×

প্রথম পাতা

মিল্টনের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভিত্তি মিলছে না, রহস্যের গন্ধ

Icon

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

 মিল্টনের বিরুদ্ধে অভিযোগের  ভিত্তি মিলছে না, রহস্যের গন্ধ
কাগজ প্রতিবেদক : মানবতার ফেরিওয়ালা খ্যাতি পাওয়া ‘চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এইজ কেয়ার’ আশ্রমের চেয়ারম্যান মিল্টন সমাদ্দারকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার শেষ নেই। শিশু পাচার, ইয়াবা সেবন করে আশ্রমে আশ্রিতদের টর্চার সেলে নিয়ে অমানষিক নির্যাতন, ভুয়া মৃত্যুসনদ দিয়ে লাশ দাফন, নিজেই ডাক্তার সেজে অপারেশন করা, সহায়সম্বলহীন মানুষের কিডনি বিক্রি করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বিভিন্ন সহানুভূতিশীল ভিডিও দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎসহ বিস্তর অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। ইতোমধ্যে ঢাকার সাভার ও রাজধানীর মিরপুর মডেল থানায় পৃথক অভিযোগে ৪টি মামলা দায়ের হয়েছে মিল্টন সমাদ্দারের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তাকে গ্রেপ্তারের পর গত ২ মে মিরপুর থানায় একসঙ্গে ৩টি মামলা দায়ের করে। পরে তাকে রিমান্ডে এনে ডিবির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে লোমহর্ষক বিভিন্ন তথ্য জানানো হয়। যেগুলো মিল্টন সমাদ্দার রিমান্ডের জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন বলে জানানো হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মিল্টন সমাদ্দারের বিরুদ্ধে যে তথ্য গণমাধ্যমে আসছে, আর যতগুলো অভিযোগ আনা হয়েছে- সেগুলো কতটুকু সত্য। আর দুস্থ অসহায়, ঘরহীন, পরিচয়হীন মানুষের প্রিয় মানবিক মিল্টন হঠাৎ কেন এমন অমানবিক হয়ে উঠলেন? বিশেষ করে মিল্টন সমাদ্দারের আশ্রমে আশ্রিতরা ও প্রতিবেশীরা এখনো তার পক্ষে অবস্থান করায় জনমনে নতুন করে এই প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে আসছে এক ব্যক্তির সঙ্গে একটি রাস্তাসংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে দ্ব›েদ্বর তথ্যও। এমনকি তদন্তসংশ্লিষ্ট সংস্থাও মৃত্যুর সনদ জালিয়াতির বিষয়টি ব্যতীত এখনো তেমন কোনো তথ্য জোগাড় করতে পারেনি। শিশু পাচারের অভিযোগে যে মামলা দায়ের করা হয়েছে সেটির এজাহারেও দুর্বলভাবে অভিযোগ উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে মিল্টন সমাদ্দারের কর্মকাণ্ড এখনো রহস্যের বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। মিরপুর মডেল থানায় ভুয়া মৃত্যুর সনদ, নির্যাতন ও পাচারের অভিযোগে দায়ের হওয়া ৩টি মামলার তদন্ত করছে ডিবি মিরপুর বিভাগ। মামলাগুলোর তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র ভোরের কাগজকে জানায়, মিল্টন সমাদ্দারের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে- এর মধ্যে মৃত্যুসনদ জালিয়াতির কথা তিনি রিমান্ডের জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন। জাল সনদও উদ্ধার করা হয়েছে। যে প্যাডে তিনি জাল সনদ দিতেন, সেটির মাঝখানে বেশ কয়েকটি পৃষ্ঠা না থাকায়, এটিও নিশ্চিত হওয়া যায়নি, সত্যিকার অর্থে তিনি কতটি জাল সনদ দিয়েছেন। তবে জিজ্ঞাসাবাদে ১৩৫টি সনদ দেয়ার পর দাফনের কথা জানিয়েছেন। এমনকি যে চিকিৎসকের সিল জাল সনদে ব্যবহার করা হতো, সেই চিকিৎসক ডা. মহিত খানও স্বীকার করেছেন- কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে মনগড়া মৃত্যুসনদ দিতেন মিল্টন সমাদ্দার। তবে অন্য বিষয়গুলো নিয়ে এখনো তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। নির্যাতনের অভিযোগে একটি মামলা হয়েছে। ওই ভিকটিম ছাড়া আর কোনো ভিকটিমকে পাওয়া যায়নি। আশ্রমে আসলেও টর্চার সেল ছিল কি না- সেটিরও সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ নেই। তবে ফেসবুক সেলিব্রেটি হওয়ার পর মানুষের সঙ্গে খারাপ আচরণ করতেন মিল্টন। এজন্য প্রতিবেশীদের সঙ্গেও সম্পর্ক ভালো ছিল না। কিডনি বিক্রির যে অভিযোগ উঠেছে- সেটিরও কোনো ভিকটিম পাওয়া যায়নি। তবে গণমাধ্যমে এসেছে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ থেকে প্রায় ছয় মাস আগে নিখোঁজ হওয়া মানসিক ভারসাম্যহীন মো. সেলিম পেটে কাটা দাগ নিয়ে বাড়িতে ফিরেছেন। তার স্বজনরা তাকে মিল্টন সমাদ্দারের আশ্রয়কেন্দ্র থেকে উদ্ধার করেছেন। বিষয়টি স্থানীয় থানাকে জানানো হয়েছে। ওই ব্যক্তিকে ময়মনসিংহ মেডিকেলে নিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে রিপোর্ট ডিবিকে তথ্য জানাতে বলা হয়েছে। থানাপুলিশ ওই রিপোর্ট পাঠালে কিডনি বিক্রির বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। মিল্টন সমাদ্দারের বিষয়ে শিশু পাচারের যে অভিযোগ আনা হয়েছে মামলায়, সেটিরও সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পায়নি ডিবি। মামলার বাদী এম রাকিব এজহারে উল্লেখ করেছেন, ২০২০ সালের ৬ সেপ্টেম্বর শেরেবাংলা নগর থানার ধানমন্ডি বয়েজ স্কুলসংলগ্ন ফুটপাত থেকে ২ বছর বয়সি এক শিশুকে উদ্ধার করে থানায় ফোন করি। থানাপুলিশ ব্যবস্থা না নেয়ায় মিল্টন সমাদ্দারের আশ্রমে রেখে আসি। ২০২১ সালের অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের মাধ্যমে জানতে পারি মিল্টন ওই শিশুটিকে পাচার করেছেন। কিন্তু অজ্ঞাতনামা ওই ব্যক্তি কারা? পাচার কবে কীভাবে করেছেন সেসব বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই এজাহারে। উল্টো মিল্টন সমাদ্দার আদালতকে জানিয়েছেন, ফুয়াদ নামের শিশুটি জসিম নামে এক ব্যক্তির কাছে রয়েছে। শিশুটির পরিচয় এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি তদন্তকারীরা। শনাক্ত করা যায়নি পরিচয়। তবে গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছেন শিশুটি দেশেই রয়েছে। অর্থাৎ পাচারের অভিযোগও প্রশ্নবিদ্ধই রয়ে গেল। শিশুটিকে পাচার করা হয়েছে নিশ্চিত হলেন কীভাবে? জানতে চাইলে মামলার বাদী এম রাকিব ভোরের কাগজকে বলেন, তদন্তাধীন কোনো বিষয়ে কথা বলতে রাজি নই। যখন বলার সময় হবে তখন বলব। মিল্টন সমাদ্দার নিয়মিত ইয়াবা সেবন করায় সবসময় বদমেজাজি থাকতেন বলে জানিয়েছেন ডিবি কর্মকর্তারা। মিল্টন সমাদ্দারের বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ বলেন, মিল্টনের অপকর্ম বিষয়ে ৫ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। যে শিশুটিকে পাচারের অভিযোগ উঠেছে- সে কোথায় রয়েছে; তা তদন্তে উঠে আসবে। শুধু মিল্টন সমাদ্দার নয়- মানবতার ফেরিওয়ালা নামে আর কেউ এরকম কাজ করে থাকলে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। জমির বিরোধ কেন সামনে আসছে : সাভার থানার কমলাপুর বাজার থেকে কিছুটা ভেতরে গেলেই বাহেরটেক। এই গ্রামের শেষ প্রান্তেই ‘চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এজ কেয়ার’ আশ্রম। গত ১ মার্চ এই ভবনটি উদ্বোধন করা হয়। ঢাকা খ্রিস্টান বহুমুখী সমবায় লিমিটেড থেকে এই জমিটি ক্রয় করেছিলেন মিল্টন সমাদ্দারের বড় ভাই। পরে মিল্টন সেটা কিনে নেন, একই সঙ্গে আরো কিছু জমি তিনি আশ্রমের নামে ক্রয় করেন। বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেন সমিতির পরিচালনা কমিটির সদস্য স্বপন। আশ্রমের বাসিন্দাদের জন্য বহুতল ভবনের পেছনে কবরস্থান করার জন্যও একটি প্লট কেনা হয়। আশ্রমের দক্ষিণ পাশে নামাজ ও স্টাফদের থাকার জায়গার জন্য টিনের ঘর তৈরি করেন। এই ঘরের পেছনেই রয়েছে শামসুদ্দিন চৌধুরী নামে এক ব্যক্তির প্রায় ৫৮ শতাংশ জমি। কিন্তু শামসুদ্দিন চৌধুরীর যাতায়াতের কোনো রাস্তা নেই। এই রাস্তা নিয়েই মিল্টন সমাদ্দার ও শামসুদ্দিন চৌধুরীর মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত। এক সময় মিল্টন সমাদ্দার আশ্রমের পাশ দিয়ে শামসুদ্দিন চৌধুরীকে ৬ ফুটের রাস্তা বের করে দেন। কিন্তু শামসুদ্দিন চৌধুরী দাবি করেন, ১২ ফুট রাস্তা ছেড়ে দিতে হবে। যেন তিনি তার গাড়ি নিয়ে জমিতে পৌঁছাতে পারেন। কিন্তু মিল্টন আর জমি দিতে রাজি হননি। তার বক্তব্য, দলিলে ৬ ফুট আছে, তাই তিনি ৬ ফুটই দেবেন। শামসুদ্দিন চৌধুরীর জমি বর্তমানে দেখভাল করে একটি পরিবার। তারা জানান, গত ১০ এপ্রিল এই রাস্তাসংক্রান্ত আলাপ করতে গেলে মিল্টন সমাদ্দার ও শামসুদ্দিন চৌধুরীর লোকজনের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার পর সাভার থানায় মারধরের ঘটনায় ১৫ এপ্রিল একটি মামলা করেন শামসুদ্দিন চৌধুরী। সেদিন আসলে কী ঘটেছিল? জানতে কথা হয় আশ্রমে থাকা কয়েকজনের সঙ্গে। তারা বলেন, আপনি যদি আমার বাড়িতে এসে আমাকেই ঘাড়ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন, তখন কি আমি চুপচাপ বসে থাকব? আমার টাকা দিয়ে কেনা জমির ওপর দিয়ে আপনাকে রাস্তা দিছি, তাও আপনার মন ভরে না। আপনি দাবি করে বসলেন ১২ ফুট রাস্তা। এই রাস্তা না দেয়াতেই মিল্টনকে ফাঁসানো হয়েছে। এদিকে শামসুদ্দিন চৌধুরীর মামলায় জামিন নিয়ে পরে কোর্টে শামসুদ্দিন চৌধুরী ও তার প্রতিবেশীদের নামে আরেকটি মামলা করেন মিল্টন। আইন আদালত সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ গণমাধ্যমের কিছু খবরে পাল্টে যেতে থাকে দৃশ্যপট। এ বিষয়ে মিল্টনের আইনজীবী ওহিদুজ্জামান বিপ্লব এক ভিডিও বার্তায় দাবি করেন, মিল্টনকে ফাঁসানোর জন্যই একটি চক্র মিথ্যা মামলা দিয়ে এই ঘটনাগুলো ঘটিয়েছে। যার কোনো তথ্যপ্রমাণ কোথাও নেই। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন করা হয়েছিল- জমির বিরোধের পরই মিল্টনের কথিত অপকর্ম সামনে এলো- বিষয়টি রহস্যজনক কি না? উত্তরে তদন্তকারীরা বলেন, মিল্টনের বিরোধী পক্ষ কারা সেটি আমরা জানি না, চিনিও না। যতটুকু তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে- সেগুলো আদালতে উপস্থাপন করা হচ্ছে। সেগুলো বিবেচনা করেই আদালত মিল্টন সমাদ্দারের বিচার করবেন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App