×

প্রথম পাতা

ডোনাল্ড লুর সফর ঘিরে ঢাকায় বাড়ছে কৌতূহল

Icon

অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য

প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ডোনাল্ড লুর সফর ঘিরে ঢাকায় বাড়ছে কৌতূহল

ডোনাল্ড লু

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা অঘটনের ক্রীড়নক হিসেবে আলোচিত। সেই লু বছরঘুরে আবার ঢাকায় আসছেন আজ মঙ্গলবার। তার এই সফর নিয়ে ব্যাপক কৌতুহল দেখা দিয়েছে। অনেকেই জানতে চাইছেন, ঢাকায় এবার তার মিশন কী? বাংলাদেশের চলমান রাজনীতির ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে কোনো ভূমিকা রাখতে চান, নাকি আন্তর্জাতিক বিষয়াবলিই তার মূল এজেন্ডা? 

জানতে চাইলে কূটনৈতিক বিশ্লেষক শমসের মবিন চৌধুরী গতকাল ভোরের কাগজকে বলেন, ডোনাল্ড লুর লক্ষ্যটা ঠিক কী তা আমাকে তিনি জানাননি। তবে সফরের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করে বোঝা যায়, ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে ঢাকাকে বার্তা দিতেই তার এই সফর। ইন্দো-প্যাসিফিকে ঢাকাকে আরো বেশি করে জড়াতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। সব মিলিয়ে নির্বাচন নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও এখন আর ওয়াশিংটন সেদিকে যেতে চায় না। তারা বাংলাদেশে সহযোগিতা বাড়াতে চায়। 

এছাড়া আগামী জুলাই মাসে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের তিন বছর পূর্ণ হচ্ছে। তিন বছর পর পর তারা তাদের দূতকে পরিবর্তন করে। এবারো করেছে। তবে এবারের বিশেষত্ব হচ্ছে, যাকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে ওয়াশিংটন ঢাকা দূতাবাসে নিয়োগ দিয়েছে; তিনি একসময় বাংলাদেশে মার্কিন দূতাবাসে কাজ করে গেলেও রাষ্ট্রদূত হয়ে আসছেন আমেরিকার চীন দূতাবাস থেকে। ফলে নতুন রাষ্ট্রদূতকে নিয়েও কোনো বার্তা দিয়ে যেতে পারেন ডোনাল্ড লু। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন কূটনৈতিক বলেন, এই সফরে ডোনাল্ড লু বিমান নিয়েও কথা বলতে পারেন। কারণ বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে একের পর এক বোয়িং কিনেছে। এবার ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড থেকে এয়ারবাস কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশ এয়ারবাস কেনার সিদ্ধান্ত নেয়ায় আমেরিকা আর বোয়িং বেচতে পারছে না। বাংলাদেশ যাতে আমেরিকা থেকে আগের মতো বোয়িং কিনতে আগ্রহী হয়- সে বিষয়টিও সফরে আলোচনায় থাকতে পারে। এয়ারবাস এবং বোয়িং কেনা নিয়ে ইউরোপিয়ান এবং আমেরিকান চাপের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। 

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, আজ মঙ্গলবার কলম্বো থেকে ডোনাল্ড লুর ঢাকায় আসার কথা রয়েছে। গত জানুয়ারির দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সিনিয়র কর্মকর্তা হিসেবে এটি তার প্রথম সফর। সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু ঢাকা সফরের প্রথম দিন অর্থাৎ আজ মঙ্গলবার রাতে প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের দেয়া এক নৈশভোজে যোগ দেবেন। সফরের দ্বিতীয় দিন বুধবার তিনি প্রথমে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়কমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে ও পরে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করবেন। পরে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। তিন দিনের ঢাকা সফরের সময় ডোনাল্ড লুর নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও মতবিনিময়ের কথা রয়েছে। 

ডোনাল্ড লুর সফরের বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। সেখানে তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবনা স্পষ্ট করেছেন। ওই চিঠির শুরুতে বাইডেন ‘যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ অংশীদারত্বের পরবর্তী অধ্যায় শুরুর পর্ব’ শব্দগুলো ব্যবহার করেছেন; যা থেকে স্পষ্ট- যুক্তরাষ্ট্র এখন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে মনোযোগ দিচ্ছে। আর অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার হিসেবে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন ও জ্বালানি, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য, মানবিক সহায়তা, বিশেষ করে রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যার মতো বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে। তাই ডোনাল্ড লু ঢাকায় এলে এ বিষয়গুলোর পাশাপাশি অন্য কোন বিষয়গুলোতে যুক্তরাষ্ট্র অগ্রাধিকার দেবে, সে ধারণা পাওয়া যাবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ গতকাল সমসাময়িক বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত চমৎকার। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুর আসন্ন ঢাকা সফরে র‌্যাবের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ও ভিসানীতি তুলে নেয়ার বিষয়ে আলোচনা করা হবে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মার্কিন প্রশাসন থেকে যারাই বাংলাদেশে সফর করুক না কেন, আমাদের সম্পর্ককে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে এক সঙ্গে কাজ করব। সেখানে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আছে, আমাদের নানা ক্ষেত্রে সহযোগিতা আছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী চতুর্থবার নির্বাচিত হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট চিঠি লিখে সম্পর্ক এগিয়ে যাওয়ার বা নতুন উচ্চতায় নেয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা ও ভিসানীতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে অস্বস্তি তৈরি করেছে। লুর সফরে র‌্যাবের নিষেধাজ্ঞা ও ভিসানীতি তুলে নেয়ার বিষয়ে আলোচনা হবে কিনা- জানতে চাইলে হাছান মাহমুদ বলেন, সেগুলো (র‌্যাবের নিষেধাজ্ঞা ও ভিসানীতি) আমাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছুটা রেখাপাত করেছে তো বটেই। সেগুলো নিয়ে অবশ্যই আমরা আলোচনা করব। তিনি বলেন, সেগুলো (র‌্যাবের নিষেধাজ্ঞা ও ভিসানীতি) যেন সহজীকরণ হয় বা উঠে যায়; তা নিয়ে মার্কিন প্রশাসনে এরই মধ্যে হোয়াইট হাউস এবং স্টেট ডিপার্টমেন্টে আলোচনা হয়েছে। আলোচনায় এ প্রসঙ্গগুলো স্বাভাবিকভাবে আসতেই পারে। আমাদের সম্পর্ক এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে উভয় দেশ কাজ করছি। 

সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ডোনাল্ড লু ১০-১৫ মে ভারত, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ সফর করছেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ডোনাল্ড লুর সফর এই দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা জোরদার করবে। লুর সফরে অবাধ, উন্মুক্ত ও সমৃদ্ধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ থাকবে। ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক জোরদারে ডোনাল্ড লু চেন্নাইয়ে মার্কিন কনস্যুলেট কর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এরপর তিনি কলম্বোতে গিয়ে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারি জোরদারে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। ওই বৈঠকগুলোতে তিনি শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করবেন। উন্মুক্ত ও গণতান্ত্রিক সমাজের কেন্দ্র হিসেবে সক্রিয় নাগরিক সমাজের প্রতিও তিনি সমর্থন জানাবেন। 

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, ডোনাল্ড লু তার ঢাকা সফরে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার ও জলবায়ু পরিবর্তনসহ যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সহযোগিতার বিষয়ে সরকারি কর্মকর্তা, নাগরিক সমাজের নেতা ও অন্য বাংলাদেশিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ডোনাল্ড লুর ঢাকা সফরের সময় পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন গণমাধ্যমকে বলেছেন, আমাদের সঙ্গে ওদের প্রচুর মেকানিজম আছে, ডায়লগ আছে। সেগুলো কীভাবে রিয়েক্টিভ করা যায়- তা নিয়েই আলোচনা হবে। তার মধ্যে অবশ্যই রোহিঙ্গা ইস্যুটা আলোচনায় থাকবে। পারস্পরিক সম্পর্কের সব উপাদানও থাকবে। 

এদিকে, বিএনপির আন্তর্জাতিক কমিটির সদস্য ড. আসাদুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, গত বছর নির্বাচনের আগে ডোনাল্ড লু যখন ঢাকা সফর করেন বিএনপির সঙ্গে তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বৈঠক হয়নি। এবারো তিনি আমাদের সঙ্গে কোনো বৈঠক করবেন বলে আমার জানা নাই। তবে আমাদের সঙ্গে তো তাদের যোগাযোগ আছে। আমরা আমাদের অবস্থান জানাচ্ছি। এখানে তিনি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলবেন। আমরা আমাদের কথা জানাব। দেশ একটা ভয়ার্ত পরিবেশের মধ্যে আছে। এখানে নাগরিক অধিকার, মানবাধিকার সবই লঙ্ঘন হচ্ছে। এই তথ্য তাদের কাছেও আছে বলে আমরা মনে করি। 

অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুর আসন্ন বাংলাদেশ সফর নিয়ে বিএনপি উদ্ভট চিন্তা করছে- এমন মন্তব্য করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, বিএনপি হয়তো মনে করছে, আবার নতুন করে নিষেধাজ্ঞা দেবে কিনা। এমন উদ্ভট চিন্তা-ভাবনা নিয়ে আছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল মো. শহীদুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন ইন্দো-প্যাসিফিক বিষয়ে বেশি জোর দিচ্ছে। তারা রাখাইন স্টেটের ভবিষ্যৎ নিয়েও জোর দিচ্ছে। বাংলাদেশকে হয়তো তারা এই প্রক্রিয়ায় আরো বেশি যুক্ত করতে চাইবে। ডোনাল্ড লুর সফরের গুরুত্ব সেই দিকেই বলে আমরা মনে হয়। এখন তারা ভূ-রাজনীতিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

 সংশ্লিষ্টদের মতে, গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকারসহ সামগ্রিক মানবাধিকারের বিষয়গুলো যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান উপাদান হলেও বাংলাদেশের নির্বাচনপরবর্তী পরিস্থিতিকে বিবেচনায় নিয়ে বিষয়গুলোকে তেমনভাবে আর প্রকাশ্যে আনছে না দেশটি। এমনকি লুর বাংলাদেশ সফরের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতিতেও প্রসঙ্গগুলো নেই। এর ফলে বোঝাই যাচ্ছে, ঢাকা-ওয়াশিংটনের মধ্যে নতুন সম্পর্কের আবহ তৈরি হয়েছে এবং সেই সম্পর্কে ভর করে নতুন করে এগিয়ে যেতে চায় দুই দেশই।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App