×

প্রথম পাতা

কাজে আসছে না ভোটার বাড়ানোর কোনো কৌশল

Icon

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কাজে আসছে না ভোটার বাড়ানোর কোনো কৌশল

এন রায় রাজা : উপজেলা নির্বাচনের ইতিহাসে সবচেয়ে কম ভোট পড়ে গত ৮ মে। ষষ্ঠ উপজেলা নির্বাচনের প্রথম ধাপে ১৪১টি উপজেলায় গড়ে ভোট পড়ে মাত্র ৩৬ দশমিক ১ শতাংশ। এত কম ভোট পড়ায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হয় নির্বাচন কমিশনকে। সে কারণে দ্বিতীয় দফা উপজেলা নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে বেশ কিছু লক্ষ্য ও কার্যক্রম হাতে নেয় ইসি। নির্বাচন কমিশনাররা প্রতিটি উপজেলায় গিয়ে প্রশাসন, প্রার্থী ও ভোটারদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে আসার আহ্বান জানান। এছাড়া প্রশাসনকে ভোটকেন্দ্র ও আশপাশের পরিস্থিতি ভোটের উপযোগী করার তাগিদ দেয়া হয়। সেই সঙ্গে প্রতিটি উপজেলার নির্বাচনী কর্মকর্তারা মাইক নিয়ে গ্রাম-গঞ্জে গিয়ে ভোটারদের কেন্দ্রে আসার আহ্বান জানান, একই আহ্বান জানিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় বিজ্ঞাপনও দেয় ইসি। পাশাপাশি সরকারি দল আওয়ামী লীগ দলীয় মনোনয়ন বা প্রতীক বরাদ্দ না দিয়ে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয় প্রার্থিতা। এমনকি মাঠ পর্যায়ের নেতাদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দিতে এমপি-মন্ত্রীদের স্বজনদের প্রার্থী হওয়ায় নিরুৎসাহিতও করা হয়। যাতে প্রার্থীরা নিজ উদ্যোগে ভোটারদের কেন্দ্রে আসতে পদক্ষেপ নেয়। তারপরও দ্বিতীয় দফায় ভোটারদের কেন্দ্র বিমুখতা লক্ষ্য করা গেছে।

গত বুধবার দ্বিতীয় ধাপে ১৪৬টি উপজেলায় গড়ে ৩৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে জানিয়েছেন ইসির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ। তিনি বলেন, যেকয়টি উপজেলায় বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় চেয়ারম্যানরা বিজয়ী হয়েছেন সেখানে ১০ শতাংশের মতো ভোট কাস্ট হয়েছে। ভোটাররা ভাইস চেয়ারম্যানদের জন্য ভোট দিতে আসেননি। আবার কোনো কোনো কেন্দ্রে ৫০ শতাংশ ভোট কাস্ট হলেও গড় হিসেবে ভোটের হার কমে যায়। তিনি বিএনপির মতো একটি বড় দলের ভোট বর্জন ও ভোটারদের কেন্দ্রে না আসতে প্রভাবিত করাকে কম ভোট পড়ার অন্যতম একটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, মূলত নির্বাচনের প্রতি ভোটারদের আস্থাহীনতা এবং একটি বড় রাজনৈতিক দলের বর্জনের কারণে ভোটাররা কেন্দ্র বিমুখ ছিলেন। অনেকে আবার এখানে নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলে প্রশাসন ও ইসির প্রতি ভোটারদের আস্থাহীনতার প্রসঙ্গ এনেছেন।

এ বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, কেন ভোটাররা ভোট দেবে। তাদের ভোট দিয়ে লাভ কী। তাছাড়া দীর্ঘদিন একপক্ষীয় নির্বাচন হওয়ায় ভোটাররা নির্বাচনের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। তাছাড়া এখানে প্রশাসন কি নিরপেক্ষতা বজায় রাখছে? তার ওপর একটি বড় দল নির্বাচনে অংশ না নেয়ায় ভোটারদের একটা বড় অংশ ভোট দিতে আসবে না এটাই স্বাভাবিক। তিনি বলেন, ভোটাররা দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছে ভোট দিয়ে তাদের কোনো লাভ হয় না, প্রার্থীরা ধনীর পরে ধনী হতে থাকে। আর আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থীর মধ্যে সহিংসতা ঘটেছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে যে গণতান্ত্রিক ধারা তাতে ভোটাদের ভোট বিমুখতার অন্যতম কারণ।

সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আমরা এমন একটা দেশ, যে দেশের মানুষ ভোটের রায় প্রতিষ্ঠিত করতে দেশকে স্বাধীন করে ফেললাম ১৯৭১ সালে। আজ সেই ভোটাররা নির্বাচন পদ্ধতি ও নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থাহীনতা প্রকাশ করছে। আর যারা নির্বাচন পরিচালনা করেন তারাও কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতাসীনদের হয়ে কাজ করতে বাধ্য হন। তাছাড়া বিএনপির মতো একটি বড় দল এ নির্বাচনে অংশ না

নেয়ায় একটি বড় অংশের ভোটার নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। সে কারণে ভোটার উপস্থিতি কমছে। এটা গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগের।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী মনে করেন, স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচনে ভোট কম পড়ার বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো- অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হওয়া। বিএনপির মতো একটি দল নির্বাচনে না এসে ভোটারদের ভোট দিতে নিরুৎসাহিত করলে, একটা বড় অংশের সমর্থক কেন্দ্রে আসবে না- এটা স্বাভাবিক। আবার ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থী না পেয়েও ভোট দিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এরসঙ্গে এবার আরো একটা ফ্যাক্টর জড়িয়ে পড়েছে- মন্ত্রী-এমপিরা আতœীয়-স্বজনের নির্বাচনে জেতাতে প্রচারে নেমে পড়েছেন। তাদের জন্য প্রশাসন প্রভাবিত হয়ে যায়। আরো একটা বড় কারণ- উপজেলা চেয়ারম্যান কতটা কী উপকারে আসতে পারেন? তারা ডিসি, এসপি, এমপির কাছে অনুগত হয়ে থাকবেন কি না? জনগণকে সেবা দেয়ার মতো কতটুকু ক্ষমতাই বা তাদের আছে? এসব বিবেচনায় অনেকেই কাজ ফেলে কষ্ট করে ভোট দিতে যান না।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, এটা সার্বিকভাবে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ভোট সম্পর্কে ও নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পর্কে আস্থাহীনতার প্রতিফলন। আমাদের যে নির্বাচনী ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি চলছে তাতে ক্রমাগতভাবে ভোটারদের অংশগ্রহণ কমে গেছে। মানুষ মনে করে বর্তমানে নির্বাচনে অনেক নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকে। প্রতিপক্ষের মারামারি, সহিংসতার পাশাপাশি নির্বাচনের পরেও ভোটারদের বাড়িতে হামলা হয়। এসব কারণে অনেক ভোটার কেন্দ্রমুখী হন না।

এদিকে গত বুধবার দ্বিতীয় ধাপের ভোট গ্রহণ শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, নিঃসন্দেহে আমি ব্যক্তিগতভাবে ৩০ শতাংশ ভোটকে কখনোই খুব উৎসাহব্যঞ্জক মনে করি না। একটা প্রধানতম কারণ হতে পারে দেশের একটা বড় রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে ভোট বর্জন করেছে এবং জনগণকে ভোট দিতেও নিরুৎসাহিত করেছে। আমি মনে করি রাজনীতি যদি আরো সুস্থ ধারায় প্রবাহিত হয়, আগামীতে হয়তো ভোটার স্বল্পতার যে সমস্যাটুকু রয়েছে তা কাটিয়ে উঠবে।

উল্লেখ্য ১৫ বছর আগে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালে তৃতীয় উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৬৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। এরপর ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত চতুর্থ উপজেলা নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৬১ শতাংশের মতো। আর ২০১৯ সালে প্রথমবার দলীয় প্রতীকে উপজেলা নির্বাচনে ভোটারের উপস্থিতি ছিল ৪০ দশমিক ২২ শতাংশ।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App