×

প্রথম পাতা

বিএনপিকে এড়িয়ে গেলেন লু

Icon

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কাগজ প্রতিবেদক : দুদিনের জন্য ঢাকা সফরে এসে বিএনপিকে এড়িয়ে গেলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু। রাজপথের এই বিরোধী দলটির সঙ্গে কোনো বৈঠক রাখেননি তিনি। অন্যদিকে বিএনপিও ডোনাল্ড লুকে নিয়ে আগের অবস্থান পাল্টে কথা বলছে ভিন্ন সুরে। দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে লুর সফর নিয়ে বিএনপির যে উচ্ছ¦াস ছিল; তার বিন্দুমাত্রও এখন নেই। এ সফরের আলোচনাও দলটির দায়িত্বশীল নেতারা এড়িয়ে গেছেন সুকৌশলে। এত অল্প দিনের ব্যবধানে পরিস্থিতির এমন পরিবর্তন কেন? এই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, বিএনপির প্রকাশ্যে বক্তব্য যেমনই হোক- এই সফরকে মোটেও খাটো করে দেখেননি দলটির নেতারা। এ সফর নিয়ে বেশ কিছু পরিকল্পনা ছিল তাদের। আর যাই হোক লুর সঙ্গে একান্ত বৈঠকের বিষয়ে বেশ আশাবাদী ছিল বিএনপির হাইকমান্ড। তাইতো ‘লু’ বাংলাদেশ সফরে আসার আগে থেকেই তার সঙ্গে একান্ত বৈঠকের তাগিদ দিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে সর্বাত্মক যোগাযোগও করা হয়। দলের ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির নেতারা লবিং-তদবির কম করেননি। তবে লুর পক্ষ থকে কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। এতে চরম হতাশ হয়ে লুকে এখন অনেক দূরের মানুষ হিসেবেই ভাবছেন নেতারা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গত নির্বাচনে ক্ষমতায় যাওয়ার বিষয়ে বিএনপি অনেকটাই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল; কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। তাছাড়া নানা কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন বিএনপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। বিষয়টি আঁচ করতে পেরেই দলটি নিজেদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবমুক্ত হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করছে। আপাতত চুপ থেকেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার বলেন, নির্বাচনপূর্ব চাহিদা ও নির্বাচন-উত্তর চাহিদা নিশ্চয়ই এক হবে না। বিএনপি ডোনাল্ড লুকে হয়তো ভিন্ন আঙ্গিকে বুঝতে চাইছে। তাদের অনাগ্রহ কৌশলগত কারণেও হতে পারে। বিএনপির বেশির ভাগ নেতা মনে করেন- আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের প্রেসক্রিপশন মোতাবেক কাজ করেছে। দেশটির বিরূপ কূটনীতির কারণে প্রতারিত হতে হয়েছে বিএনপিকে। লুর সফর প্রসঙ্গে বিএনপির ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির এক নেতার ভাষ্য- জাতীয় নির্বাচনের আগে সংলাপ ইস্যুতে ডোনাল্ড লুর ভূমিকায় হতাশ বিএনপি। দলটির নেতারা ধারণা করেছিলেন, সংলাপে বসতে আরো জোরালো পদক্ষেপ নেবেন ডোনাল্ড লু। তবে বিএনপির অপর এক নেতা জানান, বিএনপির বর্তমান নেতৃত্বের ওপর আর ভরসা রাখতে পারছে না যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য পশ্চিমা দেশগুলো। নেতৃত্ব পরিবর্তন না হলে পরাশক্তিধর দেশের নেতারা বিএনপির সঙ্গে আর কোনো আলোচনায় বসতে রাজি নন; তাদের কথা বার্তায় এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। দায়িত্ব পাওয়ার পর চারবার বাংলাদেশ সফর করেছেন লু। সবশেষ গত বছরের জুলাইয়ে এসেছিলেন তিনি। জাতীয় নির্বাচনের আগে তার সেই সফর নিয়ে বিএনপিতে এক ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। নির্বাচন নিয়ে ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রেক্ষাপটে ধারণা করা হচ্ছিল, বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপে বিএনপি বিশেষ সুবিধা পাবে। বিএনপির নেতাকর্মীদের কথায়ও এমন মনোভাবের বিষয়টি তখন ফুটে উঠেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন হয়নি। নির্বাচনের আগে ওই সফরে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য সরকারকে নানা পরামর্শ দিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অনেকটা একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে সরকার গঠিত হয়। সেই ভোট হয়ে যাওয়ার চার মাস পর যুক্তরাষ্ট্রের এই সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফের আসেন ঢাকায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক কমিটির একজন সদস্য বলেন, নির্বাচনের আগে বড় তিনটি দলকে চিঠি দিয়ে ‘পূর্বশর্ত ছাড়া’ সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়েছিলেন লু। ওই চিঠিতে সংলাপের সম্ভাবনা জেগেছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তা ছিঁড়ে ফেলেন। এর একদিন পর নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। এর পেছনে নিশ্চয়ই বড় কারণ রয়েছে। বিএনপি এগুলো নিয়ে ভাবছে। আমরা মনে করছি, সংলাপে বসার ক্ষেত্রে লুর আহ্বান জোরালো ছিল না। গত রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে প্রশ্ন করেছিলেন ডোনাল্ড লুর বাংলাদেশ সফর নিয়ে। জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, তার (লুর) আগমন নিয়ে আমরা কেউ ইন্টারেস্টেড নই। আমাদের ভরসা জনগণের ওপর, সেই আস্থার ওপর আমরা দাঁড়িয়ে আছি। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণ কারো ওপর নির্ভর করে গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে আনবে- এটা আমরা মনে করি না। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, আমাদের কাছে লু অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়; যতটা গুরুত্বপূর্ণ কুকি-চিনের আক্রমণ। এটা নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার ব্যর্থ হচ্ছে। ডোনাল্ড লু তো অনেক দূরের মানুষ। আমরা শঙ্কিত আমাদের নিজের দেশের অবস্থা নিয়ে। দলটির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, ডোনাল্ড লু গতবার তার সফরে মিটিং করেননি বিএনপির সঙ্গে। এবারো কোনো এজেন্ডা রাখেননি বিএনপির সঙ্গে। এজেন্ডা রাখলে বরং আওয়ামী লীগ বিচলিত হতো না। ষড়যন্ত্র কোনো দিন প্রকাশ্যে হয় না। দুদিনের সফরে শুধু বিএনপি নয়; সমমনা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও বৈঠক করেননি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী এ পররাষ্ট্রমন্ত্রী। হঠাৎ কেন এই ইউটার্ন যুক্তরাষ্ট্রের? সেই ব্যাখ্যা আগেই দিয়েছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র বেদান্ত প্যাটেল। রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে কথা বলার সময় নেই বলে জানান তিনি। সোমবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে ডোনাল্ড লুর বাংলাদেশ সফর নিয়ে মুখপাত্র বেদান্ত প্যাটেলকে প্রশ্ন করা হয়। ১৭ মাসের মধ্যে তৃতীয়বার তার এই সফরে তিনি রাজনৈতিক দল কিংবা রাজনীতিবিদদের সঙ্গে আলোচনা করবেন কি না- সে বিষয়টি জানতে চাওয়া হয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ইস্যুতে বারবার কথা বলা যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে কি না- সেই প্রশ্নও রাখা হয় বেদান্ত প্যাটেলের কাছে। তবে বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র বলেন, ব্যস্ততার কারণেই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক করবেন না ডোনাল্ড লু। চীনা বংশোদ্ভূত আমেরিকান ডোনাল্ড লু ২০২১ সাল থেকে পররাষ্ট্র দপ্তরে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। তার আগে তিনি কিরগিজস্তানে ও আলবেনিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফরেইন সার্ভিসে যোগ দেয়ার পর লু পাকিস্তানে এবং ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের মিশনেও কাজ করেছিলেন। পাকিস্তানে দুই বছর আগে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে উৎখাতের ক্ষেত্রে লুর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App