×

প্রথম পাতা

জাতিসংঘে প্রস্তাব পাসে আরো জোরালো হবে ফিলিস্তিনি দাবি

Icon

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

জাতিসংঘে প্রস্তাব পাসে আরো জোরালো হবে ফিলিস্তিনি দাবি
কাগজ ডেস্ক : ফিলিস্তিনকে পূর্ণ সদস্যপদ দেয়ার জন্য নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাস হয়েছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে। এর ফলে সাধারণ পরিষদ জাতিসংঘের ভেতরে ফিলিস্তিনের অধিকারসীমা আরো বাড়িয়েছে এবং সদস্য হিসেবে তাদের অন্তর্ভুক্তির দাবিকে আরো জোরালো করেছে। এদিকে গাজা উপত্যকার মিসর সীমান্তবর্তী মধ্য রাফা অঞ্চলে অভিযান চালানোর লক্ষ্যে বাসিন্দাদের নতুন করে নির্দেশনা দিয়েছে ইসরায়েল। এতে সেখানে ধ্বংসযজ্ঞ ও অনেকের বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়েছে। ফিলিস্তিন ২০১২ সাল থেকেই জাতিসংঘের অ-সদস্য পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র হিসেবে মর্যাদা পাচ্ছে। কিন্তু এর ফলে তারা পূর্ণ সদস্যের সুযোগ-সুবিধা পায় না। পূর্ণ সদস্য পদের বিষয়টি নির্ধারণ করে শুধু জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। স¤প্রতি ফিলিস্তিনের পূর্ণ সদস্য হওয়ার এক দফা চেষ্টায় ভেটো দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে গত শুক্রবার সাধারণ অধিবেশনে যে ভোট হয়েছে সেটাকে দেখা হচ্ছে ফিলিস্তিনের পূর্ণ সদস্য পদ প্রাপ্তির পক্ষে সমর্থন হিসেবে। ভোটের আগে জাতিসংঘে নিযুক্ত ফিলিস্তিনের দূত রিয়াদ এইচ মানসুর বলেন, আমরা শান্তি চাই, আমরা স্বাধীনতা চাই, একটা ‘হ্যাঁ’ ভোট ফিলিস্তিনের অস্তিত্বের ভোট, এটা কোনো রাষ্ট্রের বিপক্ষে নয়। সাধারণ পরিষদে বেশ বড় ব্যবধানেই ভোটের মাধ্যমে ফিলিস্তিনকে নতুন ‘অধিকার ও সুবিধা’ দিয়েছে জাতিসংঘ এবং একই সঙ্গে জাতিসংঘের ১৯৪তম সদস্য হিসেবে ফিলিস্তিনের অন্তর্ভুক্তির দাবিকে পুনরায় বিবেচনা করতে বলা হয়েছে। আরব ও ফিলিস্তিনের আনা এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট পড়েছে ১৪৩টি। বিপক্ষে ভোট দেয়া ৯টি রাষ্ট্রের মধ্যে রয়েছে- যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল, আর্জেন্টিনা, হাঙ্গেরি, চেক প্রজাতন্ত্র, মাইক্রোনেশিয়া, নাউরু, পালাউ ও পাপুয়া নিউ গিনি। এছাড়া ২৫টি রাষ্ট্র ভোটদানে বিরত থাকে। জাতিসংঘের এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস এক বিবৃতিতে বলছেন, এটা নিরাপত্তা পরিষদে আবারো ভোটের জন্য আমাদের যে চেষ্টা, সেটাকে সমর্থন করবে। ফিলিস্তিন জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্য পদ পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাবে। জাতিসংঘ এই প্রস্তাবটি পাস করল এমন সময় যখন বিভিন্ন ইউরোপীয় রাষ্ট্র ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়ার পরিকল্পনা করছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (ইইউ) ফরেন পলিসি প্রধান জোসেপ বোরেল বলেছেন, স্পেন আগামী ২১ মে এই স্বীকৃতি দেবে। মাল্টা, আয়ারল্যান্ড ও স্লোভেনিয়াও একই পথে হাঁটছে। শুক্রবার জাতিসংঘের প্রস্তাবে ফিলিস্তিনকে বাড়তি সুবিধা দেয়া হয়, যাতে তারা পুরোপুরি কোনো বিতর্কে অংশ নিতে পারে, এজেন্ডা প্রস্তাব করতে পারে এবং কমিটি নির্বাচনে তাদের প্রতিনিধি রাখতে পারে। তবে কোনো ভোট দেয়ার অধিকার এখনো পাচ্ছে না তারা। সেটি দেয়ার ক্ষমতা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের নেই, কেবল নিরাপত্তা পরিষদ এর অনুমোদন দিতে পারে। ৫টি দেশ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী প্রতিনিধি এবং ভোটে তাদের প্রত্যেকের ভেটো দেয়ার ক্ষমতা আছে। কাউন্সিলের বাকি ১০টি অস্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র। নিরাপত্তা পরিষদে কোনো প্রস্তাব পাস হলে, সাধারণ পরিষদে এ নিয়ে ভোট হয়, যেখানে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পেলেই চলে। নিরাপত্তা পরিষদের যে কোনো খসড়া প্রস্তাব পাস হওয়ার জন্য ৫ স্থায়ী সদস্যেরই ভোট লাগবে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন ও ফ্রান্স- কোনো একটি সদস্য ভেটো দিলে প্রস্তাবটি আটকে যাবে। নতুন প্রস্তাব পাসের তাৎপর্য কী : ইসরায়েল ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয় না। গাজা ও পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে আসছে বর্তমান ইসরায়েলি সরকার। তাদের যুক্তি, এরকম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলে তা হবে ইসরায়েলে অস্তিত্বের জন্য হুমকি। যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের পাশাপাশি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সমর্থন করে। ‘টু স্টেট সলিউশন’ বা দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানকে তারা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকটের একমাত্র সমাধান মনে করে। কিন্তু তারা বলে যে এটা আসতে হবে শুধু ওই দুই পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে। জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী দূত রবার্ট উড শুক্রবার বলেন, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের জন্য যুক্তরাষ্ট্র তখনই সমর্থন দেবে যখন দুই পক্ষের আলোচনায় ইসরায়েলের নিরাপত্তা এবং ফিলিস্তিনিরাও যে তাদের রাষ্ট্রে শান্তিতে বসবাস করবে- সেই নিশ্চয়তা দেয়া হবে। গত মাসে অনেক দেশের সমর্থনে আলজেরিয়া ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে সদস্য করার একটি প্রস্তাব আনে। নিরাপত্তা পরিষদের ৫ স্থায়ী সদস্যের একজন হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র তাতে ভেটো দেয় এবং বলে যে এটা এখনো করার সময় আসেনি। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের আনা কোনো প্রস্তাবের আইনগত বাধ্যবাধকতা আছে, যা সাধারণ পরিষদের আনা কোনো প্রস্তাবের ক্ষেত্রে থাকে না। তবে সাধারণ পরিষদের এই ভোট জাতিসংঘের সদস্য হতে ফিলিস্তিনের পক্ষে যে বৈশ্বিক সমর্থন রয়েছে সেটাকেই আবারো তুলে ধরল। অনেক দেশ গাজায় অভিযানে মৃতের সংখ্যা ও নতুন করে রাফায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে শঙ্কা জানিয়েছে। ফিলিস্তিনিদের মধ্য রাফা ছাড়ার নির্দেশ : ফিলিস্তিনিদের এবার মধ্য রাফা ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। ব্যাপক আকারে সামরিক অভিযানের লক্ষ্যেই গতকাল শনিবার তারা এই নির্দেশ দেয়। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, মিসরের রাফা সীমান্ত ক্রসিং দখল করে নিয়েছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। গত সপ্তাহে পূর্বাঞ্চলীয় এলাকা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরে যাওয়ার নির্দেশের পর এটি পরিকল্পিত অভিযান ছিল। গাজার দক্ষিণঞ্চলীয় রাফা শহর থেকে প্রায় ৩ লাখ ফিলিস্তিনি অন্যত্র সরে গেছে। গত সোমবার স্থল অভিযানের উদ্দেশে ইসরায়েল সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়ার পর থেকেই অসহায় ফিলিস্তিনিরা এই শহর থেকে পালিয়ে যেতে থাকে। এক বিবৃতিতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ গাজাবাসী রাফা থেকে আল-মাওয়াসি শহরের ‘মানবিক অঞ্চলের’ দিকে চলে গেছে। এদিকে, গাজার হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ৭ অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত গাজায় ৩৫ হাজার ৯৭১ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। তাদের মধ্যে ৭০ শতাংশই নারী ও শিশু। তাছাড়া ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত আহত হয়েছে ৭৮ হাজার ৬৪১ জন ফিলিস্তিনি। অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ : গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসন বন্ধের দাবিতে এবার বিক্ষোভে নেমেছেন যুক্তরাজ্যের খ্যাতনামা দুই বিশ্ববিদ্যালয়- অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজের শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তাঁবু টানিয়ে বিক্ষোভ করছেন তারা। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের মুখে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে ইউরোপের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের দাবিগুলোর মধ্যে অন্যতম এটি। গত বুধবার লন্ডনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন কয়েকশ শিক্ষার্থী। বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে একগুচ্ছ দাবি উত্থাপন করা হয়। ইসরায়েলকে সব ধরনের অর্থায়ন বন্ধ, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিনিয়োগ নীতি সংস্কার, ইসরায়েলকে বর্জন, গাজায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুনর্নির্মাণসহ এতে বেশ কিছু দাবি রয়েছে। অক্সফোর্ডের মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্টোরি ও কেমব্রিজের কিংস কলেজের সামনে তাঁবু টানিয়ে বিক্ষোভ করছেন শিক্ষার্থীরা। ‘গাজায় গণহত্যা থামাও’, ‘ইসরায়েলকে সহযোগিতা বন্ধ করো’- এমন স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড ও ফিলিস্তিনের পতাকা দেখা যায় শিক্ষার্থীদের হাতে। বিক্ষোভকারীদের কারো কারো মাথায় ছিল ঐতিহ্যবাহী কেফায়া (ফিলিস্তিনিদের সাদা-কালো স্কার্ফ)। এদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভের বিষয়ে সতর্ক করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক। ক্যাম্পাসে ইহুদি শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় আরো পদক্ষেপ নিতে উপাচার্যদের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রে বিক্ষোভকারীদের তাঁবু ভাঙল পুলিশ : যুক্তরাষ্ট্রের আরো কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থানরত ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভকারীদের তাঁবু ভেঙে দিয়েছে পুলিশ। গত শুক্রবার বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে তারা আটক করেছে। এদিন পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায় পুলিশ। এর কয়েক ঘণ্টা আগে অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়েও পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে বিক্ষোভকারীদের হটিয়ে দেয় এবং তাঁবুগুলো ভেঙে দেয়। প্রায় তিন সপ্তাহ আগে নিউইয়র্ক সিটির কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। এরপর অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে তা ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিলিস্তিনপন্থি শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান নেন এবং বিক্ষোভ শুরু করেন। বিক্ষোভকারীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যেন ইসরায়েলের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং গাজায় যুদ্ধবিরতির জন্য চাপ দেয়। এপির হিসাব অনুসারে, বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ৫৭টি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রায় ২ হাজার ৯০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ হিসাব করা হয়েছে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App