×

প্রথম পাতা

ইতিহাসের মোড় ঘুরানো দিন

Icon

ঝর্ণা মনি

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ইতিহাসের মোড় ঘুরানো দিন
‘পঁচাত্তরের কলঙ্কিত সেই রাত্রির পর/ নৌকা ডোবে নদীর জলে/ সবাই বলে নৌকা তুলে ধর/ কেইবা তোলে কে আসে আর/ স্বপ্নবাহু তাঁর/ বঙ্গবন্ধু কন্যার।’ সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের লেখা ‘শেখ হাসিনা’ কবিতায় বাংলাদেশ নামক ডুবন্ত তরীকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বিশ্বসভ্যতায় তুলে ধরেছেন রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা। মায়ের আঁচল বিছিয়ে সন্তানসম বাঙালিকে বুকে আগলে জাতিকে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন শেখ হাসিনা। 

গত চার দশক ধরে ‘লেডি উইথ দ্য ল্যাম্পের’ মতোই বঙ্গবন্ধুর নৌকা প্রতীক নিয়ে ছুটে চলেছেন গ্রাম থেকে গ্রামে। টানা ১৫ বছর ধরে রেখেছেন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের হাল। বুলেট-বোমা তাড়া করে ফেরা মৃত্যুকে তুচ্ছ করে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন অর্থনীতির চাকা। হেনরি কিসিঞ্জারের বটমলেস বাস্কেটকে বিশ্বে পরিচিত করেছেন উন্নয়নের ‘রোল মডেল’ হিসেবে। 

সাবমেরিন ক্যাবল থেকে মহাশূন্যে লাল-সবুজের পতাকার জয়- আত্মপ্রত্যয়ী নন্দিত রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার সাফল্যগাথা আজ দেশে-বিদেশে স্বীকৃত। বাংলাদেশের রাজনীতি-অর্থনীতির উন্নয়ন সাফল্যের ইতিহাসে ১৯৮১ সালের ১৭ মে এক তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ইতিহাসের মোড় ঘুরানো এই দিনে সামরিক শাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দেশে ফিরেছিলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। 

মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনরুদ্ধার ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অভিযাত্রায় তার ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্টের পর যখন প্রবঞ্চক বিশ্বাসঘাতক খুনি দেশদ্রোহীরা প্রিয় মাতৃভূমিকে ক্ষত-বিক্ষত করে তুলেছিল; আমাদের জাতীয় জীবন যখন জাতিদ্রোহীদের অত্যাচারের প্রচণ্ড দাবদাহে বিপর্যস্ত- তখন শেখ হাসিনার ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ছিল শ্রাবণের বারিধারার মতো পাহাড় সমান বাধা জয়ের অনন্ত অনুপ্রেরণা। 

ওইদিন বঙ্গবন্ধু কন্যার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে অশ্রু-বারিসিক্ত জন্মভূমিতে সংকটজয়ের বীজ রোপিত হয়েছিল; মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ বিনির্মাণের দৃঢ় প্রত্যয়ে প্রদীপ্ত অগ্নিশপথের রৌদ্রালোকে উদ্ভাসিত হয়েছিল বাঙালি জাতি। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার নিরবচ্ছিন্ন দীর্ঘ সংগ্রাম শুরু হয়। দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে সামরিক জান্তা ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে চলে তার অকুতোভয় সংগ্রাম। জেল-জুলুম, অত্যাচার কোনো কিছুই তাকে তার পথ থেকে টলাতে পারেনি এক বিন্দু। শত প্রতিকূলতাতেও হতোদ্যম হননি কখনো। বাংলার মানুষের হারিয়ে যাওয়া অধিকার পুনরুদ্ধার করতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি বার বার স্বৈরাচারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করেছেন, আবির্ভূত হয়েছেন গণতন্ত্রের মানসকন্যা রূপে। 

গৃহবধূ থেকে রাজপথে : একাত্তর থেকে একাশি- বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা তখন শুধুই গৃহবধূ। পঁচাত্তরে সব হারানো শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নিতে রাজি করাতে দিল্লিতে যান আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, প্রয়াত জিল্লুর রহমান, প্রয়াত আব্দুর রাজ্জাক, প্রয়াত আব্দুস সামাদ আজাদ ও আমির হোসেন আমু। শেখ হাসিনার স্বামী প্রয়াত পরমাণুবিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার লেখা ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ’ বই থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত এ প্রস্তাবে ওয়াজেদ মিয়ার সম্মতি ছিল না। অবশ্য শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই তাকে দলের সভাপতি করা হয়। 

১৯৮১ সালের ১৭ মে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিন লাখ লাখ জনতার উদ্দেশে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেছিলেন, আমি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ প্রতিষ্ঠার একজন কর্মী, আপনাদের কাছ থেকে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করার জন্য আপনাদের নিয়ে নিরলস সংগ্রাম করে যাব। ঐতিহাসিক ক্ষণে দাঁড়িয়ে জনগণকে দেয়া ওয়াদা পূরণে আজো দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগ সভাপতির দায়িত্ব নেয়ার পর দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্বৈরশাসনের অবসান, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বাঙালির ভাত ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটেছে। 

খাদ্যে স্বয়ংস্পূর্ণতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর খুনি ও একাত্তরের নরঘাতক মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্য সম্পন্ন এবং রায় কার্যকর করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্ব, যোগ্যতা, নিষ্ঠা, মেধা-মনন, দক্ষতা, সৃজনশীলতা, উদার গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও দূরদর্শী নেতৃত্বে এক সময় দারিদ্র্য-দুর্ভিক্ষে জর্জরিত যে বাংলাদেশ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম করত; সেই বাংলাদেশ আজ বিশ্ব জয়ের নবতর অভিযাত্রায় এগিয়ে চলছে। বিশ্ব সভায় আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ। 

বাংলাদেশ তলাবিহীন ঝুঁড়ির অপবাদ ঘুচিয়ে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়েছে। শেখ হাসিনা তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সততা, মেধা, দক্ষতা ও গুণাবলিতে সমসাময়িক বিশ্বের অন্যতম সেরা রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। আপন কর্ম মহিমায় হয়ে উঠেছেন নব পর্যায়ের বাংলাদেশের নতুন ইতিহাসের নির্মাতা; হিমাদ্রী শিখর সফলতার মূর্ত-স্মারক, উন্নয়নের কাণ্ডারি। উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশের রূপকার বাঙালির আশা-আকাক্সক্ষা বিশ্বস্ত ঠিকানা, বাঙালির বিশ্বজয়ের স্বপ্ন-সারথি। বিশ্ব রাজনীতির উজ্জ্বলতম প্রভা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পিছিয়ে পড়া দেশ-জাতি জনগোষ্ঠীর মুখপাত্র হিসেবে বিশ্ব নন্দিত নেতা। বারবার মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসা ‘নীলকণ্ঠ পাখি’ মৃত্যুঞ্জয়ী মুক্তমানবী। তিমির হননের অভিযাত্রী মানবতার মা, আত্মশক্তি-সমৃদ্ধ সত্য-সাধক। 

প্রগতি-উন্নয়ন শান্তি ও সমৃদ্ধির সুনির্মল-মোহনা। শেখ হাসিনার দীর্ঘ চার দশকের আন্দোলন-সংগ্রামের এ পথচলা কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না; ছিল কণ্ঠকাকীর্ণ ও বিপদসংকুল। গণমানুষের মুক্তির লক্ষ্যে আন্দোলন সংগ্রাম করার অপরাধে তাকে বারবার ঘাতকদের হামলার শিকার ও কারা নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে। কিন্তু তিনি বাংলার মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে পিতার মতোই অবিচল, দৃঢ় ও সাহসী তিনি। জনগণের ভালোবাসায় অভিষিক্ত হয়ে টানা চতুর্থ বারের মতো রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেয়ে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং সব শ্রেণি ও পেশার মানুষের কল্যাণে যুগান্তকারী অবদান রেখে চলেছেন শেখ হাসিনা।

তার নেতৃত্বে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ‘তুমি ভূমিকন্যা’ শিরোনামের কবিতায় কবি মুহাম্মদ সামাদের উচ্চারণ যেন আজ বিশ্বের সব বাঙালির উচ্চারণ- ‘ঘাতকের রক্তচক্ষু মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে/ স্বজনের রক্তেভেজা এই বাংলায়/ বুকে কষ্টের পাথর চেপে/ চোখে অশ্রুর সমুদ্র নিয়ে/ ক্লান্তিহীন তুমি ছুটে যাও গ্রাম থেকে গ্রামে/ শহরের পোড়া বিধ্বস্ত বস্তিতে;/ মায়ের মমতা দিয়ে বুকে নাও দুখিনীরে।’

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App