×
Icon ব্রেকিং
রংপুরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ

প্রথম পাতা

হঠাৎ চোখের আড়ালে চলে যায় রাইসির হেলিকপ্টার

Icon

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

হঠাৎ চোখের  আড়ালে চলে  যায় রাইসির  হেলিকপ্টার

কাগজ ডেস্ক : আজারবাইজান-ইরান সীমান্তে একটি বাঁধের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার পর প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি তার সফরসঙ্গীদের নিয়ে ৩টি হেলিকপ্টারে করে ইরানে ফিরছিলেন। তাদের গন্তব্য পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের রাজধানী তাবরিজ। পথে ভারজাকান প্রদেশের জোলফা এলাকায় রাইসিকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি বিধ্বস্ত হয়। সেদিন হঠাৎ করেই চোখের আড়ালে চলে যায় প্রেসিডেন্টের হেলিকপ্টার। যদিও যাত্রার শুরুতে আবহাওয়া বেশ ভালো ছিল এবং ফ্লাইটের বেশির ভাগ সময় যাত্রীরা ভালো আবহাওয়া পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্টের চিফ অব স্টাফ গোলাম হোসেইন ইসমাইলি। সেদিন ওই বহরের একটি হেলিকপ্টারে তিনিও ছিলেন।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ইরনাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ইসমাইলি জানান, ১৯ মে স্থানীয় সময় দুপুর ১টার দিকে হেলিকপ্টারগুলো যাত্রা শুরু করে। সে সময় আবহাওয়া স্বাভাবিক ছিল। হেলিকপ্টার বহরের নেতৃত্বে ছিলেন রাইসিকে বহনকারী হেলিকপ্টারের পাইলট ক্যাপ্টেন মোস্তাফাভি। যাত্রা শুরুর ৪৫ মিনিট পর তিনি বাকিদের নির্দেশ দেন নিকটবর্তী একটি মেঘের সংস্পর্শ এড়ানোর জন্য হেলিকপ্টারগুলোকে আরো উঁচুতে নিয়ে যেতে। প্রেসিডেন্টের হেলিকপ্টারের দুই পাশে বাকি দুটি হেলিকপ্টার উড়ছিল। হঠাৎ করেই চোখের আড়ালে চলে যায় প্রেসিডেন্টের হেলিকপ্টার। ইসমাইলি বলেন, মেঘের ওপর ৩০ সেকেন্ড ওড়ার পর আমাদের পাইলট লক্ষ্য করেন, মাঝের হেলিকপ্টারটি উধাও হয়ে গেছে। এরপর তারা বেশ কয়েকবার রেডিওর মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের হেলিকপ্টারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চালান। মেঘের কারণে হেলিকপ্টারকে নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছিল না।

ইসমাইলি জানান, তারা নিকটবর্তী একটি তামা খনিতে অবতরণ করেন। দুই হেলিকপ্টারের পাইলট প্রেসিডেন্টের পাইলট ক্যাপ্টেন মোস্তাফাভির সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির-আবদুল্লাহিয়ান ও প্রেসিডেন্টের সুরক্ষা ইউনিটের সদস্যদের বারবার কল করা হলেও তারা সাড়া দেননি। তবে একপর্যায়ে কল রিসিভ করেন তাবরিজের মসজিদের ইমাম মোহাম্মদ আলী আল-হাশেম। তার শারীরিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। তিনি জানান, হেলিকপ্টারটি একটি উপত্যকায় বিধ্বস্ত হয়েছে। ইসমাইলি নিজেও আলী হাশেমের সঙ্গে কথা বলেন। তাকেও একই কথা জানান আলী হাশেম।

ইসমাইলি বলেন, আমরা যখন দুর্ঘটনাস্থল খুঁজে পাই, তখন মরদেহের পরিস্থিতি দেখে আমাদের মনে হয়েছে প্রেসিডেন্ট রাইসি ও তার অন্য সহযোগীরা হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হওয়ার পর প্রায় তাৎক্ষণিকভাবেই মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু আলী হাশেম আরো কয়েক ঘণ্টা পর মারা যান।

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে জানাজা : গত রবিবার ওই দুর্ঘটনায় ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির সঙ্গে নিহত হন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির-আবদুল্লাহিয়ান, পূর্ব আজারবাইজানের গভর্নর মালেক রহমাতি, পূর্ব আজারবাইজানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি মোহাম্মদ আলী আল-হাশেম, প্রেসিডেন্ট গার্ডের প্রধান মেহেদি মুসাভি, হেলিকপ্টারের পাইলট, কো-পাইলটসহ মোট ৯ জন। গতকাল বুধবার তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় ইরানের সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে। ইরানের পতাকায় মোড়ানো কফিনগুলো কাঁধে করে নিয়ে যাওয়ার সময় শোকার্ত জনতা ‘আমেরিকা নিপাত যাক’ সেøাগান দিতে থাকে।

জানাজায় ইমামতি করেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। প্রার্থনার সময় ইরানের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মাদ মোখবার পাশে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে কেঁদে ফেলেন। জানাজা শেষে মরদেহগুলো একটি সেমিট্রাক ট্রেইলারে করে তেহরানের কেন্দ্রস্থল ‘ফ্রিডম স্কয়ারে’ নিয়ে যাওয়া হয়। রাইসি অতীতে সেখানে বক্তৃতা দিয়েছিলেন।

এর আগে গত মঙ্গলবার ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর তাবরিজে রাইসি ও তার সফরসঙ্গীদের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেদিন সন্ধ্যায় রাইসির মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় কোম শহরে, যেখানে ইব্রাহিম রাইসি পড়াশোনা করেছেন। সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাইসিকে আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদে দাফন করা হবে।

ইরানের পাশে থাকার প্রতিশ্রæতি পুতিনের : হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় নিহত ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুকে ‘বিরাট ক্ষতি’ বলে অভিহিত করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন। এছাড়া রাইসির মৃত্যুর পর ইরানের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রæতিও দিয়েছেন তিনি।

গত মঙ্গলবার রাশিয়ার পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ বা স্টেট ডুমার চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠকের সময় মস্কোর কাছে রাইসিকে ‘খুব নির্ভরযোগ্য অংশীদার এবং প্রতিশ্রæতি রক্ষাকারী একজন মানুষ’ বলে বর্ণনা করেন পুতিন। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট রাইসির মৃত্যু ইরান ও ইরানি জনগণের জন্য প্রথম এবং অনেক বড় ক্ষতি। তিনি একজন অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য অংশীদার, একজন স্পষ্টভাষী, আত্মবিশ্বাসী মানুষ ছিলেন যিনি তার জাতীয় স্বার্থে ছিলেন অনুপ্রাণিত। তার সঙ্গে কাজ করাটা ছিল আনন্দের।

পুতিন আরো বলেন, মস্কো তেহরানের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে প্রস্তুত কারণ দেশটি রাইসি প্রশাসনের অধীনে রয়েছে এবং রাশিয়া-ইরান সম্পর্ক যেন একইভাবে অব্যাহত থাকে তা নিশ্চিত করার জন্য সবকিছু করবে মস্কো।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করল রাশিয়া : হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করেছেন রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ। গত মঙ্গলবার কাজাখস্তানে এক বাণিজ্য সম্মেলনে অংশ নিয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের বিমান চলাচলের নিরাপত্তা আরো খারাপ হয়েছে। আমেরিকানরা এটি অস্বীকার করলেও সত্যিটা হলো, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা জারি রেখেছে। এর ফলে তারা বিমান চালনাসহ মেরামতের জন্য আমেরিকার তৈরি করা বিভিন্ন খুচরা যন্ত্রাংশ পায় না। এটি সরাসরি নিরাপত্তার স্তর লঙ্ঘন করে।

গত রবিবার ইরানের প্রেসিডেন্ট রাইসিকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বেল-২১২ মডেলের। হেলিকপ্টারটির বয়স কত ছিল তা স্পষ্ট নয়। তবে এই মডেলটি কানাডিয়ান সামরিক বাহিনীর জন্য ১৯৬০-এর দশকে তৈরি করা হয়েছিল। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের আগে শাহের শাসনামলে বেল হেলিকপ্টারের অন্যতম প্রধান ক্রেতা ছিল ইরান। সেই হিসাবে বিধ্বস্ত হেলিকপ্টারটি ৪৫ বছরেরও বেশি পুরনো।

ফ্লাইট গেøাবালের ২০২৪ সালের ওয়ার্ল্ড এয়ার ফোর্সেস ডিরেক্টরি অনুযায়ী, ইরানের নৌ ও বিমানবাহিনীর বহরে বেল-২১২ মডেলের মোট ১০টি হেলিকপ্টার রয়েছে। তবে ইরানের সরকার এসব হেলিকপ্টারের মধ্যে কতটি পরিচালনা করে আসছে তা পরিষ্কার নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এই হেলিকপ্টার যে কোনো ধরনের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যায়। মানুষ ও মালামাল পরিবহনের পাশাপাশি যুদ্ধের সময় অস্ত্র সরঞ্জাম বহন এবং ব্যবহারও করা যায়।

ইরানে সর্বশেষ বেল-২১২ মডেলের একটি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল ২০১৮ সালের এপ্রিলে। ওই সময় হৃদরোগে আক্রান্ত এক রোগীকে হাসপাতালে নেয়ার পথে বিধ্বস্ত হয় হেলিকপ্টারটি।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App