×

প্রথম পাতা

ভোটে থেকেই কেন্দ্রকে দায় দিচ্ছেন বিএনপির বহিষ্কৃতরা

Icon

প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ভোটে থেকেই কেন্দ্রকে দায়  দিচ্ছেন বিএনপির বহিষ্কৃতরা
রুমানা জামান : বহিষ্কারের মতো সর্বোচ্চ কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েও উপজেলা নির্বাচনে ভোটমুখী তৃণমূল নেতাদের ঠেকাতে পারছে না বিএনপি। কেন্দ্রের বহিষ্কারাদেশ আমলে না নিয়ে নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত অনড় থাকবেন জানিয়ে তৃণমূল নেতারা বলছেন, ‘নির্বাচন বর্জন করে স্থানীয় রাজনীতিতে টিকে থাকা কঠিন। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে; অস্তিত্ব রক্ষায় ভোটে যাওয়া ছাড়া বিকল্প পথ নেই’। তারা কেন্দ্রীয় নেতাদের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলছেন, দল প্রতিবারই নির্বাচন বর্জন করছে, এভাবে আর কতদিন? এই দলে থেকে লাভ কী? নির্বাচনে না গেলে স্থানীয় রাজনীতিতে আমরা টিকে থাকব কীভাবে? বিএনপির দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেয়ায় তিন দফায় ৮০ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নেয়ায় তাদের দলীয় সব পদ কেড়ে নেয়া হয়েছে। বহিষ্কারের চিঠিতে বলা হয়েছে, তারা সরকারের সঙ্গে ‘আঁতাত’ করেছেন। এটা মেনে নেয়া হবে না। তবে এতকিছুর পরও ৭৯ জনই ভোটের মাঠে অটল রয়েছেন। একজন নারী ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী কেবল ভোট থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। পরের ধাপে যে ১৬১টি উপজেলায় ভোট হতে যাচ্ছে, সেখানেও মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে দলের কারণ দর্শানোর নোটিস পেয়েছেন বিএনপির অন্তত ৬৩ জন নেতা। মাত্র ১৬ জন নেতা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেছেন। উপজেলা ভোটের সার্বিক বিষয়ে মনিটরিংয়ের দায়িত্বে থাকা নেতাদের ধারণা, উপজেলা নির্বাচনের শেষ ধাপ পর্যন্ত বহিষ্কারের সংখ্যা তিনশতে গিয়ে ঠেকতে পারে। হিসাবে দেখা যাচ্ছে, প্রার্থীদের থামাতে বিএনপির নেতৃত্বের তৎপরতা তেমন একটা কাজে লাগেনি। ভোটের মাঠ থেকে তৃণমূল নেতাদের ফেরাতে কেন্দ্রের সব চেষ্টাই ভেস্তে গেছে। গণহারে দল থেকে এই বহিষ্কার তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, দল আরো দুর্বল হবে কিনা; সে আলোচনা রয়েছে বিএনপিতে। দলটির নেতারা বলছেন, খুব কমসংখ্যক প্রার্থীকে বুঝিয়ে নির্বাচন থেকে ফেরানো যাচ্ছে। তারা দলীয় নির্দেশনা অমান্য করার পাশাপাশি সাংগঠনিক ব্যবস্থাকেও আমলে নিচ্ছেন না। এমনকি প্রার্থীদের নির্বাচনবিমুখ করতে কেন্দ্রীয়, বিভাগীয় ও জেলার নেতাদের বিশেষভাবে দায়িত্ব দেয়া হলেও সেটিও খুব একটা কাজে লাগছে না। এ নিয়ে দলের নীতিনির্ধারকরা অস্বস্তিতে পড়েছেন। তবে সিনিয়র নেতারা তাদের কঠোর অবস্থান জানান দিয়ে প্রকাশ্যে বলছেন- দলীয় সিদ্ধান্ত যারা অমান্য করেছেন; শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে তাদের বহিষ্কার করা ছাড়া বিকল্প নেই। তাই বহিষ্কারের ফলে সাংগঠনিক ভিত্তি কিছুটা দুর্বল হতে পারে, যা দলকে উপেক্ষা করতে হচ্ছে সচেতনভাবে। উপজেলা নির্বাচন নিয়ে তৃণমূলে আগ্রহের পরও ভোট বর্জনে কেন্দ্র কেন অনড়? এমন প্রশ্নে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের জবাব- গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় দেশের মানুষ বিএনপির ডাকে ৭ জানুয়ারি ভোট বর্জন করেছিল। জনগণের সেই দাবি এখনো পূরণ হয়নি। এ অবস্থায় উপজেলা নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। বিএনপির এই সিনিয়র নেতার পর্যবেক্ষণ- ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসবে, ততই কর্মীরা (বিএনপির) কেটে পড়বেন, যেহেতু আওয়ামী লীগের সঙ্গে নির্বাচন করছেন। ফলে কর্মীদের টিকিয়ে রাখা, বাঁচিয়ে রাখার মতো সামর্থ্য প্রার্থীর থাকবে না। কারণ, পরিবেশ তো সে জায়গায় নেই। অন্যদিকে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উদ্ধৃতি দিয়ে নেতাকর্মীদের আহ্বান জানিয়ে বলছেন, ‘তথাকথিত’ উপজেলা নির্বাচন বর্জন করুন। ভোটকেন্দ্রে যাবেন না। জনগণকেও বর্জন করতে উৎসাহিত করুন। গণতন্ত্রের পক্ষ নিন, জনগণের সঙ্গে থাকুন, জনগণকে সঙ্গে রাখুন। গতকাল রবিবার ভোট বর্জনের আহ্বানে রাজধানীতে লিফলেট বিতরন করেছেন তিনি। বহিষ্কৃত নেতারা ভোটে থাকতে নানা যুক্তি দিচ্ছেন- এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে রিজভী আহমেদ বলেন, যারা অশুভ শক্তির সঙ্গে আঁতাত করে নির্বাচনে যাচ্ছেন, তারা নিজেদের আত্মপক্ষ সমর্থনে এ রকম খোঁড়া যুক্তি দিতেই পারেন, সে বিষয়ে কিছু বলার নেই। এদিকে নির্বাচন বর্জন ও গণহারে বহিষ্কার নিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যেও রয়েছে অসন্তুষ্টি। অনেকেই নিজ এলাকায় তৃণমূল কর্মীদের অবস্থান পোক্ত করতে ভোটে অংশ নেয়ার পক্ষে ছিলেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থায়ী কমিটির কয়েকজন নেতা প্রায় একই সুরে বলেন, জাতীয় নির্বাচনের পর মাঠে সরকারবিরোধী তেমন কোনো আন্দোলন কর্মসূচি নেই। এখন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা অলস বসে কী করবেন? আর উপজেলা নির্বাচন করলে নেতাকর্মীরা খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারবেন। এসব নেতাদের ভাষ্য- জাতীয় রাজনীতি ও স্থানীয় রাজনীতির মধ্যে তফাত আছে। বাস্তবতাও ভিন্ন। মাঠের নেতারা আর কত মার খাবে! তাদের রক্ষা করতে হলেও বিএনপির উচিত ছিল কৌশলে তাদের ভোটের অনুমতি দেয়া। উপজেলা নির্বাচন প্রসঙ্গে বিএনপির এক সিনিয়র নেতা বলেন, এ নির্বাচনকে ঘিরে কেন্দ্র ও তৃণমূলের মধ্যে দ্ব›দ্ব এবং দূরত্ব দুটিই বাড়ছে। এই নেতার ভাষ্য- ‘শঙ্কা হচ্ছে শেষ পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে জনপ্রতিনিধিত্বশীল নেতাদের ধরে রাখা না কঠিন হয়ে পড়ে’! দল থেকে বহিষ্কৃত বিএনপির কয়েকজন প্রার্থী গতকাল বুধবার ভোরের কাগজকে বলেন, জাতীয় আর স্থানীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে তাদের জনপ্রিয়তা তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে। এছাড়া আওয়ামী লীগের একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকবেন। ফলে জিতে আসা কঠিন হবে না। এ কারণে বহিষ্কার হয়েও তারা শেষ পর্যন্ত ভোটে থাকতে চান। এর মধ্যে একাধিক প্রার্থী আছেন যারা তৃণমূলের মানুষের চাপে ভোটে দাঁড়িয়েছেন। তারা আগে থেকেই জনপ্রতিনিধি। তারা এখন দূরে সরে থাকতে নারাজ। একজনের দাবি- কেন্দ্রীয় নেতারা তৃণমূলের পরিস্থিতি জানেন না; বা জানতে চান না। অন্যজনের প্রশ্ন, বারবার ভোট বর্জন করে, এমন দলে থেকে লাভটা কী? কিছু করার নেই, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে : ভোটে থাকতে বহিষ্কৃত নেতাদের যুক্তি- দ্বাদশ নির্বাচনের আগে আন্দোলন চলাকালে তৃণমূলের বিপুল পরিমাণ নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হয়েছেন। বহুকষ্টে তাদের জামিন নেয়া গেলেও কোর্ট থেকে এমন একজন জামিনদার চাওয়া হয় যিনি সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি। এক্ষেত্রে চেয়ারম্যান-মেম্বারদের বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। অথচ, বেশ কয়েক বছর দল নির্বাচনের বাইরে থাকার কারণে দলের বা দল সমর্থিত গণ্যমান্য পর্যায়ের এমন কোনো ব্যক্তি নেই যারা তৃণমূল কর্মীদের দুঃসময়ে সাপোর্ট দিতে পারেন। তাছাড়া এই মুহূর্তে সরকারের জুলুম অত্যাচার থেকে রক্ষা পেতেও অবস্থান পোক্ত থাকা দরকার। বহিষ্কৃত একাধিক নেতার ভাষ্য- দলের কথা মেনে এভাবে টানা ভোট বর্জন করতে থাকলে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনীতি করা তাদের জন্য ‘কঠিন’ হয়ে যাবে। বহিষ্কৃত নেতাদের মতে, ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনে অংশ না নেয়াটা ছিল তাদের দলের ‘ঐতিহাসিক ভুল’। যে ভুলের খেসারত আজো দিচ্ছে গোটা দল। সবচেয়ে বেশি দিচ্ছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। তাই নির্বাচনে অংশ নিয়ে এক অর্থে তারা দলকেই রক্ষা করছেন। একটা সময় দল এই ভুল বুঝতে পারবে। তাইতো তারা এখন দলের এই বহিষ্কারাদেশকেও উপেক্ষা করে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। এ নিয়ে তারা ভাবছেন না। তাদের লক্ষ্য ভোটারের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং জয়ী হওয়া। এর মধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তারা বলছেন, নির্বাচনে জয়ী হলে দলই তাদের খুঁজে বের করে ফের দায়িত্ব দেবে। ভোটে থেকে দলকে দুষছেন বহিষ্কৃতরা : সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে ভোট করে আগেও জিতেছিলেন গণেন্দ্র চন্দ্র সরকার। এবারো ভোটে আছেন। বিএনপি ভোটে না থাকায় তিনি এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী। গণেন্দ্র ছিলেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি। বহিষ্কারাদেশ পেয়েও তিনি দমে যাননি। বরং ভোটের প্রচারে নেমে কেন্দ্রীয় নেতাদের তীব্র সমালোচনা করছেন। তার সঙ্গে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যেই ভোটের প্রচারে আছেন। এমনকি দায়িত্বশীলরাও সামনে না এসে পেছন থেকে তাকে সহযোগিতা দিচ্ছেন। জানতে চাইলে গণেন্দ্র বলেন, আমার ৫০ বছরের রাজনৈতিক জীবন। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে তৃণমূলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা কেন্দ্রে বসে নির্দেশনা দেয়। বাস্তবে মাঠের খবর নেয় না। তিনি অভিযোগ করেন, তৃণমূলের কর্মীদের থেকে কেন্দ্রীয় নেতারা দূরে সরে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, তারা দলকে ধ্বংস করে দিচ্ছেন। কেন্দ্রীয় নেতাদের বহিষ্কারের এই হঠকারী সিদ্ধান্তকে আমি মানি না। আমি নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাব। ২০১১ সালে নাটোরের নলডাঙ্গার ব্রহ্মপুর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে জয় পাওয়া সরদার আফজাল হোসেন এবার উপজেলা চেয়ারম্যান পদে লড়ছেন কৈ মাছ প্রতীক নিয়ে। বিএনপির ভোট বর্জনের সিদ্ধান্তে বিরক্ত এই নেতা বলেন, বারবার নির্বাচনে যাচ্ছে না, এই দলে থেকে লাভ কী? নির্বাচনে না গেলে আঞ্চলিক রাজনীতিতে আমরা টিকে থাকব কীভাবে? তিনি বলেন, দল কী কারণে আমাকে শোকজ করে, বহিষ্কার করে আমিতো বুঝি না। আমি এখন কোনো পদ পদবিতে নেই, সদস্যও নেই। তিন বছর আগে সব বাদ দিয়েছি। নাটোরের নলডাঙ্গায় চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী আফজাল হোসেন বিএনপির ভোট বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, ‘এমন দলে থেকে লাভ কী!’ দলত্যাগী নেতা বললেন, বিএনপি একটি ব্যবসায়িক দল : বরিশালের আগৈলঝাড়ায় দলের প্রতি ক্ষোভ ও নানা অভিযোগ এনে বাগধা ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক কে এম রেজাউল ফয়েজ রেজা দুধ দিয়ে গোসল করে দলত্যাগ করেছেন। দলত্যাগী এই নেতা বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে বাগধা ইউনিয়ন পরিষদে দলীয় প্রতীকে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনও করেছিলেন। গত শুক্রবার আগৈলঝাড়া প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে পদত্যাগের পর নিজ বাড়িতে গিয়ে দুধ দিয়ে গোসল করেন। তিনি বলেন, আমি দীর্ঘসময় একটি দলের সঙ্গে ছিলাম। এটা কোনো রাজনৈতিক দল নয়; ব্যবসায়িক দল। যারা বিএনপি করে তারা ব্যবসার জন্য রাজনীতি করে। নিজের ও ব্যক্তির জন্য রাজনীতি করে। তাই অরাজনৈতিক দল থেকে নিজেকে মুক্ত করেছি। পরিপূর্ণ পবিত্রতার জন্য দুধ দিয়ে গোসল করেছি। এর আগে দলের নীতি, আদর্শ আর নেতাদের উদাসীনতা, অদক্ষতা ও নিষ্ক্রিয় কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ হয়ে একই ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক লাভলু ভাট্টিও দলের পদ ও প্রাথমিক সদস্য পদ থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App