×

প্রথম পাতা

সিন্ডিকেটের কবলে মার্কেট

Icon

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সিন্ডিকেটের কবলে মার্কেট
রাজধানীর গুলিস্তান ও আশপাশের এলাকায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মালিকানাধীন মার্কেট ঘিরে গড়ে উঠেছে মাফিয়াচক্র। তাদের ইশারায় সব হয় সেখানে। চারটি মার্কেট নিয়ে গঠিত পুড়ে যাওয়া বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স, গুলিস্তান ট্রেড সেন্টার, সুন্দরবন মার্কেট, পাশের কাপ্তানবাজার মুরগি পট্রি এবং অদূরে চানখারপুল মার্কেট ঘিরে সংঘবদ্ধচক্র সবসময় সক্রিয়। বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স দোকান মালিক সমিতির নেতৃত্ব বদলে গেছে নির্বাচন ছাড়াই। এক যুগের বেশি সময় ধরে নির্মাণকাজ বন্ধ থাকলেও ঢাকা ট্রেড সেন্টার এবং কাপ্তানবাজারে মার্কেট আছে দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে। ডিএসসিসি মেয়রের চিহ্নিত ‘রেডজোনেও’ চলছে চাঁদাবাজি। 

ক্ষমতার পালাবদল হলে চক্রে নাম সংযোজন-বিয়োজন হয় মাত্র। সবই চলে একই কায়দায়। সিন্ডিকেটই সেখানে হর্তাকর্তা। তারাই কৌশল করে দোকান বরাদ্দ দিয়ে ভাড়া নির্ধারণ করে, নানা অজুহাতে টাকা তুলে এবং সমিতি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। চক্রের অনেকের বিভিন্ন নামে একাধিক দোকান রয়েছে। আবার মনগড়া দোকান মালিক সমিতি করে বাইরে থেকে কলকাঠি নাড়ে অনেকে। সব মার্কেটের মালিক সমিতির নেতৃত্বে আছে ঘুরেফিরে একই মুখ। এদের নেপথ্যে কিশোরগঞ্জের একজন সংসদ সদস্যের নাম সবসময় আলোচিত। সব মিলিয়ে ডিএসসিসির এসব মার্কেট চক্রের কাছে জিম্মি। 

এ প্রসঙ্গে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিজানুর রহমান ভোরের কাগজকে বলেছেন, বঙ্গবাজারে নতুন ভবন নির্মাণ নিয়ে সবকিছু ঠিক আছে। প্রধানমন্ত্রীর সময় পেলে নির্মাণকাজ শুরু হবে। এই মার্কেটে সমিতির নেতৃত্বে কারা তা ডিএসসিসি তা দেখছে না। এটা ব্যবসায়ীদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তবে মার্কেটগুলোর নির্মাণকাজ বন্ধ কেন সে ব্যাপারে একাধিকবার চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। 

জানা গেছে, বঙ্গবাজার হকার্স মার্কেট, গুলিস্তান হকার্স মার্কেট, মহানগর হকার্স মার্কেট ও আদর্শ হকার্স মার্কেট নিয়ে গড়ে উঠা বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স আগুনে পুড়ে গেছে। ‘বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স’ নাম পরিবর্তন করে সেখানে ১০ তলাবিশিষ্ট ‘বঙ্গবাজার পাইকারি নগর বিপণিবিতান’ নির্মাণের দরপত্র শেষ হয়েছে। ঠিকাদারি কাজ পেয়েছে ন্যাশনাল ডেভলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং (এনডিই)। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সময় দিলে নির্মাণকাজের উদ্বোধন হবে বলে জানা গেছে। নতুন ভবনে ৩ হাজার ২০৩টি দোকান নির্মাণ হবে। এর মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ২৯৬১ জন দোকান মালিক অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দোকান বরাদ্দ পাবেন। প্রতিটি দোকান হবে ৮০ থেকে ১০০ স্কয়ার ফিটের। এখনো স্কয়ার ফিটপ্রতি দর (সালামি মূল্য) নির্ধারণ হয়নি। তবে কাজ শুরুর আগে দোকান মালিকদের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা করে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দোকান মালিক সমিতি। যদিও ট্রেড ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশনকৃত এই সমিতির নির্বাচিত সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে তাড়িয়ে অন্য দুইজন সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক বনে গেছেন। প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের আগে নির্বাচিত কমিটির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়ায় নানা অজুহাতে সাধারণ সভা ও নির্বাচন না করে মালিক সমিতির কমিটি সাজানোর তোড়জোড় চলছে। এমন প্রক্রিয়া ট্রেড ইউনিয়ন আইনে অবৈধ হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত দোকান মালিকদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। 

যদিও সাধারণ সম্পাদক দাবিদার জহিরুল ইসলাম বলেছেন, আগুনের সময় সভাপতি শাহজাহান মিয়া বিদেশে ছিলেন। সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক মজু অপারগ হওয়ায় তিনি এবং নাজমুল হুদা সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছেন। সিটি করপোরেশনের নিয়ম অনুযায়ী সালামি ও দোকান মূল্য নির্ধারণ করা হবে বলেও জানান তিনি। তবে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের সভাপতি শাহজাহান মিয়া বলেছেন, তিনি অসুস্থ থাকায় সময় দিতে না পারায় অনেকে খালি মাঠে গোল দিতে চাচ্ছেন। সালামি এখনো নির্ধারণ হয়নি। কতদিনে মার্কেট নির্মাণ হবে এর নিশ্চয়তা দরকার, লিখিত কাগজ প্রয়োজন। মার্কেটে দুবার আগুন লাগানো হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, দোকান বরাদ্দ নিয়ে যারা তৎপর তারা সঠিকভাবে কাজ করছে না। শাহজাহান মিয়া শিগগিরই দোকান মালিকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বসবেন বলেও জানান। সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল বাসেত এ নিয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। মার্কেটে দোকান ছিল খোরশেদ আলম, আব্দুর রহমান, মোরসালিন, জসিম উদ্দিন, বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুল ইসলাম, মো. শাহজাহান, হাবিবুর রহমান, জাফর তালুকদারসহ অনেকের। ১০ তলা ভবনের দোকানের জন্য সালামি কত হবে এ নিয়ে সবাই এখনো অন্ধকারে আছেন। 

ডিএসসিসির ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফরিদ উদ্দিন আহম্মেদ রতন বলেছেন, ক্ষতিগ্রস্ত সব দোকান মালিক নিয়ম মতো দোকান পাবেন। সবকিছু ঠিক আছে, বরাদ্দে কোনো অনিয়ম হবে না। উল্লেখ্য, গত বছরের ৪ এপ্রিল ভোরে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের প্রায় ৫০টি ইউনিটের সাড়ে ৬ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। ততক্ষণে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের পুরোটাই পুড়ে যায়। 

ডিএসসিসির তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের তথ্যমতে, এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৩ হাজার ৮৪৫ জন ব্যবসায়ী সর্বস্ব হারিয়েছেন। আগুনে ৩০৫ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়। বঙ্গবাজারের ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সহায়তায় ব্যাংকে একটি সঞ্চয়ী হিসাব নম্বর (অ্যাকাউন্ট) খোলা হয়েছিল। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন, বঙ্গবাজার কাঠের মার্কেটের মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জহিরুল ইসলাম ও বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নাজমুল হুদার নামে খোলা এই হিসাবে ৬ কোটি ১৯ লাখ টাকা জমা হয়েছে। বিভিন্ন ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আসা এই সহায়তার অর্থ কোনো ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী এখনো হাতে পাননি বলে জানা গেছে। বঙ্গবাজার পাইকারি নগর বিপণিবিতানে গ্রাউন্ড ফ্লোর ও বেইজমেন্ট ছাড়াও থাকবে মোট ৮টি ফ্লোর। ১ দশমিক ৭৯ একর জায়গার ওপর নির্মিত হতে যাওয়া বহুতল ভবনটিতে থাকবে ৮টি লিফট, এর মধ্যে ৪টি থাকবে ক্রেতা-বিক্রেতাদের জন্য। আর বাকি ৪টি কার্গো লিফট থাকবে মালামাল ওঠা-নামানোর জন্য। এছাড়া থাকছে গাড়ি পার্কিং, খাবারের দোকান, সমিতির অফিস, নিরাপত্তাকর্মী এবং সেখানকার কর্মীদের আবাসন ব্যবস্থা। ভবনটি নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৬৫ কোটি টাকা। 

এদিকে ঢাকা ট্রেড সেন্টারটি গুলিস্তান পুরান বাজার হকার্স মার্কেট ও পোড়া মার্কেট হিসেবে পরিচিত। ট্রেড সেন্টারের দোকানিদের অভিযোগ, ২০০৩ সালে এই মার্কেটের নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রস্তাবিত ১২ তলার এই বিপণিবিতানে ১ হাজার ৬৪৬টি দোকান তৈরির কথা ছিল। কিন্তু নানা অজুহাতে ২০০৪ সাল থেকে নির্মাণকাজ বন্ধ রেখেছে ডিএসসিসি। অথচ এই মার্কেটের দোকান বরাদ্দ বাবদ ৩৪ কোটি টাকা সালামি দিয়েছেন তারা। এর বেইজমেন্ট সাড়ে ৩শ ও উপরে গোডাউন এবং সামনের অংশ ভাড়া নিয়ে টাকা তুলছেন মনোয়ার হোসেন মনু, আতিকুর রহমান ও হান্নান নামে তিনজন। ঢাকা ট্রেড সেন্টারের উপরে রঙিন টিন দিয়ে গোডাউন নির্মাণ করে ভাড়া খাচ্ছেন নাজমুল ও জহিরুল। দখল উচ্ছেদ করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরেছে ডিএসসিসির লোকজন। রহস্যজনক কারণে নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত দোকান মালিকরা হতাশায় সময় পার করছে। এরমধ্যে মারা গেছেন অনেকে। রাজধানী মার্কেট ও খুলনা বিল্ডিংয়ের মাঝখানের স্থানকে ডিএসসিসি মেয়র রেড জোন ঘোষণা করলেও বিকাল তিনটা থেকে রাত বারটা পর্যন্ত সেখানে প্রতিদিন ২০০ দোকান বসিয়ে দোকানপ্রতি ৫০০ টাকা করে তুলছেন হান্নান, আতিক ও মনুর লোকজন। অভিযোগ আছে পুলিশের বিরুদ্ধেও। সুন্দরবন মার্কেট নিয়ম মেনে না হওয়ায় মেয়র ফজলে নুর তাপস তা ভেঙে দিলেও স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মামুন, ১৭ মামলার আসামি জুম্মন ও ফিরোজ তা দখল করে খাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মার্কেটের ছাদে গোডাউন করে ভাড়া তুলছেন তারা। 

অপরদিকে কাপ্তানবাজারে মুরগি পট্রি হিসেবে পরিচিত স্থানে ডিএসসিসি একযুগ আগে মার্কেট নির্মাণকাজ শুরু করলেও এখনো শেষ হয়নি। কাজ শেষ না করে ঠিকাদার পালিয়ে যাওয়ায় কচুরিপানার জন্ম হয়েছে বেইজমেন্টে। সেখানে মাছের চাষ করছেন অনেকে। চানখারপুলে ডিএসসিসির মার্কেট নির্মাণকাজ একযুগ আগে শুরু হলেও রহস্যজনক কারণে কাজ বন্ধ রয়েছে। সিন্ডিকেটের পরিকল্পনায় মামলাসংক্রান্ত জটিলতায় নির্মাণকাজ আটকে যাওয়ায় যারা আশায় বুক বেধেছিলেন তাদের মধ্যে হতাশা ভর করেছে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App