×

প্রথম পাতা

যুক্তরাজ্যে হঠাৎ কেন আগাম নির্বাচন চাইলেন ঋষি সুনাক

Icon

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাজ্যে হঠাৎ কেন আগাম  নির্বাচন চাইলেন ঋষি সুনাক

কাগজ ডেস্ক : যুক্তরাজ্যের বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ছয় মাস আগে আগাম জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক। দেশটির বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা কেইর স্টারমার এ ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন ‘এ মুহূর্তটির জন্যই দেশ অপেক্ষা করছে’। কিন্তু হঠাৎ কেন আগাম নির্বাচন চাইছেন ঋষি সুনাক- এই প্রশ্নই এখন ঘুরেফিরে আসছে।

বুধবারের বিকাল। লন্ডনের ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের বাইরে তখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। ফটকের বাইরে থেকে গানের হালকা সুর ভেসে আসছে। বাজছে নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় গান ‘থিংস ক্যান ওনলি গেট বেটার’। আইরিশ ব্যান্ড ডি. রিমের গান এটা।

এমন বৃষ্টি-বিধুর পরিবেশে সাংবাদিকদের সামনে হাজির হন প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক। চমক হিসেবে আসা এ ঘোষণার সংবাদ সংগ্রহের সময় কারো কারো হাতে ছাতা দেখা গেলেও সংবাদকর্মীদের অনেককে ভিজে ভিজে এটি কাভার করতে দেখা যায়। ক্যামেরায় ধরা পড়া সুনাককে বেশ হতাশই দেখাচ্ছিল। ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ২০২২ সালে অক্টোবরে লিজ ট্রাসের বদলে ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে আসা সুনাক বলেন, পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়ার অনুমতি দিয়েছেন রাজা দ্বিতীয় চার্লস। ৪ জুলাই হবে যুক্তরাজ্যের জাতীয় নির্বাচন।

সুনাকের এমন ঘোষণা আকস্মিক নয়। এদিন সকালে যখন মূল্যস্ফীতি তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয় তখনি গুঞ্জন শুরু হয়। তবে অনেকের মনে আশা ছিল, জাতীয় নির্বাচন সময় মেনে আগামী শরৎকালে অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী সুনাক দুই বছর তার দপ্তরে থাকতে পারবেন। সেই সঙ্গে অর্থনৈতিক অগ্রগতির বড় সুযোগ পাবেন সুনাক। কিন্তু সেই প্রত্যাশা অধরাই রয়ে গেল। কিছু দিন ধরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির পর অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের বিষয়টিকে ঘিরেই সুনাক এখন প্রচারণা চালাবেন- এমনটিই মনে করা হচ্ছে।

কনজারভেটিভ পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পরই নির্বাচনের প্রেক্ষাপট দাঁড় করানো হয়েছে। ঋষি সুনাকের ঘোষণার মাধ্যমে সেটা স্পষ্ট হয়ে যায়। আগাম নির্বাচনের পক্ষে থাকা ব্যক্তিদের যুক্তি, পরিস্থিতি এখনকার চেয়ে আরো ভালো না-ও হতে পারে। তাই যত বিলম্ব হবে, কনজারভেটিভ সরকারের ওপর থেকে ভোটারদের আস্থা কমতে পারে। ভোটাররা মন বদলাতে পারেন। ক্ষমতাসীনদের এতে ঝুঁকি বাড়বে। তাই নির্বাচন নিয়ে মত- হয় এখনই আয়োজন করুন, নয়তো আরো খারাপ পরিস্থিতির অপেক্ষায় থাকুন।

আগাম নির্বাচন করলে প্রধানমন্ত্রী সুনাক তার কিছু আপাত সফলতার কথা প্রচারের সুযোগ

পাবেন। এর একটি হলো মুদ্রাস্ফীতির এখনকার হার। এটাকে আপাত সফলতা হিসেবে দেখাতে পারবেন সুনাক। যদিও এটা সরকারের কাজের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে না। তবে মুদ্রাস্ফীতির হার আকাশছোঁয়া হলে সরকারকেই দায়ী করা হয়। আশা করা হয়, মুদ্রাস্ফীতিতে লাগাম টানতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেবে সরকার। আর এর ফলে বৃহত্তর অর্থনীতির চিত্রটা আরেকটু উজ্জ্বল দেখাবে।

আরেকটি বিষয় আছে অভিবাসন প্রত্যাশীদের নিয়ে। বেশ কিছু আশ্রয়প্রার্থীকে রুয়ান্ডায় পাঠাতে চায় যুক্তরাজ্য সরকার। এই প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি। তবে শিগগিরই তা শুরু হতে পারে। এমনকি নির্বাচনী প্রচারের ডামাডোলেও পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা হতে পারে। তবে বলা হচ্ছে, ভোটের লড়াইয়ে এই পরিকল্পনা প্রতিবন্ধক হয়ে ওঠতে পারে। তাই হয়তো নির্বাচনের ডামাডোলে এটা নিয়ে নতুন করে ভাববে সরকার।

বিরোধীদের অভিযোগ, অর্থনীতির চাকা স্থবির হয়ে পড়ায় নিজের দায় এড়াতে প্রধানমন্ত্রী সুনাক এখন এ নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন। শরৎকালে কনজারভেটিভদের জন্য দেশের সব কিছু ভালো হয়ে যাবে না। ছোট ছোট নৌকা (অভিবাসী নিয়ে) আসতে থাকবে এবং একজন অভিবাসীকেও রুয়ান্ডায় পাঠাতে পারবে না তারা। কর কমানোর সুযোগও তাদের হাতে খুব কমই আছে।

নির্বাচনী প্রচার শুরুর আগে-পরে লেবার পার্টিসহ অন্যরা বারবার বলবে, পরিবর্তন দরকার। আর এটা পরিবর্তনের জন্য উপযুক্ত সময়। এর বিপরীতে কনজারভেটিভরা বারবার ভোটারদের একটি কথাই বলবে- যা-ই ঘটুক না কেন, আপনি যা চান, সেটা নিয়ে সতর্ক থাকুন।

নির্বাচনের দৌড়ে এগিয়ে লেবার পার্টি : জাতীয় জনমতগুলোয় লেবার পার্টি বেশ বড় ব্যবধানে এগিয়ে আছে এবং এখন তারা পূর্ণ প্রচারণায় নেমে পড়তে প্রস্তুত। ২ মে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ব্যাপক ভরাডুবি হয় ঋষি সুনাকের কনজারভেটিভ পার্টির। এতে লেবার পার্টির আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে আগাম নির্বাচনে দুটি ঘটনা ঘটতে পারে। প্রথমত, জনমত জরিপের ফল সত্য প্রমাণ করে সরকার বদলে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, তারা ভুল প্রমাণিত হতে পারেন। আর সেটা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের একটি হতে পারে।

জাতীয় নির্বাচনের দৌড়ে বিরোধী দল লেবার পার্টি জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা লেবার পার্টি সরকার গঠন করবে।

গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে লিখেছে, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তায় পিছিয়ে থাকলেও লেবার নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে আছেন কিয়ার স্টারমার। তবে ভোটের আগের ছয় সপ্তাহে অনেক নেতাকে এই পদ দখলের প্রতিযোগিতায় হয়তো নামতে দেখা যাবে।

ভোটের দিনক্ষণ কেমন হলো : দিনটি হবে বৃহস্পতিবার। যুক্তরাজ্যে বৃহস্পতিবার ভোট হওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। দিনটি বছরের দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম মাসের প্রথম সপ্তাহে পড়েছে, আর এমন প্রতিশ্রæতিই দিয়েছিলেন সুনাক, ভোট হবে বছরের দ্বিতীয়ার্ধে।

অনেকের মতে, দেশের কয়েকটি অঞ্চলের জন্য নির্বাচনের সময়টি যথার্থ হয়নি। বিশেষ করে স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের জন্য, যেখানে ওই সময় স্কুল ছুটি হয়ে যাবে এবং অনেকে ছুটি কাটাতে যাবে।

পার্লামেন্ট ভাঙবে ৩০ মে : যুক্তরাজ্যে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়ার আগে কয়েক দিন তা মুলতবি রাখা হয়। ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের ঘোষণা অনুযায়ী, গতকাল শুক্রবার পার্লামেন্ট মুলতবি হয়েছে এবং ভেঙে দেয়া হবে ৩০ মে, বৃহস্পতিবার।

এমপিরা পদ হারাবেন, দায়িত্বে থাকবেন মন্ত্রীরা : পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়ার পর পদ হারাবেন সংসদ সদস্যরা। যারা আবার নির্বাচন করতে চান, তারা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় ফিরে গিয়ে প্রচারে নামবেন। তবে তারা এমপি হিসেবে নন, সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে থাকবেন।

নির্বাচনের আগ পর্যন্ত মন্ত্রীরা আগের মতোই দায়িত্ব পালন করে যাবেন। এ সময় সরকারি কর্মকাণ্ড সীমিত থাকবে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রচারে কোনোভাবেই রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করা যাবে না।

প্রচারে যা দেখা যাবে : আগামী ছয় সপ্তাহ বা এমন সময়কালে দেশজুড়ে নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করবেন প্রতিদ্ব›দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা। কনজারভেটিভ পার্টির নেতা ঋষি সুনাক, লেবার নেতা কিয়ার স্টারমার, লিব ডেম নেতা এড ডেভি, রিফর্ম পার্টির নেতা রিচার্ড টাইস এবং গ্রিন পার্টির নেতা কার্লা ডেনিয়ার ও অ্যাড্রিয়ান রামসেকে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ভোট চাইতে দেখা যাবে। নিজেদের যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী পদে দেখতে তারা নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে যাবেন। সভা-সমাবেশের পাশাপাশি নির্বাচনী বাসে দেশজুড়ে ঘুরতে শুরু করবেন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App