×

প্রথম পাতা

নাইট্যাগের সবুজ সংকেত আশা জাগালো টিভি-০০৫

Icon

সেবিকা দেবনাথ

প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

নাইট্যাগের সবুজ সংকেত আশা জাগালো টিভি-০০৫
গত বছর দেশে ডেঙ্গুর তাণ্ডব মোকাবিলায় মশা নিধনের পাশাপাশি টিকা প্রয়োগ নিয়েও আলোচনা শুরু হয়। এরই মধ্যে ডেঙ্গুর টিকায় দেখা যাচ্ছে আশার আলো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন পাওয়ায় সরকারেরও আগ্রহ বেড়েছে। টিকাবিষয়ক জাতীয় কমিটি (ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল এডভাইজারি গ্রুপ) নাইট্যাগও এক্ষেত্রে সবুজ সংকেত দিয়েছে। নাইট্যাগের সভাপতি অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ ভোরের কাগজকে বলেন, নাইট্যাগের কয়েকটি বৈঠক ইতোমধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে ডেঙ্গুর টিকা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। টিকার বিষয়ে ইতিবাচক কমিটি। তবে আমাদের আরো তথ্য দরকার। আরো বিশ্লেষণ না করে ডেঙ্গুর সব ধরনের বিরুদ্ধে কাজ করে এমন টিকা না পেলে ট্রায়াল দেয়ার ব্যবস্থা না করে টিকা দেয়া যায় না। 

এদিকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুর দিকে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবির শিগগিরই ডেঙ্গুর টিকা আসার ইঙ্গিত দিয়ে জানিয়েছিলেন, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ৩ মাসের মধ্যে দেশে ডেঙ্গুর টিকা পাওয়া যাবে। এছাড়া কয়েক বছর ধরে দেশে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানের আবিষ্কার করা ডেঙ্গু টিকা টিভি-০০৫ (টেট্রাভেলেন্ট)। 

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্মন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের লার্নার কলেজ অব মেডিসিন এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বা আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানীরা যৌথভাবে এই কাজটি করছেন। টিকার দ্বিতীয় ধাপের পরীক্ষা শেষ হয়েছে। তবে টিকার কার্যকারিতা সম্পর্কে আরো বেশি নিশ্চিত হতে দ্বিতীয় ধাপের মধ্যেই চলছে আরো পরীক্ষা। এ পর্যন্ত টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগের যে তথ্য মিলেছে তাতে দেখা গেছে, এই টিকার একটি ডোজ ডেঙ্গুর ৪টি ধরনের জন্যই কার্যকর। ডেঙ্গুর মোট চারটি ধরন রয়েছে। এগুলো হচ্ছে ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ এবং ডেন-৪। বাজারে থাকা অন্য সব টিকার তুলনায় ডেঙ্গুর এই টিকা নিয়ে বিজ্ঞানীরা বেশ আশাবাদী। 

দেশে টিকা পরীক্ষার সঙ্গে যুক্ত দলের প্রধান হিসেবে কাজ করছেন আইসিডিডিআরবির সিনিয়র বিজ্ঞানী রাশিদুল হক। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশে পরীক্ষার আগে এটি যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রাজিলেও পরীক্ষা চালানো হয়েছে। ২০১৫ সাল থেকে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ ও ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব নিয়ে পড়াশোনাসহ পরীক্ষা চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা তৈরি করা হয়। পরে ২০১৬ সাল থেকে ডেঙ্গুর টিকার দ্বিতীয় ধাপের পরীক্ষা শুরু হয়। যে কোনো টিকা প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয়- এই তিনটি ধাপে পরীক্ষা করা হয়। প্রথম ধাপে দেখা হয়- ওই টিকাটি মানুষের দেহে প্রয়োগের জন্য নিরাপদ কিনা। দ্বিতীয় ধাপে দেখা হয়, টিকার নিরাপত্তা এবং এটির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির সক্ষমতা। 

আর তৃতীয় ধাপের পরীক্ষায় এটির কার্যকারিতা দেখা হয়। অর্থাৎ যে জনগোষ্ঠীর উপর টিকা পরীক্ষা করা হয় তাদের মধ্যে কেউ আবারো ওই রোগটি দ্বারা আক্রান্ত হয় কিনা। দেশে যে পরীক্ষাটি হলো সেটি শুধুমাত্র দ্বিতীয় ধাপের পরীক্ষা। অর্থাৎ এই টিকার নিরাপত্তা এবং এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে পারে কিনা- সে বিষয়টিই পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, এটি শিশু ও প্রাপ্ত বয়স্কদের মধ্যে প্রয়োগের জন্য নিরাপদ এবং এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে সক্ষম। এই বছরের মধ্যেই টিকার চলমান পরীক্ষামূলক প্রয়োগটিও শেষ হবে।

গবেষক ও বিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা ডেঙ্গুর টিকা নিয়ে গবেষণা করছেন। টিকা আবিষ্কারের চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কয়েকটি দেশ। ২০২২ সালে জাপানের টাকেদা ফার্মাসিউটিক্যাল ডেঙ্গুর টিকা ‘কিউডেঙ্গা’ আবিষ্কারের ঘোষণা দেয়। এটি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউকে, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, আইসল্যান্ড, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়াসহ আরো কিছু দেশ কিউডেঙ্গা ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে। গত বছর শেষের দিকে জরুরি প্রয়োজনে ‘কিউডেঙ্গা’ ব্যবহারের ছাড়পত্র দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ছাড়পত্র দিয়েছে বলেই যে এ টিকা আদর্শ টিকা, তা নায়। কারণ এই টিকার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হলো- বয়সের সীমাবদ্ধতা। সব বয়সি মানুষ এই টিকা নিতে পারবে না। আর ইউএসএ-র সানোফি-পাস্তুর ইনকরপোরেশনের ‘ডেঙ্গভ্যাক্সিয়া’ নামে যে টিকাটি রয়েছে তা কেবলমাত্র একবার ডেঙ্গু হওয়ার পরই নেয়া যায়। 

সিঙ্গাপুরসহ অনেক দেশে এই টিকা অনুমোদিত। ভারতের সিরাম ইনস্টিটিউট, পেনেসিয়া বায়োটেক এবং ই-বায়োলজিক্যালসহ ভারতের কমপক্ষে তিনটি ওষুধ কোম্পানি এরইমধ্যে ডেঙ্গুর টিকা উৎপাদনের জন্য টিকা আবিষ্কারক সংস্থা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের কাছ থেকে লাইসেন্স নিয়েছে। আর রোগতত্ত্ব ও রোগ নিয়ন্ত্রণ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোশতাক হোসেন মনে করেন টিভি-০০৫ টিকার কয়েটি ইতিবাচক দিক আছে। যেমন- এ টিকা প্রয়োগের ক্ষেত্রে বয়সের সীমাবদ্ধতা নেই। এছাড়া আগে কখনো ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে কিনা সেটিও মুখ্য নয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশে যে পরীক্ষাটি হলো; সেটি দ্বিতীয় ধাপের পরীক্ষা। পরীক্ষার আরো ধাপ বাকি রয়েছে। খতিয়ে দেখার মতো আরো অনেক বিষয় রয়েছে। তবে এই টিকাটি সফল হলে জনসাধারণ উপকৃত হবে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App