×

প্রথম পাতা

জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলা

রায়ের আদ্যপান্ত ও বিদেশে নিমন্ত্রণে মেলে রহস্যের গন্ধ

Icon

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

 রায়ের আদ্যপান্ত ও বিদেশে নিমন্ত্রণে মেলে রহস্যের গন্ধ
কাগজ প্রতিবেদক : চাঞ্চল্যকর চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলার রায়ে বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন বিচারক। এসব পর্যবেক্ষণ থেকে জনমনে অনেক প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে- যার জবাব এখনো অজানা। রায়ে বিচারক তার পর্যবেক্ষণে আলোচিত এ মামলায় দোষীদের চূড়ান্ত শাস্তি না হওয়ার পেছনের কারণও উল্লেখ করেছেন। মামলার ২৫ বছর পার হওয়া এই রায়ে লঘুদণ্ডের পেছনের কারণ খুঁজতে গিয়ে মিলেছে রহস্যের গন্ধ। মামলার বাদীসহ ১০ জন সাক্ষ্য দিলেও কারো বক্তব্যে খুনের বর্ণনা ছিল না। এদের মধ্যে আবার দুজন ছিল বৈরী সাক্ষী। ঘটনার পর আদনান সিদ্দিকী স্পটে ধরা পড়লেও সাক্ষীর বর্ণনায় তা অস্পষ্ট। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরীর গাড়িচালকসহ গুরুত্বপূর্ণ ১১ জন সাক্ষী মারা গেছেন। আবার গুরুত্বপূর্ণ ১২ সাক্ষীকে পায়নি রাষ্ট্রপক্ষ। গত বৃহস্পতিবার এই মামলার রায়ে তিনজনের যাবজ্জীবন ও ছয়জন বেকসুর খালাস পেয়েছেন। জানা গেছে, হত্যা মামলার বাদী সোহেল চৌধুরীর বড়ভাই তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরীর স্ত্রী সাঈদা মুনা তাসনিম যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাইকমিশনার। এর সঙ্গে অতিরিক্ত আয়ারল্যান্ড ও লাইবেরিয়ায় রাষ্ট্রদূতেরও দ্বায়িত্ব পালন করছেন তিনি। এর আগে থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ায় হাইকমিশনার এবং জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কমিশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি ছিলেন। মামলার প্রধান আসামি আজিজ মোহাম্মদ ভাই বছরের অনেকটা সময় পরিবার নিয়ে থাইল্যান্ডে বসবাস করেন। সেখানে তার বাড়ি, গাড়ি ও ব্যবসা রয়েছে। লন্ডনসহ অনেক দেশে তার অবাধ বিচরণও রয়েছে। ব্যবসায়িক কারণে থাইল্যান্ড দূতাবাসে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের যাতায়াত ও যোগাযোগ ছিল। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে তৌহিদুল-মুনা দম্পত্তির ছেলের জাবেদ চৌধুরীর বিয়ের অনুষ্ঠানিকতার পর ফ্রান্সের প্যারিসে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আলোচিত আজিজ মোহাম্মদ আমন্ত্রিত হয়েছিলেন বলেও চাউর রয়েছে। গুঞ্জন রয়েছে মামলার বাদী তৌহিদুলের সঙ্গে বিদেশে আজিজ মোহাম্মদের যোগাযোগ তৈরি হয়। এরপর তিনি মামলা পরিচালনায় অনেকটাই নির্লিপ্ত হয়ে পড়েন। এমনকি নিহতের সন্তানরাও ছিলেন নির্লিপ্ত। এই সুযোগে বিবাদীরা নানা কৌশলে স্বাক্ষীদের ম্যানেজ করে। প্রয়োজনীয় স্বাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে হত্যা মামলার রায়ে কোনো আসামিকেই সর্বেচ্চ সাজা দিতে পারেননি বিচারক। ওই মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক অরুণাভ চত্রবর্তী বলেন, এ মামলার সিডি (কেস ডকেট তথা মামলার তদন্তকালে তদন্ত কর্মকর্তার সংগ্রহ করা তথ্য প্রমাণ সংবলিত নথি) পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয়, সিডি গায়েব করা হয়েছে। যারা পুলিশের কাছে সাক্ষ্য দিয়েছেন তাদের অনেকেই মারা গেছেন। তাই তাদের পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি। এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা কেউ সাক্ষ্য দিতে হাজির হননি। একজন আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও দুজন সাক্ষীর জবানবন্দি নেয়া ম্যাজিস্ট্রেটদেরও পাওয়া যায়নি। সোহেল চৌধুরী কোনো অখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন না। অথচ তিনি খুন হলেন। ট্রাম্পস ক্লাবের ম্যানেজার বলেছেন, জেনেছি, সোহেল চৌধুরী নামে একজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। অথচ এ ঘটনায় আহত অপর একজনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়। মামলার বাদী ছাড়া অন্য যারা সাক্ষ্য দিয়েছেন, তারা পক্ষপাতদুষ্ট ও প্রকৃত সত্য আড়াল করে গেছেন। এই অবস্থায় সঠিক বিচার সম্ভব নয়। তারপরও ঘটনার পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য বিবেচনা করে রায় দেয়া হলো। রায়ে বিচারক বলেন, এত বছর ধরে মামলার বিচার না হওয়ায় মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রভাব পড়ে। প্রতিটি মৃতের আত্মা বিচার চায়। ঘটনাস্থল থেকে আসামি আদনান সিদ্দিকী আটক হয়েছিলেন- এ কথা অস্বীকার করা যাবে না এবং এটা প্রমাণিত। তার জবানবন্দি থেকে ও অন্যান্য সাক্ষীদের থেকে প্রমাণ হয়, ট্রাম্পস ক্লাবের মালিক বান্টি ইসলাম ঘটনার সময় ক্লাবে উপস্থিত ছিলেন। ঘটনার আগে সোহেল চৌধুরীর সঙ্গে আজিজ মোহাম্মদ ভাই ও বান্টি ইসলামের তর্ক-বিতর্ক হয়েছিল সেটাও প্রমাণিত। কাজেই হত্যা পরিকল্পনা ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তিনজন জড়িত থাকার বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হলো। তবে আদনান সিদ্দিকী কয়েকজনের নাম বলেছেন নিজের গা বাঁচিয়ে। যে নিজের গা বাঁচিয়ে সাক্ষ্য দিতে পারে, সে অন্যের নামও অসত্য বলতে পারে। তবে যাদের নাম বলেছে, তাদের কাছ থেকে কোনো রিকোভারি হয়নি। তারা যে সেখানে ছিল সেটা বিশ্বাস করার কারণ থাকা সত্ত্বেও যাদের নাম বলেছে আদনান সিদ্দিকী, তাদের মধ্যে একজনও যদি সেখানে না থাকে বা একজনের নাম অন্তর্ভুক্ত করে থাকে, তাহলে তার ভাষ্য অনুযায়ী আসামিদের গুরুদণ্ড দেয়া ঠিক হবে না। তাই বান্টির বক্তব্যে ইমন ও আশীষ রায় চৌধুরীর নাম এলেও ঘটনাস্থলে তাদের উপস্থিতি প্রমাণিত হয়নি। ছয়জনের বিষয়ে কোনো সাক্ষ্য প্রমাণ না পাওয়ায় তাদের খালাস দেয়া হলো।’ এ প্রসঙ্গে সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলার রায়ে বিচারক সাক্ষীদের উদ্দেশে করে যেটি বলেছেন, তা স্পষ্ট করে ইঙ্গিত দেয়, এসব ঘটনার রায় যত দেরি হবে সাক্ষীরা ততো বেশি প্রভাবিত হবে। হয়তো বিচারক তার পর্যবেক্ষণে অনেক কিছু খোলাসা করে বলেননি। তবে, বিচারকাজে অপূর্ণতা রুখতে শতভাগ আইনের ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। যেখানে সামাজিক, রাজনৈতিক ও আইনগত কোনো বাধা থাকবে না, বিচার শেষ হতে এত সময় লাগবে না, সাক্ষীদের কোনো মহলই প্রভাবিত করতে পারবে না। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান বলেন, নায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলাটি আলোচিত। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে যখন কোনো ক্রিমিনাল মামলা চলে তখন বাদীপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। তদন্ত কর্মকর্তা বদলি বা মারা যান। সাক্ষীরা মারা যান অথবা আসামি পক্ষের কাছে ম্যানুপুলেট হয়ে যান। অনেক সময় আলামত নষ্ট হয়ে যায়। নথি দীর্ঘসময় যতœ করে রাখাও কঠিন কাজ। কিন্তু সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়া রায় ঘোষণা করা সম্ভব নয়। তাই অনেক সময় বাদীপক্ষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। জনমনে রায় নিয়ে এক ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়। সাক্ষীদের বর্ণনায় নেই খুনের বিবরণ : মামলায় প্রথম সাক্ষী চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরীর ভাই তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী আদালতকে বলেন, সোহেল চৌধুরীর চালক সেলিম আমার দারোয়ানকে জানান, আমার একমাত্র ছোট ভাই সোহেলকে রাত ৩টার সময় বনানীর ১৭ নম্বর সড়কের আবেদীন টাওয়ারের নিচে ট্রাম্প ক্লাবের কলাপসিবল গেটের সামনে আততায়ীরা গুলি করেছে। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গিয়ে তাকে মৃত অবস্থায় পাই। তিনি বলেন, সেলিম জানায়, রাত আনুমানিক ৩টার দিকে বা তার আগে সোহেল চৌধুরী তিনজনকে নিয়ে ট্রাম্প ক্লাবের উদ্দেশে যান। ক্লাবের কলাপসিবল গেট পর্যন্ত গিয়ে তারা কতিপয় আততায়ীর বাধার সম্মুখীন হন। আততায়ীর হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। আততায়ীদের মধ্যে একজন অলির ভাই সোহেলের সঙ্গী কালামের সঙ্গে বাগ্?বিতণ্ডায় জড়ায়। তৌহিদুল ইসলাম বলেন, একপর্যায়ে আততায়ীর একজন কালামের পেটে উপর্যুপরি দুবার গুলি করে। সে সময় সোহেল চৌধুরী আততায়ীদের সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে জড়ায় এবং বাধা দিতে থাকে। তাদের একজন সোহেল চৌধুরীর বুকে পিস্তল ঠেকিয়ে উপর্যুপরি দুবার গুলি করে। এরপর আসামিরা ফাঁকা গুলি করতে করতে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। এলোপাতাড়ি গুলি চলা অবস্থায় ট্রাম্প ক্লাবের দুজন কর্মকর্তা আহত হয়। আততায়ীদের মধ্যে একজন আদনান সিদ্দিকীকে পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী লোকজন আটক করে। সোহেলের সঙ্গী গুলিবিদ্ধ কালাম আততায়ীদের চিনতে পারে। সোহেল চৌধুরীর চালকের কাছ থেকে জানতে পারি, পূর্বশত্রæতার জের ধরে সোহেল চৌধুরীকে খুন করা হয়েছে। মামলার ২ নম্বর সাক্ষী রফিকুল ইসলাম মণ্ডল আদালতকে বলেন, আবেদীন টাওয়ারে অবস্থিত ইপিক ডিজাইনার্স লিমিটেডের পিয়ন পদে কর্মরত ছিলাম। সেদিন সকাল ৯টায় আবেদীন টাওয়ারের নিচতলার কলাপসিবল গেটের পশ্চিম দিকে ৫-৬ গজ দূরে আমি একটা পিস্তলের গুলির খোসা পেছনে লাল রং দেখত পাই। আবেদীন টাওয়ারের পূর্ব পাশের কলাপসিবল গেটের রাস্তায় আমি রক্ত দেখতে পাই। এরপর তৃতীয় তলায় সিকিউরিটি অফিসার আনোয়ার রশিদকে খুঁজে না পেয়ে ষষ্ঠ তলায় যাওয়ার জন্য সিঁড়ি দিয়ে পঞ্চম তলা থেকে ষষ্ঠ তলায় যাওয়ার সময় সিঁড়িতে গুলির মাথার অংশ সিসা দেখতে পাই। রফিকুল ইসলাম মণ্ডল আরো বলেন, ষষ্ঠ তলায় যাওয়ার পর সিকিউরিটি অফিসার আনোয়ার রশিদকে গুলির বিষয়ে জানাই। আনোয়ার রশিদ গুলির খোসা দেখতে পান এবং রক্ত দেখেন। তখন লোকজন জানান, রাত ৩টার সময় আবেদীন টাওয়ারের নিচতলায় গোলাগুলি হয়েছে। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে সোহেল চৌধুরী মারা যান। একজন লোককে স্থানীয় লোকজন ধরেছেন। সেদিন সকাল ১০টা ৫ মিনিটের দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। পুলিশ প্রথমে রক্ত, রক্তমাখা বালু সিগারেটের কাগজ দিয়ে সংগ্রহ করে। পরে পুলিশ আমাকে সঙ্গে নিয়ে একটি গুলির খোসা ও পুলিশ ভবনের সিঁড়ি থেকে গুলির সিসা সংগ্রহ করে। মামলার ৩ নম্বর সাক্ষী দাইয়ান খান আদালতকে বলেন, তিনি মামলার ছয় মাস আগে বান্টির গাড়ি চালক ছিলেন। ওইদিন রাত ১১টার সময় ট্রাম্প ক্লাবে যান। গাড়ি পার্কিং করার পর বান্টি তাকে ক্লাবের সামনে থাকতে বলেন। তখন সেখানে সোহেল চৌধুরী আসেন। তাকে ক্লাবের গেটে ঢুকতে দেয়া হয়নি। তিনি ক্লাবের নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। গেটে লাথি মারেন এবং গালি দেন। রাত আড়াইটার দিকে সোহেল চৌধুরী ক্লাবে এলে দুদিক দিয়ে দুটি গাড়ি আসে। দাইয়ান খান আরো বলেন, তখন ক্লাবের কেঁচিগেট দিয়ে ঢোকার জন্য গণ্ডগোল হয়। তখন গুলির আওয়াজ শুনতে পাই। আমি গুলিতে আহত হয়ে নিচে মাটিতে পড়ে যাই। ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাওয়ার পর জ্ঞান ফিরলে শুনতে পাই, সোহেল চৌধুরী মারা গেছেন। পরে আমি হাসপাতাল থেকে বান্টি ইসলামের বাসায় চলে যাই। রাতের বেলা আমি, হান্নানসহ ৪-৫ পাঁচজনকে ডিবি অফিসে নিয়ে যায়। ডিবি অফিসার সিরাজ জিজ্ঞাসাবাদ করেন। মামলার ৪ নম্বর সাক্ষী রওশন আরা তুলি খুনের অভিযোগের সপক্ষে বক্তব্য না দেয়ায় আদালতে তাকে বৈরী সাক্ষী ঘোষণা করে রাষ্ট্রপক্ষ। জেরার জবাবে রওশন আরা তুলি বলেন, ঢাকার ইস্কাটনের টিএমসি ভবনের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরিকালে আফরিন সুলতানা তার সহকর্মী ছিলেন। কোনো দিন সোহেল চৌধুরীর বাসায় যাইনি। আফরিন সুলতানা ও আমি মাঝেমধ্যে সোহেল চৌধুরীর সঙ্গে কথাবার্তা বলতাম। তার সঙ্গে আমার কোনো বন্ধুত্ব গড়ে ওঠেনি। আমি সোহেল চৌধুরীর মৃত্যুর পর পুলিশের কাছে জবানবন্দি দিয়েছি, সত্য নয়। রওশন আরা তুলি জেরার জবাবে আদালতকে আরো বলেন, ‘সত্য নয় যে ১৯৯৮ সালের ২২ নভেম্বর চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরীর সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছিল বলে আমি পুলিশের কাছে জবানবন্দিতে বলেছিলাম। সত্য নয় যে, আমি সোহেল চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার স্ত্রী হিসেবে বিভিন্ন স্থানে পরিচয় দিয়েছি। সত্য নয় যে, সোহেল চৌধুরীর মৃত্যুর আগে আমি তার কথামতো আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের বাসায় এটিভি ব্যবসার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গিয়েছি। সত্য নয় যে, আমি সোহেল চৌধুরীর সুনাম-খ্যাতি অভিজাত্য ইত্যাদিতে আকৃষ্ট হয়ে তাকে বিয়ের প্রস্তাব করলে তিনি আমার প্রস্তাবে সম্মত হননি। সে কারণে তার প্রতি আমার ক্ষোভ ও আক্রোশ আছে। সে কারণে তাকে আমি স্বামী হিসেবে দাবি করে পুলিশের কাছে জবানবন্দি দিয়েছি।’ মামলার ৫ নম্বর সাক্ষী এনামুল হাফিজ খানকে রাষ্ট্রপক্ষ বৈরী সাক্ষী ঘোষণা করেন। এনামুল হাফিজ খান আদালতকে বলেন, সেদিন বিকালে পুলিশ ট্রাম্প ক্লাবের ১৫টি আইটেম জব্দ করেছিল। আমি তাতে স্বাক্ষর করেছিলাম। ১৯৯৮ সাল থেকে চাকরি করতাম। ঘটনার দিন রাত ১০টা থেকে ৩টার মধ্যে ব্যক্তিগত উদ্যোগে আমন্ত্রিত অতিথিদের গানবাজনা ও নৈশভোজের আয়োজন ছিল। অনুষ্ঠান নিয়ে একটা গণ্ডগোল হয়। ৮ তলার আমার অফিসে অবস্থান করার কারণে এই গণ্ডগোল বা ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত জানি না। আমি কাজ শেষ করে বাইরে যাওয়ার সময় জানতে পারি, সোহেল চৌধুরী নামের একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। জেরার জবাবে এনামুল হাফিজ খান আদালতকে বলেন, ট্রাম্প ক্লাবে চাকরিতে যোগ দেয়ার কোনো নিয়োগপত্র তার নেই। তবে বান্টি ইসলাম ট্রাম্প ক্লাবের মালিক ছিলেন। আশিষ কুমার রায় ও সুকুমার রায় আর্থিকভাবে সম্পর্কিত ও ব্যবসায়িক পার্টনার ছিলেন। আমার পিতা আমাদের বাড়ির নিচতলা ভিডিও কানেকশন নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দেন। ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক বান্টি ইসলাম। এই বান্টি ইসলামের মাধ্যমে আমি ট্রাম্প ক্লাবে চাকরি পাই। এনামুল হাফিজ খান বলেন, সোহেল চৌধুরী ট্রাম্প ক্লাবের সদস্য ছিলেন না। আমার দায়িত্ব পালনকালে সোহেল চৌধুরী দু-একবার এই ক্লাবে যান। আমার সামনে সোহেল চৌধুরীর সঙ্গে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের একবার কথাকাটাকাটি হয়েছিল। আমি সোহেল চৌধুরীকে চলে যেতে বলি। আজিজ মোহাম্মদ ভাইকে আমার কক্ষে নিয়ে যাই। তখন সোহেল চৌধুরী চলে যান। আশীষ রায় চৌধুরীর সঙ্গে সোহেল চৌধুরীর কথাকাটাকাটি সম্পর্কে আমি জানি না। দাইয়্যান ও নীরব নাইট ক্লাবের নিরাপত্তারক্ষী ছিলেন। ঘটনার দিন দুজন নিরাপত্তারক্ষী আহত হন। পরে তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। এনামুল হাফিজ খান জেরার জবাবে বলেন, ‘আমি জানি না, সোহেল চৌধুরী এই ট্রাম্প ক্লাব বন্ধ করার জন্য মসজিদ কমিটির লোকজন নিয়ে ক্লাবে গিয়েছিল। এতে শত্রæতা সৃষ্টি হয়েছে কিনা তাও জানি না। সত্য নয় যে, সোহেল চৌধুরী ঘটনার দিন ট্রাম্প ক্লাবের অনুষ্ঠান বন্ধ করার জন্য গিয়েছিল। আসামিরা তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে। মামলার ৬ নম্বর সাক্ষী আবদুল খালেক আদালতকে বলেন, ঘটনার দিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্ব পালনের সময় সোহেল চৌধুরীসহ কয়েকজন রাত ২টা ১৫ মিনিটে বাসায় আসেন। বাসায় নিজ কক্ষে যাওয়ার ৮-১০ মিনিট পর দুজন পুলিশ সদস্য সাদাপোশাকে আসেন। তাদের দুজনকে চেহারায় চিনি। পুলিশ দুজন ১০-১২ মিনিট বাসার ভেতরে অবস্থান করেন। পরে পুলিশ সদস্যরা চলে যান। রাত ২টা ৫০ মিনিটে সোহেল চৌধুরী তার বন্ধুদের নিয়ে পুনরায় বাসা থেকে বের হন। আবদুল খালেক বলেন, তারা চলে যাওয়ার পর সোহেলের গাড়িচালক সেলিম বাসা থেকে বাইরে যান। চালককে না নিয়ে সোহেল চৌধুরী তার বন্ধুদের নিয়ে হেঁটে বাসা থেকে বের হন। সোহেল চৌধুরী বাসা থেকে বের হওয়ার ১০ মিনিট পর গুলির শব্দ শুনতে পাই। গুলির শব্দের পর চালক সেলিম দৌড়ে বাসায় এসে গেট খুলতে বলেন। এরপর ওয়্যারলেসে স্যারের (সোহেল চৌধুরী) সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, গুলির শব্দ পেলাম। চালককে বাসায় রেখে গেট খুলে বের হওয়া মাত্র দুজন লোক বলেন, সোহেল চৌধুরী ক্লাবের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে আছেন। অফিসের স্টাফরা বলাবলি করেন, গোলাগুলির সময় আদনান সিদ্দিকী হাতেনাতে ধরা পড়েন। মামলার ৭ নম্বর সাক্ষী নাছিমুল আলম চৌধুরী আদালতকে বলেন, আমি সোহেল চৌধুরীর বন্ধু। শুনেছি ট্রাম্প ক্লাবে যাওয়ার পর ক্লাবে ঢোকা নিয়ে তর্কাতর্কির পর তাকে গুলি করা হয়। পরে সে হাসপাতালে মারা যায়। সোহেল চৌধুরীকে কারা মেরেছে জানি না। মামলার ৮ নম্বর সাক্ষী আহম্মেদ সাঈদ আদালতকে বলেন, সোহেল চৌধুরী আমার বন্ধু। ঘটনা সম্পর্কে কিছুই জানি না। ট্রাম্প ক্লাবে কোনো ঘটনা ঘটেছে কিনা আমি কিছুই জানি না। মামলার ৯ নম্বর সাক্ষী চিকিৎসক বেলায়েত হোসেন আদালতকে বলেন, সোহেল চৌধুরীর মৃতদেহের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে। মামলার ১০ নম্বর সাক্ষী তপন লাল দত্তকে রাষ্ট্রপক্ষ বৈরী সাক্ষী ঘোষণা করেন। সাক্ষী তপন লাল দত্ত আদালতকে বলেন, ট্রাম্প ক্লাবে ওয়েটার হিসেবে চাকরি করতাম। ঘটনা কতটার সময় বলতে পারব না। ভোর ৬টায় হোটেল থেকে বের হয়ে আসি। সোহেল চৌধুরী খুন হয়েছে এটা শুধু জানি। উল্লেখ্য, ১৯৯৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর বনানীর ১৭ নম্বর রোডের আবেদীন টাওয়ারে ট্রাম্পস ক্লাবের নিচে সোহেলকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ঘটনার পরদিনই তার ভাই তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী গুলশান থানায় হত্যা মামলা করেন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App