×

প্রথম পাতা

পাইলট আসিম জাওয়াদের মৃত্যু, প্রধানমন্ত্রীর শোক

চট্টগ্রামে বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত

Icon

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

 চট্টগ্রামে বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত
চট্টগ্রাম অফিস : চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় আহত দুই পাইলটের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে নগরীর ঈশা খাঁ নৌঘাঁটিতে নৌবাহিনী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্কোয়াড্রন লিডার আসিম জাওয়াদ নামের ওই পাইলট মারা যান। বিমান বিধ্বস্ত হয়ে আহত কো-পাইলট উইং কমান্ডার সোহান বর্তমানে বিমান বাহিনীর জহুরুল হক ঘাঁটির হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। এর আগে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে প্রশিক্ষণ বিমানটি নগরীর পতেঙ্গায় কর্ণফুলী নদীতে বিধ্বস্ত হয়। বিধ্বস্ত বিমানটি উদ্ধারে তল্লাশি অভিযান চলছে। তবে এখনো এর খোঁজ মেলেনি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, নগরীর পতেঙ্গায় বিমান বাহিনীর জহুরুল হক ঘাঁটি থেকে রাশিয়ান প্রশিক্ষণ বিমান ওয়াইএকে-১৩০ বিমানটি উড্ডয়ন করেছিল। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিমানটি পতেঙ্গায় নৌবাহিনীর বোট ক্লাবের ওপর দিয়ে উড্ডয়নরত ছিল। হঠাৎ বিমানটির পেছনের দিকে আগুন দেখা যায়। এর পরপরই প্রশিক্ষণ বিমানটি বিধ্বস্ত হয়ে পতেঙ্গা বোট ক্লাবের কাছে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের বিপরীতে এইচ এম স্টিল মিলের সামনে কর্ণফুলী নদীর মোহনায় সাগরে পড়ে তলিয়ে যায়। এ সময় বিমানের পাইলট ও কো-পাইলট প্যারাসুট দিয়ে নেমে যেতে সক্ষম হন। পরে তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়া হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্কোয়াড্রন লিডার আসিম জাওয়াদ মারা যান। নিহত আসিম জাওয়াদ নগরীর পতেঙ্গায় বিমান বাহিনীর জহরুল হক ঘাঁটিতে অফিসার্স আবাসিক এলাকায় থাকতেন। তার বয়স হয়েছিল ৩২ বছর এক মাস ২০ দিন। তিনি স্ত্রী, এক কন্যা, এক পুত্র, বাবা-মা এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। এদিকে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি ইয়াক-১৩০ প্রশিক্ষণ বিমান নিয়মিত প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে গতকাল বৃহস্পতিবার আনুমানিক সকাল ১০টা ২৫ মিনিটে চট্টগ্রামে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ঘাঁটি জহুরুল হক থেকে উড্ডয়নের পর প্রশিক্ষণ শেষে ফেরার সময় কর্ণফুলী নদীর মোহনার কাছে দুর্ঘটনায় পতিত হয়। দুর্ঘটনার পর দুই বৈমানিক উইং কমান্ডার মো. সোহান হাসান খান, পিএসসি এবং স্কোয়াড্রন লিডার মুহাম্মদ আসিম জাওয়াদ জরুরি প্যারাসুট দিয়ে বিমান থেকে নদীতে অবতরণ করেন। বিমানের দুই বৈমানিককে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী ও নৌবাহিনীর উদ্ধারকারী দল এবং স্থানীয় জেলেদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় উদ্ধার করা হয়। দুই বৈমানিকের মধ্যে স্কোয়াড্রন লিডার মুহাম্মদ আসিম জাওয়াদের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় দ্রুত চিকিৎসার জন্য বিএনএস পতেঙ্গায় নেয়া হয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক সর্বাত্মক প্রচেষ্টার পর তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এতে আরো বলা হয়, দুর্ঘটনাকবলিত বিমানটিকে উদ্ধারের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। উল্লেখ্য বিমানটিতে আগুন ধরে যাওয়ার পর বড় ধরনের ক্ষতি এড়াতে দুই বৈমানিক অত্যন্ত সাহসিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে বিমানটিকে বিমানবন্দরের কাছে অবস্থিত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে জনবিরল এলাকায় নিয়ে যেতে সক্ষম হন। সহকারী বিমান বাহিনী প্রধান (পরিকল্পনা) এয়ার ভাইস মার্শাল মু. কামরুল ইসলাম, বিবিপি, বিএসপি, জিইউপি, এনএসডব্লিউসি, এএফডব্লিউসি, পিএসসি ঢাকা থেকে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছান এবং উদ্ধার কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দেন। বিমান বাহিনী ঘাঁটি জহুরুল হকের এয়ার অধিনায়ক এয়ার ভাইস মার্শাল এ কে এম শফিউল আজম, ওএসপি, জিইউপি, এনডিসি, পিএসসি দুর্ঘটনা পরবর্তী কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করছেন। বিমান বাহিনী প্রধানের নির্দেশক্রমে দুর্ঘটনার কারণ উদ্ঘাটনের জন্য ইতোমধ্যে বিমান বাহিনীর একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আসিম জাওয়াদের মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনায় নিহত স্কোয়াড্রন লিডার মুহাম্মদ আসিম জাওয়াদের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। আইএসপিআরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল শেখ আব্দুল হান্নান, বিবিপি, বিইউপি, এনএসডব্লিউসি, এফএডব্লিউসি, পিএসসি মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবাররের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) উপকমিশনার (বন্দর) শাকিলা সোলতানা বলেন, ‘বিমান বাহিনীর বিধ্বস্ত প্রশিক্ষণ বিমানের পাইলট ও কো-পাইলট প্যারাসুট দিয়ে নেমে যেতে সক্ষম হন। তাদের আহত অবস্থায় উদ্ধার করে বানৌজা ঈসা খাঁ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দুপুর ১২টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্কোয়াড্রন লিডার আসিম জাওয়াদের মৃত্যু হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্কোয়াড্রন লিডার আসিম জাওয়াদের অবস্থা প্রথম থেকেই খারাপ ছিল। উদ্ধারের পরেও তার রেসপন্স ছিল না। আহত উইং কমান্ডার সুহান বর্তমানে জহুরুল হক ঘাঁটির মেডিকেল স্কোয়ার্ডনে চিকিৎসাধীন আছেন।’ ‘সোর্ড অব অনার’ পেয়েছিলেন আসিম জাওয়াদ : নিহত স্কোয়াড্রন লিডার আসিম জাওয়াদ সাভার ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ২০০৭ সালে এসএসসি ও ২০০৯ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। ২০১০ সালে বাংলাদেশ এয়ারফোর্স একাডেমিতে (বাফা) যোগদান করেন তিনি। ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে পাইলট অফিসার হিসেবে কমিশন লাভ করেন। তার গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জ জেলায়। তিনি চঞ-৬, খ-৩৯তঅ, ঋ-৭গই, ঋ-ইএ১ বিমান চালিয়েছেন। তিনি ছিলেন ঋ-৭গএ১ এর অপারেশনাল পাইলট ও এলিমেন্ট লিডার। ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে জাতিসংঘ মিশনে তিনি নিয়োজিত ছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ফ্লাইং ইনস্ট্রাক্টরস স্কুল অব বিএএফ-এ স্টাফ ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। পেশাজীবনে কৃতিত্বের জন্য ‘সোর্ড অব অনার’ পান আসিম জাওয়াদ। ফ্লাইং ইনস্ট্রাক্টরস কোর্সে শ্রেষ্ঠত্বের জন্য পেয়েছেন ‘মফিজ ট্রফি’। নৌপুলিশের সদরঘাট থানার ওসি একরাম উল্লাহ জানান, বিধ্বস্ত হয়ে নদীতে পড়া যুদ্ধবিমানটি উদ্ধারে নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছে। ঘটনাস্থলে বিমান বাহিনী, নৌবাহিনীর টাগবোটসহ ডুবুরি, ফায়ার ফাইটার, পুলিশসহ আরও বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা রয়েছেন। চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব মো. ওমর ফারুক জানান, বিমান দুর্ঘটনার পর কর্ণফুলী নদীর মোহনায় দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশে ঘণ্টাখানেক জাহাজ চলাচল বন্ধ ছিল। অবশ্য বেলা সাড়ে ১১টার পর আবার জাহাজ চলাচল স্বাভবিক হয়। এর আগে, ২০১৫ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি এফ-৭ যুদ্ধবিমান বিএএফ ঘাঁটি জহুরুল হক থেকে উড্ডয়নের পর সাগরে বিধ্বস্ত হয়। ওই ঘটনায় পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহমিদের খোঁজ পাওয়া যায়নি। ২০১২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পতেঙ্গা বোট ক্লাবের কাছে একটি বিএএফ যুদ্ধবিমান কর্ণফুলী নদীতে বিধ্বস্ত হয়। সে সময় পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট আহমেদ সানজিদ প্যারাসুট ব্যবহার করে নেমে রক্ষা পান। ২০১১ সালের ১০ অক্টোবর বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিধ্বস্ত হয়। অবশ্য ওই সময় ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মুনতাসিন বিমান থেকে বের হতে সক্ষম হন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App