×

প্রথম পাতা

বঙ্গোপসাগরে ঘাঁটি করার চেষ্টায় জনমনে কৌতূহল

Icon

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য : প্রায় এক বছর আগে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ কাউকে লিজ দিলে ক্ষমতায় থাকতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্ত সেটা তার (শেখ হাসিনা) দ্বারা হবে না। তিনি দেশের কোনো সম্পদ কারো কাছে বিক্রি করে ক্ষমতায় আসতে চান না। কাউকে লিজ দিলে ক্ষমতায় থাকতে অসুবিধা নেই। সেদিনের সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত কিছু না বললেও কারো বুঝতে বাকি ছিল না যে প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রকেই ইঙ্গিত করেছিলেন।

প্রায় এক বছর পর এসে গত বৃহস্পতিবার গণভবনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী আবারো বলেছেন, বাংলাদেশে এয়ার বেজ বানানোর জন্য প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। তবে কোন দেশ সে প্রস্তাব দিয়েছে সেটি তিনি উল্লেখ করেননি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার ক্ষমতায় আসতে অসুবিধা হবে না, যদি আমি বাংলাদেশে কারো এয়ার বেজ করতে দেই, ঘাঁটি করতে দেই। কোনো এক সাদা চামড়ারই প্রস্তাব। আমি একই জবাব দিয়েছি। আমি স্পষ্ট বলেছি, আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মেয়ে, আমরা যুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করেছি, দেশের অংশ ভাড়া দিয়ে বা কারো হাতে তুলে দিয়ে আমি ক্ষমতায় যেতে চাই না, ক্ষমতার দরকার নেই। যদি জনগণ চায় ক্ষমতায় আসব, না হলে আসব না। এই কথাগুলো বললাম, কারণ সবার জানা উচিত।

প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পরই নানা কৌতূহল শুরু হয়। এই সময়ে এসে তিনি কেন এই বক্তব্য দিলেন। বিশ্লেষকরাও মেলাতে চেষ্টা করছেন- প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের তাৎপর্য কী। তবে তারা একমত, প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিশ্চয়ই এমন কোনো তথ্য রয়েছে, যা তিনি জাতির সামনে প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, সম্প্রতি সফর করে যাওয়া ডোনাল্ড লুকে উপলক্ষ করে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী এমন কথা বলেছেন। আবার এ-ও বলা হচ্ছে, নতুন করে যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী কিছু বলেননি। নির্বাচনের আগে নানা ঘটনা টেনে এনে দলীয় নেতাদের জানানোর জন্য নতুন করে এমন কথা বলেছেন। যাতে দলের লোকজন ভেতরের কথাগুলো শুনে রাখে।

জানতে চাইলে কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শমসের মবিন চৌধুরী গতকাল ভোরের কাগজকে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ বিষয়ে কী খবর আছে তা এখনো আমরা জানি না। তারপরও প্রধানমন্ত্রীর কথার গুরুত্ব রয়েছে। কারণ গুরুত্ব না থাকলে তিনি এমন কথা ব্যবহার করতেন না। এই কূটনৈতিক বিশ্লেষক আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী যদি আমেরিকাকে ইঙ্গিত করে এমন বক্তব্য দিয়ে থাকেন তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে- আমেরিকা কেন এখানে ঘাঁটি করবে? কারণ আন্দামান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানে থাকা ঘাঁটি ব্যবহার করে অনায়াসেই তারা তাদের স্বার্থ হাসিল করে নিতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ ভোরের কাগজকে বলেন, আগেও বেশ কয়েকবার তিনি এমন কথা বলেছেন, এবার আরেকটু স্পষ্ট করেছেন। তিনি আমাদের প্রধানমন্ত্রী। সঙ্গতকারণেই তার কাছে তথ্যও বেশি। সেই তথ্য পেয়েই তিনি প্রকাশ করেছেন। তবে এয়ার বেজ সংক্রান্ত যে বক্তব্য; তা বিশ্লেষণ করে বলা যায়, এটি আগের তথ্য এবং সেদিন ১৪ দলীয় জোটের বৈঠকে নেতাদের সঙ্গে সেই তথ্য শেয়ার করেছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বৃহস্পতিবার আরো বলেছিলেন, দেশের অংশ ভাড়া দিয়ে বা কারো হাতে তুলে দিয়ে আমি ক্ষমতায় যেতে চাই না, ক্ষমতার দরকার নেই। যদি জনগণ চায় ক্ষমতায় আসব, না হলে আসব না। প্রধানমন্ত্রীর মতে, বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে প্রাচীনকাল থেকে ব্যবসাবাণিজ্য চলে। এ জায়গাটার ওপর অনেকেরই নজর। এ জায়গায় কোনো বিতর্ক নেই, এ নিয়ে কারো কোনো দ্ব›দ্ব নেই। সেটা আমি হতে দিচ্ছি না। এটাও আমার একটা অপরাধ। এখানে এয়ার বেজ করে কার ওপর হামলা করবে? আমাদের সব সময় সমস্যায় পড়তে হচ্ছে, আরো হবে। কিন্ত এটা পাত্তা দেই না, সোজা কথা। দেশের মানুষ আমাদের শক্তি, মানুষ যদি ঠিক থাকে আমরা আছি।

বিশ্লেষকরা বলেছেন, সেন্ট মার্টিন বাংলাদেশের একমাত্র কোরাল বা প্রবাল দ্বীপ। প্রায় ৫ হাজার বছর আগে দ্বীপটি ছিল মূলভূমি তথা টেকনাফ পেনিনসুলার বর্ধিত অংশ। কিন্ত পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে দ্বীপটি সমুদ্রের নিচে নিমজ্জিত হয়ে যায়। প্রায় ৪৫০ বছর আগে বর্তমান সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দক্ষিণ অংশ জেগে ওঠে। পরবর্তী ১০০ বছরে এর উত্তর অংশ এবং তার পরবর্তী ১০০ বছরের মধ্যে মধ্যবর্তী ও বাকি অংশ জেগে ওঠে। ঐতিহাসিকদের মতে, প্রায় ২৫০ বছর আগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের সময় আরব বণিকদের নজরে আসে সমুদ্রবেষ্টিত এ ভূখণ্ডটি। যেটি মূলত তারা সমুদ্রযাত্রায় বিশ্রামের জন্য ব্যবহার করত। তৎকালীন সময়ে আরবরা এটিকে ‘জাজিরা’ বলে ডাকত। আরবি ‘জাজিরা’ অর্থ দ্বীপ। ১৮৯০ সালে ১৩টির মতো আদিবাসী রাখাইন ও বাঙালি পরিবার সর্বপ্রথম এ দ্বীপে বসতি স্থাপন করে। মূলত নারিকেল গাছের প্রাধান্য থাকায় স্থানীয় অধিবাসীরা এটিকে ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’ বলে ডাকত। আরবি ‘জিঞ্জিরা’ অর্থ সমুদ্রবেষ্টিত উপদ্বীপ। ১৯০০ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে সম্পন্ন ভূমি জরিপের সময় এ দ্বীপটিকে ব্রিটিশ-ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যদিও সে সময় বার্মা তথা মিয়ানমার ব্রিটিশ শাসনাধীন ছিল। তারপরও দ্বীপটির অবস্থানগত কারণে এটিকে বার্মার অন্তর্ভুক্ত না করে ব্রিটিশ-ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ব্রিটিশ শাসনামলে সেন্ট তথা সাধু-সন্ন্যাসী প্রভাবিত এ দ্বীপকে তৎকালীন চিটাগংয়ের জেলা প্রশাসক মিস্টার মার্টিনের নাম অনুসারে সেন্ট মার্টিন রাখা হয়। সেই থেকে ব্রিটিশ-ভারত প্রশাসনের হয়ে এবং ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হওয়ার পরে পূর্ব পাকিস্তানের ও ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সার্বভৌম ভূখণ্ড হিসেবে সেন্ট মার্টিন স্বমহিমায় উজ্জ্বল।

কক্সবাজার জেলার টেকনাফ থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং মিয়ানমার উপকূল থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে নাফ নদীর মোহনায় সেন্ট মার্টিন দ্বীপের অবস্থান। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে প্রায় ৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ দ্বীপ তার জন্মলগ্ন থেকেই উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উপকূলের এক গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক প্রপঞ্চ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই এ দেশের পর্যটন অর্থনীতিতে এ দ্বীপের অবস্থান অনস্বীকার্য।

দেশের একমাত্র ও অনন্যসুন্দর প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন এখন মুখ্য আলোচনায়। ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই দ্বীপটিকে বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশের অমূল্য সম্পদ। জীববৈচিত্র্য ও পর্যটনসহ নানাবিধ কারণে অনেক আগে থেকেই এই দ্বীপটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার পাশাপাশি ভূ-রাজনীতিতেও এই অঞ্চলটি গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকা সামরিক ঘাঁটির উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের কাছে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ চায়। দক্ষিণ এশিয়া ও প্যাসিফিক অঞ্চলে নজরদারির স্বার্থে বিশ্বের সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ক্ষমতাধর দেশটির এমন ইচ্ছা দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিককালে মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ আরো বেড়েছে। এ কারণে দ্বীপটি তাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বছরজুড়েই সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে- সেন্ট মার্টিন দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও বিষয়টি অস্বীকার করে বিবৃতি দিয়েছিল মার্কিন দূতাবাস। তবুও সেন্ট মার্টিন নিয়ে আলোচনা যেন থামছেই না। প্রবাল দ্বীপটি নিয়ে রাজনীতির টেবিলে চলছে তুমুল আলোচনা। বঙ্গোপসাগরের ওপর কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে মেরিন একাডেমির নামে কার্যত মার্কিন সৈন্যদের ঘাঁটি করার কৌশল বলে মনে করেন কেউ কেউ।

বিষয়টি নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শরিক দল জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টির নেতারাও জাতীয় সংসদে কথা বলেছিলেন। গত বছরের ১৪ জুন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন জাতীয় সংসদে বলেছিলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেন্ট মার্টিন দ্বীপটিকে পাওয়ার লক্ষ্যে চক্রান্তে লিপ্ত রয়েছে। এজন্য তারা রেজিম চেঞ্জ (সরকার হটানো) চায়। যুক্তরাষ্ট্রের যারা বন্ধু, তাদের শত্রæর প্রয়োজন নেই। এমন অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সেন্ট মার্টিন দ্বীপ নিয়ে তার মতামত জানিয়ে গত বছরের ২১ জুন কোনো দেশের নাম না উল্লেখ করে বলেছিলেন, এখনো যদি বলি, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ বা আমাদের দেশ কাউকে লিজ দেব, তাহলে আমার ক্ষমতায় থাকার কোনো অসুবিধা নেই, আমি জানি সেটা। কিন্তু আমার দ্বারা সেটা হবে না। আমাদের দেশের মাটি ব্যবহার করে কোনো জায়গায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাবে, সেটি হতে দেব না। প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পরই মূলত সেন্ট মার্টিন নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিভিন্ন মহলে তুমুল আলোচনা চলছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন সবাই।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App