×

প্রথম পাতা

নির্বাচন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে টেনশন ছিল, এখন আস্থা ফেরাতে চাই : ডোনাল্ড লু

সম্পর্ক মেরামত করে গেলেন লু

মার্কিন কর্মকর্তার ঢাকা সফর

Icon

প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পর্ক মেরামত করে গেলেন লু
কাগজ প্রতিবেদক : কী ছিল মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুর ঢাকা মিশন- এ নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই। গতকাল বুধবার দিনভর দুই মন্ত্রী এবং পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে বৈঠকের পর পাওয়া গেল এর জবাব। এলো ঢাকা-ওয়াশিংটনের মধ্যে নতুন সম্পর্কের বার্তা। উভয় পক্ষের বক্তব্যে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে- তা হলো ‘সম্পর্ক’। দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন ঘিরে পিটার হাসসহ যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কোনো কর্মকর্তার তৎপরতায় দুদেশের সম্পর্কের মধ্যে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল, তা-ই যেন মেরামত করে গেলেন ডোনাল্ড লু। এর আগে তিন দিনের সফরে গত মঙ্গলবার ঢাকায় পৌঁছান ডোনাল্ড লু। ওই রাতেই গুলশানে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বাসায় নৈশভোজের মধ্য দিয়ে তার সরকারি কর্মসূচি শুরু হয়। গতকাল বুধবার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু বিষয়কমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ ও সচিব মাসুদ বিন মোমেনের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন লু। আজ বুধবার সকালে তার ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার কথা। প্রসঙ্গত, গত সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে মানবাধিকার ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনসহ বিভিন্ন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের মতপার্থক্য দেখা দিয়েছিল। অবাধ, নিরপেক্ষ ও নির্বিঘœ নির্বাচনের স্বার্থে ভিসানীতিতে কড়াকড়ি আরোপের ঘোষণাও দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ফলে নির্বাচনের পাঁচ মাসের মাথায় ডোলান্ড লুর এবারের সফরে সম্পর্ক উন্নয়নের ইঙ্গিত বলেই মনে করছেন অনেকে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সঙ্গে বৈঠকের পর ডোনাল্ড লু জানান, দুদেশের জনগণের মধ্যে আস্থা পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করাই তার এবারের বাংলাদেশ সফরের উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, সবাই জানেন, গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে অনেক উত্তেজনা (টেনশন) ছিল। এখানে অবাধ, নিরপেক্ষ ও সহিংসতাহীন নির্বাচনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র কঠোর পরিশ্রম করে। এর ফলে কিছু উত্তেজনা তৈরি হয়। এ উত্তেজনাকে সম্পর্কের সাধারণ বিষয় হিসেবে বর্ণনা করে তিনি বলেন, আমরা সামনে তাকাতে চাই, পেছনে নয়। আমাদের সম্পর্ককে শক্তিশালী করার উপায় খুঁজতে চাই। আমাদের সম্পর্কের মধ্যে যেসব কঠিন বিষয় রয়েছে সেগুলো নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে মন্ত্রীর (হাছান মাহমুদ) সঙ্গে কথা বলেছি। কঠিন বিষয় বলতে ‘র‌্যাব ও এর সাবেক-বর্তমান কর্মকর্তাদের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং শ্রম সংস্কার, মানবাধিকার ও ব্যবসায় পরিবেশের সংস্কার’ এর কথা বলেছেন এই মার্কিন সহকারী মন্ত্রী। এসব কঠিন ইস্যুতে কাজ করার জন্য ইতিবাচক সহযোগিতার ভিত্তিতে যেসব বিষয় রয়েছে, সেগুলো নিয়ে এগোতে চান তিনি। তিনি বলেন, নতুন বিনিয়োগ, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা এবং ক্লিন এনার্জির মতো ইস্যুতে সহযোগিতার বিষয়ে আমাদের আলোচনা এগিয়ে যাচ্ছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে একযোগে কাজ করার বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হওয়ার কথা তুলে ধরে লু বলেন, সরকারকে স্বচ্ছতা বজায় রেখে চলতে এবং দুর্নীতিতে জড়িত কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার ক্ষেত্র বাড়াতে আমাদের অনেক কিছু করার আছে। এ সময় ঢাকা সফরের আরেকটি কারণের কথা উল্লেখ করে মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে করের আওতা কীভাবে বাড়ানো যায়, যার ভিত্তিতে সব বাংলাদেশি তার ভাগের দেনাটা পরিশোধ করতে পারে, সে বিষয়ে সহযোগিতা করার জন্য সম্প্রতি তাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন মন্ত্রী (পররাষ্ট্রমন্ত্রী)। এবারের সফরের অভিজ্ঞতাকে ‘চমৎকার’ বলে বর্ণনা করে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি, র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা, শ্রম আইন সংশোধন এবং জলবায়ু পরিবর্তনসহ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আরো বেশ কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন লু। তিনি বলেন, এসব বিষয়ে বাংলাদেশের অগ্রগতি দেখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ জানিয়েছেন, লুর সঙ্গে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে তার কোনো আলোচনা হয়নি। পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে হয়তো আলোচনা হয়ে থাকতে পারে। প্রসঙ্গত, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের আগে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের সঙ্গে বৈঠক হয় ডোনাল্ড লুর। তবে র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়ার বিষয়টি দুদেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলেছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। দুদেশের সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে মার্কিন সরকার বাংলাদেশকে জিএসপি সুবিধা ফিরিয়ে দিতে চায় বলেও জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই সুবিধা ফিরে পেতে হলে শ্রম আইনে কিছু সংশোধন করতে হবে বলে তারা জানিয়েছে। সেটা নিয়ে আমরা ইতোমধ্যেই কাজ করছি বলে তাদের জানিয়েছি। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশ থেকে জিএসপি সুবিধা তুলে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। কবে নাগাদ সেই সুবিধা আবার ফিরে আসতে পেতে পারে, সে ব্যাপারে নির্দিষ্ট করে কিছু বলা হয়নি বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তারা এতদিন এটি বন্ধ রেখেছিল, এখন পুনরায় চালু করতে চায়। এটি হলেই বাংলাদেশ জিএসপি সুবিধা পাবে। ডোনাল্ড লুর সঙ্গে বৈঠকে অতীত নিয়ে কোনো কথা হয়নি বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ। আমরা দুজনই বলেছি, অতীতে কী ঘটেছে, সেটা নিয়ে আলোচনা করতে চাই না। তিনি আরো বলেন, আলোচনা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে দুদেশের মধ্যকার সম্পর্ককে আরো কীভাবে এগিয়ে নেয়া যায়, সে বিষয়েই আলোচনা হয়েছে। এক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং আয়কর আদায়ের ব্যবস্থা আধুনিকায়নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ সরকারকে সাহায্য করতে চায় বলেও জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এছাড়া আনুষ্ঠানিকভাবে মধ্যম আয়ের কাতারে যাওয়ার পরও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেন বাংলাদেশকে দেয়া সুযোগ এবং সহযোগিতা অব্যাহত রাখে, সে বিষয়ে ডোনাল্ড লুকে অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের আগে সচিবালয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন ডোনাল্ড লু। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী আয়োজিত ওই বৈঠকের পর লু জানিয়েছেন, আলোচনা খুবই ফলপ্রসূ হয়েছে। অন্যদিকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়কমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী বলেছেন, মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুর সঙ্গে অতীত নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। আমরা ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেছি। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ এবং আমেরিকার মধ্যে যে সম্পর্ক আছে, সেটাকে কীভাবে আরো এগিয়ে নিতে পারি, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে স্বাভাবিকভাবেই যে বিষয়গুলোতে আমাদের অবস্থান অভিন্ন, যেমন- জলবায়ু পরিবর্তন এবং এর অভিঘাত মোকাবিলায় বাংলাদেশ এবং আমেরিকা আরো কীভাবে কাজ করতে পারে, সে বিষয়ে আলাপ করেছি। জলবায়ু অর্থায়নের বিষয়ে বিশ্বব্যাংক, এডিবি আগামী দিনে কীভাবে অর্থায়ন করবে, সে বিষয়েও আমরা আলোচনা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। পরিবেশমন্ত্রী বলেন, এসব বিষয় নিয়ে ভবিষ্যতে আবার বসবেন। তখন সবকিছু সুনির্দিষ্ট হবে। কোন কোন খাতে সহযোগিতা হবে, তা নির্ধারণ করা হবে। ডোনাল্ড লুও জোর দিয়েছেন, ভবিষ্যতে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে যা-ই বিনিয়োগ হোক, তা যেন প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার একই জায়গায়। সেটি হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। এ বিষয়ে কীভাবে কাজ করা হবে, কৌশল কী হবে তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পরিবেশমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে ডোনাল্ড লু পররাষ্ট্র সচিব রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেনের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় বৈঠক করেন বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাঠানো এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে। এ সময় তারা বাণিজ্য, অর্থনীতি, নারীর ক্ষমতায়ন, শ্রম সংস্কার এবং বিমান চলাচলের মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App