×

প্রথম পাতা

অটোরিকশা চালকদের তাণ্ডব

Icon

প্রকাশ: ২০ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

অটোরিকশা চালকদের তাণ্ডব

কাগজ প্রতিবেদক : রাজধানীতে তাণ্ডব চালিয়েছেন অটোরিকশা চালকরা। ব্যাটারিচালিত এই ত্রিচক্রযান বন্ধের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গতকাল রবিবার মিরপুরে অবস্থান ও বিক্ষোভ কর্মসূচির জেরে পুলিশের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন চালকরা। দিনভর ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পুরো মিরপুর এলাকা পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। এ সময় সাগর মিয়া (২২) নামে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হওয়াসহ আহত হন অনেকে। আগুন দেয়া হয় কালশী মোড় ট্রাফিক পুলিশ বক্সেও। সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে। এ ঘটনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এদিকে পরিবহন-সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি পরিবহন-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অপিরপক্ক সিদ্ধান্তের পরিণতি। ফলে জনগণ ও চালকরা দুর্ভোগে পড়ছেন বা পড়বেন।

সাধারণ রিকশায় ব্যাটারি লাগিয়ে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন করা অগণিত বাহন চলাচল করে রাজধানীসহ সারাদেশে। গত ১৬ মে অনুষ্ঠিত সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা পরিষদের এক সভায় ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের নির্দেশ দেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এরই প্রতিবাদে গতকাল রাজপথে নামের চালকরা। মিরপুর-১, ১১, কালশী ও ১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত রোকেয়া সরণীর বিভিন্ন অংশে সকাল থেকেই অবস্থান নেন তারা। এ সময় ওইসব এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। মেট্রোরেল ও যাত্রীর নিরাপত্তার স্বার্থে মিরপুর-১০ নম্বর স্টেশনের দুটি গেট বন্ধ করে রাখা হয়। স্থানীয়রা জানান, সড়কে অবস্থান নেয়া চালকদের সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা চালালে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করেন বিক্ষোভকারীরা। এর জেরে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়।

দুপুরে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলতে মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় আসেন ঢাকা-১৬ আসনের সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা। তিনি আন্দোলনকারীদের সড়ক ছেড়ে দেয়ার অনুরোধ করেন ও অটোরিকশা চলাচলের বিষয়ে আলোচনার আশ্বাস দেন। তার আশ্বাসে চালকদের একটি অংশ আন্দোলন শেষ করে ফিরতে সম্মত হয়। তবে শেওড়াপাড়া থেকে আসা শ্রমিকদের একাংশ লাঠি হাতে হৈ-হুল্লোড় করে এসে আবারো অবরোধ শুরু করে। এ সময় পুলিশ তাদের সরে যেতে বললে তারা পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় শেওড়াপাড়া দিয়ে মিরপুরের দিকে আসা অটোরিকশা চালকদের একটি অংশ ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে ও লাঠি নিয়ে পুলিশকে ধাওয়া দেয়। মিরপুর গোলচত্বরে ৩টি বাস ভাঙচুর করে অটোরিকশার চালকরা। এ সময় বাসে থাকা যাত্রীরা আতংকিত হয়ে বাস থেকে নেমে পড়েন।

মিরপুর থানার ওসি মুন্সি সাব্বির জানান, গতকাল সকাল থেকে প্রায় ৪ ঘণ্টা অবরোধের কারণে সড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েন। আড়াইটার দিকে মিরপুর-১০ নম্বর গোল চত্বরের একপাশ দিয়ে বাস চলাচল শুরু করলে ৩টি বাস ভাঙচুর করে অটোরিকশা চালকরা।

তবে পুলিশের বাধায় তারা সেখান থেকে সরে যায়। পুলিশের বাধার মুখে ও ধাওয়ায় মিরপুর-১০ এলাকা থেকে অটোচালকরা সরে কালশীতে এসে অবস্থান নেয়। সড়ক আটকে দিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। এ সময় অনেকের হাতে লাঠি দেখা যায়। তারা গাড়ি ভাঙচুর করতেও উদ্যত হয়। সড়কের মাঝখানে রশি টানিয়ে দিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেয় তারা। একপর্যায়ে সড়কে গাড়ি আড়াআড়িভাবে রাখতে বাস চালকদের বাধ্য করেন অটোরিকশার চালকরা। এতে ওই সড়ক ব্যবহারকারী হাজার হাজার যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েন। গন্তব্যে যেতে মানুষকে পায়ে হেঁটে রওনা দিতে দেখা যায়।

বিকালে কালশী মোড় ট্রাফিক পুলিশ বক্সে আগুন ধরিয়ে দেন আন্দোলনকারীরা। প্রথম দিকে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দিতে চাইলে অটোরিকশা চালকরা পুলিশকে ধাওয়া দেয়। পরে পুলিশের সংখ্যা বাড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়া হয়। এ সময় বিক্ষোভকারীরা পুলিশের দিকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করলে পুলিশও পাল্টা অ্যাকশনে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ রাবার বুলেট ছুড়লে সাগর মিয়া নামে এক টেইলার্স কর্মী গুরুতর আহত হন।

তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসা রাকিবুল ইসলাম জানান, তাদের বাসা মিরপুর-১১ নম্বর সেকশন, বাউনিয়াবাদ এলাকায়। এলাকায় একটি টেইলার্সে কাজ করেন সাগর। তারা দুজন আজ সকালে একটি কাজে উত্তরায় গিয়েছিলেন। বিকালে সেখান থেকে মিরপুরের বাসায় ফিরছিলেন। পথে কালশী মোড়ে এসে দেখেন, পুলিশের সঙ্গে অটোরিকশা চালকদের সংঘর্ষ হচ্ছে। অটোরিকশা চালকদের দমাতে পুলিশ সেখানে গুলি চালাচ্ছিল। তখন সেই সংঘর্ষের মাঝে পড়ে গেলে সাগরের গলা ও বাম কাঁধে ৪-৫টি গুলি লাগে। গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় পড়ে গেলে তাকে প্রথমে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়।

পল্লবী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোখলেসুর রহমান বলেন, কালশী মোড়ে অবস্থিত একটি পুলিশ বক্সে আগুনের ঘটনা ঘটে। এটি ট্রাফিক পুলিশের একটি বক্স। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। পল্লবী ফায়ার স্টেশনের পরিদর্শক সাইফুল ইসলাম জানান, খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইঞ্জিন ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে। যদিও রিকশাচালকদের বাধার মুখে পড়েন দমকল কর্মীরা।

এদিকে ব্যাটারিচালিত একাধিক চালকের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, বাধ্য হয়ে রাস্তায় নেমেছেন তারা। অটোরিকশা বন্ধ থাকায় তাদের কোনো উপার্জন নেই। কীভাবে সংসারের খরচ চালাবেন; তার মধ্যে কিস্তির টাকাও রয়েছে অনেকের। এর মধ্যে অনেক চালককে পুলিশ আটক করেছে। বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে দেয়া পর্যন্ত অটোরিকশা চালানোর সুযোগ দেয়ার দাবি জানান তারা।

মিরপুর ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) জসিম উদ্দিন মোল্ল্যা ভোরের কাগজকে বলেন, সরকারি নির্দেশনার পর মিরপুর এলাকা থেকে অটোরিকশা বন্ধ করে দেয়া হয়। এর প্রতিবাদে রবিবার সকাল থেকে চালকরা মিরপুর-১০ গোলচত্বরে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন এবং যান চলাচল বন্ধ করে দেন। স্থানীয় সংসদ সদস্যও কথা বলেন তাদের সঙ্গে। অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে প্রায় ৪ ঘণ্টা অপেক্ষার পরও তারা নিবৃত না হলে সাধারণ নাগরীকদের স্বার্থে মিরপুর-১০ নম্বর চত্বরে থাকা চালকদের বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়। তারা এ সময় বেশ কয়েকটি বাস ভাঙচুর করে। পরে মিরপুর-১০ নম্বর থেকে সরে তারা কালশীতে গিয়ে রাস্তায় ও পুলিশ বক্সে আগুন দেয়। তিনি বলেন, সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে। পরিস্থিতি এখন পুরোপুরি অনুকূলে রয়েছে। আর যারা আইন ভেঙেছেন; আগুন ও গাড়ি ভাঙচুর করেছেন তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত ১৫ মে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে ঢাকার রাস্তায় ব্যাটারিচালিত রিকশা নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকের পর সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এসব সিদ্ধান্তের কথা সাংবাদিকদের জানান। তিনি বলেন, সারাদেশে মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে এবং এসব যানবাহনে হতাহতের হার বেশি। ঢাকা শহরে কোনো ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার চলবে না। এর আগে আমরা ২২টি হাইওয়েতে এটি নিষিদ্ধ করেছিলাম। এরই ধারাবাহিকতায় অভিযান শুরু করে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ।

২০২৩ সালের বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যমতে, যাদের মোটর চালিত গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা নেই, এমন চালকদের বেপরোয়া চলাচলের কারণে ব্যাটারি রিকশার স্পষ্ট নিরাপত্তা সমস্যা রয়েছে। ওই বছর ৮ হাজার ৫৫টি যানবাহন দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল। এর মধ্যে ১৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ ছিল ব্যাটারিচালিত রিকশা এবং ইজিবাইক। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) ২০১৯ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ঢাকায় ১১ লাখের বেশি প্যাডেল রিকশা এবং ২ লাখের বেশি ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এবং বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল হক ভোরের কাগজকে বলেন, শহরাঞ্চলসহ দেশের অনেক এলাকার সড়কেই অটোচালিত রিকশা এখন নির্ভরযোগ্য যানবাহনে রূপ নিয়েছে। কোনো পরিকল্পনা ছাড়া হঠাৎ বন্ধের সিদ্ধান্ত অপরিপক্ক। কারণ কোনো সমস্যার গোড়ায় না গেলে তা সমাধান হয় না। তিনি বলেন, যানবাহন-সংক্রান্ত কিছু বন্ধে যেতে হলে এর সহজলভ্যতা বন্ধ করতে হবে। কারা গাড়িগুলোর যন্ত্রাংশ আনছে, কীভাবে আসছে- সেগুলো বন্ধ করতে হবে। ইতোমধ্যে যারা জড়িয়ে পড়েছেন তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা ভাবতে হবে। তা না করে চলতে দেয়া হবে না- এমন সিদ্ধান্ত এ ধরনের সংঘর্ষ ও জনদুর্ভোগের কারণ হবে। তাই স্মার্টলি ভেবেই কাজ করতে হবে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App