×

প্রথম পাতা

একই চক্র আগেও দুইবার হত্যার ছক কষে ব্যর্থ হয়

Icon

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

একই চক্র আগেও দুইবার হত্যার ছক কষে ব্যর্থ হয়

ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনারকে এর আগে আরো দুইবার হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেশে এবং গত জানুয়ারিতে কলকাতায় তাকে খুনের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। তখন ব্যর্থ হলেও তৃতীয় দফায় তারা সফল হয়। কলকাতা সিআইডির হেফাজতে রিমান্ডে থাকা কসাই জিহাদকে নিয়ে খণ্ড লাশের খুঁজে অভিযান চলছে। আর ঢাকায় ডিবি হেফাজতে রিমান্ডে থাকা এক তরুণীসহ তিনজন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই কথা বলছে। তারা তদন্তে সহায়ক নতুন কোনো তথ্য দেয়নি। মাস্টারমাইন্ড আখতারুজ্জামান শাহিন সব জানে বলে দাবি করছে তারা। সর্বহারা নেতা শিমুল ভূঁইয়া খুবই চতুরতার সঙ্গে ডিবির প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে। কলকাতা সিআইডি পুলিশের চার সদস্যকে লাশের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেয়নি ঢাকায় ডিবি হেফাজতে রিমান্ডে থাকা সৈয়দ আমানুল্যা আমান ওরফে শিমুল ভূঁইয়া, ফয়সাল আলী সাজী ওরফে

তানভীর ভূঁইয়া ও সেলেস্টি রহমান। জিহাদের দেয়া তথ্যে টুকরো লাশের খোঁজে গতকাল শনিবার সকালে কলকাতার কৃষ্ণমাটি এলাকায় বগজোলা খালে জাল ফেলে তল্লাশি করে সিআইডি। নামানো হয় চারজন ডুবুরি। সিআইডি জানতে পেরেছে আনারকে হত্যা ও তার মরদেহ টুকরো টুকরো করার পর সেটির পাশে বসেই খাবার ও মদ খায় হত্যাকারীরা। হত্যার পর আনারের মরদেহ ফ্ল্যাটের বাথরুমে নেয়া হয়। সেখানেই বসে টুকরো টুকরো করে জিহাদ। সেখানে সে হেরোইন সেবন করে। বাথরুমে যেন হত্যার কোনো আলামত না থাকে সেজন্য কয়েকবার পানি এবং ডিটারজেন্ট ব্যবহার করে এটি পরিষ্কার করা হয়। এছাড়া রক্তের যেসব ছোপ ছোপ দাগ রুমে লেগেছিল সেগুলো মুছে ফেলতে পুরো ফ্ল্যাটটি পরিষ্কার করা হয়।

কলকাতা সিআইডি জানিয়েছে, আনারের মরদেহের বড় বড় হাড্ডি এবং মাথার খুলি টুকরো করার জন্য চাপাতির মতো কোনো কিছু ব্যবহার করা হয়। লাশ ৮০ টুকরো করা হয়। মরদেহটি টুকরো করে জিহাদ হাওলাদার নামের পেশাদার কসাই। এজন্য তাকে ৫ হাজার রুপি দেয়া হয়েছে। জিহাদের বাড়ি বাংলাদেশের খুলনায়। সে ভারতের মুম্বাইয়ে অবৈধভাবে থাকত। হত্যার দুই মাস আগে তাকে কলকাতার নিউ টাউনে নিয়ে আসা হয়। সফলভাবে হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন করার পর কসাই জিহাদ মুম্বাই অথবা বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু তার অন্য সহযোগীরা পারলেও সে পালাতে পারেনি।

গতকাল শনিবার স্থানীয় সময় দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার পোলেরহাট থানার কৃষ্ণমাটির বাগজোলা খালে তল্লাশি শুরু করে সিআইডি। খালে জাল ফেলে ও নৌকা দিয়ে চলে এই তল্লাশি অভিযান। কিন্তু শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সন্ধান মেলেনি নিহত এমপির দেহাংশের। সিআইডির সঙ্গে এবার মাঠে নেমেছে স্থানীয় ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট গ্রুপ। খালে তল্লাশি শেষে জিহাদকে নিয়ে তাদের সঞ্জীবা আবাসনের বিইউ সিক্সটি ফোর ফ্ল্যাটে নিয়ে যাওয়া হয়।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেছেন, সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনারকে তিনবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। এমনকি কলকাতায় গত জানুয়ারি মাসেও একবার হত্যার পরিকল্পনা সাজায় শাহিন ও আমানুল্ল্যা ওরফে শিমুল। কিন্তু সেবার তাদের পাতা ফাঁদে পা না দেয়ায় বেঁচে যান সংসদ সদস্য আনার। গত ১৩ মে শহিনের ফাঁদে পা দেয়ার পর আনারকে জিম্মি করে আপত্তিকর ছবি ব্যবহার করে বাংলাদেশ ও কলকাতার বন্ধুদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায়ের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু তার ওপর অতিরিক্ত চেতনানাশক (ক্লোরোফর্ম) প্রয়োগ করার কারণে জ্ঞান না ফেরায় হত্যা করা হয়।

গত ২০ মে আখতারুজ্জামান ঢাকা ছেড়ে দিল্লি, কাঠমান্ডু ও দুবাই হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেছেন। হারুন বলেন, আনার হত্যার ঘটনা তদন্তে ভারতীয় পুলিশের একটি দল ঢাকায় কাজ করছে। পাশাপাশি আমাদের হাতে গ্রেপ্তার আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে আমরা দুটি বিষয় পেয়েছি। দুটি গ্রুপ এখানে কাজ করেছে। একটি গ্রুপ মদত দিয়েছে, আরেকটি গ্রুপ বাস্তবায়নে কাজ করেছে। এই ঘটনার মদদদাতা আখতারুজ্জামান শাহীন ৩০ এপ্রিল কলকাতায় তিন সদস্যকে নিয়ে যান। সেই দলে এক তরুণী ছিলেন। শাহীন ১০ মে পর্যন্ত অবস্থান করে কিলিং মিশন বাস্তবায়নের মূলহোতা পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির নেতা আমানুল্যা ওরফে শিমুল ভূঁইয়াকে সব বুঝিয়ে দিয়ে দেশে চলে আসেন। শিমুল ভুয়া নাম ব্যবহার করে ভারতে গিয়েছেন। তাদের কাছ থেকে ডিবি বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে। ভারতীয় পুলিশের কাজ শেষ হলে ঢাকার ডিবির তিন সদস্যের টিম কলকাতায় যাবে।

কি কারণে হত্যা করা হয়েছে- এমন প্রশ্নের জবাবে হারুন বলেন, এই হত্যার পেছনে অনেকগুলো কারণ থাকতে পারে। মিশন বাস্তবায়নে জড়িতরা পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। ২০১৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ডিবির কাছে যে তথ্য রয়েছে; তাতে অন্তত ৫ থেকে ৬টি গলাকাটার ঘটনা ঘটিয়েছে। তবে অনেকগুলো বিষয় রয়েছে। কি কারণে হত্যা সেটি এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কি কারণে এই হত্যা সেটি আরো তদন্ত শেষে বলা যাবে। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, আগেও সংসদ সদস্য আনোয়ারুল হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। নির্বাচনের আগেও তারা হত্যার চেষ্টা করেছে। তখন তারা ব্যর্থ হয়েছে। দ্বিতীয়বার জানুয়ারি মাসের ১৭-১৮ তারিখে সংসদ সদস্য আনোয়ারুল কলাকাতায় যান। সেই সময়ে হত্যাকারীরা তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে কলকাতা যায়। কিন্তু হোটেলে থাকার কারণে সেইবার তারা ব্যর্থ হয়। তৃতীয় ধাপে তারা এসে সফল হয়েছে। তবে হত্যার আগে তাদের পরিকল্পনা ছিল সংসদ সদস্য আনোয়ারুলকে জিম্মি করা।

এরপর তার আপত্তিকর ছবি তুলে দুই দিন ব্ল্যাকমেইল করে হুন্ডির মাধ্যমে এবং কলকাতায় থাকা তার বন্ধুদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করার। কিন্তু আনার ওই বাসায় যাওয়ার পর তার মুখে চেতনানাশক স্প্রে করায় জ্ঞান হারান। অজ্ঞান অবস্থায় আনারের আপত্তিকর ছবি তোলা হয়। কিন্তু তাদের মূল টার্গেট ছিল হত্যা করা। আদায় করা টাকা হত্যকারীদের ভাগ করে দেয়ার কথা ছিল। তবে স্প্রে করায় জ্ঞান না ফেরায় ব্ল্যাকমেইলের পরিকল্পনা বাদ দিয়ে লাশ গুমের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। এরপর তারা মোবাইলগুলো বিভিন্নস্থানে পাঠিয়ে দেয়। এমনকি হত্যাকারীদের একজন আনারের চারটি মোবাইল বেনাপোল এলাকায় নিয়ে আসে। এখানে এসে আনারের প্রতিপক্ষকে চারটি মোবাইল থেকে ফোন করা হয়। ফোন করে বলা হয় ‘শেষ’। এর টার্গেট ছিল এই ফোনের সূত্র ধরে যেন পুলিশ প্রতিপক্ষকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে। হত্যাকারীদের যেন না পায়।

স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের কোনো সম্পৃক্ততা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, নির্দিষ্ট কোনো কিছুই বলা যাবে না। তবে অনেকগুলো বিষয় আছে। তদন্ত শেষ করে জানাতে পারব। হত্যার ঘটনায় কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিসের ভিত্তিতে হত্যার কথা বলা হচ্ছে জানতে চাইলে হারুন বলেন, আমরা অনেক তথ্য প্রমাণ পেয়েছি। তদন্তের স্বার্থে এখন প্রকাশ করছি না। প্রমাণ পেয়েছে বলেই কলকাতায় হত্যা মামলা হয়েছে। দেশে একটি অপহরণ মামলা হয়েছে। কলকাতায় মামলাটি সিআইডি তদন্ত করছে। নিশ্চয়ই তারা আলামত পেয়েছে। কলকাতায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলার তদন্তে আমারও যাবো। সিসিটিভির ফুটেজ, পারিপার্শ্বিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে কলকাতার পুলিশ বলছে, মাস্টারমাইন্ড শাহিনসহ কিলিং মিশনে সাতজনের প্রাথমিক সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।

এমপির আনারের ছয় বোন, চার ভাই। বড়ভাই আলী আবেদ বিশ্বাস, এরপর ওবায়দুল হক, ইনামুল হক ঈমান ও নিহত এমপি আনার। ৬ বোন হলেন- তাসলি, রিনা, মিনু, ব্লæ, এ্যামি ও মিনু। ভাই ওবায়দুল হক ও বোন মিনু মারা গেছেন। এমপির স্ত্রী ইয়াসমিন ফেরদৌস শেফালি। তাদের সংসারে দুই মেয়ে অরিন ও ডরিন। এদের মধ্যে অরিন ঢাকার একটি হাসপাতালের চিকিৎসক। তার বিয়ে হয়েছে। ডরিন তার বাবার অপহরণ মামলার বাদি।

জিহাদ যেভাবে অপরাধ জগতে : খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুলনার দীঘলিয়ার বারাকপুর বাজারের পাশে একটি টিনশেড বাড়িতে থাকতেন জিহাদ। তিনি ও তার বাবা জয়নাল হাওলাদার রং মিস্ত্রির কাজ করতেন। জিহাদের স্ত্রী মুন্নি বেগম জানান, চার বছর তাদের বিয়ে হয়েছে। আড়াই বছরের একটি সন্তান আছে। প্রায় দেড় বছর আগে ঢাকা ও যশোরে দুটি মামলায় জড়িয়ে পড়ায় জিহাদ গা ঢাকা দেয়। তখন যশোর থেকে একবার ডিবি পুলিশ বাড়িতে এসেছিল। জিহাদ বাড়ি ছাড়ার পর থেকে কোথায় আছে, তা আমরা জানি না। সবশেষ ৯ মাস আগে ফোন করে এক-দেড় মিনিট কথা বলে আড়াই বছরের ছেলে ও বাবা-মার খবর নিয়েছিল। কিন্তু কোথায় আছে তা বলেনি।

জিহাদের বাবা জয়নাল হাওলাদার বলেন, এলাকায় মারামারির ঘটনা থেকে তার ছেলে সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। তবে এমন নৃশংস খুনের ঘটনা ঘটাবে তা কোনো দিন ভাবিনি। ছেলেকে নিয়ে অনেকটা অশান্তিতে ছিলাম। অনেকবার সঠিক পথে ফেরাবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। ছেলের পা জড়িয়ে ধরে খারাপ পথ থেকে ফিরে আসার আকুতি করেছি।

স্থানীয়দের কারণে বেপথে গিয়েছে ছেলে। তবে তারা কারা? প্রশ্নে জয়নাল হাওলাদার বলেন, ‘নাম বললে কালই আমাকে মেরে ফেলবে।’ এলাকায় আধিপত্য নিয়ে দুই গ্রুপের দ্ব›দ্ব দীর্ঘদিনের। তার কারণেই ছোট বেলা থেকেই উগ্র জিহাদ। ছেলের এই পরিণতির জন্য দুষলেন স্থানীয় রাজনীতিকে। জিহাদ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পর আর লেখাপড়া করেনি। মাঝে মধ্যে এলাকায় মারামারিতে জড়াত। দুই দফায় প্রায় আট মাস জেলও খেটেছে। জিহাদের ভাই জায়েদ বারাকপুর এলাকায় এক আনসার সদস্য হত্যা মামলার আসামি।

দীঘলিয়া থানার ওসি বাবুল আক্তার জানান, জিহাদ হাওলাদারের বিরুদ্ধে এ থানায় ২০২৩ সালের ৮ জুন অস্ত্র মামলা ও ২০২০ সালের ২৯ মে ও ২২ এপ্রিল দুটি মারামারির মামলা রয়েছে। অনেকদিন সে আত্মগোপনে রয়েছে। খুলনা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, জিহাদ দেশে থাকাকালেই তার সঙ্গে চরমপন্থি নেতা শিমুলের পরিচয় হয়। জিহাদ পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিল। শিমুল তাকে এই হত্যা মিশনে সম্পৃক্ত করেছে।

টাইমলাইন: ভারতে এমপি আজিম হত্যাকাণ্ড

আরো পড়ুন

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App