×

প্রথম পাতা

শেয়ার নিয়ে দ্বন্দ্বে কাজ বন্ধ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের

Icon

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

শেয়ার নিয়ে দ্বন্দ্বে কাজ বন্ধ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের

এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে

বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার-ভিত্তিক মেগা প্রকল্প ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ এখন পুরোপুরি বন্ধ। গত তিন মাসে ৮০ শতাংশের বেশি কর্মীকে বিনা বেতনে ছুটিতে পাঠানো হয়েছে। নির্মাণকাজে সম্পৃক্ত চীন ও থাইল্যান্ডের তিন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার নিয়ে দ্ব›দ্ব চরমে পৌঁছেছে। বিষয়টি আদালতে গড়িয়েছে। আদালতে সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত কাজ বন্ধই থাকবে। চায়না ব্যাংক অব এক্সিম জানিয়ে দিয়েছে, ইতালিয়ান থাই কোম্পানির শেয়ার চীনের প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে আর কোনো টাকা দেবে না। এদিকে থাইল্যান্ডের প্রতিষ্ঠানটি তাদের শেয়ার হস্তান্তরে রাজি নয়।

প্রকল্পের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চীনের দুটি ব্যাংক এই প্রকল্পে ঋণসহায়তা দিয়ে আসছিল। চীনের আর্থিক প্রতিষ্ঠান দুটির সঙ্গে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকার ঋণ চুক্তি হয়। এরই মধ্যে ১৯ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে ৮ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। সরকারি-বেসরকারি (পিপিপি) অংশীদারত্বে নির্মাণাধীন এই প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকার দেবে ২ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা। বাকি ঋণ দেবে থাইল্যান্ডের ইতালিয়ান-থাই ডেভেলপমেন্ট পাবলিক কোম্পানি লিমিটেড এবং চীনের দুটি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান- শ্যানডং ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কো-অপারেশন গ্রুপ ও সিনোহাইড্রো করপোরেশন লিমিটেড। এখন প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা। কিন্তু শেয়ারসংক্রান্ত জটিলতার কারণে গত ১৭ জানুয়ারি হঠাৎ করেই চীনের এক্সিম ব্যাংক ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাংক অব চায়না (আইসিবিসি) ঋণের টাকা ছাড় দেয়া বন্ধ করে দেয়। টাকা না থাকায় প্রকল্পের কর্মী ছাঁটাই শুরু হয়। ওই সময় কাওরানবাজার, কমলাপুর অংশের ওয়ার্ক শেডে কাজ বন্ধ হয়।

২০২৩ সালের ২ সেপ্টেম্বর প্রকল্পের কাওলা থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত সাড়ে ১১ কিলোমিটার অংশের কাজ শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যান চলাচলের জন্য উদ্বোধন করেন। ৩ সেপ্টেম্বর থেকে যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়। চলতি বছরের ২০ মার্চ বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) গেটসংলগ্ন একটি র‌্যাম্প খুলে দেয়া হয়। এরপর থেকেই বন্ধ হতে থাকে এক্সপ্রেসওয়ের কাজ।

সরজমিন দেখা যায়, এফডিসির সামনে থেকে এক্সপ্রেসওয়ের সব পিলার উঠে গেছে। কিছু অংশে ওপরের সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এক্সপ্রেসওয়ের নিচে রেললাইনের উত্তর পাশে টিনের বেড়া দিয়ে ওয়ার্ক হেড তৈরি করা হয়েছিল। আগে সেখানে রাত-দিন পুরোদমে কাজ চলেছে। টঙ্গী ডাইভারশন রোড পার হওয়ার পর রেললাইনের দক্ষিণ পাশের ওয়ার্ক শেডেও নির্মাণকাজের সব কিছু পড়ে আছে। ক্রেন, হেভি ট্রাক, ছোট ট্রাকসহ সব পড়ে আছে। নির্মাণ শ্রমিকদের পদচারণা, ক্রেন, ভারী ট্রাক চলাচলের কারণে আগে যেখানে মুখরিত থাকত, এখন সেখানে ৫ জন নিরাপত্তাকর্মী মালামালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন।

শামীম নামের এক নিরাপত্তাকর্মী জানান, এই অংশে গত কয়েক মাস ধরে কাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। সব কর্মীদের ছাঁটাই করা হয়েছে। পিলারের ওপর সড়ক নির্মাণের কাজ এখান থেকেই করা হতো। মালিবাগ পর্যন্ত সব পিলার উঠে যাওয়ার পর কমলাপুর ওয়ার্ক স্টেশন থেকে গার্ডার এনে স্থাপন করা হতো। এখন কমলাপুরে গার্ডার নির্মাণকাজও পুরোপুরি বন্ধ আছে বলে শুনেছি। মগবাজার, মালিবাগ, শাহজাহানপুর ও কমলাপুর অংশের কাজও পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। কমলাপুরের টিটিপাড়ার ওয়ার্ক ইয়ার্ড একেবারেই জনমানবহীন। যানবাহন ও মালপত্র পড়ে আছে। আগে এই ইয়ার্ডের ভেতরেই গার্ডার তৈরি হতো। কিন্তু এখন তা পুরোপুরি জনমানবশূন্য বিরান অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।

জানা গেছে, ২০১১ সালে দেশের প্রথম এলিভেটেড এসপ্রেসওয়ের কাজ পায় থাইল্যান্ড-ভিত্তিক নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ইতালিয়ান-থাই ডেভেলপমেন্ট পাবলিক কোম্পানি লিমিটেড। কিন্তু টাকার জোগাড় করতে না পারায় ৮ বছরেও কাজ শুরু করতে পারেনি। ২০১৯ সালে চাইনিজ দুই কোম্পানি শ্যানডং ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যান্ড টেকনিক্যাল কো-অপারেশন গ্রুপ ও সিনোহাইড্রো করপোরেশন লিমিটেডকে এই প্রকল্পের কাজের সঙ্গে যুক্ত করার পর কাজ শুরু হয়। এ কাজে তিন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার যথাক্রমে- ৫১, ৩৪ ও ১৫ শতাংশ। এখন এই শেয়ার নিয়েই দ্বন্দ্বের কারণে প্রকল্পের কাজ বন্ধ রয়েছে। চীনা বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান অর্থ ছাড় করছে না। এরই মধ্যে প্রকল্পের অর্ধেক কাজ শেষ হয়েছে।

তবে শেয়ার নিয়ে দ্বন্দ্বের সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত প্রকল্পের বাকি কাজ শুরুর আর সম্ভাবনা নেই বলে জানা গেছে। শেয়ার নিয়ে দ্বন্দ্বের বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ হলো এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্বাহী প্রতিষ্ঠান। প্রকল্পের চুক্তি অনুযায়ী নির্মাণ ব্যয়ের ৭৩ শতাংশের জোগান দেবে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। আর ২৭ শতাংশ দেবে বাংলাদেশ সরকার।

২০২৪ সালের মধ্যেই ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ শেষ হবে বলে মন্ত্রণালয় আশা করেছিল। তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে ২০২৫ সালের আগে আর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ শেষ হচ্ছে না। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে কাওলা থেকে এক্সপ্রেসওয়ের যাত্রা শুরু হয়। এরপর রেললাইনের ওপর দিয়ে তেজগাঁও, মগবাজার, মালিবাগ, খিলগাঁও, কমলাপুর হয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালীতে গিয়ে শেষ হবে।

প্রকল্প পরিচালক এ এইচ এম সাখাওয়াত আখতার জানিয়েছেন, আমরা টাকা পেলে প্রকল্পের কাজ করব। টাকা না পেলে তো কাজ করা যাবে না। ঋণের টাকা ছাড় হওয়ার বিষয়টি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের। বর্তমান অচলাবস্থার বিষয়গুলো বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এবং মন্ত্রণালয় দেখবে।

আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা : এদিকে গত বৃহস্পতিবার ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে ইতালিয়ান-থাই কোম্পানির শেয়ার চীনের সিনোহাইড্রো করপোরেশন লিমিটেডের কাছে হস্তান্তরের ওপর দুই সপ্তাহের স্থিতাবস্থা জারি করেছেন আপিল বিভাগ। এর ফলে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজ আপাতত বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছেন আইনজীবী। প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে ৮ বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

চীনা কোম্পানির পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মেহেদী হাছান চৌধুরী জানান, ইতালিয়ান-থাই কোম্পানির শেয়ার চীনের সিনোহাইড্রো করপোরেশন লিমিটেডের কাছে হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে হাইকোর্টের আদেশের ওপর আপিল বিভাগ দুই সপ্তাহের স্থিতাবস্থা দিয়েছেন।

থাইল্যান্ড-ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ইতালিয়ান-থাই কিস্তির টাকা দিতে না পারায় তাদের শেয়ার দাবি করে চীনা প্রতিষ্ঠান। এই নিয়ে সিঙ্গাপুরে আরবিট্রেশন চলা অবস্থায় এই প্রকল্প নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্ব›দ্ব গড়ায় আদালত পর্যন্ত। সেই সঙ্গে ঋণ সহায়তা বন্ধ করে দেয় দুটি চীনা ব্যাংক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App