×

প্রথম পাতা

বাজেটে আইএমএফের চাপ

Icon

মরিয়ম সেঁজুতি

প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বাজেটে আইএমএফের চাপ

আইএমএফ

  • আকার ছোট রাখার পরামর্শ
  • নতুন প্রকল্পে নিরুৎসাহিত করা
  • ঘাটতি কমিয়ে রাজস্ব বাড়ানো 

বাজেটের আকার ছোট রাখা, ঘাটতি কমিয়ে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোসহ আরো বেশ কিছু বিষয়ে তাগিদ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। দাতা সংস্থাটির পরামর্শের বড় প্রতিফলন রেখেই আগামী (২০২৪-২৫) অর্থবছরের বাজেট তৈরির কাজ চলছে। সে হিসেবে চলতি অর্থবছরের মূল বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) আগামী অর্থবছরের তুলনায় আকার বাড়ছে মাত্র শূন্য দশমিক ৭৬ শতাংশ, তিন অর্থবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এমনকি এডিপিতে নতুন প্রকল্প গ্রহণ নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। 


বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন অর্থবছরে এডিপির আকার খুব বেশি না বাড়ানোটা সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। প্রস্তাবিত এডিপি যথাযথ বাস্তবায়ন হলেই প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব। তবে বিদেশি ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভর্তুকি কমানো, রাজস্ব ও রিজার্ভ বাড়ানোসহ যেসব বিষয়ে আইএমএফ শর্তারোপ করছে, সরকারও সেগুলো বাস্তবায়নে কাজ করছে। এ বিষয়ে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মাদ আবদুল মজিদ বলেন, রাজস্ব খাতের সংস্কারে আমরা যে কাজগুলো করতে পারিনি, আইএমএফ সেগুলোই মনে করিয়ে দিয়েছে। অনেক আগেই এসব সংস্কার করা উচিত ছিল। 

উন্নয়ন বাজেটের বিষয়ে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান ভোরের কাগজকে বলেন, চলতি বছরের তুলনায় আসন্ন বাজেটে এডিপির আকার তেমন বাড়ানো হয়নি। এটা সরকারের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। কারণ এডিপি বাস্তবায়ন হয় ঋণের টাকায়। আমরা সরকারের ঋণনির্ভরতা কমানোর কথা বলছিলাম। লাখ কোটি টাকা বিদেশি ঋণ গ্রহণের ফলে অভ্যন্তরীণ উৎসে চাপ কমবে। এটা ব্যক্তি খাতের জন্যও ভালো হবে। যেহেতু সরকার এডিপি বাস্তবায়ন করছে প্রায় পুরোটাই ঋণ করে। বিদেশি ঋণ ও অভ্যন্তরীণ ঋণ মিলে চাপ আরো বেশি। সে হিসেবে এবারের এডিপি কমিয়ে ধরা যৌক্তিক। তবে এগুলো যাতে সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন হয় সেদিকে নজর দিতে হবে। তিনি বলেন, খাদ্য ও জলবায়ুকে মূল অগ্রাধিকার তালিকায় রাখা ঠিকই আছে। তবে শিক্ষা খাতে আরো বরাদ্দ রাখা উচিত ছিল। প্রস্তাবিত এডিপি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হলে এটা দিয়েই উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ। 

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, মূল্যস্ফীতির হিসেবে উন্নয়ন বাজেটের আকার বাড়েনি, বরং কমেছে। আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী এডিপির আকার ঠিকই আছে। কারণ বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে আমাদের ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ নেই। তবে প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করে বিদেশি অর্থায়নের যথাযথ ব্যবহারে জোর দিতে হবে। জানা গেছে, উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে ব্যয় সংকোচন নীতি আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও অব্যাহত রেখে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) নতুন প্রকল্প গ্রহণ নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। অনুমোদিত প্রকল্প এবং এডিপি বা সংশোধিত এডিপি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে (এএমএস) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে শুধু এমন নতুন প্রকল্পকে বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে। বরাদ্দ দেয়া ও নতুন প্রকল্প নেয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে যে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে, তা অনেক ক্ষেত্রে আমলে নেয়া হয়নি। চলতি এডিপিতে বাস্তবায়নের ধীরগতির বিষয়টিও বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। এসব কারণে নতুন এডিপির আকার তেমন বাড়ছে না। 

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের মূল এডিপির তুলনায় আগামী অর্থবছরের এডিপির আকার বাড়ছে মাত্র শূন্য দশমিক ৭৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরও এ বৃদ্ধির হার ছিল কম, ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে যা ছিল ৯ দশমিক ২০ শতাংশ। অর্থাৎ গত তিন অর্থবছরের মধ্যে সবচেয়ে কম হারে বাড়ছে আগামী অর্থবছরের এডিপি। গত ৮ মে পরিকল্পনা কমিশনের বর্ধিত সভায় নতুন এডিপির চূড়ান্ত খসড়া অনুযায়ী, নতুন এডিপির আকার দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের মূল এডিপির আকার ছিল ২ লাখ ৬৩ হাজার কোটি টাকা। অবশ্য সংশোধিত এডিপিতে যা কমে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকায়। চলতি অর্থবছরের মূল এডিপির চেয়ে মাত্র ২ হাজার কোটি টাকা বাড়ছে নতুন এডিপিতে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং বিভাগের পক্ষ থেকে ২ লাখ ৭৬ লাখ ৪০ হাজার ২৪৬ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়েছিল। 

পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, প্রস্তাবিত এডিপিতে খাদ্য নিরাপত্তাকে মূল অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দিয়ে কৃষি, কৃষিভিত্তিক শিল্প, বিদ্যুৎ, শ্রমশক্তির দক্ষতা বাড়ানো, দারিদ্র্য কমানোর প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার তালিকায় রাখা হয়েছে। তাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যেসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ- বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, অতিবৃষ্টি নিরোধের প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সবুজ ও জলবায়ু অভিঘাত মোকাবিলা সম্পর্কিত প্রকল্পে বিশেষ অগ্রাধিকারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। 

বিশ্লেষণে দেখা যায়, উন্নয়ন বাজেটের মধ্যে বড় ১০টি প্রকল্পে বরাদ্দ ধরা হয়েছে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা। এসব প্রকল্পের মধ্যে চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। অন্যদিকে আগামী অর্থবছরে সমাপ্তি ঘটবে ২৮৯টি প্রকল্পের। এগুলোর মধ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারণ (থার্ড টার্মিনাল), পূর্বাচলে খাল খনন ও আশ্রয়ণ প্রকল্প রয়েছে। নতুন অর্থবছরের এডিপিতে সরকার অর্থায়ন করবে ১ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১ লাখ কোটি টাকা আসবে বিদেশি বিভিন্ন দাতা গোষ্ঠীর কাছ থেকে। প্রস্তাবিত এডিপিতে ১ হাজার ৩৩৭টি প্রকল্প রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বড় ১০ প্রকল্পে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৫১ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা। সর্বোচ্চ বরাদ্দ ধরা হয়েছে চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি প্রকল্পে, ১১ হাজার ৫৫ কোটি টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১০ হাজার ৫০২ কোটি টাকা রাখা হয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য। তৃতীয় সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ পাচ্ছে মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এরপর আছে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে, যেখানে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৭৯৬ কোটি টাকা। মেট্রোরেল লাইন-১ প্রকল্প পাচ্ছে ৩ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা। প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা করে বরাদ্দ পাচ্ছে পাওয়ার গ্রিডের নেটওয়ার্ক শক্তিশালীকরণ প্রকল্প, পদ্মা রেল প্রকল্প ও বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্প। 

খাতভিত্তিক বরাদ্দ : ১৫টি খাতের বরাদ্দ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৪০ হাজার ৭৫১ কোটি ৮৬ লাখ এবং তৃতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাচ্ছে শিক্ষা খাত ৩১ হাজার ৫২৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অন্যান্য খাতের বরাদ্দ হচ্ছে- গৃহায়ণ ও কমিউনিটি সুবিধাবলি ২৪ হাজার ৮৬৮ কোটি ৩ লাখ, স্বাস্থ্যে ২০ হাজার ৬৮২ কোটি ৮৮ লাখ, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়নে ১৭ হাজার ৯৮৬ কোটি ২১ লাখ এবং কৃষি খাতে ১৩ হাজার ২১৯ কোটি টাকা। আরো আছে শিল্প ও অর্থনৈতিক সেবায় ৬ হাজার ৪৯২ কোটি ১৮ লাখ, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিতে ৪ হাজার ৭৮৬ কোটি ৯২ লাখ, ধর্ম-সংস্কৃতি ও বিনোদনে ৩ হাজার ৪৯২ কোটি, সামাজিক সুরক্ষায় ৩ হাজার ৩০৪ কোটি, জনশৃঙ্খলা ও সুরক্ষায় ৩ হাজার ৩০৮ কোটি এবং সাধারণ সরকারি সেবা খাতে দেয়া হচ্ছে ২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। 

সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া মন্ত্রণালয় ও বিভাগ : আগামী অর্থবছরের এডিপিতে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগকে ৩২ হাজার ৪২ কোটি টাকা। তৃতীয় সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ বিভাগ ২৯ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা। এছাড়া প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ১৬ হাজার ১৩৫ কোটি, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ ১৩ হাজার ৭৪১ কোটি, রেলপথ মন্ত্রণালয় ১৩ হাজার ৭২৫ কোটি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ১২ হাজার ৮৮৬ কোটি টাকা। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ ১১ হাজার ৩৮৭ কোটি, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ১০ হাজার ৩৭৩ কোটি এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ৮ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকা। 

উন্নয়ন প্রকল্প : মোট প্রকল্প থাকছে ১ হাজার ৩৩৭টি। এর মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্প ১ হাজার ১৪৯টি, কারিগরি সহায়তার ৮৬টি এবং সমীক্ষা প্রকল্প রয়েছে ২৩টি। মোট প্রকল্পের মধ্যে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপি থেকে স্থানান্তর হবে ১ হাজার ২৭৭টি প্রকল্প। বাকিগুলোর মধ্যে নতুন অনুমোদিত প্রকল্প রয়েছে ৬০টি। এছাড়া আগামী অর্থবছরের এডিপিতে নতুন কিন্তু অনুমোদনহীন প্রকল্প যুক্ত হচ্ছে ১ হাজার ৮৯৪টি, বৈদেশিক অর্থায়নের সুবিধানে অনুমোদনহীন নতুন ২৫৭টি প্রকল্প এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) প্রকল্প থাকবে ৮০টি। প্রস্তাবিত এডিপির বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক সচিব মামুন-আল-রশীদ বলেন, বর্ধিত সভাতেই এডিপির খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। আর এডিপির আকার নির্ধারণ হয় সরকারের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। রাজস্ব আয় না বাড়লে উন্নয়ন খাতে বেশি ব্যয় করা যায় না। তবে অতীতে দেখা গেছে, বিদেশি ঋণের সঠিক ব্যবহার করা যায়নি। দক্ষতার সঙ্গে পরিকল্পনা করে এসব ঋণের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বিদেশি ঋণ উপযুক্ত শর্তের আলোকে গ্রহণ করা হলে তা দেশের জন্য উপকারী।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App