×

প্রথম পাতা

বিএনপি-জামায়াত সখ্য আরো জোরালো হচ্ছে

Icon

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

 বিএনপি-জামায়াত সখ্য  আরো জোরালো হচ্ছে

রুমানা জামান : সরকার পতনের লক্ষ্যে নতুন আন্দোলন জোরালো করতে পুরনো ও বিশ্বস্ত মিত্র জামায়াতে ইসলামীকে রাজপথে সক্রিয় ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ হিসেবে দেখতে চায় বিএনপি। এ লক্ষ্যে সব টানাপড়েন পাশ কাটিয়ে আগামীতে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে একই ‘প্ল্যাটফমের্’ পথ চলার পরিকলল্পনা করেছে দলটি। তবে যুগপৎ আন্দোলনে যুক্ত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে শলা-পরামর্শের পর এ নিয়ে রয়েসয়ে এগোনোর কৌশল নিয়েছেন নেতারা। যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলের বেশির ভাগ নেতার মত- নিজস্ব প্ল্যাটফর্মে দলগুলো যে যার মতো করে আন্দোলন করছে; এই সমীকরণটাই ভালো। জামায়াতকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে বিভাজন বাড়বে। ফলে এবারো জামায়াত ইস্যুতে ‘চুপ’ থাকার কৌশল নিতে হচ্ছে বিএনপিকে।

সূত্র বলছে, জোটের চাপে আপাতত প্রকাশ্যে না পারলেও; অন্তরালে জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় রেখেই চলবে বিএনপি। এরই মধ্যে দলটির পক্ষ থেকে আলাদা ফর্মে সরকারবিরোধী নতুন কর্মসূচি প্রণয়নের পরামর্শ দেয়া হয়েছে জামায়াতকে। এ কর্মসূচি আলাদাভাবে পালন করলেও তাতে বিএনপির পূর্ণ সমন্বয় থাকবে। এদিকে, আগামীতে দল দুটির সম্পর্ক জোট গঠন পর্যন্ত যাবে কিনা তা নিয়ে এখনই কিছু পরিষ্কার না করলেও এ সম্পর্ক যে কোনো সময় নতুন মোড় নিতে পারে; এমন সম্ভবনাকেও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিএনপির নেতারা।

বিএনপির সিনিয়র নেতাদের ভাষ্য- ২০১৪ সালের আগে পরে সারা বিশ্বকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যেভাবে জামায়াতের নামে জুজুর ভয় দেখিয়েছে; দেশের অভ্যন্তরে কিংবা বৈশ্বিক প্রেক্ষপটে সেই পরিস্থিতি এখন আর নেই। তাইতো পুরনো সম্পর্ককে নতুন করে ঝালিয়ে নিতে গেল রমজান মাসের ইফতার পার্টিতে দল দুটির গুরত্বপূর্ণ নেতাদের হাসিমুখের উপস্থিতি দেখা গেছে। একই সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেছেন তারা।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান ভোরের কাগজকে বলেন, নিয়মতান্ত্রিক শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যারা বিশ্বাস করে; তাদের সবার

সঙ্গেই আমরা এক সঙ্গে রাজনীতি করি এবং করব। দলটির স্থায়ী কমিটির অপর সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, জামায়াত তো বিএনপির মতোই আন্দোলন করে আসছে। এর বাইরে আর কিছু হলে সেটা ভবিষ্যতে জানতে পারবেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরো একজন সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ বলছেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য যারাই ৭ জানুয়ারির একদলীয় নির্বাচন বর্জন করছে, তাদের সবাইকেই আমরা আহ্বান জানাচ্ছি। তবে এ ব্যাপারে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির কোনো আলোচনা হচ্ছে কিনা- এমন প্রশ্নের সরাসরি জবাব তিনি দেননি।

সূত্র জানায়, বিএনপির গত ২৮ অক্টোবরের মহাসমাবেশের দিন জামায়াতও ঢাকায় সমাবেশের ডাক দিয়েছিল। এরপর থেকেই বিএনপি যখন যে কর্মসূচি পালন করছে; একই ধরনের কর্মসূচি আলাদাভাবে জামায়াতও ঘোষণা করে যাচ্ছে। যে কোনো ইস্যুতে ডাকা সভা সমাবেশ আর প্রতিবাদে বিএনপির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে জামায়াত। শেষ পর্যন্ত সরকারের বিরুদ্ধে বা নির্বাচন নিয়ে নিজেদের দাবি অর্জনে তেমন কোনো সফলতা না পেয়ে লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এখন চাইছেন নির্বাচনে যায়নি এমন সব দলকে এক জায়গায় নিয়ে আসার একটি প্রক্রিয়া বের করতে। এর পরিপ্রেক্ষিতে হতাশা ও বিপর্যয় কাটিয়ে দল কীভাবে সামনে এগোতে পারে- সে ব্যাপারে গত মার্চে সুপারিশ বা প্রস্তাব তৈরির জন্য স্থায়ী কমিটির একজন সদস্যকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন তারেক রহমান। সেই প্রস্তাবে উঠে আসে আগামীতে সরকারবিরোধী আন্দোলন সংগ্রামে জামায়াতকে সঙ্গে রেখে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টি। এরপর এ নিয়ে শুরু হয় তৎপরতা। সম্প্রতি জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির হাইকমান্ডের একাধিকবার যোগাযোগ হয়েছে। সূত্রের দাবি- কয়েক দফা বৈঠকও হয়েছে দুপক্ষের।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএনপির সিনিয়র নেতারা এখন শরিকদের মতামত ও প্রস্তাব সামনে রেখে নতুন কর্মকৌশলে সামনের পথচলা এবং কর্মসূচি প্রণয়নের দিকেও মনোযোগী হচ্ছেন। এ কারণেই সম্প্রতি শরিকদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক পর্ব শেষ করেছেন বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা। সূত্র বলছে, এই বৈঠকগুলোর লক্ষ্য মূলত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো যে সক্রিয় এবং এক সঙ্গে আছে, জনগণের কাছে সে বার্তা দেয়া। সেই সঙ্গে বিরোধী দলগুলো আবার রাজপথে কীভাবে একত্র হবে, সেই প্রক্রিয়া এবং কর্মসূচি ঠিক করা। সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে যুক্ত ৩৯টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠকে জামায়াত প্রসঙ্গটি উঠে আসে। বৈঠকে যুগপৎ নেতাদের ভোট বর্জনকারী সব রাজনৈতিক দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে ‘ঐক্যবদ্ধ বৃহৎ প্ল্যাটর্ফম’ গঠনসহ যুগপৎ আন্দোলনে থাকা মিত্রদের দুটি প্রস্তাব দেয় বিএনপি।

সূত্র জানায়, এসব বৈঠকে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে জোটবদ্ধ আন্দোলনের প্রসঙ্গে শরিকদের মধ্যে দ্বিমত দেখা গেছে। বিশেষ করে এক মঞ্চে আন্দোলনে ঘোর আপত্তি জানিয়েছে গণতন্ত্র মঞ্চ। শরিক দলের কিছু নেতাদের ভাষ্য- নিজস্ব প্ল্যাটফর্মে দলগুলো যে যার মতো করে আন্দোলন করছে; এই সমীকরণটাই ভালো। জামায়াতকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে বিভাজন বাড়বে। সে কারণে অন্তরালে জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করলেও যুগপতে যেন দলটিকে যুক্ত করা না হয়। মঞ্চের নেতাদের যুক্তি- নির্বাচনের আগে কঠিন সময়ের আন্দোলনে রাজপথ দখলে নেয়ার মতো জামায়াত সে ধরনের কোনো তৎপরতা দেখায়নি। তাই জামায়াত ঐক্যে এলেই যে সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নামবে, তা বিশ্বাস করা কঠিন।

এ প্রসঙ্গে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক ভোরের কাগজকে বলেন, যুগপৎ ও যুগপতের বাইরে যারা যে পর্যায়ে আছেন, একই লক্ষ্যে আন্দোলনকে আরো বিস্তৃত করা দরকার। এর পরবর্তী সময়ে সব দল মিলে আন্দোলনকে যখন আরো তুঙ্গে নেয়া হবে, তখন বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সমন্বয় কিংবা বোঝাপড়া অথবা আরো কাছাকাছি আসব। এখন আমরা স্ব স্ব জায়গায় যেখানে আছি, সেখানে থেকেই আন্দোলন এগিয়ে নিতে চাই। গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর বলেন, ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফরম করলে আন্দোলনের জন্য ভালো হবে। তবে সেটা করার আগে একটা বিষয় বিশ্লেষণ করতে হবে- আমাদের যে যুগপৎ আন্দোলন চলছে, এর প্রতি আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি কী এবং দেশের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি কী। সেটাও বিবেচনা করা দরকার।

অন্যদিকে জামায়াতের সঙ্গে ২০ দলীয় জোটে দীর্ঘদিন এক সঙ্গে থাকা দলগুলো চায় বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামীকে যুক্ত করে সামনের কর্মসূচি গ্রহণ করতে। সমমনা, ১২-দলীয় জোট, এলডিপিসহ বেশ কয়েকটি দলের বক্তব্য- অতীতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও জামায়াতকে নিয়ে আন্দোলন করেছিল। তাহলে জামায়াতকে নিয়ে বিএনপি আন্দোলন করলে দোষ কোথায়? তাই আন্দোলনের নতুন কর্মপরিকলনায় জামায়াতকে রাখতে বিএনপিকে চাপ দিয়েছে সমমনারা। এ নিয়ে বিএনপির লিয়াজোঁ কমিটির সদস্যদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে বিভক্তি। যদিও বিএনপি চায় যুতসই আন্দোলনের স্বার্থে বিতর্ক এড়িয়ে সামনে চলতে। দলটি ডান-বাম ও ইসলামপন্থি সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে পথ চলার কথা বললেও জামায়াতকে সঙ্গে রাখবে কোন চরিত্রে; সেটি স্পষ্ট করেনি।

এ বিষয়ে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ইসলামী দলগুলো মাঝে মধ্যে সরব হলেও রাজনৈতিক গুরত্বপূর্ণ ইস্যুতে রাজপথে এখনো কার্যকরীভাবে সক্রিয় নয়। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ যেন শপথ করে বসে আছেন- ‘জামায়ত থাকলে হবে না’- ব্যাপারটা বর্তমান প্রেক্ষাপটের সঙ্গে মোটেও যায় না। ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে জামায়াত সঙ্গী হলে আমি তো দোষের কিছুই দেখছি না।

গত ১৮ মে শনিবার নিজ দলীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতকে নিয়ে আন্দোলনে বিরোধিতাকারীদের বিরুদ্ধেই কথা বলেছেন লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি অলি আহমেদ। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে অলি বলেন, ‘হাল চাষের জন্য ন্যূনতম হলেও গরু দরকার হয়। ছাগল দিয়ে চাষ হয় না। আমরা তো দেখেছি গত ১০-২০ বছরে কী অর্জিত হয়েছে। সুতরাং এখন কী প্রয়োজন (জামায়াতের দিকে ইঙ্গিত করে), সেটা আপনিও বোঝেন, আমরাও বুঝি।

১২ দলীয় জোটের মুখপাত্র বাংলাদেশ এলডিপির মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, জামায়াতকে নিয়ে আন্দোলনে কোনো আপত্তি নেই। এখন অত্যন্ত কঠিন একটা সময় পার করছি। এ সময়ে আমাদের নিজস্ব চিন্তাভাবনা বাদ দিয়ে গণতন্ত্র উদ্ধারের লড়াইয়ে নিয়োজিত হওয়া দরকার। অতীতে বিএনপিকে হটানোর জন্য আওয়ামী লীগ ও জামায়াত নেতারা যদি এক মঞ্চে বসতে পারে, তাহলে আমাদের তো জামায়াতে সঙ্গে এক মঞ্চে বসতে কোনো অসুবিধা দেখছি না।

জামায়াতের উচ্চপর্যায়ের একজন দায়িত্বশীল নেতার ভাষ্য- বিগত আন্দোলন এবং নির্বাচনের পর বিএনপির হাইকামন্ড বুঝতে পেরেছে- জামায়াতকে দূরে সরিয়ে রাখা কৌশলগত দিক থেকে সঠিক হয়নি। এখন যুগপৎ চলবে, এক মঞ্চে না এলেও রিলেশন বেটার হবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ তাহের বলেন, নতুন নির্বাচন ও সরকার পতনের নতুন আন্দোলনে বিএনপিসহ সব বিরোধী দল যে কোনো এক ব্যানারে এক মঞ্চে মিলিত হবো। সম্মিলিত আন্দোলনের মাধ্যমেই এই সরকারের পতন নিশ্চিত হবে। তিনি বলেন, আমরা নিজেদের মতো করে আন্দোলনের কর্মসূচি প্রনয়ন করছি; বিএনপির সঙ্গে অবশ্যই সমন্বয় থাকবে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App