×

প্রথম পাতা

ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির অষ্টম জাতীয় সম্মেলন

সাম্প্রদায়িক অপশক্তি সব অর্জন গ্রাস করতে চাইছে

Icon

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কাগজ প্রতিবেদক : বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার ক্ষমতায় থাকলেও সমাজ মৌলবাদীদের হাতে চলে গেছে। সাম্প্রদায়িক অপশক্তি সব অর্জন গ্রাস করতে চাইছে। এ অবস্থায় সরকারকে আপসের পথ পরিহার করতে হবে। সামাজিক শক্তিগুলোকেও ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। তাহলেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ধর্মনিরপেক্ষ মানবিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব বলে মনে করছেন প্রগতিশীল আন্দোলন সংগ্রামে থাকা দেশের বিশিষ্টজনরা। গতকাল শনিবার একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির অষ্টম জাতীয় সম্মেলনে অংশ নিয়ে নিজেদের এই উদ্বেগের কথা জানান তারা। একইসঙ্গে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের নিরাপত্তার কথা ভেবে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শ তুলে ধরেন। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সারাদেশ থেকে অসংখ্য প্রতিনিধি এই সম্মেলনে যোগ দেন। এ উপলক্ষে পুরো প্রাঙ্গণটি বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন দিয়ে সাজানো হয়। সকালে জাতীয় সম্মেলনের উদ্বোধন করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। দুপুরের পর দ্বিতীয় অধিবেশনে বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্টজনরা বক্তব্য রাখেন। বক্তাদের মধ্যে ছিলেন- মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা আ ক ম মোজাম্মেল হক, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন ইউসুফ, সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ প্রমুখ। এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন নির্মূল কমিটির সহসভাপতি শহীদজায়া শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী।

আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, সরকারকে কোনো কোনো সময় আপস করতে হলেও, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি সব সময় সক্রিয়। সরকার চেষ্টা করছে। তবে সরকারের বাইরে থেকেও অনেক কিছু করার আছে। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ গড়ার জন্য সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে কাজ করার আহ্বান জানান মন্ত্রী।

সরকার আপস করছে বলে অভিযোগ করেন রাশেদ খান মেনন। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে লড়াই আমরা শুরু করেছিলাম তা থেকে বহু দূরে চলে গেছি। ক্রমাগত আত্মসমর্পণ করছি আমরা। এ প্রসঙ্গে মৌলবাদীদের হুমকির মুখে পাঠ্যপুস্তক থেকে তৃতীয় লিঙ্গবিষয়ক একটি রচনা সরিয়ে নেয়ার কথা উল্লেখ করেন। বলেন, পাঠ্যপুস্তক থেকে প্রখ্যাত কবি, লেখকদের লেখাও সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে হয়তো দেখব পাঠ্যবইয়ে কী যাবে না যাবে তা ঠিক করার জন্য এনসিটিবিতে হেফাজতের সদস্য রাখা হবে। লালনের গানের কথা প্রচার করায়

সম্প্রতি এক ভক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তিনি বলেন, পুলিশ কর্মকর্তা কী করে এই কাজটি করতে পারলেন? তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে আমরা জানি না। মুক্তিযুদ্ধের যে আদর্শের কথা বলি আমরা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় আচরণে তা পাচ্ছি না।

হাসানুল হক ইনু বলেন, দেশে এখন মোল্লাতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে। রাজনৈতিক মোল্লারা ধর্মকে সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে। জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে। স্বাধীনতার বিরুদ্ধে, গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে। এই মোল্লাতন্ত্রের প্রধান পৃষ্ঠপোষক বিএনপি। মৌলবাদী যত পাখি, সব এসে বিএনপির ডালে আশ্রয় নিয়েছে। বাসা বেঁধেছে। সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেন, এই সব পাখিদের খুদ-কুড়া দিয়ে কাছে ডেকে লাভ হবে না। মৌলবাদীদের পোষা পাখি মানা আওয়ামী পাখি হবে না। তিনি বলেন, বিএনপি এবং মোল্লাতন্ত্র- এমনকি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের সংবিধান প্রভৃতি মীমাংসিত বিষয় অস্বীকার করছে। যারা গণতন্ত্র বা নির্বাচন নিয়ে কথা বলছেন তারা মীমাংসিত এসব বিষয়ে ঐক্যমত প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কোনো কথা বলছেন না। এসব বিষয়ে একমত না হতে পারলে যুদ্ধাবস্থা চলতে থাকবে। যুদ্ধাবস্থায় গণতন্ত্রের আলোচনা ফলপ্রসূ হবে না।

রামেন্দু মজুমদার বলেন, সরকারে মুক্তিযুদ্ধের শক্তি; কিন্তু সমাজটা বেদখল হয়ে গেছে। মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তির হাতে চলে গেছে সমাজ। আমি মনে করি শিক্ষা, সংস্কৃতি, গণমাধ্যম- এই তিন ইস্যুতে অনেক কাজ করার আছে আমাদের। শিক্ষাক্ষেত্রে আমরা যদি একেবারে পাঠ্যসূচি থেকে শুরু করে ছেলেমেয়েদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা না বলতে পারি তাহলে সামনে এগিয়ে যেতে পারব না। একই উদ্দেশ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। তৃণমূল পর্যন্ত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি। হতাশার সুরে বলেন, আমরা আগে যেভাবে সংস্কৃতিকর্মীদের জড়ো করতে পারতাম এখন পারি না। তিনি বলেন, গণমাধ্যমে সারাদিন ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বা ‘বঙ্গবন্ধু’ ‘বঙ্গবন্ধু’ করলে কাজ হবে না। পরিমিতি বোধটা বুঝতে হবে। নতুন প্রজন্ম যেন আকৃষ্ট হয় সেভাবে অনুষ্ঠানগুলো পরিকল্পনা করতে হবে।

‘প্রশাসনিক সাম্প্রদায়িকতা’ নিয়েও কথা বলেন রামেন্দু মজুমদার। তিনি জানতে চান, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চিন্তা আপনি কাদের দিয়ে বাস্তবায়ন করবেন? সরকারের প্রশাসনে এখনো সাম্প্রদায়িক অপশক্তি আছে। পাকিস্তানি ভূত বিরাজ করছে। এসব দূর করার দাবি জানান তিনি। সেই সঙ্গে সামাজিক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ারও আহ্বান জানান।

গোলাম কুদ্দুছ বলেন, ঐক্যবদ্ধভাবে অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধারণ না করলে রাষ্ট্র অসাম্প্রদায়িক হবে না। আমরা সংস্কৃতিকর্মীরা মনে করি, দেশে যে উন্নয়ন হয়েছে তা অভাবনীয়। কিন্তু চিন্তাচেতনা মননে আমরা দরিদ্র হয়ে যাচ্ছি। দারিদ্র্য দূর করতে। এ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য গ্রাম থেকে রাজধানী পর্যন্ত সাংস্কৃতিক জাগরণ চাই। তিনি বলেন, রাজনীতি সাম্প্রদায়িক হলে এর প্রভাব সংস্কৃতির ওপরও পরবে। তাই রাজনীতিকে আগে সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত হতে হবে।

পরে দুপুরে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়। মিলনায়তনের সামনের রাস্তা থেকে দোয়েল চত্বর হয়ে পুনরায় সম্মেলন কেন্দ্রে এসে শেষ হয় শোভাযাত্রা। সন্ধ্যায় বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় অধিবেশন সমাপ্ত হয়। সংগঠনের কেন্দ্রীয় ও বিভাগীয় নেতাদের রিপোর্ট পেশ করার মাধ্যমে সম্মেলনের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হয় সন্ধ্যায়। সমাপনী অধিবেশনে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্র ও বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধিরা। এরপর অষ্টম জাতীয় সম্মেলনের প্রস্তাব, আগামী ৩ বছরের কর্মসূচি ঘোষণা এবং নতুন কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী ও উপদেষ্টা পরিষদের নাম ঘোষণার মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী সম্মেলনের সমাপ্তি ঘটে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App