×

প্রথম পাতা

তীব্র গরমে লোডশেডিং চরমে

Icon

দেব দুলাল মিত্র

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

তীব্র গরমে লোডশেডিং চরমে
চলমান বিদ্যুৎ সংকটে জনজীবনে দুর্ভোগের শেষ নেই। দিনে দিনে বাড়তে থাকা লোডশেডিংয়ে মানুষ অতিষ্ঠ। গ্রামীণ এলাকার ৮০ ভাগ মানুষই লোডশেডিংয়ের কবলে। উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায় দিনে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। লোডশেডিংয়ের কারণে এই বোরো মৌসুমে কৃষকরাও জমিতে সেচ দিতে পারছে না। সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং হচ্ছে ময়মনসিংহ অঞ্চলে। বরিশাল অঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা কম। দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) প্রয়োজনের চেয়ে সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম পাচ্ছে। লোডশেডিংয়ের কারণে শিল্পকারখানার উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। খোদ ঢাকায়ও আগের চেয়ে বেড়েছে লোডশেডিং। 

বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকায় চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুতের স্বল্পতা রয়েছে। উপায় না থাকায় ‘সামান্য’ লোডশেডিং করতে হচ্ছে। চলতি মৌসুমে সাড়ে ১৭ হাজার বিদ্যুৎ চাহিদার বিপরীতে সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ২৩৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে একদিন। অন্য সময় দিনে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ১৩ হাজার থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। ফলে বড় ধরনের বিদ্যুৎ ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপাদন সক্ষমতা বেশি থাকলেও চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে না পারাই সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। বিদ্যুৎ ঘাটতির প্রকৃত তথ্য বিদ্যুৎ বিভাগ স্বীকার করছে না। বগুড়ার নন্দীগ্রাম এলাকার বাসিন্দা এম এম রানা জানান, একদিকে প্রচণ্ড গরম, অন্যদিকে লোডশেডিংয়ে জনজীবন অতিষ্ঠ। নিয়মিত ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা, কখনো কখনো ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। এই গরমে বৃদ্ধ ও শিশুদের নিয়ে ঘরে থাকা দায়। এরপর বিদ্যুতের অভাবে সেচে পানি দেয়া যাচ্ছে না। বোরো মৌসুমে ক্ষেতে পানি দিতে না পারায় ফসলের ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় বিদ্যুৎ থাকলেও লো-ভোল্টের কারণে পানির মেশিন চালানো সম্ভব হয় না। 

বগুড়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর মহাব্যবস্থাপক মোনয়ারুল ইসলাম ফিরোজী জানিয়েছেন, চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুতের সরবরাহ না থাকায় পল্লী বিদ্যুৎ থেকেও পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। আগের চেয়ে আমরা এখন গড়ে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ কম পাচ্ছি। এ কারণে প্রতিদিন কমপক্ষে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করতে বাধ্য হচ্ছি, আমাদের আর কোনো উপায় নেই। বগুড়ার মতো একই অবস্থা গাইবান্ধা জেলায়। 

গোবিন্দগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা মাকসুদার রহমান জানান, ৮ থেকে ১২ ঘন্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। কৃষিকাজেও সেচ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। সেচের অভাবে অনেকের ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। ময়মনসিংহ, ফেনী, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, রংপুর, রাজশাহী, দিনাজপুর, নাটোরসহ দেশের অন্য জেলাগুলোতেও লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে জনজীবন। কোনো কোনো এলাকায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ লোডশেডিং হচ্ছে। কৃষিক্ষেত্রে সেচ ব্যবস্থা অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। বিদ্যুৎ না পেয়ে কৃষকরা বিকল্প উপায়ে সেচের ব্যবস্থা করছেন বলে জানা গেছে। এতে তাদের ফসল উৎপাদন খরচ বেশি পড়ছে। 

ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির উপমহাব্যবস্থাপক বলাই মিত্র জানান, ফেনী উপজেলায় ২৫ থেকে ৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চাহিদা থাকলেও পল্লী বিদ্যুৎ ৫ থেকে ৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাচ্ছে। লোডশেডিং না দিয়ে উপায় নেই। আরইবির কর্মকর্তারা বলছেন, আরইবির বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট। বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াট। এর ফলে দেশের এক বৃহৎ অংশ লোডশেডিংয়ের আওতায় থাকে। রাজধানীতেও লোডশেডিং চলছে। নগরীর অনেক এলাকায় দিনে ও রাতে লোডশেডিংয়ে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। এর কারণ হিসাবে ঢাকার দুই বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ডিপিডিসি ও ডেসকো বলছে, ঢাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। কোনো কোনো এলাকায় ট্রান্সমিটার ফল্ট করলে, গ্রিডে সমস্যা হলে বা অন্য কারিগরি ত্রুটি হলে লোডশেডিং করতে হয়। 

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। এবার তাপদাহের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা আরো বেড়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভাগ প্রস্তুতি নেয়নি। ২৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা কাজে আসছে না। জ্বালানির অভাবে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র অলস পড়ে আছে। এভাবে চলতে থাকলে উৎপাদনের ঘাটতি এবং জনগণের ভোগান্তি কখনোই কমানো সম্ভব হবে বলে আমি মনে করি না। সরকার মূল্য বাড়িয়ে চলছে, কিন্তু গ্রাহককে বিদ্যুৎ দিতে পারছে না। লোডশেডিং সমতাভিত্তিক হচ্ছে না। ভোক্তাকে বিদ্যুৎ না দিয়েও ডিমান্ড মাশুল আদায় করা হচ্ছে। 

পিডিবি সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি সংকটের কারণে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে পর্যাপ্ত উৎপাদন হচ্ছে। তবে গ্যাস ও তেল চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদনে ঘাটতি রয়েছে। তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি রয়েছে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পিডিবির বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে ১১ হাজার ২৪০ মেগাওয়াট। এখন বিদ্যুৎ পাচ্ছে ৫ হাজার ৫১৯ মেগাওয়াট। 

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এজাজ হোসাইন বলেন, জ্বালানি খাতে সরকারের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। জ্বালানি সংকট সৃষ্টি হওয়ার পরও একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। বন্ধ থাকার পরও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে টাকা দিতে হচ্ছে। ফার্নেস অয়েল বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো বন্ধ করে দেয়া উচিত। ২৬ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার প্রয়োজন নেই। আমাদের ১৫ থেকে ১৭ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতা ও উৎপাদন থাকলেই হবে। এভাবে বিদ্যুৎ খাতে অপচয় হচ্ছে। অথচ আইএমএফ অপচয় রোধে কোনো কথা বলছে না। তারা গ্যাস, বিদ্যুতে ভর্তুকি থেকে সরে আসার পরামর্শ দিচ্ছে। সারাবিশ্বে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৫ শতাংশের বেশি ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় না। অথচ বাংলাদেশে এখনো ৩০ শতাংশের বেশি ফার্নেস অয়েল ব্যবহার হচ্ছে- যা অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App