িয়ে রবিবার সকালে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়। এরপর ধেয়ে আসে উপকূলের দিকে। এর প্রভাবে প্লাবিত হতে থাকে বাংলাদেশ অংশে ছয় হাজারের বেশি বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিশ্ব ঐতিহ্যের সুন্দরবন। সন্ধ্যার মধ্যেই বনটি ডুবে যায়।

তবে বরাবরের মতো উপকূলবাসীকে রক্ষায় এবারো ঢাল হয়ে দাঁড়ায় সুন্দরবন। ঘূর্ণিঝড়ের প্রচণ্ড বাতাসকে ঠেকিয়ে রাখে বন। এতে ঝড় কিছুটা দুর্বল হয়। এ কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে কম হয়েছে বলে মনে করেন খুলনা আবহাওয়া অফিসের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ আমিরুল আজাদ। তিনি বলেন, ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের যে বাতাসের বেগ, সেটি ছিল ৯০ থেকে ১২০ কিলোমিটার। এটি যখন উপকূলে আঘাত হানে তখন উপকূল এলাকায় ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত বাতাসের বেগ ছিল। ঝড়গুলো যে বেগে আসে, সেই তুলনায় ভূমিতে কম বেগে প্রবেশ করে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, এটা অতিক্রম করে সুন্দরবনের পাশ দিয়ে। সুন্দরবন এলাকায় এটা যখন প্রথমে ওঠে তখন দেখা যায়, বাতাসের যে সর্বোচ্চ গতি থাকে সেটা কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়। পরে সামনে আগালেও সে গতিটা থাকে না।

খুলনার সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ু নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ক্লাইমেট মুভমেন্টের সমন্বয়ক শর্মিলা সরকার বলেন, সুন্দরবন যেন উপকূল এলাকায় প্রকৃতির দেয়াল। বাংলাদেশে ঝড় প্রবেশের মুখেই সুন্দরবনের অবস্থন। এ কারণে ঝড় প্রবেশ করতেই বনে বাধার সম্মুখীন হয়। এতে বনের গাছপালা ও বন্যপ্রাণীর ক্ষতি হলেও লোকালয়ে বড় দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে।

খুলনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ননী গোপাল মণ্ডল বলেন, ভৌগোলিকভাবে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলার জনপদ ও বঙ্গোপসাগরের মাঝখানে সুন্দরবনের অবস্থান। গাছপালা আচ্ছাদিত সুন্দরবনের কারণে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা কম টের পেয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূল ও বঙ্গোপসাগর তৎসংলগ্ন এলাকার মানুষ। রেমাল উপকূলে আঘাত হানার সময় জলোচ্ছ¡াসের পানির উঁচু চাপও ঠেকিয়েছে এ বন।

তিনি বলেন, ঝড়ের সময়ে সুন্দরবন নিজে লড়াই করে ক্ষতবিক্ষত হলেও উপকূলের তেমন ক্ষতি হতে দেয় না। তবে ঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট উঁচু জোয়ার, জলোচ্ছ¡াসের কারণে সুন্দরবনের হরিণ, বানর, রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর প্রাণহানির শঙ্কা রয়েছে। এছাড়া মিঠাপানির পুকুর তলিয়ে যাওয়ার কারণে বনের প্রাণিকূল ও বনকর্মীদের বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট তৈরি হতে পারে।

ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাবে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) মিহির কুমার দে। তিনি বলেন, বনের অভ্যন্তরে ২৫টি টহল ফাঁড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া উঁচু জোয়ারে বিস্তীর্ণ বনভূমি প্লাবিত হয়েছে। সাগরের নোনাপানিতে বনভূমির সঙ্গে তলিয়ে গেছে ৮০টি মিঠাপানির পুকুর। সেখান থেকে বনের প্রাণী ও বনজীবীরা খাবার পানি পেতেন। এতে বনে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট তৈরি হবে।

বন সংরক্ষক বলেন, অধিক উচ্চতার জলোছ¡াসে হরিণ ভেসে গিয়ে মারা যাওয়ার খবরও মিলেছে। পাশাপাশি আরো বন্যপ্রাণীর মৃত্যু ও ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এখন ঘূর্ণিঝড়ে হওয়া ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের চেষ্টা করা হচ্ছে।

সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী ও প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির বলেন, সুন্দরবনের গাছপালার কারণে ঝড়ের পুরো ধাক্কাটা টের পাননি সুন্দরবনসংলগ্ন লোকালয়ের বাসিন্দারা। ৫ থেকে ৭ ফুট উঁচু জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে গোটা সুন্দরবন।

সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীদের জন্য পর্যাপ্ত উঁচু টিলা ও শেল্টার রাখা জরুরি। তাহলে এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব। মিঠাপানির পুকুরের পাড় অনেক উঁচু করতে হবে যাতে বন্যার পানি সেখানে প্রবেশ করতে না পারে।

করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাওলাদার আজাদ কবির বলেন, ঘূর্ণিঝড় রেমালের তাণ্ডবে এখানকার পর্যটক চলাচলের কাঠের পোল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অসংখ্য গাছপালা ভেঙেছে। তবে পুরো সুন্দরবনের গাছপালাসহ কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা নিশ্চিত করে এখনই বলা সম্ভব নয়।

উল্লেখ্য, ২০০৯ সালে ১২০ কিলোমিটার গতির ঘূর্ণিঝড় আইলা ও ২০০৭ সালে ২৬০ কিলোমিটার গতির ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় সিডরের তাণ্ডবেও বুক পেতে দিয়েছিল বাংলাদেশের ফুসফুস বা হৃৎপিণ্ডখ্যাত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সুন্দরবন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App