×

প্রথম পাতা

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সংশয়

Icon

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর  সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সংশয়
খোন্দকার কাওছার হোসেন : সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আবারো হুংকার দিলেন মন্ত্রী, ক্ষোভ ঝাড়লেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর। কঠোরভাবে বাস্তবায়নের জন্য দিলেন কিছু নির্দেশনাও। স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেন- এবার আর নিস্তার নেই। ছাড় দেয়া হবে না কাউকে। এসব সিদ্ধান্ত বা নির্দেশনা নতুন নয়; আগে একাধিকবার উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু কার্যকর হয়নি। মন্ত্রীর কথায়ই উঠে এলো হতাশার এই চিত্র। এবার হবে তো? এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা। রাজধানীর বনানীতে গতকাল বুধবার বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ভবনে সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা পরিষদের সভা ডাকা হয়। ওই সভায়ই কঠোরভাবে বাস্তবায়নের জন্য বেশ কিছু সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, যদি মোটরসাইকেল চালকদের কাউকে হেলমেটবিহীন অবস্থায় পাওয়া যায়, তাদের জ্বালানি দেয়া হবে না। পুরো বাংলাদেশে এই নিয়ম জারি করতে হবে। নো হেলমেট, নো ফুয়েল। ঈদের আগে ও পরে অনেক দুর্ঘটনা ঘটেছে- এ নিয়ে আক্ষেপ করে ওবায়দুল কাদের বলেন, এগুলো মন্ত্রী হিসেবে নয়; মানুষ হিসেবে আমাদের কষ্ট দেয়। আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর প্রধান কারণ মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা। এক অটোরিকশায় ৭ থেকে ৮ জন থাকে। একটা দুর্ঘটনা হলে অটোরিকশার সবাই মারা যায়। আর মোটরসাইকেল তো আরেক উপদ্রব। দুর্ঘটনা হলে তো কাউকে কেউ কিছু বলে না। শুনতে হয় আমাকে। কেউ বলে না বিআরটিএ চেয়ারম্যান কী করছে, সবাই আমাকে বলে। কাদের বলেন, সমতল থেকে পাহাড়ে আজকে সুন্দর সুন্দর রাস্তা, এত রাস্তা হওয়ার পরও শৃঙ্খলা আসে না। এতকিছু করে কী লাভ, কোনো ফলাফল আসছে না। এত রাস্তা, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, পদ্মা সেতু, টানেল করা হচ্ছে। কিন্তু যানজট বা দুর্ঘটনা কমছে না। এ সময় ঝালকাঠিতে ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ৪০ বছরের পুরনো গাড়ি কীভাবে সড়কে চলে? ঢাকা শহরের লক্কড়ঝক্কড় গাড়িগুলোর গরিব গরিব চেহারা। ঢাকার চেয়ে গ্রামের গাড়িগুলো ভালো। এতদিন কী করছিল বিআরটিএ জানতে চান তিনি। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শাজাহান খান মেয়াদোত্তীর্ণ ও লক্কড়ঝক্কড় গাড়িগুলোকে ডাম্পিং নয়; সম্পূর্ণভাবে ধ্বংসের সুপারিশ করেন। সভায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম, সড়ক বিভাগের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী, বিআরটিএ চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার উপস্থিত ছিলেন। রাজধানী ঢাকায় কোনো ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানো যাবে না; সারাদেশে মোটরসাইকেলের চালকসহ দুজনের বেশি বহন করা যাবে না, দুজনকেই হেলমেট পরতে হবে; ‘নো হেলমেট, নো ফুয়েল’- নীতিতে হেলমেট ছাড়া কোনো মোটরসাইকেলে জ¦ালানি দেবে না কোনো পেট্রোল পাম্প; ফিটনেসবিহীন গাড়ি স্ক্রাপ (ধ্বংস) করতে হবে; চলন্ত অবস্থায় কোনো চালক মোবাইল ফোনে কথা বলতে পারবেন না; ২২টি মহাসড়কে রিকশা ও ইজিবাইক নিষিদ্ধ করা হয়েছে- এসব মহাসড়কে কোনো রিকশা ও ইজিবাইক চালানো যাবে না; জরুরি সেবা ছাড়া হুটার, উচ্চ হর্ন বাজানো যাবে না, বিকন লাইট লাগানো যাবে না- এমন নিষেধাজ্ঞা ইতোমধেই বলবৎ রয়েছে। সরজমিন দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন সড়কও গলিপথগুলোতে অবাধে চলছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। অহরহ ঘটছে দুর্ঘটনাও। হেলমেটবিহীন যাত্রী নিয়ে ছুটছে মোটরসাইকেল। ছোট বড় ৪-৫ সদস্যের পুরো পরিবার নিয়েও মোটরসাইকেল দেখা যায় রাজপথে। কিছুদিন হেলমেট ছাড়া ফুয়েল না দেয়ার নীতি ফুয়েল স্টেশনগুলো বাস্তবায়ন করলেও আবার গা ভাসিয়ে দিয়েছে অনিয়মে। বিভিন্ন মহাসড়কে অহরহই দেখা যাচ্ছে অটোরিকশা, ইজিবাইক। চলন্ত গাড়িতে চালক মোবাইল ফোনে দেদার গালগপ্প করেন। যাত্রীরা নিষেধ করলেও গা করেন না। কোনো কোনো চালক পাল্টা যাত্রীদের কটুকথা শুনিয়ে দেন। উচ্চ হর্ন, হুটার বাজছে অহরহ। বেপরোয়া গতি তো আছেই। আইনের প্রতি এমন উদাসীনতা দেখে চরম ক্ষেপেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গতকাল রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে ঢাকায় কোনো ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানো যাবে না- এমন নির্দেশনা আগে কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি ২২ মহাসড়কে রিকশা ও ইজিবাইক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সেটা বাস্তবায়ন করার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। ঢাকার বাইরেও নো হেলমেট, নো ফুয়েল, মোটরসাইকেলের চালকসহ দুজনের বেশি বহন না করা নিশ্চিত করতে বলেছেন। মন্ত্রীর অভিমত, সারাদেশে মোটরসাইকেল-ইজিবাইকের কারণে দুর্ঘটনা বেশি হচ্ছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি স্ক্র্যাপ (ধ্বংস) করতে হবে। উচ্চ হর্ন ও জরুরি সেবা ছাড়া হুটার বাজানো যাবে না। এগুলো দেখার দায়িত্বে যারা রয়েছেন তারা বিষয়গুলোকে পাত্তা দিচ্ছেন না। রাজধানীতে দায়িত্ব পালনকারী ট্রাফিক পুলিশ এগুলো দেখেও না দেখার ভান করে। এসব যেন তাদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে না। হাইওয়ে পুলিশের অবস্থাও একইরকম। বিভিন্ন সময়ে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে কিছু সময় বা কয়েকদিন নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও পুরোপুরি বন্ধ করা হচ্ছে না। এর নেপথ্যে সংশ্লিষ্টদের বিভিন্ন সুবিধা নেয়ার কথাও শোনা যায় অহরহ। যদিও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ গত কয়েকদিন থেকে অন স্ট্রিট পার্কিং বন্ধ, অবৈধ পার্কিং বন্ধে আইনের সঠিক প্রয়োগ ও নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। পাশাপাশি ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা, কারা চালায় তাদের নাম ঠিকানা সংগ্রহ করছে। বিকন লাইট, হুটার বন্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি, ট্রাফিক-অ্যাডমিন অ্যান্ড রিসার্চ) ও ঢাকা রোড সেফটি প্রজেক্টের (ডিআরএসপি) প্রকল্প ম্যানেজার মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জনসাধারণের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে ডিএমপি কমিশনারের নির্দেশনায় কাজ চলছে। নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)’র চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, গত ৫ মে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় মোটরযানের গতিসীমা নির্দেশিকা-২০২৪ প্রণয়ন করেছে। জারি করা মোটরযানের গতিসীমা নির্দেশিকা রোডক্র্যাশ ও প্রতিরোধযোগ্য অকালমৃত্যু ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, এই নির্দেশিকার যথাযথ বাস্তবায়ন ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ও সেকেন্ড ডিকেইড অব অ্যাকশন ফর রোড সেফটি অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতের সংখ্যা অর্ধেকে কমিয়ে আনতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। তিনি এর সঠিক বাস্তবায়ন প্রত্যাশা করেছেন। নচেৎ পরিস্থিতি যে তিমিরে রয়েছে সেখানেই থাকবে বলে অভিমত দেন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App