×

প্রথম পাতা

কালীগঞ্জের গডফাদার আনার

Icon

ইমরান রহমান, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) থেকে

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কালীগঞ্জের গডফাদার আনার

আনোয়ারুল আজীম আনার

ঝিনাইদহ-৪ আসন কালীগঞ্জ উপজেলা ও সদর থানার আংশিক এলাকা নিয়ে গঠিত। এই নির্বাচনী এলাকার উপর দিয়েই গেছে যশোর ও চুয়াডাঙ্গা মহাসড়ক। যেটি দেশের চোরাকারবারিদের অন্যতম নিরাপদ রুট হিসেবে পরিচিত। এর নেপথ্য নায়কদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ভারতের কলকাতায় নির্মমভাবে খুন হওয়া ঝিনাইদহ-৪ আসনের এমপি আনোয়ারুল আজীম আনার। আনোয়ারুল আজীম পর পর তিনবার এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সেই কারণে অনেকের কাছেই তিনি একজন জনপ্রিয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত। কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠে এই সৌম্যদর্শন মানুষটিই ছিলেন অপরাধ জগতের এক ভয়ংকর গডফাদার। পর্দার আড়ালে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রতিপক্ষের ওপর তার নিষ্ঠুর নির্যাতন, চোরাচালানের নিয়ন্ত্রণ, মদ ও নারী আসক্তিসহ সামাজিক নানা অপকর্ম ছিল ওপেন সিক্রেট। অন্ধকার জগতে আনোয়ারুল আজীমের স্বরূপ ছিল সিনেমার খলনায়কের চেয়েও বীভৎস।

তিন দশকের বেশি সময় ধরে চলতে থাকা আনারের চোরাচালান সম্পৃক্ততা বিষয়ে সবাই জানলেও ভয়ে কেউ এ নিয়ে কোনো কথা বলতেন না। তবে ভোটের রাজনীতি ঠিক রাখতে প্রটোকল ছাড়াই চলাফেরা করতেন আনার। অংশ নিতেন প্রায় সব জানাজায় ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে। বাইরের এই গণমুখী আবরণের বিপরীতে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে হত্যা করাতেও পিছ পা হতেন না তিনি। মতের অমিল হলেই ৭-১০ জনের টিম পাঠিয়ে হত্যা করাতেন। আসামি গ্রেপ্তার হলে তাদের জামিন করাতে কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করতেন।

অনেককে গুলি করিয়েছেন; আবার অনেকের ওপর হামলা করিয়েছেন। শুধু হামলা হত্যা নয়- সম্পত্তি লুট করতেও পটু ছিলেন এমপি আনার। হুট করে ধনি হয়ে যাওয়া লোকদের বিরুদ্ধে মামলা করিয়ে সেই মামলা নিষ্পত্তির কথা বলে সম্পত্তি লিখে নিতেন। নামে-বেনামে তার অঢেল সম্পত্তি থাকলেও নিজের নামে তেমন সম্পত্তি করতেন না। তার রোষানলে পড়ে সম্পত্তি হারিয়েছে অনেক সংখ্যালঘুও। কিন্তু ভয়ে কেউ কখনো মুখ খোলেনি। অনেকে এখনো ভয়ে মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, উপজেলা চেয়ারম্যান থাকার সময় চোরাচালানের বিরোধে সাইফুলসহ বেশ কয়েকজনকে হত্যা করলেও অদৃশ্য শক্তির ছায়ায় বেঁচে যান নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দেয়া এমপি আনার। ২০১৪ সালে এমপি হওয়ার পর আগের সব মামলা থেকে অব্যাহতি নেন। এরপর নিজের রাজনৈতিক মাঠ ঠিক রাখতে ও নিজের অনুসারীদের জনপ্রতিনিধি বানাতে আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনের বেশ কয়েকজন নেতাকে হত্যা করান। পুলিশের সহযোগিতায় ভিন্ন মতাদর্শের অনেককেই ক্রসফায়ার দেয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। পাশাপাশি মিথ্যা মামলা দিয়ে ফাঁসানও ছিল রুটিন ওয়ার্ক। তার ভয়ে কালীগঞ্জ ছেড়ে পালিয়েছে অনেকে। প্রাণভয়ে বিচারও চায় না কেউ। এলাকাবাসী বলছেন, কালীগঞ্জের যমদূত ছিলেন এমপি আনার।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১৫ বছরে এমপি আনারের ছত্রছায়ায় ১০টিরও বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। যাদের হত্যা করা হয়েছে, তাদের বেশির ভাগ ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল মান্নানের অনুসারী ছিলেন অথবা এমপি আনারের অবাধ্য ছিলেন। পুলিশও বলছে, এই এলাকাটি অনেক আগে থেকেই হত্যাকাণ্ড, আত্মহত্যা ও সড়ক দুর্ঘটনা প্রবণ। ছোট বিষয় নিয়ে প্রতিপক্ষকে হত্যা করা এখানে কালচারে পরিণত হয়েছে।

এই প্রতিবেদক গতকাল শনিবার ৮ জন ভিকটিমের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন। এর মধ্যে ৪ জন জীবনের নিরাপত্তার কথা ভেবে কোনো কথাই বলেননি। একজনের পরিবার বাড়ি ছাড়া। আরেকজন মিথ্যা মামলার হয়রানিতে তিক্ত হয়ে নিজের পৈতৃক ভিটা বিক্রি করে ভাড়াবাসায় থাকছেন। আরেকজনের স্বজনরা প্রাণভয়ে হত্যা মামলার মীমাংসা করে নিয়েছেন। হত্যার বিচার চেয়ে সোচ্চার রয়েছেন শুধু কালীগঞ্জের কাশিপুর এলাকার বাসিন্দা হত্যাকাণ্ডের শিকার ৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. আরিফুল ইসলামের স্ত্রী রেশমা লস্কর। গতকাল সকালে তার বাড়িতে গিয়ে কথা বলেন এই প্রতিবেদক।

আরিফুল ইসলামের স্ত্রী রেশমা লস্কর ভোরের কাগজকে বলেন, আমার স্বামী আরিফুল ইসলাম রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই এখানকার সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল মান্নানের সঙ্গে থাকতেন। বিষয়টি ভালোভাবে দেখতেন না কলকাতায় হত্যাকাণ্ডের শিকার এমপি আনার। বহুবার বিভিন্ন হুমকি দিয়েছেন; কিন্তু আমার স্বামী তার কথা শোনেননি। এর পরিণাম হিসেবে কোনো শত্রæতা ছাড়াই ২০২২ সালের ২৯ নভেম্বর আমাদের বাড়ির সামনে ৭ জন লোক পাঠান। তারা কোনো কথা না বলেই আমার স্বামীকে রড দিয়ে পিটাতে থাকে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপায়। আমাদের ঘর ভাঙচুর করে আমার ওপরও হামলা চালানো হয়। যারা হামলায় অংশ নেয় তারা হলো- খলিলুর রহমান, আশিকুর রহমান, মেহেদী হাসান, মকলেচুর রহমান, আশা, রানা ও মফিজ। এরা প্রত্যেকেই এমপি আনারের ঘনিষ্ঠ ছিল। এদের প্রত্যেককে জামিন পেতে সহযোগিতা করেছিলেন আনার।

এমনকি জনসভায় নিজের ভাষণে এই ৭ জনের নাম উল্লেখ করে বলেছিলেন, আমার ছেলেগুলো নির্দোষ। ওদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। এরপর আর বুঝতে বাকি থাকে না- কে আমার স্বামীকে হত্যা করিয়েছে। কারণ হত্যায় অংশ নেয়া কারো সঙ্গে আমার স্বামীর কোনো বিরোধ ছিল না। এক প্রশ্নের জবাবে রেশমা লস্কর আরো বলেন, এখনো মামলা টিকিয়ে রাখতে পেরেছি, এটাই অনেক। আশা করি, আমার স্বামীর হত্যার সঠিক বিচার আমি পাব। আর যিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন- তাকে মামলার আসামি করতে পারিনি। তবে তার করুণ পরিণতি দেশবাসী দেখেছে।

আরিফুল ইসলামের কিশোর বয়সি ছেলে তাসিনুর রহমান বলে, ‘আমার চোখের সামনে আমার বাবাকে মেরে ফেলা হইছে। যারা আমাকে এতিম করেছে তাদের যেন বিচার হয়।’

২০১৫ সালে জানুয়ারিতে কালীগঞ্জে পৌর অডিটোরিয়ামে আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভা চলাকালে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয় আনন্দ মোহন নামে কালীগঞ্জের কোলা ইউনিয়নের সাবেক ১ নম্বর ওয়ার্ডের (বর্তমানে ৩ নম্বর ওয়ার্ড) মেম্বারকে। তিনি তখনকার সময়ের কোলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতিও ছিলেন। এ ঘটনায় আরো কয়েকজন আহত ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। তবে, এলাকাবাসী জানান, এমপি আনারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দুবার চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করায় আগেই টার্গেটে ছিলেন আনন্দ মোহন। পরিকল্পিতভাবেই তাকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় হত্যা মামলা হলেও এমপি আনারের হস্তক্ষেপে মনগড়া তদন্ত প্রতিবেদন দেয় তদন্তকারী সংস্থা। এতে হতাশ হয়ে এমপি আনার যে কোনো কিছু করতে পারে ভেবে মীমাংসা করে ফেলে পরিবারের সদস্যরা।

আনন্দ মোহনের ছোট ভাই কোলা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান মেম্বার সুজন ঘোষ বলেন, এটা নিয়ে আমরা জলঘোলা করতে চাই না। যা হওয়ার হয়ে গেছে। কারো বিরুদ্ধে আমরা অভিযোগ করতে চাই না। আমরা নিরাপদে বাঁচতে চাই। নিহতের ছোট বোন রূপা ঘোষ বলেন, এটি নিয়ে আমরা কোনো কথাই বলতে চাই না। আর এত বছর পর কি বা বলার থাকতে পারে। তার চোখেমুখের আতঙ্কের ছাপ ও দীর্ঘশ্বাসই বলে দেয়- ভাই হত্যার বিচার না পাওয়ার আক্ষেপ কতটা হতে পারে।

গত বছরের ৮ জুলাই কালীগঞ্জে শহরের ফয়লা গ্রামে খুন হন মেহেদী হাসান। প্রতিবেশী দুই মাদকাসক্ত ভাই আকরাম ও সাদ্দাম তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে। এ ঘটনায় তারা গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান। আকরাম ও সাদ্দাম এমপি আনারের অনুসারী হওয়ায় মেহেদীর পরিবারের ওপর নিয়মিত আসতে থাকে হুমকি ধমকি। একপর্যায়ে খুনি এক ভাইকে জামিন করিয়েও আনেন এমপি আনার। এতে ভীত হয়ে বাড়ি ভাড়া দিয়ে অন্যত্র চলে যায় পরিবারটি। মেহেদীর প্রতিবেশীরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব কথা বলেন। পরে মেহেদীর মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

মিথ্যা মামলায় হয়রানির শিকার অমিত শিকদার বিশু ভোরের কাগজকে বলেন, আমি ২০০২ সালে কালীগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক, ২০০৯ সালে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বর্তমানে শ্রমিক লীগের উপজেলা কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও প্রস্তাবিত কালীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক। এক সময় এমপি আনারের রাজনীতি করতাম। কিন্তু ৫ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হওয়া নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত। তার পছন্দের প্রার্থীকে জেতাতে নোংরামি শুরু করেন। ২০১৬ সালে আমাকে থানায় নিয়ে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করে রাজজনীতি থেকে চিরতরে অবসর নিতে বলা হয়। আমি তার কথা না শোনায় মাদক মামলায় ফাঁসানো হয়। ২০১৮ সালে মামলা থেকে খালাস পেয়ে আমি ঝিনাইদহ চিফ জুডিশিয়াল কোর্টে আমাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর ঘটনা তদন্ত ও দোষীদের শাস্তি চেয়ে আবেদন করি। আদালত ঝিনাইদহের এসপিকে তদন্তের নির্দেশ দেন। ওই তদন্তে জেলা পুলিশ অভিযোগের সত্যতা পায়।

২০১৯ সালে আবারো আমাকে বাসা থেকে গ্রেপ্তার করিয়ে নিয়ে ফেনসিডিল পাচার ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে পৃথক দুটি মাামলা করা হয়। এ ঘটনার পরও আমার মা খুলনা ডিআইজি বরাবর ঘটনা তদন্তের আবেদন করেন। পরেরবার যখন গ্রেপ্তার করানো হয়- পুলিশ আমাকে ক্রসফায়ারে দিতে চেয়েছিল। ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছি। কালীগঞ্জ শহরের আমার পৈতৃক ভিটা বিক্রি করে ভাড়াবাসায় থাকছি। এখনো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগি। এমপি নির্মমভাবে মারা গেছেন, তার লাঠিয়াল বাহিনী, সাঙ্গপাঙ্গরাতো এখনো রয়েছে। তারা যে কোনো সময় আমার ক্ষতি করতে পারে।

এমপি আনারের ভাগ্নে মিন্টুর একটি অডিও রেকর্ড পেয়েছে ভোরের কাগজ। সেখানে তিনি ভিকটিম বিশুকে ফোনে বিলাপ করতে করতে বলছেন, ‘ও বিশুরে বিশু- মামা আর নেই। তোর আর কোনো অসুবিধা হবে নারে বন্ধু। এ কেমন রাজনীতিতে পড়ল মামা। তোর আর কিছু লেখা (ফেসবুকে) লাগবিনেনে। লিখলেও অসুবিধে হবিনেনে।’ এক ইউপি চেয়ারম্যানকে লোকজন দিয়ে বেধড়ক পিটিয়েছিলেন এমপি আনার। ভোরের কাগজের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় ওই চেয়ারম্যানের সঙ্গে। পরিচয় জানার পর তিনি বলেন, দয়া করে আমার নাম নিউজে কোথাও উল্লেখ করবেন না। কারণ লোকটি মারা গেছে। আমি ক্ষোভ ভুলে গেছি। এখন চাই, তার লাশের একাংশ হলেও উদ্ধার হোক। মৃত মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে কি হবে? কালীগঞ্জে এমপি আনারের হাতে নির্যাতনের শিকার অন্যদের অবস্থাও হয়তো একইরকম।

টাইমলাইন: ভারতে এমপি আজিম হত্যাকাণ্ড

আরো পড়ুন

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App