×

প্রথম পাতা

অপরিকল্পিত নগরায়ণে বারবার জলাবদ্ধ ঢাকা

Icon

প্রকাশ: ২৮ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

অপরিকল্পিত নগরায়ণে  বারবার জলাবদ্ধ ঢাকা

মুহাম্মদ রুহুল আমিন : ঘূর্ণিঝড় রেমালের প্রভাব পড়েছে রাজধানীতে। কয়েকদিনে তীব্র গরমের পর গতকাল সোমবার সকাল থেকে শুরু হয় একটানা বৃষ্টি। অবশ্য রবিবার রাত থেকেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়তে শুরু করে বিভিন্ন এলাকায়। কখনো তা বেড়েছে, কখনো কমেছে।

গতকাল সকাল থেকে শুরু হয় টানা বৃষ্টি। এর সঙ্গে ছিল ঝড়ো হাওয়া। আবহাওয়া অধিদপ্তরের মতে সকাল ৬টায় ঢাকায় বাতাসের গতিবেগ ছিল ৫৯ কিলোমিটার। ভোর থেকে ঢাকায় ৩৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। নগরীজুড়ে শুরু হয় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন কর্মস্থলে যাওয়া ও খেটে খাওয়া মানুষ। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গাছ ভেঙে পড়ে। সেই সঙ্গে দিনভর ছিল যানবাহন সংকট, যাত্রীদের ভাড়াও গুনতে হয়েছে দ্বিগুণ। এই চিত্র শুধু একদিনের নয়। বছরের পর বছর এই সমস্যা ভুগতে হয় নগরবাসীকে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এজন্য কাজও করে অনেক। তাদের কাজে অগ্রাধিকারের মধ্যে থাকে নগরবাসীকে জলাবদ্ধমুক্ত নগরী উপহার দেয়া। এজন্য প্রতি বছর বাজেটে মোটা অঙ্কের টাকা বরাদ্দও রাখেন দুই মেয়র। লোকবলও নিয়োগ দেন। বেশকিছু কাজও করেন তারা। মেয়ররা এও বলেন- ঢাকায় আর জলাবদ্ধতা তৈরি হবে না। কিন্তু সামান্য বৃষ্টি হলেই ঢাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়।

জানতে চাইলে রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলাম ভোরের কাগজকে বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ন হচ্ছে মূল কারণ। ঢাকা শহরের আয়তন এখন যা আছে, আগেও তা ছিল। আগে বৃষ্টি হতো, কিন্তু জলাবদ্ধতা হতো না। এখন বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা হয়। আগে জলাবদ্ধতা না হওয়ার মূল কারণ বৃষ্টির বেশির ভাগ পানি মাটি শোষণ করে নিত। নগরীতে খেলার মাঠ ছিল। আগে এক বিঘা জমিতে বাড়ি করলে দুই-তৃতীয়াংশ জায়গায় ভবন নির্মাণ করা হতো আর এক-তৃতীয়াংশ জায়গা সবুজ থাকত। সেখানে পানি যেত। এখন পুরো জমিই কংক্রিটে আচ্ছাদিত। এক ইঞ্চি জায়গাও ফাঁকা রাখা হয় না।

তিনি বলেন, ঢাকায় সব কৃষি জমি এখন ভরাট হয়ে গেছে। ফলে বৃষ্টির পানি এখন আর মাটি দ্বারা শোষণ হচ্ছে না। আন্ডারগ্রাউন্ডেও যাচ্ছে না। সব পানি এখন ড্রেনেজ সিস্টেমে যাচ্ছে। টানা বৃষ্টি হলে একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ড্রেনেজে আর পানি সহজে সরে না। কারণ যে পরিমাণ বৃষ্টির পানি আসছে, আমাদের ড্রেনেজ ক্যাপাসিটি তার থেকে অপ্রতুল। পানি সরতে সময় লাগে কয়েক ঘণ্টা। এজন্য ড্রেনেজ ক্যাপাসিটি বাড়াতে হবে। কিন্তু

ঢাকার যা অবস্থা কোনো কোনো রাস্তায় ড্রেনেজ ক্যাপাসিটি বাড়ানাই সম্ভব নয়। কারণ রাস্তা আছে ৮ ফুট। পানিটা যাবে কোন দিক দিয়ে। ফলে চাপটা ড্রেনেজের ওপরই পড়ছে। সেজন্য পানি নামতে অনেক সময় লাগে।

তিনি আরো বলেন, আগে ঢাকা শহরে এলাকাভিত্তিক পুকুর ছিল। এই পুকুরগুলো বৃষ্টির পানি ধারণ করত। ফলে ধীরে ধীর প্রাকৃতিকভাবেই পানি সরে যেত। সেই পুকুরগুলো এখন আর নেই, সব ভরাট হয়ে গেছে। তাই বৃষ্টি হলেই সেই পানি ড্রেনেজ সিস্টেমে যাচ্ছে। পানি সাময়িক সময় ধারণ করার ক্যাপাসিটি নেই। এজন্য যা করতে হবে তা হলো- নগরীতে ২২০টা পুকুর আছে। এগুলো দখলমুক্ত ও পুনর্খনন করতে হবে, যেন বৃষ্টি হলেই পানিটা পুকুরে চলে যায়। উদাহরণস্বরূপ তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়র শহীদুল্লাহ হলের আশপাশে বৃষ্টির পানি জমে না। কারণ ওই এলাকার পানি পুকুরে চলে যায়। ধানমন্ডি লেকের কারণে ওই এলাকায় এখন আর তেমন পানি জমে না। এসব না করলে ড্রেন আর খাল পরিষ্কার করে সমস্যা একেবারেই সমাধান হবে না।

নগরবিদ ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ঢাকার জলাবদ্ধতার মূল কারণ যদি বলতে যাই, তাহলে সেটা হলো ঢাকার উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ বলতে কিছু নেই। আরবান গভর্ননেন্স আর উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ- এই দুটি যদি না থাকে, তাহলে যতই খাল উদ্ধার আর খালের ময়লা পরিষ্কার করা হোক না কেন, তাতে কাজ হবে না। ঢাকায় দেদারসে ভবন হচ্ছে, খাল দখল করে রাস্তা হচ্ছে। নগরীর ধারণক্ষমতার তুলনায় ভবন ও মানুষের সংখ্যা ৩ থেকে ৪ গুণ হয়ে গেছে। এখনো ঢাকা ঘিরে উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের কোনো প্রচেষ্টা নেই। মনে হচ্ছে এই ঢাকাটা সারা বাংলাদেশকে ধারণ করবে। এটা করতে গেলে তো এরকমই হবে।

তিনি আরো বলেন, যে পরিমাণ সবুজ এলাকা দরকার, তা নেই। তাহলে পানিধারণ করে আন্ডারগ্রাউন্ডে যাবে কীভাবে? সেখানে গত কয়েক বছরে যা ওয়াটার বডি ছিল, সেগুলোও সরকার ভরাট করেছে। যেমন- হাতিরঝিলে একটা অংশ, বিমানবন্দর এলাকার একটা অংশও ভরাট করা হয়েছে। বিএডিসিও জায়গা ভরাট করেছে। অর্থাৎ কেউ কোনো উন্নয়ন করতে গেলেই সবার আগে খাল ভরাট করে। তিনি বলেন, সবুজ এলাকা কিছুটা হলেও পানি আন্ডারগ্রাউন্ডে পাঠায়, সেখানেও কংক্রিট হয়ে যাচ্ছে। তাহলে এত কংক্রিট হলে, সবুজ এলাকা না থাকলে তো ঢাকা ডুববেই।

ড. আদিল বলেন, মেয়ররা প্রতি বছর বলেন আগামী বর্ষায় ঢাকা ডুববে না। এই কথাটা তাদের বলা উচিত নয়। এই পুরো ঢাকার দায়ভার তাদের কাঁধে আর নেয়া উচিত নয়। তাদের বলা উচিত, ঢাকার পরিকল্পনা আর উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ সবার আগে করতে হবে। তাহলেই সম্ভব।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App