×

প্রথম পাতা

‘মডেলে’ আগ্রহ নেই বাংলাদেশে

Icon

প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

‘মডেলে’ আগ্রহ নেই বাংলাদেশে
সেবিকা দেবনাথ : দেশজুড়ে বিশেষ করে ঢাকা শহরে ডেঙ্গু একটি ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা তীব্রহারে বাড়ছে- সেই ইঙ্গিত দেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্যও। ইতোমধ্যে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাফল্য দেখিয়েছে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও কলকাতা মডেল। সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও মশা গবেষক অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশারও কেবি (কবিরুল বাশার) মডেল নামে একটি মডেল তৈরি করেছেন। এর আগে গত বছর আগস্ট মাসে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস জানিয়েছিলেন, তারা সিঙ্গাপুরের মডেল অনুসরণ করে মাঠপর্যায়ে মশার আধার নির্মূলে কাজ করছেন। কলকাতা মডেল : ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কলকাতা মডেল বিশ্বে প্রসংশিত হয়েছে। কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে মশা নিয়ন্ত্রণ কমিটি করে এতে ওয়ার্ড কাউন্সিলর, চিকিৎসক ও স্থানীয় ব্যক্তি এবং প্রতিটি কমিটিতে ৬ থেকে ১৫ জন মশককর্মী যুক্ত করা হয়- যাদের সবাইকে মশা নিয়ন্ত্রণের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ওই কমিটির কাছে এলাকার সম্ভাব্য ডেঙ্গুর উৎসস্থলের তালিকা থাকে। প্রতিবছর ১০০ দিনের কর্মসূচি পালিত হয়। এসব কর্মসূচিতে যুক্ত ব্যক্তি ও ওয়ার্ড পর্যায়ে মশককর্মীরা জানুয়ারি থেকে জুন সার্বক্ষণিক নজরদারি করে। আর জুলাইয়ে মশার প্রাদুর্ভাবের মৌসুমে নজরদারি আরো বাড়িয়ে দেয়। প্রতি ওয়ার্ডে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসায় যথেষ্ট চিকিৎসক যুক্ত থাকেন। পরীক্ষায় কারোর ডেঙ্গু ধরা পড়লে সেই তথ্য নির্দিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলর, ডেপুটি মেয়র, সিটির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও প্রধান ভেক্টর কন্ট্রোল কর্মকর্তার মোবাইলে চলে যায়। ওয়ার্ডের কোনো বাড়িতে চৌবাচ্চা, কুয়া বা ডোবা আছে- সেই হিসাবও ওয়ার্ড কার্যালয়ে সংরক্ষিত থাকে। এসব বাড়িতে কবে এডিসের লার্ভা জšে§ছিল, সেই তথ্যভাণ্ডারও থাকে। কারোর ডেঙ্গু হওয়ার তথ্য পেলে ওয়ার্ডের মশা নিয়ন্ত্রণ কমিটির মাঠকর্মীরা ওই বাড়ি ও আশপাশের ৫০টি বাড়িতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। কোথাও লার্ভা পাওয়া গেলে সেখানে লার্ভানাশক দেয়া হয়। এভাবেই মশার উৎস সমূলে নিধন করা হয়। ওয়ার্ড কমিটির ওপর থাকে বরো কমিটি (কয়েকটি ওয়ার্ড মিলে একটি বরো)। এখানেও মশা নিয়ন্ত্রণ কমিটি থাকে। কমিটিতে একজন কীট নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা ও চিকিৎসক থাকেন। প্রতিটি বরোতে দুটি করে র‌্যাপিড অ্যাকশন টিম থাকে। তারা শিক্ষাকেন্দ্র, সরকারি অফিস, বিপণিবিতান, থানা, বেসরকারি বড় স্থাপনাসহ নানা স্থানে নজরদারি করে। কোথাও মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল পেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানায় ও জায়গাটি পরিষ্কার করে দেয়। কেউ লার্ভা পাওয়ার স্থানের দায় না নিলে জমির দলিল দেখে মালিকানা চিহ্নিত করে আবর্জনা পরিষ্কারের খরচ তার আয়কর নথির সঙ্গে যুক্ত করে দেয়া হয়। আয়কর দিতে গেলে তাকে জরিমানার অর্থও পরিশোধ করতে হয়। কেউ ভবন নির্মাণ করতে গেলে নির্মাণাধীন ভবন কীভাবে মশামুক্ত রাখা যাবে সেই নির্দেশিকা দেয়া হয়। এসব ভবন হঠাৎ পরিদর্শনে যায় র‌্যাপিড অ্যাকশন টিম। প্রথম দফায় লার্ভা পেলে জরিমানা করা না হলেও পরের বার এক লাখ রুপি জরিমানা করা হয়। মালয়েশিয়ান মডেল : মালয়েশিয়ান মডেলের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- জনসম্পৃক্ততা; ব্যক্তি, সমাজের নেতা এবং বিভিন্ন সংস্থার সক্রিয় অংশগ্রহণ। এর মধ্য দিয়ে দায়িত্বশীলতা, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বাস্তবায়ন ও মশার সম্ভাব্য প্রজনন স্থানগুলো চিহ্নিত করার জন্য জনগণকে ক্ষমতায়ন করা হয়। শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থাও আছে এই মডেলে। জনসচেতনতামূলক প্রচারাভিযানের ওপর জোর দিয়ে, বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে জনগণকে ডেঙ্গু প্রতিরোধ, লক্ষণ ও প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে শিক্ষিত করা হয়েছে। এছাড়া দেশটিতে কোনো ডেঙ্গুরোগী হাসপাতালে ভর্তি হলে রোগী কোনো এলাকা থেকে এসেছে সেই তথ্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সিটি করপোরেশনকে দেয়। সিটি করপোরেশন রোগীর ওই বাড়িকে নির্দিষ্ট করে এর এক থেকে দুই কিলোমিটার পরিধির মধ্যে মশা বিস্তার করার মতো ড্রেন, নালা ও বাড়িতে ওষুধ দিয়ে লার্ভা সমূলে ধ্বংস করে দেয়। এ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেশটি ডেঙ্গুর বিস্তার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমাতে সক্ষম হয়েছে। সিঙ্গাপুর মডেল : কঠোর অনুশাসনের মাধ্যমে সিঙ্গাপুর সরকার জনগণের শতভাগ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সফলতা প্রমাণ করেছে। এছাড়া ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হার প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে পেরেছে। দেশটির কোনো এলাকায় ডেঙ্গুরোগী শনাক্ত হলে সেই এলাকায় তাৎক্ষণিকভাবে ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্টাল এজেন্সি (এনইএ) টিম যায়। কোনো জায়গায় ডেঙ্গু মশার বংশ বিস্তারের উৎস বা মশা আছে তা শনাক্ত হলে তাৎক্ষণিকভাবে ৫ হাজার সিং ডলার (বাংলাদেশি ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা) জরিমানা করা হয়। অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী গ্রেপ্তার করে কোর্টে চালান করা হয় এবং ক্ষেত্র বিশেষে ৩ মাস পর্যন্ত জেলও হয়। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে কোনো শিল্পকারখানা ও দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হোটেল রেস্টুরেন্ট, কমিউনিটি ক্লাব, প্রজেক্ট এলাকায় ডেঙ্গু মশার উৎস স্থল অথবা ডেঙ্গু মশা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের ওপর একই ধরনের কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়। জেল-জরিমানার ভয়ে সিঙ্গাপুরে সবাই ডেঙ্গু প্রতিরোধ কার্যক্রমে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা নিয়ে অংশ নেয়। কেবি মডেল : নিজের মডেল সম্পর্কে অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, বাংলাদেশের ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জন্য আমরা একটি মডেল তৈরি করেছি। এই মডেল অনুযায়ী ৫ বছর কার্যক্রম চালাতে পারলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ হবে। এ বছর আনুমানিক ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। আমাদের এই মডেলটি বাস্তবায়নে যে ব্যয় হবে, তা মোট নিয়ন্ত্রণ ব্যয়ের চেয়ে অনেক কম। টানা এক বছর এই মডেল অনুসরণ করে সব বাড়িকে পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখলে আমাদের দেশে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলে। কেবি মডেল অনুযায়ী, প্রতিটি এলাকাকে কয়েকটি ব্লকে ভাগ করেতে হবে, আর প্রতি ব্লকে থাকবে ৫শ থেকে ১ হাজার বাড়ি। যা একজন স্বাস্থ্যকর্মী ১৫ দিন পর পর পর্যবেক্ষণ করবেন। বাড়ির কোথাও এডিসের উৎসস্থল থাকলে তা বাড়ির মালিককে জানাবেন। পর্যবেক্ষণের পর কোনো বাড়িতে এডিস মশা বা মশার উৎসস্থল পাওয়া না গেলে ওই বাড়িতে সবুজ স্টিকার, মশা বা উৎসস্থল পাওয়া গেলে হলুদ স্টিকার আর কোনো বাড়িতে ৩ বার এডিস মশা বা মশার উৎসস্থল পাওয়া গেলে ওই বাড়িতে লাল স্টিকার লাগিয়ে দেয়া হবে। এরপর সরকার ওই বাড়ির মালিকের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিবে। স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে ডেঙ্গু টেস্ট করার কিট থাকতে হবে। পরীক্ষা করিয়ে কারোর ডেঙ্গু পজিটিভ পাওয়া গেলে সিটি করপোরেশনের চিকিৎসকের সঙ্গে তার সংযোগ করিয়ে দিতে হবে। ওই চিকিৎসক নিয়মিতভাবে রোগীর খোঁজখবর রাখবেন এবং চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্র দেবেন। প্রতিটি ব্লকে একজন করে ক্লিনার থাকবে। তিনি আটকে যাওয়া ড্রেন, ডোবা ও নর্দমার পানি প্রবাহিত রাখার পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে পড়ে থাকা পাত্র, যেখানে এডিস মশা জন্মানোর আশঙ্কা আছে, সেগুলো পরিষ্কার রাখা। প্রতিটি ব্লকে ২ জন করে মশককর্মী থাকবেন, যারা সকালে লার্ভিসাইড এবং বিকেলে অ্যাডাল্টিসাইড স্প্রে করবেন। প্রতি ৩ দিন পর অবশ্যই একটি এলাকায় লার্ভিসাইড এবং অ্যাডাল্টিসাইড স্প্রে নিশ্চিত করতে হবে। একটি ওয়ার্ডের জন্য একজন সুপারভাইজার থাকবেন। তিনি তার ওয়ার্ডের স্বাস্থ্যকর্মী ও মশককর্মীদের নিয়মিত কাজ নিশ্চিত করবেন। তার স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজের মাসিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন ওয়ার্ড কমিটিকে দেবেন। প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন করে চিকিৎসক সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে থাকবেন। তিনি সুপারভাইজারের কাছ থেকে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা, তার প্রজননস্থল, ঘনত্ব, ডেঙ্গু রোগী প্রভৃতি তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করবেন। ডেঙ্গুরোগীর চিকিৎসা ও খবরাখবর রাখবেন। তিনি তার আঞ্চলিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কাছে নিয়মিত মাসিক সভায় প্রতিবেদন দাখিল করবেন। এছাড়া মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত কীটনাশক জনগণের হাতের নাগালে আনতে হবে। কীটনাশক রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সহজীকরণ করতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও ড. কবিরুল বাশারের করা (কেবি) মডেলের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি কপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম গতকাল ভোরের কাগজকে বলেন, এ মডেল ডেঙ্গু নিধনে কার্যকর হবে বলে আমার বিশ্বাস। তিনি বলেন, ডিএনসিসিতে এই মডেল প্রয়োগের ব্যাপারে এখনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি। তবে বেশ কয়েকটি ডেঙ্গু নিধন কর্মসূচিতে কবিরুল বাশার (কেবি) মডেল নিয়ে আমার সঙ্গে আলোচনা করেছেন। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কলতাকাসহ বেশ কিছু দেশে এই ধরনের মডেলে সফলতা মিলেছে। তাই কি প্রক্রিয়ায় এটি ডিএনসিসিতে ‘প্রয়োগ’ করা যায়- এ বিষয়ে কর্মপদ্ধতি ঠিক করতে খুব শিগগিরই আমরা বসব। মেয়র আরো আরো বলেন, ২০১৯ সালে ডেঙ্গু নিধন কার্যক্রম প্রক্রিয়ায় এই মডেলের কিছু অংশ অন্তর্ভুক্ত করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছিলাম। এবারের নতুন কার্যপদ্ধতিতেও এটি যুক্ত করব। তবে ডেঙ্গু সচেতনতা বাড়াতে আমরা এবার ‘সচেতনতা’ কার্যক্রমের প্রতি বেশি নজর দিচ্ছি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ, ওরস্যালাইনের প্রসার, টিকাদানের মতো বিষয়ে বাংলাদেশের সাফল্যের ইতিহাস আছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে- এমন কোনো একটি মডেল ধরে যদি কাজ করি ও জনগণকে সম্পৃক্ত করতে পারি- তাহলে আমাদেরও সাফল্য আসবে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App